মাইকেল এক চলমান অভিজ্ঞতা

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ১৭: ৩৭
ছবি: সংগৃহীত

প্রাচ্যদেশে প্রতিমার বিশেষ ভূমিকা আছে, হয়তো ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই এই প্রতিমাকাণ্ড ঘটেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিমার অবসান ঘটলেও নিকট ও দূরপ্রাচ্যে এবং ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় আকছার রয়ে গেছে। প্রতিমাতত্ত্ব একটা মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাও, তাই আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিমাকে বিস্তার করি, লালন করি; সাকার না-হলেও নিরাকার প্রতিমার। এমনকি যখন আমরা কাউকে স্মরণ করি, কিংবা ভালোবাসি নিজের অগোচরে তাকে এক ধরনের স্থির প্রতিমায়ও পরিণত করি। আমরা মনে করি প্রতিমা করে তুলতে না পারলে বুঝি সে বড়ো হয় না, ভালোবাসা ও ভক্তি পূর্ণতা পায় না। এতে আরও সুবিধাও আছে। প্রতিমাকে প্রশ্ন করা যায় না, পরিবর্তন তো নয়ই। ইতিহাসের সুবিধাজনক স্থানে তাকে স্থির করে রেখে স্মৃতি ও শ্রুতিতে সেটাকেই ‘জ্ঞান’ হিসেবে চালিয়ে দিই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মতো মাইকেল মধুসূদন দত্তও এমন আমাদের কাছে।

কয়েকটা ট্যাগ দিয়ে আমরা মাইকেলের পরিচয়কে স্থির করে রেখে দিয়েছি। তিনি বাংলা নবজাগরণের উজ্জ্বল প্রতিভূ, আধুনিক কবিতার উদ্গাতা, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক, প্রথম মহাকাব্যের রচয়িতা, প্রথম ট্র্যাজেডিকার ও সনেটের প্রবর্তক ইত্যাদি। মাইকেলের এসব পরিচয় মিথ্যা নয়, কিন্তু এ দিয়ে তাঁকে স্থির করে নিলে কবির প্রতি অবিচারও করা হয়। কারণ এসবেও মাইকেলের সম্পূর্ণ পরিচয় ফুটে ওঠে না। কেননা কৃতিত্বের পরিচয় মানুষের একমাত্র পরিচয় নয়; নিজের ভিতরকার চলমান দ্বন্দ্ব এবং অমীমাংসিত জিজ্ঞাসাও তার বিশিষ্ট দিক। মাইকেলের ক্ষেত্রে ওই একই কথা খাটে। নিজের সৃষ্টিকর্মে যেমন, জীবনের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা ও জিজ্ঞাসাও মাইকেলকে সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। তাই তিনি উনিশ শতকের প্রতিভামাত্র নন, বরং এমন এক মানসিক অবস্থার নাম, যেখানে উচ্চাকাক্সক্ষা নিজের শিকড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যেখানে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন আত্মপরিচয়ের গভীর সংকটে পরিণত হয়, এবং যেখানে প্রত্যাবর্তন কখনো শেষকথা হয়ে ওঠে না। এই কারণেই বলতে পারি যে মাইকেলের মৃত্যু হলেও, কিন্তু আমাদের জীবনের নানা স্তরে, নানা ভাবে মাইকেল ক্রিয়াশীল আছেন।

উনিশ শতকের গোটা সময়টা ছিল বাঙালির কাছে ভাঙন, দ্বন্দ্ব ও রূপান্তরের কাল। ঔপনিবেশিক শাসন কেবল বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো বদলায়নি; বদলে দিয়েছিল জ্ঞানের ভাষা, মর্যাদার ভাষা, এমনকি স্বপ্ন দেখার ভাষাকেও। ইংরেজি তখন কেবল ঔপনিবেশকদের কিংবা বিদেশিদের ভাষা ছিল না; এটি আধুনিকতা ও খ্যাতির প্রতিশব্দ হয়ে ওঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে অনেক শিক্ষিত বাঙালির মতো মাইকেলও প্রথমে বিশ্বাস করেছিলেন যে বিশ্বসাহিত্যে আসন পেতে হলে মাতৃভাষাকে অতিক্রম করতে হবে। এই বিশ্বাস তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং সময়ের চাপড়ের মিলিত ফল। কিন্তু ইতিহাসের ট্র্যাজেডি এখানেই শুরু হয় যে, যেখানে মানুষ মনে করে সে নিজের পথ বেছে নিচ্ছে, অথচ সে একটি বৃহত্তর কাঠামোর ভেতরে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করছে। মাইকেলের ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চার প্রথমপর্ব সেই কাঠামোরই অংশ। সেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু আত্মপরিচয়ের নিশ্চয়তা ছিল না; স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু নিজের ভাষিক শিকড়ের সঙ্গে স্থিত সম্পর্ক ছিল না। তাই বলে মাইকেলের জীবন কোনো সরল ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং তা এক ধীর, জটিল ও বেদনাময় উপলব্ধির ইতিহাস। তিনি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়, তা মানুষের চিন্তার গভীরতম গঠন। যে-ভাষায় মানুষ স্বপ্ন দেখে, সে-ভাষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে উন্নত চিন্তা যেমন করা যায় না, তেমনি বিশ্বজনীন হওয়াও যায় না। এই উপলব্ধি তাঁকে ধীরে ধীরে মাতৃভাষার দিকে ফিরিয়ে আনে, কিন্তু সেই ফিরে আসাটাও তাঁর কোনো সরল প্রত্যাবর্তন ছিল না। তা ছিল ভাঙনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক পুনর্নির্মাণ, আর এই পুনর্নির্মাণের শ্রেষ্ঠ ফল মাইকেলের সাহিত্যকর্ম। ফলে দেখা গেল, মাতৃভাষায় তিনি যা লিখেছেন তা-ই সোনার ফসল হয়ে উঠেছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিতও তিনি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তার চেয়ে বড়ো কথা নিজের জীবনবীক্ষা এবং জীবনচিন্তাকে রূপান্তরের ভিতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া।

ধরা যাক মেঘনাদবধ কাব্যের কথা। একে কেবল মাইকেলের সাহিত্যিক সাফল্য হিসেবে দেখলে ঠিক হবে না। এ আসলে একটি দৃষ্টিভঙ্গির বিপ্লব ছিল। রামায়ণের প্রচলিত নৈতিক বিন্যাস এখানে পালটে যায়; এখানে বিজয়ী ও পরাজিতের অর্থ নতুন করে নির্ধারিত হয়, এবং কণ্ঠস্বরের কেন্দ্রও অদলবদল ঘটে। এই অদলবদল যে শুধু মাইকেলের সাহিত্যিক কৌশল ছিল এমন নয়; তা ছিল অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের এক বহিঃপ্রকাশও। এই পরিবর্তনের গভীরে ছিল মাইকেলের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা; অভিবাসনের আকাঙ্ক্ষা, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, এবং শেষপর্যন্ত আত্ম-অসন্তোষ। ততদিনে তিনি অভিজ্ঞান পেয়ে গেছেন যে মানুষ যত দূরেই যাক না কেন, তার ভেতরের সবচেয়ে স্থায়ী ভূগোল হচ্ছে নিজের স্মৃতি, আর স্মৃতি কখনোই সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তরিত হয় না; তা সবসময় ফিরে ফিরে আসে এবং অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখে। এই ফিরে আসা এবং বাঁচিয়ে রাখা মাইকেলের জীবনকে আজকের পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কারণ আজও আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে মানুষ বারবার ঠাঁইনাড়া হয়। কখনো তা ভাষার, কখনো দেশের, কখনো পেশার, কখনো-বা পরিচয়ের ঠাঁইনাড়া। কিন্তু এই স্থানান্তরের ভেতরেও নীরব জিজ্ঞাসা কাজ করে আমাদের: আমরা কি আমাদের মূল সত্তা হারাচ্ছি, নাকি তাকে নতুনভাবে নির্মাণ করছি? কিংবা আমাদের পরিচয় কি আদৌ আছে?

এমন জিজ্ঞাসার সরল উত্তর পাওয়া যায় না। মাইকেলও কোনো সহজ উত্তর দেননি। তিনি কেবল জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন যে মানুষের পরিচয় স্থির কিছু নয়; এটি ক্রমাগত নির্মিত ও পুনর্নির্মিত হতে থাকে। আর এই বিনির্মাণের সবচেয়ে গভীর উপাদান হচ্ছে ভাষা; কারণ ভাষাই মানুষের জ্ঞানকে সংগ্রহ করে, চিন্তার কাঠামো তৈরি করে এবং স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। সুতরাং ভাষা কখনো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা হচ্ছে একটি মানসিক আশ্রয়। সেই আশ্রয়ে মানুষ প্রথম নিজের চিন্তার ছায়া দেখতে পায়, প্রথম নিজের কণ্ঠস্বরকে চিনতে শেখে। তাই ভাষা বদলানো মানে কেবল কাঠামো বদলানো নয়; তা এক ধরনের মানসিক পুনর্গঠন। মাইকেলের জীবন এই পুনর্গঠনেরই এক জটিল ইতিহাস।

মাইকেলকে স্মরণ করা মানে কেবল তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, তাঁকে পুনরায় পাঠ করা। তাঁকে পুনরায় পাঠ করা মানে নিজের সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া করা। আর নিজের সময়কে বোঝা মানে নিজের সীমা ও সম্ভাবনাকে একসঙ্গে দেখা।

মাইকেল যখন ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চার স্বপ্ন দেখেছিলেন, এবং দেশান্তরী হয়েছিলেন; তখন তা তাঁর নিছক ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ছিল না। ঔপনিবেশিক সমাজে ইংরেজি ছিল নতুন পৃথিবীতে প্রবেশের পাসপোর্ট। মাইকেল সেই পৃথিবীতে প্রবেশও করেছিলেন। কিন্তু প্রবেশের মুখেই বুঝতে পেরেছিলেন, সেই পৃথিবী তাঁকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। এমন নয় যে শুধু একজন আউটসাইডার বলে এমনটা ধারণা হয় তাঁর। এর পেছনে কিছু বাস্তব সত্যও ছিল যে, ভাষা তো কেবল বাইরের কাঠামো নয়; তা মানুষের অভিজ্ঞতাকেও ধারণ করে পূর্ণতা পায়। ইংরেজি ভাষায় তিনি যে-জগৎ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, তা ছিল অর্জিত জ্ঞানের জগৎ; কিন্তু বাংলায় তাঁর যে অভিজ্ঞতা ছিল, তা ছিল বেঁচে থাকার জগৎ। সুতরাং এই দু-জগতের দূরত্বই মাইকেলের জীবনের কেন্দ্রীয় টানাপোড়েন তৈরি করে। একে আমরা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলতে পারি না; ঔপনিবেশিক আধুনিকতায় বরং এটি একটি গভীরতর সংকট। উপনিবেশ মানুষের কাছে এমন এক ধারণা তৈরি করে যে, উন্নতির একমাত্র পথ বাইরে যাওয়া। ফলে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্মৃতি অনেক সময় পিছিয়ে পড়ার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এই মনস্তত্ত্ব মাইকেলের সময়ে যেমন শক্তিশালী ছিল, আমাদের সময়েও তা নতুন মোড়কে বিদ্যমান। মাইকেলের সময়ে তরুণ প্রজন্ম যেমন বহির্মুখী ছিল, আজ তার কয়েকগুণ বেশি বই কম নয়।

মাইকেলের ইংরেজিপর্ব তাই কেবল সাহিত্যিক অনুশীলন ছিল না; তা ছিল এক ধরনের আত্ম-পরীক্ষা। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, নিজের পরিচয় ছেড়ে দিয়ে অন্য এক পরিচয়ে কতদূর এগোনো সম্ভব। কিন্তু এই পরীক্ষা শেষপর্যন্ত তাঁকে একটি গভীর উপলব্ধির এনে দেয় কঠিন বাস্তবতায়। দক্ষতার সঙ্গে ইংরেজি প্রয়োগ করলেও রচিত সাহিত্য দিয়ে উপনিবেশকদের কল্কে পেলেন না তিনি। বরং চেতনা ফিরে পেলেন এমন যে, মানুষ যতই নতুন ভাষা শিখুক, তার চিন্তার সবচেয়ে গভীর স্তরটি গঠিত হয় মাতৃভাষায় এবং এই উপলব্ধিই তাঁকে বাংলার দিকে মোড় ঘোরায়। এই ‘মোড় ঘোরা’ কিংবা ‘ফেরা’কে সরলভাবে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ এটি শুধু ঘরের ছেলে ঘরের ফেরার বিষয় ছিল না; মাইকেলের ফেরার গল্প নতুন দৃষ্টিতে নিজের ঘরকে আবিষ্কার করারও গল্প। মাইকেল যখন বাংলায় লিখতে শুরু করেন, তখন তিনি আর আগের মাইকেল ছিলেন না; হয়ে উঠেছিলেন নতুন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত মানুষ। রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ মাইকেলের কাব্য, নাটক ও প্রহসন ও চিঠিপত্র। তাঁর এই রূপান্তরের ইতিহাস একটি সত্যের দিকেও আমাদের নিয়ে যায়। আধুনিকতা মানে কেবল নতুন হওয়া নয়; আধুনিকতা মানে নিজের পূর্বধারণাকে প্রশ্ন করা। মাইকেল সেই প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই আধুনিক হয়ে ওঠেন। তিনি দেখান, সত্যিকারের সৃষ্টিশীলতা তখনই জন্ম নেয়, যখন মানুষ নিজের গ্রহণ করা সত্যকে পুনরায় পরীক্ষা করতে শেখে; কর্মে প্রয়োগ করতে পারে।

বর্তমান কালে এই প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আমরা এমন এক কালে বাস করছি যেখানে ভাষা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যোগাযোগ বৈশ্বিক হচ্ছে, এবং পরিচয় বহুস্তরীয় হয়ে উঠছে। একজন মানুষ একই দিনে একাধিক ভাষায় কথা বলে, মিশ্রসংস্কৃতিতে দিনযাপন করে। কিন্তু এই বহুভাষিক ও বহু সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ভেতরেও একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্নও উঁকি মারে যে, সে কোন ভাষায় নিজেকে সবচেয়ে গভীরভাবে বোঝে? এই প্রশ্নের জবাব প্রযুক্তি দিতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাষা অনুবাদ করতে পারে, কিন্তু ভাষার ভেতরের স্মৃতি তৈরি করতে পারে না। কারণ স্মৃতি তো কেবল তথ্য নয়; এটি অভিজ্ঞতার ঘনীভূত ফল। মাইকেলের জীবন বিশ্লেষণ করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে জীবনাভিজ্ঞতার এই ঘনীভূত ভূমি হচ্ছে সৃষ্টিশীলতার ভিত্তি। তাই তাঁর ইংরেজি থেকে বাংলায় প্রত্যাবর্তন কেবল ভাষাগত প্রত্যাবর্তন নয়, অস্তিত্বগত প্রত্যাবর্তনও। মাইকেলপাঠে আমরা বুঝতে পারি যে, মানুষ নিজের বাইরে যেতে পারে, কিন্তু নিজের ভেতরের গঠন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারে না। এই গঠনই তাকে সচেতন কিংবা অবচেতনে বারবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। এই প্রত্যাবর্তনকে ব্যর্থতা বলা যায় না, বরং এটি উপলব্ধির গভীরতা। কারণ যে-মানুষ কখনো ফিরে আসে না, সে হয়তো দূরে যায়; কিন্তু যে-মানুষ ফিরে আসে, সে নিজেকে বুঝতে শেখে। মাইকেলের জীবন সেই বোঝাপড়ারই দীর্ঘ যাত্রা এবং ঠাঁইনাড়া মানুষের চলমান অভিজ্ঞতাও।

মাইকেলের গুরুত্ব যেমন তার কর্মের জন্য, তেমনি জীবনের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতায় অবতীর্ণ হয়ে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যও। তিনি সেই বিরল শিল্পীদের একজন; যাঁরা উত্তর দেন না, বরং জিজ্ঞাসাকে জিইয়ে রাখেন। মাইকেল-জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু তাঁর জিজ্ঞাসার মীমাংসা এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে। সেই জিজ্ঞাসা মানবজীবনের চিরকালীন তিনটি রেখায় আবর্তিত যে ভাষা, পরিচয় আর প্রত্যাবর্তন। এসব জিজ্ঞাসার কেন্দ্রে এসে দাঁড়ালে মাইকেল আবারও সমকালীন হয়ে ওঠেন। তিনি এমন এক মানুষ, যিনি একসময় নিজভাষা ও সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে চেয়েছিলেন, আবার সেই ভাষা ও সংস্কৃতিতেই নিজের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর থেকে আমরা শিখেছি যে ভাষা কেবল বাহ্যিক পরিচয় নয়; এটি অস্তিত্বগঠনের অংশ। মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে স্থায়ী সৃষ্টিশীলতা সম্ভব নয়, আত্মপরিচয় তো নয়ই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মানুষকে এক ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে বহুভাষিতা তখনই সৃজনশীল হয়, যখন তার কেন্দ্র হারিয়ে যায় না। মাইকেলের ক্ষেত্রে এই কেন্দ্র ছিল তাঁর অভিজ্ঞতার স্মৃতি, তাঁর শৈশবের উচ্চারণ, এবং মাতৃভাষার সঙ্গে তাঁর অন্তর্গত সম্পর্ক। ইংরেজি তাঁকে দুনিয়া চিনিয়েছিল, আর বাংলা তাঁকে নিজেকে চিনিয়েছে। এ দুয়ের মধ্যে যে-টানাপোড়েন, সেটিই তাঁর জীবনকে কেবল সাহিত্যিক নয়, দার্শনিক তাৎপর্যও দেয়।

এই টানাপোড়েন আজও আমাদের জীবনের অংশ। যারা অভিবাসী হয়, বিদেশে পড়তে যায়, যারা বৈশ্বিক পেশায় যুক্ত হয় এবং যারা একাধিক ভাষায় দিনযাপন করে তাদের প্রত্যেকের ভেতরেই কোনো না কোনোভাবে মাইকেল উপস্থিত থাকেন। কারণ তিনি শুধু কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নন, এক অভিজ্ঞতার নাম। তিনি এমন এক রূপক, যিনি আমাদের দেখান যে মানুষের যাত্রা কেবল বাইরে নয়, ভেতরেও। বাহ্যিক যাত্রা মানুষকে নতুন জগতে নিয়ে যায়; ভেতরের যাত্রা তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। আর এই দুই যাত্রার মিলনেই জন্ম নেয়ে প্রকৃত উপলব্ধি। এই উপলব্ধি মানুষের আত্মপরিচয়কে সংহত করে। আমরা যত আধুনিক হচ্ছি, যত প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছি, যত বৈশ্বিক হচ্ছি আমাদের ভিতরে ততই জিজ্ঞাসা তেড়ে আসে: আমরা কি নিজেদের হারিয়ে ফেলছি? এই প্রশ্নের জবাব সহজে পাবার নয়। কিন্তু মাইকেলের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এ শিক্ষা নিতেই পারি যে, এমন জিজ্ঞাসাকে এড়িয়ে যাবার সুযোগ কম। কারণ যে-ব্যক্তি বা সমাজ নিজের আস্তিত্ব জিজ্ঞাসাকে হারিয়ে ফেলে, সে ধীরে ধীরে নিজেকেও হারায়। এভাবে হারায় একেটি ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়। জাতিসত্তার মৃত্যুও ঘটে সমান প্রক্রিয়ায়।

মাইকেলকে স্মরণ করা মানে কেবল তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, তাঁকে পুনরায় পাঠ করা। তাঁকে পুনরায় পাঠ করা মানে নিজের সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া করা। আর নিজের সময়কে বোঝা মানে নিজের সীমা ও সম্ভাবনাকে একসঙ্গে দেখা। কারণ মাইকেলের গল্প শেষ হয় না; অন্য কোনো ভাষায় অন্য অপর মাইকেল কোনো এক কালে যখন সুতো ধরেন, তাঁকে হয়তো আমরা চিনি না। কিন্তু আমাদের মাইকেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ছিল উনিশ শতকের বাঙালিজীবনের নতুন বাস্তবতায়, কিন্তু শেষ হয়নি একুশ শতকে এসেও। কারণ মাইকেলের পরেও মাইকেল রয়ে গেছেন বিশ্বায়নের বাস্তবতায়। তাই এ যাত্রা শেষ হবারও নয়। কেননা যতদিন মানুষ নিজের ভাষা ও জগতের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজবে, যতদিন আত্মপরিচয় ও আকাক্সক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকবে, ততদিন মাইকেল নতুন রূপে, নতুন জিজ্ঞাসা নিয়ে হাজির হবেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত