আজ খান আতাউর রহমানের জন্মদিন। তিনি ‘খান আতা’ নামে বহুল পরিচিত ছিলেন। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার এবং প্রযোজক।
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

১৯৬৭ সালের কথা। খান আতাউর রহমান তখন অভিনেতা, পরিচালক ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত মুখ। ‘অনেক দিনের চেনা’ ও ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’র মতো সিনেমা বানিয়েছেন। সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২) সিনেমায় তৈরি করেছেন ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে’-র মতো গান। আর এর আগে এ জে কারদারের ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৯) আর জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ (১৯৬১) এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। তবে সে সময়ে তিনি নিলেন বড় একটি প্রজেক্ট। ঠিক করলেন, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে তিনি সিনেমা বানাবেন৷ নাম হবে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’।
সিনেমা বানালেন। মূল চরিত্রে আনোয়ার হোসেন। আনোয়ারের কণ্ঠে ধ্বনিত সংলাপগুলো যেন হয়ে উঠল সে সময়ে পাকিস্তানি শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের মুক্তির প্রতিধ্বনি। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় যে স্বাধীনতা হাতছাড়া হলো, সেই স্বাধীনতা ফিরে এল ঠিকই, কিন্তু এর ভেতরেই হয়ে গেল দেশভাগ। ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত ভারত ও পাকিস্তানে ভাগ হয়ে গেল বাংলা। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর থেকেই আশাভঙ্গ হতে শুরু করে পূর্ব বাংলার মানুষের। আমরা পরিণত হই আরেক উপনিবেশে। এবং তখন থেকেই স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু হয়েছিল।
১৯৬৬-৬৭ সালের কথা বললে, আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন তখন অনেক এগিয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ছয় দফার ঘোষণা এসেছে। আইয়ুব খানের সেই শাসনামলে খান আতা যখন নবাব সিরাজউদ্দৌলা বানালেন, তখন তা শুধুই ঐতিহাসিক একটি কাহিনীচিত্র হয়ে থাকল না, বরং প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিল পাকিস্তানিদের অপশাসন আর সেখান থেকে বাঙ্গালির মুক্ত হতে চাওয়ার আকাঙ্খাকেও।

তুমুল জনপ্রিয় এই সিনেমা মুক্তির দুই বছর পর ১৯৬৯-এ সংঘটিত হলো গণঅভ্যুত্থান। এরপর ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধ।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের আশাভঙ্গ আর দুর্বৃত্তায়নকে তিনি প্রচণ্ড দক্ষতার সঙ্গে তুলে এনেছিলেন তাঁর ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘আবার তোরা মানুষ হ’-তে। এই সিনেমায় স্বাধীন বাংলাদেশে কালোবাজারি, রেশন নিয়ে নয়-ছয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পূর্বের ধাঁচেই ধনীদের হাতে ক্ষমতা আর দরিদ্রদের বঞ্চিত হতে থাকা, পরীক্ষায় নকল, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন দেশে ব্রাত্য হয়ে পড়া ও ক্রমাগত স্বপ্নভঙ্গ—এই সবকিছুই অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে এনেছেন খান আতা। সিনেমাটি ১৯৭২-৭৫ শাসনামলের দলিল হয়ে আছে।
খান আতা রাজনৈতিকভাবে ‘সচেতন’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। যেমন ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)। এই সিনেমায় অভিনয় ও সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’ গানটি তো মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে যেন মুক্তিসংগ্রামেরই ঘোষণা।
খান আতা ‘প্রমোদকার’ নামে তিনজনের একটি টিমের সদস্য ছিলেন। বাকি দুজন ছিলেন সি. বি জামান ও তাহের চৌধুরী। ‘সুজন সখী’ (১৯৭৫) ও ‘দিন যায় কথা থাকে’ (১৯৭৯) এর মতো তুমুল দর্শকনন্দিত সিনেমাও বানিয়েছেন এই টিম।
আশির দশকের পরে খান আতা চলচ্চিত্রে আর আগের মতো সক্রিয় ছিলেন না। তবে চলচ্চিত্র নিয়ে সব সময়ই ভাবতেন। তার প্রতিবাদী সত্ত্বাও সক্রিয় ছিল সব সময়। একবার রিকশা করে এফডিসিতে ঢুকতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, রিকশা ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন, ‘কেন এফডিসিতে কি সবার গাড়ি হয়ে গেছে!’
খান আতা তাঁর শেষ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন ১৯৯৭ সালে। এটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘এখনো অনেক রাত’। এখানেও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না হওয়ার ব্যাপারটাই তুলে এনেছেন।
১৯২৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে জেলার সিঙ্গাইর থানার রামকান্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন খান আতাউর রহমান। ১৯৯৭ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা।

১৯৬৭ সালের কথা। খান আতাউর রহমান তখন অভিনেতা, পরিচালক ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত মুখ। ‘অনেক দিনের চেনা’ ও ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’র মতো সিনেমা বানিয়েছেন। সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২) সিনেমায় তৈরি করেছেন ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে’-র মতো গান। আর এর আগে এ জে কারদারের ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৯) আর জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ (১৯৬১) এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। তবে সে সময়ে তিনি নিলেন বড় একটি প্রজেক্ট। ঠিক করলেন, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে তিনি সিনেমা বানাবেন৷ নাম হবে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’।
সিনেমা বানালেন। মূল চরিত্রে আনোয়ার হোসেন। আনোয়ারের কণ্ঠে ধ্বনিত সংলাপগুলো যেন হয়ে উঠল সে সময়ে পাকিস্তানি শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের মুক্তির প্রতিধ্বনি। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় যে স্বাধীনতা হাতছাড়া হলো, সেই স্বাধীনতা ফিরে এল ঠিকই, কিন্তু এর ভেতরেই হয়ে গেল দেশভাগ। ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত ভারত ও পাকিস্তানে ভাগ হয়ে গেল বাংলা। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর থেকেই আশাভঙ্গ হতে শুরু করে পূর্ব বাংলার মানুষের। আমরা পরিণত হই আরেক উপনিবেশে। এবং তখন থেকেই স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু হয়েছিল।
১৯৬৬-৬৭ সালের কথা বললে, আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন তখন অনেক এগিয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ছয় দফার ঘোষণা এসেছে। আইয়ুব খানের সেই শাসনামলে খান আতা যখন নবাব সিরাজউদ্দৌলা বানালেন, তখন তা শুধুই ঐতিহাসিক একটি কাহিনীচিত্র হয়ে থাকল না, বরং প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিল পাকিস্তানিদের অপশাসন আর সেখান থেকে বাঙ্গালির মুক্ত হতে চাওয়ার আকাঙ্খাকেও।

তুমুল জনপ্রিয় এই সিনেমা মুক্তির দুই বছর পর ১৯৬৯-এ সংঘটিত হলো গণঅভ্যুত্থান। এরপর ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধ।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের আশাভঙ্গ আর দুর্বৃত্তায়নকে তিনি প্রচণ্ড দক্ষতার সঙ্গে তুলে এনেছিলেন তাঁর ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘আবার তোরা মানুষ হ’-তে। এই সিনেমায় স্বাধীন বাংলাদেশে কালোবাজারি, রেশন নিয়ে নয়-ছয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পূর্বের ধাঁচেই ধনীদের হাতে ক্ষমতা আর দরিদ্রদের বঞ্চিত হতে থাকা, পরীক্ষায় নকল, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন দেশে ব্রাত্য হয়ে পড়া ও ক্রমাগত স্বপ্নভঙ্গ—এই সবকিছুই অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে এনেছেন খান আতা। সিনেমাটি ১৯৭২-৭৫ শাসনামলের দলিল হয়ে আছে।
খান আতা রাজনৈতিকভাবে ‘সচেতন’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। যেমন ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)। এই সিনেমায় অভিনয় ও সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’ গানটি তো মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে যেন মুক্তিসংগ্রামেরই ঘোষণা।
খান আতা ‘প্রমোদকার’ নামে তিনজনের একটি টিমের সদস্য ছিলেন। বাকি দুজন ছিলেন সি. বি জামান ও তাহের চৌধুরী। ‘সুজন সখী’ (১৯৭৫) ও ‘দিন যায় কথা থাকে’ (১৯৭৯) এর মতো তুমুল দর্শকনন্দিত সিনেমাও বানিয়েছেন এই টিম।
আশির দশকের পরে খান আতা চলচ্চিত্রে আর আগের মতো সক্রিয় ছিলেন না। তবে চলচ্চিত্র নিয়ে সব সময়ই ভাবতেন। তার প্রতিবাদী সত্ত্বাও সক্রিয় ছিল সব সময়। একবার রিকশা করে এফডিসিতে ঢুকতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, রিকশা ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন, ‘কেন এফডিসিতে কি সবার গাড়ি হয়ে গেছে!’
খান আতা তাঁর শেষ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন ১৯৯৭ সালে। এটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘এখনো অনেক রাত’। এখানেও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না হওয়ার ব্যাপারটাই তুলে এনেছেন।
১৯২৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে জেলার সিঙ্গাইর থানার রামকান্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন খান আতাউর রহমান। ১৯৯৭ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা।
.png)

ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
১৫ ঘণ্টা আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
১৬ ঘণ্টা আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
১৮ ঘণ্টা আগে
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূ
১৮ ঘণ্টা আগে