জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ঈদের ছুটিতে দেখতে পারেন এই ৭ কালজয়ী বাংলা সিনেমা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২৬, ১৫: ২৮
ঈদের ছুটিতে দেখতে পারেন এই ৭ কালজয়ী বাংলা সিনেমা

ঈদের ছুটি মানেই ভরপেট খাওয়াদাওয়া, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি কিংবা সিনেমা দেখা। পুরোনো দিনের বাংলা সিনেমার বিভিন্ন ক্লিপ রিলস হিসেবে আমরা ফেসবুক বা ইউটিউবে অনেকসময়ই দেখি। কেমন হয় এবারের ঈদে সেই সিনেমার পুরোটা পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখলে?

আধুনিক সময়ের হিসেবে এই সিনেমাগুলোর গল্প বলার ধরণ কিংবা নির্মাণশৈলী অনেকটাই ভিন্ন মনে হতে পারে। তবে দেশীয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝতে চাইলে এ সিনেমাগুলো আপনাকে বেশ সাহায্য করতে পারে।

এ ছাড়া ভরপুর বিনোদনে ডুবে থাকতে চাইলে বন্ধুবান্ধব বা কাজিনদের নিয়ে এখনই পপকর্ণ হাতে নিয়ে ইউটিউব খুলে বসে যান আর উপভোগ করুন এসব পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি।

রূপবান

‘কীসের লেখা, কীসের পড়া গো?

ও দাই মা, কিছুই ভালো লাগে না

আমার দাই মা, দাই মা গো’

ফেসবুকের রিলসে এই গান শোনেনি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। একই সুরে এমন অনেক গান রয়েছে ‘রূপবান’ সিনেমাতে। পরিচালক সালাহউদ্দিন নির্মিত 'রূপবান' সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৬৫ সালে। বাংলার জনপ্রিয় লোককথার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন সুজাতা, মনসুর, সিরাজুল ইসলাম, ইনাম আহমেদ প্রমুখ।

সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, এক রাজপুত্রকে অভিশাপ থেকে বাঁচাতে ১২ দিন বয়সী শিশু রাজপুত্র রহিমের সঙ্গে তরুণী রূপবানের বিয়ে দেওয়া হয়। শিশু স্বামীকে নিয়ে রূপবানকে বনবাসে পাঠানো হয়। সেখানে বহু কষ্টে স্বামীকে বড় করে তোলে রূপবান। স্বামী বড় হয়ে তাজেল নামের এক রাজকন্যার প্রেমে পড়লে শুরু হয় রূপবানের জীবনের নতুন এক সংগ্রাম।

রূপবান। সংগৃহীত ছবি
রূপবান। সংগৃহীত ছবি

লোকজ সংস্কৃতির অসাধারণ এক চিত্র এই সিনেমা। মুক্তির পর সিনেমাটি অবিশ্বাস্য রকম ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ করে এবং টানা কয়েক মাস সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়। এই সিনেমাটি সেসময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ধুকতে থাকা চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুন করে জীবন দান করেছিল।

বেদের মেয়ে জোসনা

তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা। ২০ লাখ টাকা বাজেটের এই ছবি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৯ সালের ৯ জুন। ২০২৩ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্রের মধ্যে এক নম্বরে ছিল এর অবস্থান।

চলচ্চিত্রটি সে সময় এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে সিনেমার গানের অডিও ক্যাসেট মুক্তির এক মাসের মধ্যে এক লাখ কপি বিক্রি হয়। শুধু তাই নয়, হাসান মতিউর রহমানের লেখা ও মুজিব পরদেশীর গাওয়া ‘আমি বন্দি কারাগারে’ গানটি পরবর্তী কয়েক যুগ ধরে মানুষের মুখে শোনা যেত। সিনেমার টাইটেল গান ‘বেদের মেয়ে জোসনা’তে কণ্ঠ দিয়েছেন এন্ড্রু কিশোর ও রুনা লায়লা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর তালিকায় এখনো এই গানটি শুরুর দিকেই থাকবে। এই সিনেমায় জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন সেসময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এবং নায়িকা অঞ্জু ঘোষ।

বেদের মেয়ে জোসনা। সংগৃহীত ছবি
বেদের মেয়ে জোসনা। সংগৃহীত ছবি

সিনেমার মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে এক রাজপুত্র এবং সাধারণ এক বেদেনী বা সাপুড়ের মেয়ের প্রেমকে কেন্দ্র করে। রাজপুত্র জোসনার প্রেমে পড়লে শুরু হয় চরম শ্রেণী সংঘাত। সমাজের সব বাধা বিপত্তি পার হয়ে তাদের এই প্রেমের গল্প সেসময় মানুষের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। সিনেমাটির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে পরবর্তীতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও এটি হুবহু পুনর্নির্মাণ করা হয়।

আনন্দ অশ্রু

শিবলি সাদিক পরিচালিত 'আনন্দ অশ্রু' মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ, শাবনূর, হুমায়ূন ফরীদি প্রমুখ।

সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, খসরু নামের একজন প্রতিভাবান গীতিকার ও গায়ক নিজের চাচার দ্বারা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এর আগে দোলা নামের গ্রামের এক সাধারণ মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর তাদের এই প্রেম এক করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। সালমান শাহের মৃত্যুর পর মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি দর্শকমহলে ব্যাপক আবেগের জন্ম দেয়।

শিবলি সাদিক পরিচালিত 'আনন্দ অশ্রু'। সংগৃহীত ছবি
শিবলি সাদিক পরিচালিত 'আনন্দ অশ্রু'। সংগৃহীত ছবি

দারুণ গল্পের পাশাপাশি এই সিনেমার গানগুলো ছিল সুপারহিট। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ‘ভালো আছি ভালো থেকো /আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো…’ কবিতার কথাগুলো সুরের স্রোতে মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা /হৃদয়ের সুখের দোলা /নিজেকে আমি ভুলতে পারি / তোমাকে যাবে না ভোলা…’ গানে মানুষ নিজেদের ভালবাসাকে খুঁজে ফিরেছে।

হঠাৎ বৃষ্টি

১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া 'হঠাৎ বৃষ্টি' বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত একটি রোমান্টিক সিনেমা। খ্যাতিমান পরিচালক বাসু চ্যাটার্জি পরিচালিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন ফেরদৌস আহমেদ, প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদী, রাইসুল ইসলাম আসাদ প্রমুখ। সিনেমার গল্পটি সেই সময়ের হিসেবে বেশ আলাদা।

একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্র ধরে পূর্বপরিচয়হীন অজিত আর দীপার মধ্যে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু হয়। একে অপরকে না দেখেই চিঠির ভাষায় তারা একে অন্যের প্রেমে পড়ে যায়। আর এই প্রেম কিভাবে পূর্ণতার পথে যাবে, তা নিয়েই সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে। যেকোনো রোমান্সপ্রেমী মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে সিনেমার নির্মাণশৈলী।

সঙ্গে শ্রুতিমধুর গান তো আছেই। কখনো মরুর বুকে চিত্রনায়ক ফেরদৌস গাইছেন, ‘সোনালি প্রান্তরে, ভ্রমরার গুঞ্জরে’, কখনো চিত্রনায়িকা প্রিয়াংকা নায়কের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, ‘একদিন স্বপ্নের দিন, বেদনা বর্ণবহীন’ গান গেয়ে।

শ্রাবণ মেঘের দিন

‘এক যে ছিল সোনার কন্যা মেঘবরণ কেশ, ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ’ এই গানের সঙ্গে গলা মেলায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত 'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালে। এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, মাহফুজ আহমেদ, মুক্তি, গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ারাসহ আরও অনেকে।

সিনেমার গল্পটি গ্রামীণ পটভূমিতে বোনা এক সুন্দর ত্রিভুজ প্রেমের। গায়ক মতি মিয়াকে ভালোবাসে গ্রামের মেয়ে কুসুম। অন্যদিকে গ্রামের আরেক যুবক সুরুজও কুসুমকে পছন্দ করে। এদিকে জমিদারের নাতনী শাহানা সেই গ্রামে পা রাখার পর গ্রামীণ জীবনে আসতে থাকে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

গ্রামীণ জীবন, ভাটিয়ালি গান এবং না-বলা প্রেমের এক অসাধারণ দৃশ্যপট ফুটে উঠেছে এই সিনেমায়। এই সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ বেশ কয়েকটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

জীবন থেকে নেয়া

কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান পরিচালিত 'জীবন থেকে নেয়া' ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক রূপক সিনেমা। এতে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক, সুচন্দা, আনোয়ার হোসেন, রওশন জামিল, খান আতাউর রহমান প্রমুখ।

জীবন থেকে নেয়া। সংগৃহীত ছবি
জীবন থেকে নেয়া। সংগৃহীত ছবি

সিনেমার গল্পটি আপাতদৃষ্টিতে একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের। পরিবারের একনায়কতন্ত্র চালানো বড় বোন মূলত তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক আইয়ুব খানের রূপক। সেই বোনের বিরুদ্ধে পরিবারের অন্য সদস্যদের বিদ্রোহ আসলে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতার আন্দোলনেরই প্রতিচ্ছবি। এই সিনেমাতেই প্রথমবারের মতো মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটি সেলুলয়েডের ফিতায় ধারণ করা হয়।

স্বাধীনতার এই মাসে পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে পারেন কালজয়ী এ সিনেমাটি।

গোলাপী এখন ট্রেনে

বাংলাদেশি সিনেমার ইতিহাসে ‘গোলাপী’ শুধু একটি চরিত্র নয়। সে এক যাত্রা। প্রথম সিনেমা গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮) দিয়ে শুরু। পরে আসে গোলাপী এখন ঢাকায় (১৯৯৪) এবং গোলাপী এখন বিলেতে (২০১০)। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে প্রথম ‘সিরিজ চলচ্চিত্র’ হিসেবে পরিচিত এই সিনেমাগুলো। এই ট্রিলজিতে পরিচালক আমজাদ হোসেন সমাজকে গোলাপীর চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন।

সিনেমায় দেখা যায়, গোলাপী গ্রামের মেয়ে। গোলাপী চরিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা। ছোটবেলায়ই সে বুঝেছিল জীবন সহজ নয়। দরিদ্র পরিবার। জীবিকা নির্বাহের জন্য ট্রেনে চা বিক্রি করতে শুরু করে। ট্রেনের কামরা তার কর্মক্ষেত্র। সেখানে নানা মানুষের সঙ্গে দেখা হয়।

একদিন ফার্স্ট ক্লাসে বসার সময় একজন যাত্রী তাকে বলে, ‘এটা ফার্স্ট ক্লাস।’ গোলাপী জবাব দেয়, ‘বাংলাদেশে কোনো ক্লাস নেই, আমরা হইলো সবাই এক ক্লাসের মানুষ।’ এই সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।

গোলাপী শুধু অর্থ উপার্জন করতে চায় না। সে লড়ছে সামাজিক অবহেলা, শোষণ ও অপমানের বিরুদ্ধে। গ্রামের মোড়ল চরিত্রে অভিনয় করেছেন এ টি এম শামসুজ্জামান। ধনী, প্রভাবশালী, নির্দয় মোড়লের বিরোধ চলতে থাকে গোলাপীর সঙ্গে।

মোড়লের ছেলে মিলন (ফারুক) গোলাপীকে ভালোবাসে। কিন্তু বাবার অন্যায় দেখে চুপ থাকে না। পরিবারের ভেতর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মিলন সাহসী, তবে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখে পড়ে। গোলাপী একা হয়। তবুও তার যাত্রা থামে না। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় সে আবার ট্রেনে উঠছে।

মুক্তির পর ছবিটি সাড়া ফেলে। গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় সিনেমাটি। বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা পায়।

সম্পর্কিত