leadT1ad

মাইকেল মধুসূদন দত্ত কীভাবে পেরিয়ে গেলেন সাহিত্যচর্চার সংকট

আজ ২৫ জানুয়ারি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদিন। সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্য-পরিসরে শতবর্ষ পরেও তিনি বেঁচে আছেন সক্রিয়তার ভেতর দিয়েই। এও সত্য যে, তাঁকে নিয়ে তাঁর কালেই তো বেশ জোরজারের সাথে চর্চা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ধুন্ধুমারভাবে প্রভাবিত করে গেছেন বিচিত্র ধারার সাহিত্যের লোকজনকে। এসবের পরও সেইকালে মধুসূদনের নিজের সাহিত্যচর্চারই নানামাত্রিক সংকট ছিল।

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৫২
মাইকেল মধুসূদন দত্ত কীভাবে পেরিয়ে গেলেন সাহিত্যচর্চার সংকট? ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) বাংলা সাহিত্যের ‘উপনিবেশিত আধুনিক’ যুগে ‘রোমান্টিক সাহিত্যে’র ধুন্ধুমার চর্চার পরও তাঁকে আমরা সবাই মিলে বানিয়ে দিয়েছি ‘আধুনিক সাহিত্যিক’। এখানকার ‘সাহিতের লোকজন’ প্রায় কোনোভাবেই তাঁকে আর ‘আধুনিক সাহিত্যিক’ না বলে থাকতেই পারেন না। যেন ‘আধুনিক সাহিত্যিক’ বলা তাঁদের একটি লোভ; আর বলে ফেললেই যেন তা বেশ ভালো হবে ‘আমাদের মধুসূদনের’ জন্য। সেই লোভের বিষয়টিই বারবার মধুসূদনকে আরো বেশি সাহিত্য-সমালোচনার জটিল আবর্তে ফেলে দেয়। তাঁকে নিয়ে নিরেট নন্দনতাত্ত্বিক ও সাহিত্যচর্চার ধারণা পোষণ করতে গিয়েও এই ভুলভাল করে ফেলা হয়, এবং পরিপ্রেক্ষিতের বাস্তবতায় তাঁকে বিচারের বেলায় ‘নানা অকেজো সূত্র’ অকারণে আরোপণ করা হয়।

মরে গিয়েও মধুসূদন একটি সুনির্ধারিত আর প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক-জীবনে স্থির থাকতে পেরেছেন। মানে জনসাধারণের কাতারেই তাঁকে মরে যেতে হয়েছে; কিন্তু সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্য-পরিসরে শতবর্ষ পরেও তিনি বেঁচে আছেন সক্রিয়তার ভেতর দিয়েই। এও সত্য যে, তাঁকে নিয়ে তাঁর কালেই তো বেশ জোরজারের সাথে চর্চা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ধুন্ধুমারভাবে প্রভাবিত করে গেছেন বিচিত্র ধারার সাহিত্যের লোকজনকে। এসবের পরও সেইকালে মধুসূদনের নিজের সাহিত্যচর্চারই নানামাত্রিক সংকট ছিল। সেই সংকটসমূহ তাঁকে ব্যথিত করেছিল।

এই ব্যথার কারণে তাঁকে করতে হয়েছিল বিচিত্র সব কর্মকাণ্ড। না, তাতেও কোনো ফল যে হয়েছিল, কিংবা তার কোনো আলাদা স্বীকৃতি তিনি পেয়েছিলেন-এমন কোনো শক্ত উদাহরণ আমাদের হাতে নেই। বরং বারবার তাঁকে প্রবলভাবে ব্যথিত হয়েই ফিরে আসতে হয়েছে এসব জায়গা থেকে। প্রবল প্রতিভাও এক্ষেত্রে তাঁকে আর কোনোভাবেই সক্রিয়তায় সহায়তা করতে পারেনি।

এই প্রসঙ্গে আরও বলতে হয় যে, মধুসূদন বিদেশ গিয়ে আরও বেশি দেশের অনুকূলে পৌঁছোতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তাঁকে দিয়ে এই ফরাসি কিংবা ইংরেজ-এই দুই সাহিত্য-সমাজে অবস্থান করে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই যখন তিনি কপোতাক্ষ নদ নিয়ে কবিতা লিখলেন, তখন তা ফর্মের দিক থেকে সনেট হলো, কিন্তু বিষয়ের দিক থেকে তা আর স্বদেশের বাইরে যেতে পারলো না।

একটু আগে বলে নেই, যে আলাপে যাচ্ছি, সেই আলাপের বিবেচনা একটু ভিন্ন। আপনি কিংবা আমি এতে নিশ্চয় বেঁকে বসবো না, কিংবা ভেঙে যাবো না। কারণ তাতে আবার আবেগ ভর করতে পারে। আবেগের এই স্থূলতা আবারও মধুসূদন বিচারে বড়ো সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই এই আবেগের ভারসাম্য বাতিল করেই একপথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ইউরোপে পনেরো শতেকের পরপরই নাগরিক-বাস্তবতার সূত্রপাত হয়, আঠারো শতকের দিকে তা ক্রমান্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নাগরিক-বাস্তবতার জন্ম দিতে পেরেছিল। ব্যক্তির মেট্রোপলিটন মন নির্মাণের বিষয় এক্ষেত্রে জরুরি ছিল। তার সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত আরও বেশ আগে থেকেই নির্মিত হচ্ছিল। কিন্তু প্রথমত, মধুসূদনের জন্য, তাঁর সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পেলেন একটি মেকি নগর। সামগ্রিকভাবে সাহিত্য-পরিসর ও সাহিত্য-চরিত্র নির্মাণের এই নগর ছিল অপর্যাপ্ত। আর যা-ও ছিল তা ঔপনিবেশিক নাগরিকতা ছাপিয়ে রোমান্টিক সাহিত্য করার কিংবা সেই বোধ ও ভাবনার আধার হিসেবে আর থাকল না। এমনকি বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বাংলায় বিশ শতকের শেষ দশকেও গ্রামীণ জীবনে অভ্যস্ত মানুষের সংখ্যা ৯০ শতাংশের বেশি। ফলে উনিশ শতকের বাংলায় মধুসূদন কীভাবে নাগরিক বাস্তবতা পেতে পারেন? আর পশ্চিমের বিবেচনায় তো তার প্রকৃত হদিস মেলায় ভার।

মধুসূদন যশোর থেকেই কলকাতা গেছেন। সেটাও তখন একরকম গণ্ডগ্রাম। তাঁর নিজের পিতাও সামন্তমনা, কর্মে জমিদার। কপোতাক্ষের তীর ঐ সময়ে আর কী ঘটতে পারে ও হতে পারে, তা তো আমাদের ‘পল্লী-বাংলার ইতিহাস’ খুঁজলেই বুঝতে পারি। কিন্তু মধুসূদনের বেলায় এই সমস্যাটি একভাবে কেটে গিয়েছিল। নতুন প্রতিষ্ঠিত সিভিলিয়ান পরিবেষ্টিত হিন্দু কলেজের ডিরোজিও সমর্থিত পশ্চিমা-পরিবেশ-প্রভাব মধুসূদনকে কেবল নয়, এমন আরো ‘মধুসূদনকে’ নির্মাণ করেছিল। অথচ প্রায় প্রত্যেকেই কিছুদিন পরে ফিরে এসেছিলেন নিজের ভূমির সীমানায়। মধুসূদন নিজে ফিরে আসবেন করে করেও আর সম্পূর্ণরূপে ফিরতে পারেননি। কিন্তু অন্যরা পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে পেরেছিলেন একরকম; তাঁর আর পরিপ্রেক্ষিত বোঝা হয়ে ওঠেনি। একটা মেকি মেট্রোপলিটনের ভেতরে তাঁকে ঘুরপাক খেতে হয়েছে আমৃত্যু। তিনি যখন তা পারেননি, তখন তিনি সেখান থেকে সরে যেতে চেয়েছেনে। জীবনযাপনে সাহেবিয়ানা এনেছেন। জীবনযাপন আর আশৈশব ফেলে আসা অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তিনি যেতে পেরেছিলেন একটি জায়গায়; কিন্তু সাহিত্যিকরূপে তিনি তা কীভাবে প্রদান করবেন? এটি পয়লা নম্বরেই তাঁর জন্য সমস্যা হয়ে গিয়েছিল।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ব্রিটিশ লাইব্রেরির ছবি
মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ব্রিটিশ লাইব্রেরির ছবি

দ্বিতীয়ত একটি খণ্ডিত ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় ইউরোপীয় ধাঁচের ব্যক্তি উৎপাদন একেবারেই অসম্ভব। কারণ উৎপাদনকাঠামোর স্বকীয় বিকাশ ব্যতীত উপরিতলের বিকাশ কীভাবে সম্ভব? এটি ঠিকঠাকভাবে সম্ভবই নয়। ফলে এই সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলে নয়, বাস্তবতায়ই মধুসূদন তাঁর রোমান্টিক সাহিত্য-বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিকতা নির্মাণে অসহায় বোধ করেছেন। মধুসূদন যে সময় সাহিত্য করছেন, সেই সময় ঈশ্বররচন্দ্র গুপ্ত তাঁর কবিতায় যে ভাব-ধারণা প্রকাশ করেছেন, সেই বাস্তবতাই আদতে সেই সময়ের প্রকৃত বাস্তবতা।

তৃতীয়ত এই ব্যক্তির বিকাশ যখন সম্ভব হয়নি, তখনই এখানে সাহিত্যের বিকাশের বেলায় একটি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আরও বিষয় তো ছিলই। এই বিষয়ই প্রধানতম ছিল সাহিত্যের বেলায়। ফলে পশ্চিম দ্বারা সবচেয়ে প্রভাবিত হয়েছেন মধুসূদন-এ কথা ঠিক। অথচ সেই পশ্চিমের ব্যক্তি আর সাহিত্যিক পরিপ্রেক্ষিত এখানে কোথায়? তিনি প্যারাডাইস লস্ট কিংবা এমন আরো কবি-কবিতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। সেই প্রভাবের বিষয় তাঁকে কতোটুকু বাঁচাতে পেরেছে? বলা চলে যে, মধুসূদন কোনোভাবেই আর বাঁচতে পারেননি। বরং ইউরোপীয় রেনেসাঁশাসিত সাহিত্যের মূল নকশা হয়েছে তাঁর মূল অবলম্বন। ইউরোপীয় সাহিত্যে যুক্তির বিচারেই তা ধরা পড়ে যায় করুণভাবে।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও তিনি তাঁর মেঘনাদবধ কাব্য রচনা করলেন। পৌরাণিক কাহিনি-সত্তাকে তিনি মানবিক কাহিনি-সত্তা দ্বারা প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করলেন। এক্ষেত্রে বিপরীত কাঠামোর মডেল সক্রিয়ভাবেই তাঁকে ব্যবহার করতে হলো; মূল কাহিনিকে তিনি দুমড়েমুচড়ে তাঁর সাহিত্যিক আদর্শের পটভূমির সাথে জুড়ে দিলেন। মধুসূদন এসব করার পরও আর তাঁর নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারেননি। কারণ তাঁর সাহিত্য-রচনার পরিপ্রেক্ষিতের ভেতরে ঢুকে গেছে এমন এক দ্বৈত পরিস্থিতি, যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে তিনি নিজে সামনে আগাতে পারলেন, কিন্তু অন্যান্য বিষয় আর যৌক্তিকভাবে সামনে এগোলো না। তিনি মেঘনাদবধ কাব্যে পৌরাণিক দুঃখবোধকে মানবিক আর উদারনৈতিক দুঃখবোধের সাথে সংযুক্ত করে ফেললেন। অথচ সেই দুঃখবোধের বিষয় ততটা বাস্তব হলো না, যেমনটা স্বর্গ হারানো এবং স্বর্গ পাওয়ার বিষয়টি পরিপ্রেক্ষিতগত দিক থেকে শৈলী খুঁজে পেয়েছিলেন ঠিকঠাকভাবে, তাঁর সাহিত্যিক পরিসরে।

ব্রজাঙ্গনা কাব্যে এই প্রবণতা চোখে সিঁধে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করলো। ঐ ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিস্থিতিতে উদারনৈতিক মানবতাবাদী ব্যক্তিকতার বিষয় তাঁকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি তা প্রচার করেছেন যখন, তখন তা জনপরিসর আর জনসমাজ ছুঁয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে একটি ইউটোপিয়া রয়েই গেল তাঁর সাহিত্যে।

মধুসূদন তাহলে আর কী কী করেছিলেন তাঁর সাহিত্যচর্চার এই সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে? তিনি স্বদেশে থাকতেই খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা কি কেবল তাঁর ধর্মচিন্তার জায়গা থেকে?

সবশেষ তাঁর সনেট-প্রকল্প নিয়ে কথা বললে এই বিষয় বেশ শক্তভাবেই বলা যায় যে, মহাকাব্য কিংবা অন্যান্য কবিতা লেখার কালে তিনি সবচেয়ে স্ফটিকাকার কবিতা-প্রকল্প হিসেবে সনেটকে তাঁর কবিতা লেখার কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সেই সব সনেটের ভেতরে যদি একটুখানি ঢুঁ মারা যায়, তো সেখানে তিনি বিদেশি কবি না হয়ে দেশি কবি ও কবিতা লেখার বিষয় তাঁর কবিতার খাতায় জারি রেখে দিলেন; অর্থাৎ বিষয় হিসেবে এই কাব্যে পরিপ্রেক্ষিতকে আকাঁড়ারূপে প্রকাশ করতে পারলেন। আর সামগ্রিকভাবে তাঁর সনেটপ্রকল্পই তাঁর সাহিত্যিক-জীবনের ভালো উপস্থাপনা করতে সক্ষম হয়েছে। আর এই সনেটপ্রকল্পেই মধুসূদন তাঁর নিজের বাস্তবতায় ফিরে এসেছিলেন। যা ভুল-নিভুর্লতা, শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা, ভালো-মন্দ-এই প্রকল্পের ভেতর দিয়েই তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল একরকম।

মধুসূদন তাহলে আর কী কী করেছিলেন তাঁর সাহিত্যচর্চার এই সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে? তিনি স্বদেশে থাকতেই খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা কি কেবল তাঁর ধর্মচিন্তার জায়গা থেকে? এমন কোনো তীব্র সাক্ষী এক্ষেত্রে আমাদের হাতে নেই। বরং বলা যায় প্রণয়ঘটিত বিষয়টি এক্ষেত্রে সক্রিয় ছিল; এরই সাথে তিনি যে পশ্চিমা চিন্তাবিষ্টতায় ভুগছিলেন তাঁর পড়ালেখার কাল থেকে, সেটিই তাঁকে এই জায়গায় নিয়ে পৌঁছোতে আরও বিশেষভাবে সহায়তা করেছিল। পশ্চিমের ধর্মচিন্তার ক্রমবিবর্তনের ভেতর দিয়ে যে আলোকায়ন ও অন্যান্য চিন্তার উন্মেষ-বিকাশ ঘটেছিল, সেই বিষয়টিই মধুসূদনকে ধর্মান্তরের জন্য প্রভাবিত করতে পেরেছিল। তিনি মনে করেছিলেন, খ্রিষ্টীয়করণ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তিনি যদি যান তবে হয়তোবা তাঁর সাহিত্যিক জীবন বেশ সফল হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবে তা তাঁর কাছে ধরা দেয়নি।

মধুসূদন বিদেশ গমন করেছিলেন তাঁর চিন্তার সারাৎসার খুঁজে পেতে। এই কথা বললে বেশ বেমানান লাগে যে, চিন্তা খুঁজতে বিদেশ গমন করেছিলেন তিনি। কিন্তু সত্যি তিনি তো তা করেছিলেন। নিজের অবস্থান তিনি বদলাতে পারেননি। কারণ সেটি বদলানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেই যে কম বয়সের পশ্চিমাপ্রীতি, দরদ আর আগ্রহের বিষয় তাঁকে পাগলের মতো টানতে টানতে বিদেশ নিয়েই পৌঁছেছিল শেষমেশ। সেখানে গিয়ে তিনি কোনো ভালো কিছু করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। তিনি বরং বিদেশ গিয়ে আরো বেশি দেশে ফিরে এসেছিলেন, দেখেছিলেন সেখানকার সাহিত্যিক পরিমণ্ডল তাঁকে আর সেভাবে আর নিচ্ছে না। তিনি তাই চিঠি লিখে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, মহররমের কাহিনি নিয়ে একটি মহাকাব্য রচিত হতে পারে। আর রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি নিয়ে তিনি তো নিজেই লিখে গিয়েছিলেন অমর মহাকাব্য।

এই প্রসঙ্গে আরও বলতে হয় যে, মধুসূদন বিদেশ গিয়ে আরও বেশি দেশের অনুকূলে পৌঁছোতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তাঁকে দিয়ে এই ফরাসি কিংবা ইংরেজ-এই দুই সাহিত্য-সমাজে অবস্থান করে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই যখন তিনি কপোতাক্ষ নদ নিয়ে কবিতা লিখলেন, তখন তা ফর্মের দিক থেকে সনেট হলো, কিন্তু বিষয়ের দিক থেকে তা আর স্বদেশের বাইরে যেতে পারলো না।

আবার রাধাকে নিয়েই মধুসূদন কবিতা লিখলেন, কিন্তু সেই রাধার আগে-পরে তিনি অন্য এক জীবনের বাস্তবতা চাপিয়ে দিলেন। পশু ও কৃষি সেই সামন্ততান্ত্রিক যুগ-পরিবেশ তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় হিসেবে এলো রাধাকে ঘিরেই। কিন্তু সেই যুগও আর তখন থাকলো না। রাধা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে সেই সময়ে। সব বদলে গেছে-একথা সত্য না হলেও সাহিত্যচর্চার পরিপ্রেক্ষিতগত অবস্থা একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

আবার তিনি ইংরেজিতেও কবিতা লিখে বড়ো বড়ো পত্র-পত্রিকায় পাঠাতে লাগলেন। তার প্রায় অধিকাংশই কেউ ছাপল না। বরং এই উপদেশ দিয়ে এসব কবিতা ফেরত দেওয়া হলো যে, তিনি কেবল নিরম্বু অপচয় করে যাচ্ছেন নিজের বেলায়ই। তাই তাঁর এখনই মনোযোগী হওয়া উচিত তাঁর নিজের ভাষা-সাহিত্যের প্রতি। এরপরও তিনি যে বোধ ও সাহিত্য-শিক্ষার অবস্থানে পৌঁছে গেছেন, সেই অবস্থান থেকে নিচে নেমে এসে আবার ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর হবেন তিনি, এমনকি ঈশ্বরগুপ্তের মতো কিছু লিখবেন-তিনি তা আর পারেননি। ফলে তাঁকে নিজের পরিমণ্ডলের ভেতরে থেকেই লিখতে হলো। তিনি বাংলা ভাষার জন্য বড়ো উপকার করে গেলেন ঠিকই, কিন্তু আমৃত্যু এই সংকটকে নিয়েই তাঁকে সাহিত্যচর্চা করে যেতে হলো। তিনি হয়তোবা এই পথটা দেখিয়ে গিয়েছিলেন। যে পথে পরিপ্রেক্ষিতগত সংকট থাকার পরও আমরা আজতক সে পথেই সাহিত্য করে চলেছি। তাঁর কালের সংকট কাটানোর পরিস্থিতি নির্মাণে সক্রিয় আছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত