উৎপাদনের ‘উৎস’ ধসে অস্থির ডিমের বাজার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোকসানে ছোট খামার বন্ধ হয়ে যাওয়া, বৃষ্টির কারণে সবজি-মাংসের মূল্যবৃদ্ধি, হাতবদল ও মুরগির রোগের প্রাদুর্ভাবে বেড়েছে ডিমের দাম।

ঈদুল ফিতরের পর প্রতি ডজন ডিম ১০০ থেকে ১১০ টাকাতে বিক্রি হলেও এখন তা বেড়েছে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। খামারি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১ মাসে ধাপে ধাপে প্রতি সপ্তাহে কমবেশি ডিমের দাম বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধির আগে টানা কয়েকমাস ডিমের দাম কম ছিল। এ সময় ক্ষতি পোষাতে না পেরে অনেক ছোট খামারি মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে বর্তমান ডিমের বাজারে। এই সময়ে পোলট্রি খাদ্যমূল্য না বাড়লেও বেড়েছে ডিমের দাম।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, টানা লোকসান পোষাতে না পেরে লেয়ার মুরগি অনেকে বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার রোগেও কিছু মুরগি মারা গেছে। এ জন্য ডিমের দাম বাড়তি।

মেহেরপুরের খামারি মিলন হোসেন ১৩ হাজার লেয়ার মুরগি পালন করেন। টানা কয়েক মাস খামারে লোকসান দিয়ে খামার পরিচালনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘দেড় মাস আগেও সাড়ে ৭ টাকা করে প্রতিটি ডিম বিক্রি করেছি। তখন প্রতি ডিমে ২ টাকার মতো লোকসান হতো। এখন দাম বাড়াতে কিছুটা লাভ হচ্ছে। অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রতিদিন লোকসান দেওয়া তো সম্ভব নয়।’

দাম বাড়ার কারণে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রচুর মুরগি অসুখে মারা গেছে। ডিমের দাম কম থাকার কারণে লেয়ার মুরগির দামটা যখন বাড়ল, তখন অনেকে বিক্রি করে দিয়েছে। এই কারণে মুরগি এখন কম। ডিমের ঘাটতির এটাও কারণ।

মিলন আরও বলেন, ডিমের দাম তো বাড়া দরকার। দাম না থাকলে খামারি পর্যায়ে টিকে থাকতে পারবে না। পোলট্রি শিল্প নষ্ট হয়ে যাবে। প্রান্তিক খামারি না থাকলে তখন ডিম ২০ টাকায় কিনে খেতে হবে।

বাংলাদেশ প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন উপপরিচালক বলেন, উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় খামারিরা লসে ছিল এটা ঠিক। তবে উৎপাদন কমেনি সেভাবে। বৃষ্টির কারণে সবজি, মাংসের দাম বেশি এ জন্য ডিমের চাহিদা বেড়েছে। কোরবানির ঈদ এলে ডিমের দাম ঠিক হয়ে যাবে।

হাতবদলে বাড়ছে দাম

রাজধানীতে ডিম আসা থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে তিনবার হাত বদল হয়। প্রতিবারই বাড়ে দাম। এ বিষয়ে তেজগাঁও ডিম মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হানিফ মিয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে আড়তদারেরা নিজে অথবা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ডিম আনেন। এরপর পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। খানে ১৫-১৬ লাখ ডিম আসে। গাড়িভাড়া, লেবার খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি ডিমে ৫ থেকে ১০ পয়সা লাভ করেন এখানকার ব্যাবসায়ীরা।’

তেজগাঁও পাইকারি ডিমের আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার সাইজ ভেদে ১০০টি ডিম বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০ টাকা থেকে ১ হাজার ৯০ টাকায়। প্রতিটি ডিম ১০ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৯০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। এরপর পাইকার সেটা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ১ হাজার ১২০ টাকা থেকে ১ হাজার ১৬০ টাকায় বিক্রি করেছেন। যা পরবর্তীতে হাত বদল হয়ে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকার ওপরে। অর্থাৎ প্রতিটি ১২ থেকে সাড়ে ১২ টাকায়।

সোমবার রাজধানীর হাতিরপুল কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা বাজারে প্রতি হালি মুরগির লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা ও সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও যা বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকা ও ১৩০ টাকায়।

হাতিরপুল বাজারে ডিম কিনতে এসেছেন আইনজীবী মো. লিটন । তিনি বলেন, কয়দিন আগেও ডিমের দাম কম ছিল। এখন ৫০ টাকা হালি কিনতে হচ্ছে।

ডিমের উৎপাদন খরচ কত

ডিমের উৎপাদন খরচ নির্ভর করে খামারের আকারের ওপর। বড় খামারের উৎপাদন খরচ কম, ছোট খামারের বেশি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে বলেন, ক্ষুদ্র খামারিদের তাদের ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৮০ পয়সা পড়ে এবং বড় খামারির ক্ষেত্রে ১০ টাকা ৩৮ পয়সা বা ১০ টাকা ৪০ পয়সার মতো। গড়ে ১০ টাকা ৫০ বা ৬০ পয়সা।

তিনি আরও বলেন, ডিম বিক্রি করার সময়েও আরও কিছু খরচ আছে। সেক্ষেত্রে ১১ টাকার নিচে কোনোভাবেই ডিমের দাম হওয়া উচিত নয়। ডিমের দাম যখন ১১ টাকার নিচে চলে আসে, তখন উৎপাদনকারীরা অস্বস্তিতে ভোগেন। আবার সাড়ে ১১ টাকা বা ১২ টাকার বেশি হলে ভোক্তাদের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।

সম্পর্কিত