আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনারের

যুদ্ধ নিয়ে এবার ইরানের ‘গড়িমসি’ কৌশল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ২২: ৫১
স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুদ্ধ অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। তেহরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রস্তাব দিয়েছে। ইরান সেই প্রস্তাবের জবাব দেওয়ার জন্য এখনো সময় নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল শুক্রবারের (৮ মে) মধ্যে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে জবাব পাওয়া যাবে। তবে তেহরান জানিয়েছে, তারা এখনো প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। তারা দাবি করেছে, যেকোনো চুক্তি হতে হবে ‘ন্যায্য এবং সামগ্রিক’।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটন ১৪ দফার প্রস্তাব তুলে ধরে। এতে বলা হয়েছে, ইরানকে অন্তত ১২ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে। মার্কিন প্রস্তাবে ইরানের ওপর চলা কয়েক দশকের অবরোধ তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর আলোচনা শুরু হয়। হরমুজ প্রণালি ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন সরকার ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাব কী এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া কেমন?

মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রস্তাবে ইরানের কাছে দুটি দাবি করা হয়েছে। প্রথমত, অন্তত ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখা। দ্বিতীয়ত, ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। ইরানকে তাদের প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে। এই ইউরেনিয়াম তারা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় না পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ পর্যায়ে ইরান পৌঁছাক। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছু অবরোধ তুলে নেওয়ার এবং ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন ‘খুব শিগগিরই’ ইরানের উত্তর জানতে পারবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আশা প্রকাশ করেছেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উত্তর পাওয়া যাবে। ইতালির রোমে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দেখব তাদের উত্তরে কী থাকে। আশা করছি, এমন কিছু আসবে যা আমাদের আলোচনার প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে পারে।’

ট্রাম্প বারবার বলছেন, আলোচনা এগোচ্ছে। এ সপ্তাহের শুরুতে তিনি জানান, দুই পক্ষের মধ্যে ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানো ‘পুরোপুরি সম্ভব’।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শুক্রবার বলেছেন, তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে এবং তাদের উত্তরের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে।

ইরানের উত্তর দিতে দেরি হওয়ার কারণ কী?

আল জাজিরার সংবাদদাতা রাসুল সেরদার আতাশ জানিয়েছেন, শুক্রবার তেহরানের উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও তা হয়নি। আতাশ জানান, এই দেরির কারণ হলো মার্কিন প্রস্তাব—যা মূলত একটি ‘প্রযুক্তিগত টেক্সট’। ইরানি মধ্যস্থতাকারীরা ওই টেক্সটের প্রতিটি তারিখ এবং শব্দ নিয়ে চিন্তিত। তিনি আরও বলেন, এই উত্তর পাঠানোর আগে ইরানের একাধিক ক্ষমতাকেন্দ্রকে তা অনুমোদন করতে হবে। সবশেষে, সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির ‘সবুজ সংকেত প্রয়োজন’।

দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, মার্কিন প্রস্তাবে সাড়া দিতে ইরানের দেরির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এলমাসরি বলেন, ‘ইরানিরা বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের হাতে দর-কষাকষির বেশি ক্ষমতা রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের কূটনৈতিক আলোচনায় অভিজ্ঞতা কম। তারা ধৈর্য্যহীন এবং ট্রাম্পের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় তারা দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করতে চায়।

ইরানের শর্তগুলো কী কী?

আল জাজিরার আতাশের মতে, ইরানি কর্মকর্তারা ‘তিন ধাপের কৌশল’ অনুসরণ করছেন। প্রথম ধাপে, তেহরান চায় সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধ অবসান নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

আতাশ বলেন, ‘এই বিষয়ে গ্যারান্টি দেওয়া আমেরিকানদের জন্য কঠিন।’ ১৭ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল সীমান্ত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ২ মার্চ সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৮ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন।

আতাশের মতে, ইরান এমন নিশ্চয়তা দাবি করছে যে হামলা আর নতুন করে শুরু হবে না। তিনি বলেন, ‘ইরানিরা জোর দিচ্ছে, এই নিশ্চয়তা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে আসতে হবে; ওয়াশিংটনের জন্য যা মেনে নেওয়া কঠিন।’

জানা গেছে, ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে অবরোধ তুলে নেওয়া, আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করা, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজের নিয়ন্ত্রণ।

আতাশ বলেন, ‘হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই শর্ত মানা কঠিন। অনেক আঞ্চলিক দেশের জন্যও এই শর্ত মানা কঠিন।’

রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দেবে না। শুক্রবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক পোস্টে রুবিও বলেন, ‘প্রতিটি দেশকে নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, তারা এমন একটি দেশকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেবে কি না, যারা একটি আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণের দাবি করে। উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে শুধু কড়া কথা বলার চেয়ে তাদের উচিত এর পেছনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া।’

আলোচনার আরেক বড় বাধা হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। আতাশ বলেন, ‘ইরানিরা তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলতে এবং সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম অন্য দেশকে দিতে রাজি হচ্ছে না।’

অন্যদিকে আলোচনার ক্ষেত্রে মার্কিন নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আরাগচি বলেন, ‘যখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব টেবিলে থাকে, যুক্তরাষ্ট্র তখনই বেপরোয়া সামরিক দুঃসাহসিকতার পথ বেছে নেয়।’

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত