আটকে আতঙ্ক, মেডিকেল প্রতিনিধির পাশে নেই ‘কেউ’

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০০: ০৪
চিকিৎসাসেবার স্বার্থেই মেডিকেল প্রতিনিধিদের নীতিমালার আওতায় আনা উচিত। স্ট্রিম গ্রাফিক

আটকের ঘটনায় আতঙ্কে মেডিকেল প্রতিনিধিরা। তাদের অভিযোগ, লক্ষ্য পূরণে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে বিপদে পড়লেও, পাশে পাচ্ছেন না খোদ চাকরিদাতাকে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরেদরে আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং চিকিৎসা সেবার স্বার্থেই মেডিকেল প্রতিনিধিদের নীতিমালার আওতায় আনা উচিত।

বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক ও ফার্মেসি ঘুরে কোম্পানির ওষুধ পরিচিত করান মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর) ও মেডিকেল প্রমোশন অফিসাররা (এমপিও)। সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে কয়েকজন এমআরকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে আটকের কারণ হিসেবে তারা এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে হাসপাতালে ‘দালালি’ কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জরিমানা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ছেড়ে দিলেও, ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা হয়। বিশেষ করে এমআর-এমপিওদের বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আসে। অনেকেই এমআরদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

চিকিৎসকেরা বলছেন, এমআরদের দালাল তকমা দিয়ে হেনস্তা করার কোনো সুযোগ নেই। বরং তাদের সঠিক নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি। রাষ্ট্র এটি করতে ব্যর্থ হলে রোগীর পাশাপাশি ওষুধ শিল্প চরম ক্ষতির মুখে পড়বে।

এ ব্যাপারে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির (বাপি) নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, এমআর একটি বৈজ্ঞানিক পেশা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই এমআররা কাজ করেন। জ্ঞান বিনিময় ছাড়া কোনো খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা সব সময় সব ওষুধ সম্পর্কে জানেন না। এমআরের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো চিকিৎসককে জানানোর চেষ্টা করে। সে সময়ে তাদের প্রফেশনালি কিছু কোডস ও ওষুধপত্র দেওয়া হয়। এই কাজকে কোনোভাবেই দালালি বলার সুযোগ নেই।

চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. মোহাম্মদ ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, দালাল বলা খুবই খারাপ হয়েছে। এমআর প্রত্যেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর করা। এটি তাদের পেশা। ঢালাওভাবে তাদের দালাল বলা কিংবা গ্রেপ্তার করা সমর্থনযোগ্য নয়।

আটকে ক্ষোভ, আন্দোলনে প্রতিনিধিরা

গত ৪ মে ঢামেক হাসপাতালে শাহবাগ থানার সঙ্গে অভিযান চালায় সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তারা যে ৪৯ জনকে আটক করেন, তাদের মধ্যে ৩০ এমআর ছিলেন। ভুক্তভোগী কয়েকজন স্ট্রিমকে জানান, অফিসের কাজে এসে তাঁরা আটক হন। পরিচয় দিলে দালাল বলে চড়াও হন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

ছাড়া পেয়ে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান মামুন স্ট্রিমকে বলেন, আমাদের ভিজিট টাইম ছিল দুপুর ১২টায়। আমরা তো লিফট ব্যবহার করি না। এজন্য একটু আগে সিঁড়ি বেয়ে ৯ তলায় উঠি। ১২টা বাজার একটু আগে কয়েকজন এসে আমাদের হাতে হ্যান্ডকাফ দিয়ে শাহবাগ থানায় নিয়ে যান।

বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যালস রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালায়েন্সের (ফারিয়া) তথ্যে, ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শতাধিক এমআর আটক, জেল-জরিমানাসহ নানা হেনস্তার শিকার হয়েছেন। ঢামেকের ঘটনার পরে সারা দেশেই আন্দোলন করেছেন তাঁরা। ঢাকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। হয়রানি বন্ধ না হলে কর্মবিরতি এবং ওষুধ সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়েছেন মেডিকেল প্রতিনিধিরা।

ঢামেকের ঘটনায় শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, এমআরদের চিকিৎসকের সঙ্গে দেখার করার জন্য নির্দিষ্ট সময় আছে। কিন্তু তাঁরা সেটা মানেননি। নির্দিষ্ট সময়ের আগে তাঁরা দালালি কাজে যুক্ত থাকায় আটক করা হয়। এসব মানুষের কারণে গরিবরা হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে পারছেন না।

ওসির দাবি, আটকরা হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়ার তদবির করছিলেন। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ৫০০ টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নীরব চাকরিদাতা কোম্পানি

কয়েকজন এমআর স্ট্রিমকে জানান, তাদের পেশায় কাজের সময়সীমা বলে কিছু নেই। কখনো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতাল-ক্লিনিকে দৌড়াতে হয়। বিনিময়ে শুরুতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন মেলে। সঙ্গে থাকে যৎসামান্য যাতায়াত ভাতা। কাজের প্রধান শর্তই, ‘সেলস টার্গেট’ পূরণ। এটি পূরণের চাপে অনেক সময় হাসপাতালের নিয়ম মানতে পারেন না। চিকিৎসকের চেম্বারে ভিড়, রোগীর প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে নিজের কোম্পানির ওষুধ লিখতে অনুরোধ করতে হয়।

ফারিয়ার সাধারণ সম্পাদক ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির এমআর শফিকুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘এমআরদের কোনো ছুটি, কাজের সময়সীমাও নেই। সারাক্ষণ বাড়তি চাপে থাকতে হয়। ওষুধ কোম্পানি ভেদে দিনে ১৩০ থেকে ১৮০টা পর্যন্ত সেলস টার্গেট থাকে। এসব পূরণের প্রমাণ হিসেবে রোগীদের প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে রাখতে হয়। আমরা না চাইলেও করতে হচ্ছে। ছবি না দিলে চাকরি চলে যায়, পদোন্নতি হয় না। যাতায়াত ভাতা কেটে রাখে। ছবি তোলায় মানুষ খারাপ ভাবে। কিন্তু আমরা দালালির সঙ্গে যুক্ত নই।’

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রেসক্রিপশন রোগীর গোপন নথি। সমিতির পক্ষ থেকে আমরা ছবি নিতে নিষেধ করেছি। চাইলে অন্যভাবে জরিপ করা যায় এবং আমরা যতবার ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির মার্কেটিং হেডদের সঙ্গে মিটিং করি, ততবার সেই নির্দেশনা দিয়ে থাকি।

ঢামেকে আটক এমআরসহ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওষুধ কোম্পানির নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও প্রতিষ্ঠান তাদের দায় নিতে নারাজ। যেসব প্রতিষ্ঠানে তাঁরা কাজ করেন, মালিকপক্ষ থেকে পদক্ষেপ চান তাঁরা।

ফারিয়া সভাপতি এস এম এম রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ঢামেকের ঘটনার পর এখন পর্যন্ত মালিকপক্ষের কেউ কোনো কথা বলেননি। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের একটি সংগঠন রয়েছে। তারা পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটেছেন। আমাদের ছেলেদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, আমরা তার সুরাহা চাই। এভাবে চলতে পারে না, চলতে দেবও না।

তবে বাপির নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলামের দাবি, এমআরদের অভিযোগ সঠিক নয়। ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে যারা কাজ করেন, তাঁরা আমাদের লোক। আমাদের প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকি।

এ ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, বাজারে সবাই নিজ পণ্যের প্রচার চালান। বৈজ্ঞানিক পণ্যের তথ্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দেন এমআর-এমপিওরা। চিকিৎসকের কাছে পাবলিক আওয়ারে যাচ্ছে কিনা, ভিজিটের কারণে সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে কিনা, তাদের মাথায় রাখতে হবে। আইনে সরাসরি তাদের কার্যক্রমে মানা করার সুযোগ সীমিত।

এমআরদের হেনস্তা কমাতে ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের রেগুলেশনে নাই। এটি সরাসরি হসপিটাল ম্যানেজমেন্টের ইস্যু। সরকারের পক্ষ থেকে একটি টাইম দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে হসপিটাল ম্যানেজমেন্টের ইন-হাউস কোনো শৃঙ্খলা ইস্যু থাকতে পারে। তবে আটকের মতো কিছু হওয়ার কথা না।’

বিএমএ মহাসচিব ডা. মোহাম্মদ ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, এই পেশায় বহু মানুষ কাজ করছেন। তাদের ভুল নেই, বলব না। বড় সমস্যা এই পেশার কোনো নীতিমালা নাই। সরকারিভাবে একটি নীতিমালা থাকা দরকার। তাহলে এমআর-এমপিওরা আর হেনস্তার শিকার হবেন না।

আবদুল্লাহ কাফি

সম্পর্কিত