মনের কথা থেকে সিসিমপুর: শিশুদের বন্ধু মুস্তাফা মনোয়ার

স্ট্রিম গ্রাফিক

টেলিভিশনের পর্দায় তাঁকে সবসময় দেখেছি সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ হিসেবে। সামনে কাগজ, হাতে রঙ তুলি। কয়েকটি আঁচড়েই ফুটে উঠত পাখি, ফুল, নদী কিংবা গ্রামের কোনো দৃশ্য। ছবি আঁকছেন ‘শিল্পী ভাই’ মুস্তাফা মনোয়ার। শুধু সাদা ক্যানভাস নয়, আমাদের শৈশবকেও রাঙিয়ে দিয়েছেন তাঁর রঙ-তুলির আঁচড়ে।

শিল্পী ভাইয়ের চারপাশে পুতুল চরিত্র পারুল, বাউল ভাই কিংবা ষাঁড় ভাই। তারা হাসি, গল্প, গানে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করতেন যেন এরা কোনো পাপেট চরিত্র নয়, সত্যিকারের মানুষ কিংবা প্রাণি।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ছোটদের পাপেট শো অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ ছিল আমাদের শৈশবের আনন্দময় মুহূর্তের একটি। অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা, গ্রন্থনা ও উপস্থাপনার দায়িত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের ওপরে।

মনের কথার সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলোর একটি ছিল যখন পর্দায় হাজির হতেন ‘শিল্পী ভাই’। তিনি আসলে মুস্তাফা মনোয়ার নিজেই। মুস্তফা মনোয়ারকে আমার মতো অনেকেই ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চিনলেও তিনি সিসিমপুর, মীনা কার্টুন এবং নতুন কুঁড়ির মতো জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠানের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনন্য।

ভাষা আন্দোলনের সময়ও মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন প্রতিবাদী। ১৯৫২ সালে স্কুলে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলন নিয়ে কার্টুন এঁকে এক মাস কারাভোগ করেছিলেন। পরে চারুকলার শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে পাকিস্তান টেলিভিশনের (পিটিভি) ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন। কারণ বাংলা সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তিনি দেখেছিলেন টেলিভিশনে।

‘সিসেমি স্ট্রিট’ যেভাবে ‘সিসিমপুর’ হলো

বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষামূলক টেলিভিশন অনুষ্ঠান বলতে যে কয়েকটি নাম সবার আগে আসে, তার মধ্যে ‘সিসিমপুর’ অন্যতম। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই অনুষ্ঠানটি শুধু শিশুদের বিনোদনের নতুন দিগন্তই খুলে দেয়নি, বরং আনন্দের মাধ্যমে শেখার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আর এই সাফল্যের পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের অন্যতম ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। বিশ্বখ্যাত শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘সিসেমি স্ট্রিট’-এর বাংলাদেশি সংস্করণ হিসেবে সিসিমপুর তৈরি হলেও, এটিকে নিছক বিদেশি অনুষ্ঠানের অনুকরণ হতে দেননি মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি চিফ ক্রিয়েটিভ অ্যাডভাইজার হিসেবে নিশ্চিত করেছিলেন, অনুষ্ঠানটির ভাষা, চরিত্র, পরিবেশ, গল্প ও সাংস্কৃতিক উপাদান যেন পুরোপুরি বাংলাদেশের শিশুদের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়।

‘সিসেমি স্ট্রিট’-এর বাংলাদেশি সংস্করণ হিসেবে সিসিমপুর তৈরি হলেও এটিকে নিছক বিদেশি অনুষ্ঠানের অনুকরণ হতে দেননি মুস্তাফা মনোয়ার। ছবি: সংগৃহীত
‘সিসেমি স্ট্রিট’-এর বাংলাদেশি সংস্করণ হিসেবে সিসিমপুর তৈরি হলেও এটিকে নিছক বিদেশি অনুষ্ঠানের অনুকরণ হতে দেননি মুস্তাফা মনোয়ার। ছবি: সংগৃহীত

মুস্তাফা মনোয়ারের দীর্ঘদিনের পাপেটচর্চা সিসিমপুরকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। তাঁর সৃজনশীল ভাবনায় অনুষ্ঠানে যুক্ত হয় দেশীয় পুতুলনাট্যের নানা উপাদান। বিশেষ করে ‘ইকরির জগৎ’ অংশে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী পাপেটগুলোর নকশা ও নির্মাণে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এই অংশে বাংলাদেশের লোকজ পুতুলশিল্পের সৌন্দর্য ও কল্পনার জগতকে শিশুদের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়। হালুম, টুকটুকি, শিকু ও ইকরি মিকরির মতো চরিত্রের মাধ্যমে শিশুদের বর্ণমালা, সংখ্যা, স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং পরিবেশ সচেতনতার মতো বিষয়গুলো সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন একটি অনুষ্ঠান, যা ছড়া, বর্ণমালা, সংখ্যা শেখানোর পাশাপাশি বিশেষ করে মেয়েশিশুদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখে।

সিসিমপুর শুধু টেলিভিশনের পর্দাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে এটি স্কুল, কমিউনিটি কার্যক্রম, বই, ডিজিটাল কনটেন্ট ও সামাজিক সচেতনতামূলক উদ্যোগে বিস্তৃত হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের কোটি কোটি শিশুর শৈশবের অংশ হয়ে আছে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এর আবেদন অটুট রয়েছে। মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই—তিনি বিশ্বমানের একটি শিক্ষামূলক ধারণাকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও শিশুদের বাস্তবতার সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে সিসিমপুর হয়ে ওঠে একেবারেই বাংলাদেশের নিজস্ব। তাঁর সৃজনশীলতা প্রমাণ করেছে, একটি আন্তর্জাতিক ধারণাও স্থানীয় সংস্কৃতির স্পর্শে নতুন পরিচয় পেতে পারে। তাই সিসিমপুরের ইতিহাস লিখতে গেলে মুস্তাফা মনোয়ারের নাম উচ্চারিত হবে এর অন্যতম প্রধান নির্মাতা ও সৃজনশীল স্থপতি হিসেবে।

‘পারুল’ চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘মীনা কার্টুন’

বাংলাদেশের শিশুতোষ অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘মীনা কার্টুন’ সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয়। ৯০-এর দশকে উপমহাদেশের মেয়েদের সচেতন করার লক্ষ্যে মীনা কার্টুন প্রচারের উদ্যোগ নেয় ইউনিসেফ। সেসময় মুস্তাফা মনোয়ারের ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের ‘পারুল’ চরিত্রটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেখান থেকেই মূলত কিছু ধারনা নেয় ইউনিসেফ।

পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে বিখ্যাত কার্টুনিস্ট রাম মোহন ইউনিসেফের সহযোগিতায় মীনা কার্টুনের প্রথম অ্যানিমেশন পরিচালনা করেন। এরপর একে একে ১৬টি এপিসোড তৈরি করেন তিনি। এই ১৬টি এপিসোডের কার্যকাল ছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই জন্ম নেয় দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর পরিচিত চরিত্র ‘মীনা’।

মুস্তাফা মনোয়ারের ভাষায়, ‘পটোলচেরা চোখ’, ‘মেঘের মতো চুল’ আমি সেগুলোকে কল্পনা করে পাপেট তৈরি করি। অর্থাৎ দেশের রূপটা থাকে পাপেটের মধ্যে। তাঁর মতে, পারুল নামটি এসেছে ‘সাত ভাই চম্পা’ থেকে যে সাত ভাইকে জাগাতে পারে। পারুল ছবি আঁকতে বা গান গাইতে পারে, অন্যকে সাহায্য করতে পারে। ভালো কিছুর মধ্যে তার আগ্রহ। পশুপাখির প্রতি যেমন ভালোবাসা, মানুষের প্রতিও। মীনা চরিত্রটিও অনেকটা পারুলের মতোই। মীনা কার্টুন আট-নয় বছর বয়সী একজন মেয়ে। সাথে থাকবে মেয়েটির বাবা, মা, ছোট ভাই এবং পোষা কোনো প্রাণী। শিশির ভট্টাচার্য এবং মুস্তাফা মনোয়ার এ কাজে ফিলিপাইনের ম্যানিলাতে অবস্থিত হান্না-বারবারা স্টুডিওতেও যান এবং মীনার চিত্রায়নে কাজ করেন। বিখ্যাত হান্না-বারবারা স্টুডিওতে মীনার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এখানেই মীনার প্রথম দিককার বেশ কিছু পর্ব নির্মিত হয়। ১৯৯২ সালে মীনার প্রথম পর্বটিও কিন্তু বাংলায় ডাব করে প্রথম বিটিভিতে প্রদর্শন করা হয়।

‘এদের শুধু পেটের খাবার খাওয়ালে হবে না, মনের খাবারও খাওয়াতে হবে।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশজুড়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মধ্যে আশা ও মনোবল জাগিয়ে তোলার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মীদের গুরুওপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুস্তাফা মনোয়ার সেই সময় ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে পাপেট শো পরিচালনা করেছিলেন। এই পাপেট শোগুলোতে তিনি সহজ ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য, স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এবং পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার কথা তুলে ধরতেন।

মুস্তফা মনোয়ার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা তো শরণার্থী শিবিরে যেতাম। বাচ্চাদের কারও মুখে হাসি নেই। আতঙ্কিত চেহারা, অসহায়। একদম গম্ভীর হয়ে গেছে। তখন বললাম, নাহ্, এদের শুধু পেটের খাবার খাওয়ালে হবে না, এদের মনের খাবারও খাওয়াতে হবে।’

মুস্তাফা মনোয়ার বিশ্বাস করতেন পাপেট শো শুধু বিনোদন নয়, এটি এক ধরনের প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর সেই প্রয়াস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত