লেখা:

মাসিক পত্রিকা ‘আদব-ই-লতিফ’-এর ১৯৪৩ সালের বার্ষিক সংখ্যায় আমার একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। নাম ‘কালি সালওয়ার’। কিছু মানুষ একে ভুল বুঝেছেন। তাঁদের সেই ভুল ধারণা দূর করার জন্য আমি এই প্রবন্ধটি লিখছি।
গল্প লেখা আমার পেশা। আমি গল্পের সমস্ত আদবকেতা জানি। এর আগেও আমি এই একই বিষয়ে অনেক গল্প লিখেছি। সেগুলোর কোনোটিই অশ্লীল নয়। ভবিষ্যতেও আমি এই বিষয়ে গল্প লিখব।
হজরত আদমের কাল থেকে সত্য কথা বলার রেওয়াজ চলে আসছে। সম্ভবত সেই রেওয়াজ কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। শুধু এর ধরণ বদলে যাবে। তবে মানুষ তার অনুভূতি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ধারা বজায় রাখবেই। পতিতাদের নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক লেখা হয়েছে। সামনেও আরও অনেক কিছু লেখা হবে। হাজার বছর ধরে তারা আমাদের মাঝে টিকে আছে। তাদের উল্লেখ ঐশী কিতাবগুলোতেও পাওয়া যায়। এখন কোনো নতুন ঐশী কিতাব বা পয়গম্বর আসার সুযোগ নেই। তাই বর্তমান সময়ে তাদের কথা পবিত্র আয়াতে নয়, বরং খবরের কাগজ, সাময়িকী বা বইপত্রে আপনারা দেখতে পান। এগুলো পড়ার সময় আগরবাতি বা লোবান জ্বালানোর প্রয়োজন পড়ে না।
আমি এমন একজন মানুষ যে এ ধরনের সাময়িকী বা বইপত্রে লিখি। আমি যা দেখি, তা-ই লিখি। যে দৃষ্টিভঙ্গি বা যে কোণ থেকে আমি দেখি, ঠিক সেভাবেই অন্যদের সামনে তুলে ধরি। যদি সব লেখকই পাগল হতেন, তবে আপনারা আমাকেও সেই পাগলদের দলেই রাখতে পারতেন।
‘কালি সালওয়ার’ গল্পের পটভূমি একজন পতিতার ঘর। এটি অন্য যেকোনো ঘরের মতোই সাধারণ। সেখানে বিস্ময়কর কোনো ব্যাপার নেই। দিল্লির মতো জায়গায় এমন নারীদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নেই। শহরের আনাচে-কানাচে তাদের অজস্র ঘর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমার গল্পের সুলতানাও এমনই এক সাদামাটা ঘরে থাকত।
এই ঘর সে নিজে বানায়নি। সে ছিল এক জোনাকির মতো। রাত নামলে নিজের ঘর নিজে সে আলোকিত করতে পারে না। আলোর জন্য তার ঘরে বিদ্যুৎ ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বিদ্যুৎ তো আর মাগনা পাওয়া যায় না। তেমনি থাকার ঘরটির জন্যও ভাড়া দিতে হয়। সেই ভাড়ার পয়সা জোগাতে তাকে লড়াই করতে হতো। বিবাহিতা হলে হয়তো এসব সে বিনে পয়সায় পেত। বিদ্যুৎ আর ঘর ভাড়ার টাকা দেওয়ার চাপ এলে তাঁর জন্য দয়ালু কেউ এগিয়ে আসত না। সুলতানা তখন অস্থির হয়ে পড়ত। নিজেদের ঘরে থাকে যেসব নারী, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গে সুলতানাকে মেলানোর উপায় নেই।
আমার গল্পের সুলতানা পতিতা পল্লীর একজন সাধারণ নারী। তার পেশাও সেটিই। পতিতা পল্লীর নারীদের কে না চেনে? প্রতিটি শহরেই এমন এলাকা রয়েছে। ড্রেন আর নোংরা নর্দমাকেও কে না চেনে? প্রতিটি শহরেই নোংরা জল বের করে দেওয়ার জন্য নর্দমা থাকে। আমরা আমাদের মার্বেল পাথরের তৈরি স্নানঘরে বসে ড্রেনের গল্প করতে পারি। যদি সাবান আর ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধি নিয়ে কথা বলতে পারি, তবে নর্দমা আর নোংরা ড্রেন নিয়ে কেন কথা বলতে পারব না? এগুলোও তো আমাদের শরীরের ময়লাই বহন করে। আমরা যদি মন্দির আর মসজিদের কথা বলতে পারি, তবে পতিতা পল্লীর কথা কেন বলতে পারব না? মন্দির আর মসজিদ তো সেই জায়গা, যেখান থেকে ফিরে মানুষ আবার সেই পতিতালয় আর মদের দোকানের দিকেই ছোটে। আমরা যদি আফিম, ভাঙ, চরস আর মদের আড্ডার কথা বলতে পারি, তবে যেখানে সব ধরনের নেশা করা হয় সেই জায়গা নিয়ে কেন কথা বলা যাবে না?
ঝাড়ুদারদের আমরা অস্পৃশ্য মনে করি। ঝাড়ুদার যখন আমাদের ঘরের ময়লা ঝুড়িতে ভরে বাইরে নিয়ে যায়, আমরা নাকে রুমাল চাপা দেই। ঘেন্না লাগে ঠিকই, কিন্তু আমরা ঝাড়ুদারের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারি না। ঠিক তেমনি শরীরের ভেতর থেকে যে বর্জ্য বেরিয়ে যায়, তাকেও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অসুখ সারানোর ঔষধ তো এজন্যই তৈরি হয় যাতে আমাদের শরীর থেকে বিষাক্ত ময়লা বেরিয়ে যেতে পারে। শরীরের স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটলে তো আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি। যদি ময়লা পরিষ্কারের কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতি আবিষ্কার হয়ে যেত, তবে ঝাড়ুদারদের আর দরকার হতো না।
আমরা যদি ঝাড়ুদারদের নিয়ে কথা বলি, তবে ময়লা আর আবর্জনার কথা আসবেই। তেমনি আমরা যদি পতিতা নিয়ে কথা বলি, তবে তাদের পেশার কথাও আসবে। বেশ্যালয়ে আমরা প্রার্থনা করতে যাই না। আমরা সেখানে কেন যাই তা সবারই জানা। যাই কারণ সেখানে যাওয়ার অনুমতি আছে। সেখান থেকে আমরা পছন্দমতো শরীর কিনে নিতে পারি। যখন সেখানে যাওয়ার অবাধ অনুমতি আছে, যখন প্রতিটি নারী চাইলে পতিতা হতে পারে আর লাইসেন্স নিয়ে দেহ ব্যবসা করতে পারে— অর্থাৎ যখন এই ব্যবসা আইনত স্বীকৃত, তখন এটি নিয়ে আমরা কেন কথা বলতে পারব না?
যদি পতিতার উল্লেখ করা অশ্লীল হয়, তবে তার অস্তিত্ব থাকাও তো অশ্লীল। যদি তার কথা বলা নিষিদ্ধ হয়, তবে এই পেশাটাও নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। আপনারা পতিতাপ্রথা বিলুপ্ত করে দিন, দেখবেন তার উল্লেখও নিজে থেকেই মুছে যাবে।
আমরা উকিলদের নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারি। আমরা নাপিত, ধোপা এবং মেথরদের নিয়েও কথা বলতে পারি। আমরা চোর, ডাকাত আর খুনিদের নিয়ে গল্প করতে পারি। আমরা জিন আর পরীদের কাহিনীর আসর বসাতে পারি। আমরা বলতে পারি যে একটি বলদ তার শিংয়ের ওপর পুরো পৃথিবী ধরে রেখেছে। আমরা আমির হামজা কিংবা ‘তোতানামা’র কাহিনী লিখতে পারি। আমরা পালোয়ানের বীরত্ব আর হোজ্জা নাসিরুদ্দিনের চাতুরীর প্রশংসা করতে পারি। আমরা টিয়া আর ময়না পাখির গল্প শোনাতে পারি। আমরা জাদুটোনা আর তন্ত্রমন্ত্রের কথা বলতে পারি। আমরা দাড়ির স্টাইল, পায়জামার লম্বাই কিংবা চুলের সিঁথি নিয়ে বিতর্ক করতে পারি। আমরা পোলাও বা কোরমা রান্নার নতুন নতুন রেসিপি নিয়ে ভাবতে পারি। আমরা ভাবতে পারি যে সবুজ রঙের কাপড়ে কী রঙের বোতাম মানাবে। কিন্তু আমরা পতিতাদের নিয়ে ভাবতে পারব না। কেন? কেন তাদের পেশা নিয়ে আলোচনা করতে পারব না? সেই সব মানুষদের নিয়ে কেন কিছু বলতে পারব না যারা তাদের কাছে যায়?
আমরা চাইলে একজন তরুণ আর তরুণীর প্রেম করিয়ে দিতে পারি। তাদের প্রথম দেখা করিয়ে দিতে পারি দাতা গঞ্জ বখশ-এর মাজারে। এমনকি বুড়ো বয়সেও তাদের দিয়ে প্রেম করাতে পারি। শেষে তাদের ব্যর্থ প্রেম নিয়ে মাতম করতে পারি। তাদের দুজনের জানাজা দুই মহল্লা থেকে বের করে এক কবরে মাটি দিতে পারি। এমনকি কবরের ওপর ফেরেশতাদের দিয়ে ফুলও বর্ষণ করাতে পারি। অথচ আমরা একজন পতিতার জীবন নিয়ে কেন বলতে পারি না? তার জীবনে তো ফেরেশতা বা ফুলের দরকার পড়ে না। সে যদি মারা যায়, তবে অন্য মহল্লা থেকে কেউ তার জানাজায় আসে না। মৃত্যুতেও কেউ তার সঙ্গী হয় না। কেউ তার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছেও প্রকাশ করে না।
আসলে একজন পতিতা নিজেই যেন এক জ্যান্ত জানাজা। সমাজের লাশ সে নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে চলছে। সমাজ তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দাফন করবে না, যতক্ষণ সে কথা বলতে থাকবে। এই সমাজ পচা, দুর্গন্ধযুক্ত এবং বীভৎস হতে পারে, কিন্তু একে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। এই সমাজ কি আমাদের কিছুই লাগে না? আমরা কি এর আত্মীয় বা আপন কেউ নই? আমরা কি একে কাফন ছাড়াই নগ্ন অবস্থায় দেখব এবং অন্যদেরও তাই দেখাব?
দিল্লির মিউনিসিপ্যালিটি পতিতাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করে দিয়েছিল। সেই জায়গা ছিল পরিত্যাক্ত এক মালগুদাম। মিউনিসিপ্যালিটি কি বুঝতে পেরেছিল এই পতিতাদের জীবনের একদম সঠিক প্রতিচ্ছবি এই মালগুদাম? যারা সমাজকে গভীরভাবে দেখেন, তাঁদের চোখে এই বাড়িগুলো আর মালগুদামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁরা হয়তো 'কালি সালওয়ার'-এর মতো আরও অনেক গল্পই লিখবেন।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত। উৎস: ‘মুঝে কুছ ক্যাহনা হ্যাঁয়’, কমরেড মান্টো, সম্পাদক আলী আহমদ ফাতমি, রুজহান পাবলিকেশন্স, ২০১২, এলাহাবাদ)

মাসিক পত্রিকা ‘আদব-ই-লতিফ’-এর ১৯৪৩ সালের বার্ষিক সংখ্যায় আমার একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। নাম ‘কালি সালওয়ার’। কিছু মানুষ একে ভুল বুঝেছেন। তাঁদের সেই ভুল ধারণা দূর করার জন্য আমি এই প্রবন্ধটি লিখছি।
গল্প লেখা আমার পেশা। আমি গল্পের সমস্ত আদবকেতা জানি। এর আগেও আমি এই একই বিষয়ে অনেক গল্প লিখেছি। সেগুলোর কোনোটিই অশ্লীল নয়। ভবিষ্যতেও আমি এই বিষয়ে গল্প লিখব।
হজরত আদমের কাল থেকে সত্য কথা বলার রেওয়াজ চলে আসছে। সম্ভবত সেই রেওয়াজ কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। শুধু এর ধরণ বদলে যাবে। তবে মানুষ তার অনুভূতি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ধারা বজায় রাখবেই। পতিতাদের নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক লেখা হয়েছে। সামনেও আরও অনেক কিছু লেখা হবে। হাজার বছর ধরে তারা আমাদের মাঝে টিকে আছে। তাদের উল্লেখ ঐশী কিতাবগুলোতেও পাওয়া যায়। এখন কোনো নতুন ঐশী কিতাব বা পয়গম্বর আসার সুযোগ নেই। তাই বর্তমান সময়ে তাদের কথা পবিত্র আয়াতে নয়, বরং খবরের কাগজ, সাময়িকী বা বইপত্রে আপনারা দেখতে পান। এগুলো পড়ার সময় আগরবাতি বা লোবান জ্বালানোর প্রয়োজন পড়ে না।
আমি এমন একজন মানুষ যে এ ধরনের সাময়িকী বা বইপত্রে লিখি। আমি যা দেখি, তা-ই লিখি। যে দৃষ্টিভঙ্গি বা যে কোণ থেকে আমি দেখি, ঠিক সেভাবেই অন্যদের সামনে তুলে ধরি। যদি সব লেখকই পাগল হতেন, তবে আপনারা আমাকেও সেই পাগলদের দলেই রাখতে পারতেন।
‘কালি সালওয়ার’ গল্পের পটভূমি একজন পতিতার ঘর। এটি অন্য যেকোনো ঘরের মতোই সাধারণ। সেখানে বিস্ময়কর কোনো ব্যাপার নেই। দিল্লির মতো জায়গায় এমন নারীদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নেই। শহরের আনাচে-কানাচে তাদের অজস্র ঘর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমার গল্পের সুলতানাও এমনই এক সাদামাটা ঘরে থাকত।
এই ঘর সে নিজে বানায়নি। সে ছিল এক জোনাকির মতো। রাত নামলে নিজের ঘর নিজে সে আলোকিত করতে পারে না। আলোর জন্য তার ঘরে বিদ্যুৎ ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বিদ্যুৎ তো আর মাগনা পাওয়া যায় না। তেমনি থাকার ঘরটির জন্যও ভাড়া দিতে হয়। সেই ভাড়ার পয়সা জোগাতে তাকে লড়াই করতে হতো। বিবাহিতা হলে হয়তো এসব সে বিনে পয়সায় পেত। বিদ্যুৎ আর ঘর ভাড়ার টাকা দেওয়ার চাপ এলে তাঁর জন্য দয়ালু কেউ এগিয়ে আসত না। সুলতানা তখন অস্থির হয়ে পড়ত। নিজেদের ঘরে থাকে যেসব নারী, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গে সুলতানাকে মেলানোর উপায় নেই।
আমার গল্পের সুলতানা পতিতা পল্লীর একজন সাধারণ নারী। তার পেশাও সেটিই। পতিতা পল্লীর নারীদের কে না চেনে? প্রতিটি শহরেই এমন এলাকা রয়েছে। ড্রেন আর নোংরা নর্দমাকেও কে না চেনে? প্রতিটি শহরেই নোংরা জল বের করে দেওয়ার জন্য নর্দমা থাকে। আমরা আমাদের মার্বেল পাথরের তৈরি স্নানঘরে বসে ড্রেনের গল্প করতে পারি। যদি সাবান আর ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধি নিয়ে কথা বলতে পারি, তবে নর্দমা আর নোংরা ড্রেন নিয়ে কেন কথা বলতে পারব না? এগুলোও তো আমাদের শরীরের ময়লাই বহন করে। আমরা যদি মন্দির আর মসজিদের কথা বলতে পারি, তবে পতিতা পল্লীর কথা কেন বলতে পারব না? মন্দির আর মসজিদ তো সেই জায়গা, যেখান থেকে ফিরে মানুষ আবার সেই পতিতালয় আর মদের দোকানের দিকেই ছোটে। আমরা যদি আফিম, ভাঙ, চরস আর মদের আড্ডার কথা বলতে পারি, তবে যেখানে সব ধরনের নেশা করা হয় সেই জায়গা নিয়ে কেন কথা বলা যাবে না?
ঝাড়ুদারদের আমরা অস্পৃশ্য মনে করি। ঝাড়ুদার যখন আমাদের ঘরের ময়লা ঝুড়িতে ভরে বাইরে নিয়ে যায়, আমরা নাকে রুমাল চাপা দেই। ঘেন্না লাগে ঠিকই, কিন্তু আমরা ঝাড়ুদারের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারি না। ঠিক তেমনি শরীরের ভেতর থেকে যে বর্জ্য বেরিয়ে যায়, তাকেও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অসুখ সারানোর ঔষধ তো এজন্যই তৈরি হয় যাতে আমাদের শরীর থেকে বিষাক্ত ময়লা বেরিয়ে যেতে পারে। শরীরের স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটলে তো আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি। যদি ময়লা পরিষ্কারের কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতি আবিষ্কার হয়ে যেত, তবে ঝাড়ুদারদের আর দরকার হতো না।
আমরা যদি ঝাড়ুদারদের নিয়ে কথা বলি, তবে ময়লা আর আবর্জনার কথা আসবেই। তেমনি আমরা যদি পতিতা নিয়ে কথা বলি, তবে তাদের পেশার কথাও আসবে। বেশ্যালয়ে আমরা প্রার্থনা করতে যাই না। আমরা সেখানে কেন যাই তা সবারই জানা। যাই কারণ সেখানে যাওয়ার অনুমতি আছে। সেখান থেকে আমরা পছন্দমতো শরীর কিনে নিতে পারি। যখন সেখানে যাওয়ার অবাধ অনুমতি আছে, যখন প্রতিটি নারী চাইলে পতিতা হতে পারে আর লাইসেন্স নিয়ে দেহ ব্যবসা করতে পারে— অর্থাৎ যখন এই ব্যবসা আইনত স্বীকৃত, তখন এটি নিয়ে আমরা কেন কথা বলতে পারব না?
যদি পতিতার উল্লেখ করা অশ্লীল হয়, তবে তার অস্তিত্ব থাকাও তো অশ্লীল। যদি তার কথা বলা নিষিদ্ধ হয়, তবে এই পেশাটাও নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। আপনারা পতিতাপ্রথা বিলুপ্ত করে দিন, দেখবেন তার উল্লেখও নিজে থেকেই মুছে যাবে।
আমরা উকিলদের নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারি। আমরা নাপিত, ধোপা এবং মেথরদের নিয়েও কথা বলতে পারি। আমরা চোর, ডাকাত আর খুনিদের নিয়ে গল্প করতে পারি। আমরা জিন আর পরীদের কাহিনীর আসর বসাতে পারি। আমরা বলতে পারি যে একটি বলদ তার শিংয়ের ওপর পুরো পৃথিবী ধরে রেখেছে। আমরা আমির হামজা কিংবা ‘তোতানামা’র কাহিনী লিখতে পারি। আমরা পালোয়ানের বীরত্ব আর হোজ্জা নাসিরুদ্দিনের চাতুরীর প্রশংসা করতে পারি। আমরা টিয়া আর ময়না পাখির গল্প শোনাতে পারি। আমরা জাদুটোনা আর তন্ত্রমন্ত্রের কথা বলতে পারি। আমরা দাড়ির স্টাইল, পায়জামার লম্বাই কিংবা চুলের সিঁথি নিয়ে বিতর্ক করতে পারি। আমরা পোলাও বা কোরমা রান্নার নতুন নতুন রেসিপি নিয়ে ভাবতে পারি। আমরা ভাবতে পারি যে সবুজ রঙের কাপড়ে কী রঙের বোতাম মানাবে। কিন্তু আমরা পতিতাদের নিয়ে ভাবতে পারব না। কেন? কেন তাদের পেশা নিয়ে আলোচনা করতে পারব না? সেই সব মানুষদের নিয়ে কেন কিছু বলতে পারব না যারা তাদের কাছে যায়?
আমরা চাইলে একজন তরুণ আর তরুণীর প্রেম করিয়ে দিতে পারি। তাদের প্রথম দেখা করিয়ে দিতে পারি দাতা গঞ্জ বখশ-এর মাজারে। এমনকি বুড়ো বয়সেও তাদের দিয়ে প্রেম করাতে পারি। শেষে তাদের ব্যর্থ প্রেম নিয়ে মাতম করতে পারি। তাদের দুজনের জানাজা দুই মহল্লা থেকে বের করে এক কবরে মাটি দিতে পারি। এমনকি কবরের ওপর ফেরেশতাদের দিয়ে ফুলও বর্ষণ করাতে পারি। অথচ আমরা একজন পতিতার জীবন নিয়ে কেন বলতে পারি না? তার জীবনে তো ফেরেশতা বা ফুলের দরকার পড়ে না। সে যদি মারা যায়, তবে অন্য মহল্লা থেকে কেউ তার জানাজায় আসে না। মৃত্যুতেও কেউ তার সঙ্গী হয় না। কেউ তার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছেও প্রকাশ করে না।
আসলে একজন পতিতা নিজেই যেন এক জ্যান্ত জানাজা। সমাজের লাশ সে নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে চলছে। সমাজ তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দাফন করবে না, যতক্ষণ সে কথা বলতে থাকবে। এই সমাজ পচা, দুর্গন্ধযুক্ত এবং বীভৎস হতে পারে, কিন্তু একে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। এই সমাজ কি আমাদের কিছুই লাগে না? আমরা কি এর আত্মীয় বা আপন কেউ নই? আমরা কি একে কাফন ছাড়াই নগ্ন অবস্থায় দেখব এবং অন্যদেরও তাই দেখাব?
দিল্লির মিউনিসিপ্যালিটি পতিতাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করে দিয়েছিল। সেই জায়গা ছিল পরিত্যাক্ত এক মালগুদাম। মিউনিসিপ্যালিটি কি বুঝতে পেরেছিল এই পতিতাদের জীবনের একদম সঠিক প্রতিচ্ছবি এই মালগুদাম? যারা সমাজকে গভীরভাবে দেখেন, তাঁদের চোখে এই বাড়িগুলো আর মালগুদামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁরা হয়তো 'কালি সালওয়ার'-এর মতো আরও অনেক গল্পই লিখবেন।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত। উৎস: ‘মুঝে কুছ ক্যাহনা হ্যাঁয়’, কমরেড মান্টো, সম্পাদক আলী আহমদ ফাতমি, রুজহান পাবলিকেশন্স, ২০১২, এলাহাবাদ)

সাদাত হাসান মান্টোর জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, তিনি পাঠককে স্বস্তি দেওয়ার জন্য বাস্তবতাকে কখনো হালকাভাবে উপস্থাপন করেননি।
৮ মিনিট আগে
গবেষণা বলছে, যারা খুব বেশি সৃজনশীল বা বুদ্ধিমান হন, তাঁদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা তথ্য পুরোপুরি বাদ দিতে পারে না। সাধারণ মানুষ হয়তো হইচইয়ের মধ্যেও মন দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের মাথায় সেই শব্দগুলো তীরের মতো বিঁধে।
৭ ঘণ্টা আগে
মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার এলেই পৃথিবীর বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘মা দিবস’ ঘিরে শুরু হয় বিশেষ আয়োজন। রেস্তোরাঁর অফার, অনলাইন ক্যাম্পেইন, ফুলের দোকানে ভিড়, ফেসবুকে দীর্ঘ আবেগঘন পোস্ট— সব মিলিয়ে দিনটি যেন ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে বেশি একটি সামাজিক ও বাণিজ্যিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
১ দিন আগে
ফেসবুকে ঢুকলেই চোখে পড়ছে মাকে নিয়ে পোস্ট। হবে না-ই বা কেন? আজ যে বিশ্ব মা দিবস। এই ফেসবুকেই কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—‘মা দিবস কি শুধুই ফেসবুককেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে?’
১ দিন আগে