leadT1ad

শীতেই কেন কপির রাজত্ব, যেভাবে এই বিদেশি সবজি বাঙালির পাতে

শীত এলেই আমাদের খাবারের পাত ভরে থাকে শাক-সবজিতে। বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম আর এখন তো ব্রকলিও। শীতের খাবারের তালিকায় এই সবজিগুলো এতটাই পরিচিত যে মনে হয়, শীত মানেই বুঝি ‘কপি-রাজ্য’। কিন্তু শীতের এই পরিচিত সবজিগুলো আদতে আমাদের দেশীয় নয়।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৪৩
শীতেই কেন কপির রাজত্ব, যেভাবে এই বিদেশি সবজি বাঙালির পাতে। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

শীত এলেই আমাদের রান্নাঘরের চিত্র বদলে যায়। খাবারের পাত ভরে থাকে শাক-সবজিতে। বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম আর এখন তো ব্রকলিও। শীতের খাবারের তালিকায় এই সবজিগুলো এতটাই পরিচিত যে মনে হয়, শীত মানেই বুঝি ‘কপি-রাজ্য’। এগুলোর সবই উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রাসিকা’ বা কপি গোত্রের সবজি।

কিন্তু শীতের এই পরিচিত সবজিগুলো আদতে আমাদের দেশীয় নয়। এদের শিকড় বহু দূরের বিদেশে। বাংলার হেঁশেলে ঢুকতে ঢুকতে এদের পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ আর ভাঙতে হয়েছে খাদ্যসংস্কৃতির দেয়াল।

'কপি জাতীয় সবজি কেন শীতকালে ভালো হয়

এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে প্রকৃতির ভেতরেই। কপিজাতীয় সবজিগুলোর আদি নিবাস ছিল ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের শীতপ্রধান এলাকা। তাই ঠান্ডা আবহাওয়াই এদের জন্য ভালো। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বলতে গেলে, এই সবজিগুলোর সালোকসংশ্লেষণ ও মেটাবোলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া কম তাপমাত্রায় এটা ভালো থাকে। বিশেষ করে ফুলকপি বা বাঁধাকপির যে অংশটি আমরা খাই, যাকে ‘কার্ড’ বা ‘হেড’ বলা হয়, তা সুন্দর ও জমাটবদ্ধ হওয়ার জন্য ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলো আদর্শ।

শীতকালে বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে ফুলকপি। বিএসএস থেকে নেওয়া ছবি
শীতকালে বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে ফুলকপি। বিএসএস থেকে নেওয়া ছবি

তাছাড়া শীতকালে রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে এই উদ্ভিদগুলো নিজেদের কোষের ভেতরে জমানো শ্বেতসার বা স্টার্চকে চিনি বা গ্লুকোজে রূপান্তর করে। এই চিনি গাছকে শীতে জমে যাওয়া থেকে বাঁচায়। আর ঠিক এই কারণেই শীতের ফুলকপি বা বাঁধাকপি খেতে এত সুস্বাদু হয়, যা অন্য কোনো ঋতুতে সম্ভব নয়।

যেভাবে এই বিদেশি সবজি বাঙালির পাতে

এই সবজিগুলো বাংলায় এসেছে মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে। আঠারো শতকের শেষ দিকে ও উনিশ শতকের শুরুতে ইংরেজ সাহেবরা বাংলায় এসে বিপাকে পড়েছিলেন। পটল, ঝিঙে বা কচুর লতির সঙ্গে তারা অভ্যস্ত ছিলেন না। নিজেদের খাবারের স্বাদ মেটাতে তারা বিলেত থেকে জাহাজে করে ফুলকপি ও বাঁধাকপির বীজ আনাতে শুরু করেন।

শুরুর দিকে এই চাষ ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে বীজ আসতে সময় লাগত কয়েকমাস, আর অনেক সময় বীজ নষ্টও হয়ে যেত। তবুও হাল ছাড়েনি ব্রিটিশরা। ১৮২০ সালের দিকে ধর্মপ্রচারক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী উইলিয়াম কেরিসহ কয়েকজন যখন কলকাতায় ‘এগ্রি-হর্টিকালচারাল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন এই সবজি চাষে এক বিপ্লব আসে।

তাছাড়া ফুলকপির চেহারাও আলাদা। সাদা রঙের ফুলের মতো দেখতে একটি জিনিস যে সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়, এই ভাবনাই অনেকের কাছে অস্বাভাবিক লাগত।

তিনি স্থানীয় কৃষকদের এসব বিদেশি সবজি চাষে উৎসাহিত করেন এবং উন্নত মানের বীজ বিতরণের ব্যবস্থা করেন। ব্রিটিশরা ব্যারাকপুর ও আলিপুরের বাগানবাড়িগুলোতে মালি দিয়ে শখ করে এসব সবজি ফলাতেন। তখন সাধারণ বাঙালিরা এগুলোকে ‘সাহেবি সবজি’ বা ‘বিলাতি আনাজ’ বলে ডাকত।

প্রথমে আপত্তি, তারপর গ্রহণ

তবে এই সবজিগুলো গ্রহণ করতেও বাঙালির বেশ সময় লেগেছিল। উনিশ শতকের শুরুতে বাংলার সমাজ ছিল বেশ রক্ষণশীল। খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়, সংস্কার ও সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল। তাই ইউরোপ থেকে আসা এই সবজিগুলোকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি।

তাছাড়া ফুলকপির চেহারাও আলাদা। সাদা রঙের ফুলের মতো দেখতে একটি জিনিস যে সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়, এই ভাবনাই অনেকের কাছে অস্বাভাবিক লাগত। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন এর স্বাদ, সুগন্ধ ও পুষ্টিগুণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল, তখন সব সংস্কার ভেঙে এটি ঢুকে পড়ল বাঙালির হেঁশেলে।

চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাষও ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে বীজ আসত ইউরোপ থেকে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের কৃষকেরাই এই সবজি চাষে দক্ষ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে পাটনা অঞ্চল কপি জাতীয় সবজির উন্নত বীজ উৎপাদনের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে বাংলার কৃষকরাও নিজেদের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া জাত তৈরি করতে সক্ষম হন। বিদেশি বীজের ওপর নির্ভরতা কমে আসে। এভাবেই ‘বিদেশি’ ফুলকপি ও বাঁধাকপি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে বাঙালির নিত্যদিনের রান্নায়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত