সা র শু

কী কী শর্তপূরণ হলে আমরা কোনো শিল্পকর্মকে বৈপ্লবিক বলতে পারি? শিল্পের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক হওয়ার একটা জায়গা থাকে শিল্পশৈলী ও শিল্প-মাধ্যমের দিক থেকে। সেই দিক বিবেচনায় সুবোধ সিরিজটা অতিপরিচিত সীমিত রঙে করা স্টেনসিল পদ্ধতির গ্রাফিতি। মূলত জনপরিসরে যখন এই সিরিজ নিয়ে আলাপ হয় তা এর শিল্পশৈলী না, বরঞ্চ এর বিষয়বস্তু ও বক্তব্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের জায়গা থেকেই।
আবার গ্রাফিতি মাধ্যমের কারণেও এর আলাদা একটা গুরুত্ব তৈরি হয়। আমরা মূলত অনুসন্ধান করব ‘হবেকি’ বা ‘সুবোধ’ কি দৃশ্য বা লেখায় আমাদের কোনো বৈপ্লবিক বার্তা দিয়েছে কি না, তা নিয়ে।
বৈপ্লবিক হওয়া কাকে বলি? নিশ্চয় তার বহু শর্ত আছে। এই আলাপের জন্য আমি যেই শর্তটাকে প্রাধান্য দিব তা হলো সমাজ বা রাষ্ট্রে, মানুষের চিন্তা-বুদ্ধি-বিশ্বাসে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বা প্রক্রিয়াতে প্রকাশ্যে বা গোপনে যা যা স্বাভাবিক, প্রতিষ্ঠিত বা সত্যায়িত হিসেবে বিদ্যমান, সেগুলোকে প্রশ্ন করা, আঘাত করা বা সেগুলোর বিকল্প দেখানো। এই দিকটা যদি আমরা মাথায় রাখতে পারি তাহলে আমরা দেখব কোনো কিছুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা, কোনো কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা বিদ্রোহ করা কখনো কখনো বৈপ্লবিক হলেও ক্ষোভপ্রকাশ বা প্রতিরোধ বা বিদ্রোহ করা মানেই তা বৈপ্লবিক নাও হতে পারে। যেমন, উচ্চদ্রব্যমূল্য নিয়ে আমি গ্রাফিতির মাধ্যমে সবার দুরবস্থার কথা শক্ত ভাষায় তুলে ধরতে পারি। তবে তা যদি শুধু ক্ষোভটাই প্রকাশ করে, কিন্তু ক্ষোভটা কোনো উৎস বা কর্তৃপক্ষের অভিমুখী না হয়, মানুষকে অসংগঠিত ক্ষোভকে সংগঠিত না করে— তবে তাকে বিদ্রোহী বা প্রতিরোধমূলক বলার উপায় নেই। আবার সেই গ্রাফিতি বা চিত্রকর্ম যদি কর্তৃপক্ষ বা বাজার সিন্ডিকেটকে তাক করে হয়, কিন্তু তা যদি বিদ্যমান বৈষম্যমূলক উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাকে প্রশ্ন না করে, ভিন্ন কোনো ন্যায্য সমাজের কল্পনা বা সম্ভাবনা দর্শকের মনে না জাগাতে পারে, তবে তাকে প্রতিরোধমূলক বা বিদ্রোহী বলা গেলেও বৈপ্লবিক বলার সুযোগ থাকে না।

প্রথমে আমরা যদি ‘সুবোধ’ সিরিজের আইকনোগ্রাফি দেখি তবে তাতে নিয়মিত উপাদান হিসেবে যা যা পাই তা হলো ছেঁড়া জিনসের প্যান্ট পরিহিত একজন যুবক, তার হাতে খাঁচা, খাঁচায় রক্তিম বা হলুদাভ সূর্য। এ ছাড়াও কখনো জেলখানা, কখনো মোরগ বা কখনো কৌতূহলী শিশুচরিত্র প্রভৃতিরও আবির্ভাব ঘটে। আমাদের সম্মিলিত মানসে এসব প্রতীকের কিছু অর্থ আছে। যেমন সূর্যের বদলে যদি চাঁদ থাকত তবে আমাদের দর্শকদের অনুভূতি ভিন্ন হতো। খাঁচার বদলে যদি থাকত বাজারের ব্যাগ তাতেও আমরা একইরকম অনুভব করতাম না। জিনসের পরিবর্তে লুঙ্গি থাকলে আমরা সুবোধকে ভিন্ন কেউ হিসেবেই দেখতে পেতাম।
এ ছাড়া আর্টিস্ট ট্যাগ হিসেবে আছে ‘হবেকি’ এবং অধিকাংশ গ্রাফিতির সঙ্গে যুক্ত লেখা বা টাইপোগ্রাফিগুলো থেকে যুবকের একটা নাম পাই, তা হলো ‘সুবোধ’। ‘হবেকি’ ট্যাগটাতে স্পষ্টতই একটা কিছু ঘটার আকাঙ্ক্ষা আছে। আবার সুবোধ নামটা হয়তো উত্তম, শুভ বা সৎ বোধের দিকে নির্দেশ করে, নির্বোধ বা বোধহীনের বিপরীতে। আমি যখন প্রথম সুবোধ সম্বোধনটা দেখছিলাম গ্রাফিতিগুলোতে, আমার কাছে মনে হয়েছিল সুবোধ বলতে বিবেককে বোঝানো হয়েছে।

যদি লেখাগুলো খেয়াল করি তবে দেখব লেখায় সুবোধকে যে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, ছবির যুবকটা তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিছুই করছে। যেমন, যেখানে সুবোধকে বলা হচ্ছে পালিয়ে যেতে, সেখানে যুবককে আমরা দেখি দর্শকের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আছে। যেখানে লেখা আছে ‘সুবোধ এখন জেলে!’ সেখানে আমরা সেই যুবককেই দেখতে পাই গারদের পেছনে। অর্থাৎ, শিল্পকর্মগুলো থেকে এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে ছবির বিধ্বস্ত যুবক সুবোধ নামের কাউকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে না। বরং, অন্য কেউ, হয়তো শিল্পী নিজে বা পরিস্থিতি কিংবা সিস্টেম (সমাজ, রাষ্ট্র, বাজার ইত্যাদি) ওই যুবককে সুবোধ নামে সম্বোধন করে কথাগুলো বলছে। সিস্টেম যে বলছে না তা ধারাবাহিক বক্তব্যগুলো দেখলে নিশ্চিত হওয়া যায়। কেন না, যে বলছে সে সুবোধের প্রতি সহানুভূতিশীল। এই চলে যেতে বলা দমনমূলক নয়। শিল্পী বা পরিস্থিতি দুইয়ের কে কথাগুলো বলছে তাতে খুব একটা পার্থক্য হয় না। কারণ, শিল্পী বললেও তা যে পরিস্থিতি সুবিধার না দেখেই বলছে, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। এ ছাড়াও থাকে খাঁচায় বন্দি সূর্য। আমাদের সংস্কৃতিতে সূর্য সাধারণত সুবোধ-এরই প্রতীক। আবার আশা বা নতুন সূচনারও প্রতীক।

তবে এই ক্ষেত্রে হয়তো সূর্যটা সুবোধের হৃদয়ের প্রতীক। এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে বলা যায় সুবোধের প্রথম দিককার অন্তত দুটি গ্রাফিতির কথা। যার একটাতে সুবোধ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, খাঁচার ভেতর সূর্যের বদলে একটা লাল হার্ট প্রতীক। আরেকটাতে খাঁচার ভেতর একটা লাল হার্ট প্রতীক এবং খাঁচার ওপর বসে আছে রোমান পুরাণের প্রেমের দেবদূত ছোট্ট কিউপিড।

কিন্তু সেই খাঁচাটা আবার সুবোধেরই হাতে। তার সূর্যটাকে কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে এমন না। যেন পরিস্থিতিই এমন যে সুবোধ তার হৃদয়টাকে নিজেই খাঁচায় বন্দি করতে বাধ্য হয়েছে। খাঁচার বদলে যদি বাক্স বা সিন্দুক হতো তবে হয়তো এভাবে পাঠ করার সুযোগ থাকত যে সুবোধ নিজ হৃদয়টাকে বাইরের দুনিয়া থেকে রক্ষা করতে সিন্দুকে আগলে রাখছে। খাঁচা যেহেতু, তাই বন্দিদশা হিসেবেই পাঠ করাটা বেশি উপযুক্ত। ‘সুবোধ এখন জেলে’ শীর্ষক গ্রাফিতিটাও সেই অর্থই ইশারা করে।

‘হবেকি’ সিরিজের গ্রাফিতিগুলোর কয়েকটি ধারা দেখা যায়। ২০১৭-এর দিকে সুবোধ সিরিজের প্রাথমিক পর্বের কাজে অর্থের দিক থেকে দুইটা ধারা দেখা যাবে। প্রথম ধারাটা সবচেয়ে বিখ্যাত। যেখানে একাধিক চিত্রের সঙ্গে যে লাইনগুলো দেখা যায়, সেগুলো এমন যে—‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নাই’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, ভুলেও ফিরে আসিস না’, ‘এখানে সাপ ভরা চাপ চাপ রুচি! কাপ ভরা পাপ পাপ চা! সুবোধ… তুই পালিয়ে যাহ্’ ইত্যাদি।

চিত্রগুলোতেও দেখা যায় সুবোধ চলে যাচ্ছে, দৌড়াচ্ছে বা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। তার হাতে খাঁচাবন্দি সূর্য। কাছাকাছি সময়ে আরেকটা গ্রাফিতিতে দেখা যায়, সুবোধ গারদের পেছনে। ওপরে লেখা—‘সুবোধ এখন জেলে, পাপবোধ নিশ্চিন্তে করছে বাস মানুষের হৃদয়ে।’
প্রথম ধারায় আমরা মূলত দেখতে পাই অসহায়ত্ব ও হতাশা থেকে উদ্ভূত ক্ষোভ বা অভিমান। সেই ক্ষোভ নির্দিষ্ট কারও প্রতি উদ্দিষ্ট নয়। সময় কেন পক্ষে না, কেন সুবোধের ভাগ্যে কিছু নেই তা নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষের দিকে আঙুল তোলা নেই। বলা আছে, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে। কিন্তু মানুষ কেন ভালোবাসতে ভুলে গেছে, কেন মানুষের হৃদয় সুবোধের মতোই খাঁচায় বন্দি তা নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসা নেই। এই যে সময়, যা সুবোধ কিংবা মানুষ কারও পক্ষেই নেই, তার মুখোমুখি হওয়ার বার্তাও এই ধারাতে নেই। আছে সতর্কবার্তা, সুবোধ যেন ভুলেও না ফিরে আসে। আবার, সুবোধকে কোথায় যেতে বলা হচ্ছে তার কোনো দিকনিশানা এখানে নেই।
চিত্রগুলোতেও দেখা যায়, সুবোধ চলে যাচ্ছে। তবে সুবোধ যেন পিছুটান ছাড়তে পারে না। তাকে পালিয়ে যেতে বলা হলেও বারবার সে পেছন ফিরে চায়, মাটিতে বসে মাথায় হাত রেখে অঝোরে কাঁদে। এই ধারাতে ‘সুবোধ’ কিংবা ‘হবেকি’ কেউই প্রতিবাদী, প্রতিরোধী কিংবা বিপ্লবী নয়। সে অসহায়, দিশেহারা, পলায়নপর এবং যাবতীয় পরিস্থিতির মধ্যে সুবোধ প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয়।
এই যে ‘হবেকি’ তার ও অন্যদের অনুভূতিগুলো প্রকাশের জন্য দেয়ালে দেয়ালে বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে গ্রাফিতি করছে, এটাও কর্তাসত্তার পরিচয়। কিন্তু সময়, পরিস্থিতি ও বাস্তবতার সামনে তার যে আত্মসমর্পণমূলক বার্তা, তাতে কর্তাসত্তার পরিচয় দুর্বল।
আমরা যদি দেখি সুবোধের চেহারা বা শরীর শিল্পী কতখানি দরদ নিয়ে এঁকেছে, তাতে আমরা উপহাস পাব না। তাহলে, খোঁচাটা কি দর্শকের দিকে? হ্যাঁ, একটা অভিমানী খোঁচা দর্শকের দিকে আছে। তবে সেই উদ্দিষ্ট দর্শকও তো ভিক্টিম বা ভুক্তভোগী। ‘হবেকি’ নিজে তার অংশ। ফলে এই অভিমান মূলত অগঠনমূলক আত্মগ্লানি হিসেবেই পাঠ করা বেশি যৌক্তিক বলে মনে করি।
এই প্রবণতা অনেকটা নিজেকে বদলে দিয়ে দুনিয়া বদলে দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গিরই অনুরূপ। যেখানে কাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যার দায়ভার চলে আসে ব্যক্তি মানুষের ওপরে। যেহেতু কাঠামোগুলোর চালকেরাও সেটাই প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ফলে ভুক্তভোগীদের এই সব ধারণাতে সাবস্ক্রাইব করার মধ্যে কর্তাসত্তার প্রয়োগ খুব একটা নেই। যদিও বক্তব্য ও দৃশ্যের বাইরে ওই সময়ের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু মাধ্যমের কারণেই হবেকি’র এই শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে একটা রেবেল বা বিদ্রোহী স্পিরিট লোকেট করা সম্ভব। কারণ একটা দমনমূলক সরকার যখন সবকিছু স্বাভাবিক দেখাতে ভয়াবহ মাত্রায় তৎপর, তখন তার কড়া পাহারা এড়িয়ে দুঃখটুকু প্রকাশ করার মাধ্যমে সেই কৃত্রিম স্বাভাবিকতায় ছেদ ঘটানোও কম রেজিস্ট্যান্স নয়। আবার বেদখল পাবলিক স্পেসকে রিক্যাপচার করার মধ্যেও একটা স্পষ্ট স্পর্ধা আছে। তবে এই স্পর্ধা মূলত শিল্প মাধ্যম বা আর্ট মিডিয়ামের পলিটিক্সের অন্তর্ভুক্ত।
সুবোধকে উদ্দেশ্য করে ‘হবেকি’র এই নির্দেশনা কি সর্বজনীন? মানে সকল বর্গের মানুষের জন্য নাকি কোনো নির্দিষ্ট বর্গের মানুষের জন্য? খেয়াল করলে দেখব, এই পালিয়ে যাওয়ার বার্তা সকল শ্রেণির মানুষের কাছে একইরকম অর্থবহ নয়। বাংলাদেশের একেবারে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষদের জন্য দেশ-বিদেশের সীমানা তুলনামূলক আবছা। তাদের যখন খুশি তারা এই দেশ ছেড়ে মুহূর্তেই চলে যেতে পারে, তাদের এক পা দেশে থাকলে আরেক পা থাকে বিদেশে। ফলে তাদের এখান ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়াটা পালিয়ে যাওয়া নয়। তাদের বেছে নেওয়ার বিশেষাধিকার আছে।
অপরদিকে একেবারেই যারা নিম্নশ্রেণির, তাদের ক্ষেত্রেও এই পালিয়ে যাওয়াটা কোনো অর্থ রাখে না। কারণ দুনিয়ার যেখানেই তারা যাক না কেন, তাদের কফিনে করে এই দেশের মাটিতেই নামতে হয়। তারা তাদের কবর এই দেশ ভিন্ন অন্য কোনো দেশে কল্পনা করে না। ভিন্ন কোনো দেশ মানে তাদের কাছে ভিন্ন কোনো চাকরিই কেবল। সেখানে গেলেই সে ভিন্ন কোনো শর্তের বা ভিন্ন বাস্তবতার জীবন পায় না। ফলে পালিয়ে যাওয়া সবচেয়ে অর্থবহ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির জন্য। কারণ তাদের জন্য অন্য দেশ মানে কিছুটা হলেও অন্য বাস্তবতা।
প্রশ্ন জাগতে পারে, সুবোধকে পালিয়ে যেতে বলাটা আক্ষরিক অর্থে নেব কেন আমরা। এটা হয়তো শুধু বোধকে উদ্দেশ্য করে বলা, মানুষটাকে নয়। কিন্তু ছবিতে আমরা দেখব, শুধু সূর্যটাকে ছুঁড়ে ফেলতে বলা হচ্ছে না, বন্দি করে রাখতে বলা হচ্ছে না; বরং সুবোধ নামের মানুষটাকেই হৃদয় হাতে প্রস্থান করতে বলা হচ্ছে। তবে এই শিল্পকর্ম গুলো সর্বজনীন নয় বলে যে শিল্প হিসেবে এর গুরুত্ব নেই, এমন না। এমনকি শিল্প হিসেবে এটা এর সীমাবদ্ধতাও না। একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শক যখন তার জন্য প্রাসঙ্গিক বলেই যেকোনো শিল্পকর্মকে সর্বজনীন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটা প্রধানত ঐ নির্দিষ্ট দর্শক শ্রেণির সীমাবদ্ধতা। তবে, এই সীমাবদ্ধতাকে হবেকি কখনো অ্যাড্রেস করেনি। প্রতিষ্ঠিত ‘মধ্যবিত্ত ডিকশনারির’ ভাষা ও বোধ কাঠামোর ভেতরেই খেলা না করে যদি হবেকি বা সুবোধ তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো সেটা একটা বৈপ্লবিক ব্যাপার হতো।
আবার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও হবেকি বা সুবোধের যে হতাশা, বেকারত্বের অনুভব, পলায়নপরতা, আবার ত্রাণকর্তার ভূমিকা তা প্রধানত ম্যাস্কুলিনিটির সংকট হিসেবেও পাঠ করা সম্ভব। ছেঁড়া জিনস পরা, এলোমেলো চুল, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে ভাব—এগুলো আমাদের মানসে রোমান্টিসাইজড মেল-অ্যাংস্ট হিসেবে আবির্ভূত হয় সাধারণত। এই পাঠকে আরও জোরদার করে ‘হবেকি’ সিরিজের গ্রাফিতি গুলোতে নারীদের উপস্থিতি দেখলে।

যেমন আমরা দেখতে পাব নারী শিশু এসে সুবোধকে ভোর কবে হবে জিজ্ঞেস করছে। পরবর্তীতেও আমরা আরেকটা গ্রাফিতিতে দেখব, পুরুষ যোদ্ধা হয়তো তার শিশু কন্যাকে আলিঙ্গন করছে। দুই ক্ষেত্রেই পুরুষ চরিত্রটি ডমিন্যান্ট, নারী এসেছে অবুঝ ও নিষ্পাপ শিশুরূপে। তবে সেটাকে এভাবে পাঠ করা যেতে পারে যে শিল্পীর নিজের জীবনে হয়তো তেমন নারী শিশু কেউ আছে, যে কি না চিত্রকর্মে চলে আসছে। হয়তো এটা ‘হবেকি’র সাধারণ মেল ডমিন্যান্ট ভাবনার প্রকাশ না। তবে দর্শকের যেহেতু ‘হবেকি’র ব্যক্তিগত জীবন জেনে দৃশ্য পাঠের সুযোগ নেই, সেহেতু তেমন হলেও তা অতটা প্রাসঙ্গিক না। পরবর্তী সময়ে আমরা যুদ্ধবিরোধী দুটি গ্রাফিতি দেখতে পাব; যেখানে নারী চরিত্রটির বেলায় সে আহত, ভুক্তভোগীরূপে আসে। কিন্তু একই যুদ্ধবিরোধী থিমে আবার পুরুষ চরিত্রটিকে দেখা যায় সুপারহিরোর মতো আকাশে দুই হাত দিয়ে মিসাইল থামিয়ে দিচ্ছে। এখানে একই থিমে একই মেসেজের ক্ষেত্রেও আমরা নারী ও পুরুষের দুই রকম রিপ্রেজেন্টেশন দেখতে পাই। তবে ‘This is my masterpiece’ শিরোনামের গ্রাফিতিতে নারী শিশুর বাংলাদেশের পতাকা বুকে নিয়ে যে প্রবল ঘোষণা, সেখানে নারীকে শিশু হিসেবে আনা হলেও, তার উপস্থিতিটা শক্তিশালী এবং কোনো পুরুষকে আশ্রয় করে না।

‘হবেকি’র কাজগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলো খেয়াল করার উদ্দেশ্যে এই বিশ্লেষণ। যদি সে পুরুষ শিল্পী হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার পুরুষ জীবনের অভিজ্ঞতাই তার শিল্পকর্মে সঞ্চারিত হবে। তাতে নানান বায়াস থাকাটাও অস্বভাবিক না। তবে এই বায়াসনেস বৈপ্লবিক হওয়ার পথে সীমাবদ্ধতাও বটে। এই ধরনের বায়াসগুলোকে অতিক্রম করার ভেতর দিয়ে শিল্পকর্ম বৈপ্লবিক হওয়ার সুযোগ থাকে, যা ‘হবেকি’ সিরিজে দৃশ্যমান না। আমরা যেন এগুলো পাঠ করার সময় শ্রেণি বা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হিসেবে ধরে সর্বজনীন প্রকাশ হিসেবে না দেখি সেই সচেতনতা আমাদের দরকার আছে। আমরা আশাবাদী হব যে হবেকির মতোই আমরা ভিন্ন লিঙ্গ ও শ্রেণির গ্রাফিতি আর্টিস্টদেরকেও পাব, যারা তাদের জীবন অভিজ্ঞতাকে গ্রাফিতি শিল্পকর্মে সঞ্চারিত করবে। পুরুষতান্ত্রিক দুনিয়া-কল্পনার বাইরে সেই অভিজ্ঞতার দৃশ্যায়ন নিশ্চয় বৈপ্লবিক হবে।
প্রথম ধারাতে ‘হবেকি’ বা সুবোধ কাউকেই সম্পূর্ণ বন্দি করে ফেলার সুযোগ হয়তো নেই। অন্তত পক্ষে, যতক্ষণ না আমরা বাকি কাজগুলোও দেখছি। যেমন প্রথম দিকের গ্রাফিতিগুলোর মধ্যেই সংখ্যায় কম হলেও, আরেকটা ধারা আছে। ২০১৭ সালেই আগারগাঁও শিশুমেলা রোডে আরেকটা গ্রাফিতি দেখা যায়। যেখানে দুইটা কাক, যেন কোনো কিছুর অপেক্ষায় ওপরে চেয়ে আছে, ওপরে লেখা ‘হবেকি?’

কী হওয়ার অপেক্ষায় তীর্থের কাক হয়ে বসে আছে তারা, তারই একটা নিশানা পাওয়া যায় আবার কাছাকাছি সময়ে আগারগাঁওয়ের এয়ারপোর্ট রোডের দুইটা গ্রাফিতিতে। যার একটাতে আগের মতো সুবোধ খাঁচা হাতে মাটিতে বসে থাকলে তার পাশে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে একটা মেয়ে শিশু, যার পাশে লেখা—‘সুবোধ, কবে হবে ভোর’। অপর গ্রাফিতিটাতে দেখা যায়, আকাশে খাঁচায় বন্দি সূর্য, মাটিতে একটা মোরগ ডেকে যেন ভোরের বার্তা দিচ্ছে।

এ ছাড়াও একই সময়ে আরেকটা গ্রাফিতিতে দেখা যায় সুবোধকে বলা হচ্ছে ‘তবুও সুবোধ রাখিস সূর্য ধরে’। ফলে এক কথায় হবেকি বা সুবোধকে পলায়নপর কিংবা হতাশাবাদী বলার সুযোগ নেই। একটা নতুন ভোরের আকাঙ্ক্ষা তার মাঝে আছে। বরং এই সময় পর্যন্ত, এই দুই ধারাতে বরং যেকোনো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের অন্তর্গত টানাপোড়েনটাই দৃশ্যমান। যার জন্য সময়টা অসহনীয়, তবু সে পালানোর সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান, যে কি না একটা ভোরের অপেক্ষা করে। তবে, আশাবাদ দেখতে পেলেও, এই সময়কাল পর্যন্ত আমরা সুবোধ বা হবেকির মাঝে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রতিবাদী, বিদ্রোহী বা বিপ্লবী কোনো অভিব্যক্তি পাই না।

পরবর্তী পর্বে ২০১৮-এর দিকে হবেকির একটা দেয়াললিখনে আমরা পাই— ‘THE BEAUTIFUL PAINTINGS ARE THOSE WHICH SPEAK OF THE UGLIEST’ কথাটা।

এতে কোনো চিত্র ছিল না। তবে, এই কথার মাঝে কুৎসিত সত্যকে উন্মোচিত করার, পলায়নপর না হয়ে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার একটা তাড়না ‘হবেকি’র মধ্যে দেখা যাবে। চিত্ররূপেও একই সময়কালে ‘This is my Masterpiece’ শিরোনামে একটা গ্রাফিতি দেখা যায়। যা প্রথম ধারাটা থেকে অনেকটাই আলাদা। এতে দেখা যায়, একটা মেয়েশিশু, হয়তো সুবোধকে কবে ভোর হবে জিজ্ঞাসা করা সেই মেয়েটাই, বুকে আঁকড়ে ধরে আছে ফ্রেমে বাঁধাই করা একটা বাংলাদেশের পতাকা। এতে হয়তো বিপ্লব বা বিদ্রোহ সেভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে, একটা শক্ত প্রতিরোধ এখানে আছে। তা বাইরের কোনো শক্তির বিরুদ্ধে না হলেও, হয়তো পলায়নপর আপনার প্রতি। এই দুইটাকে আমরা ‘হবেকি’র সুবোধ সিরিজের দ্বিতীয় ধারারই ধারাবাহিকতা বলতে পারি। আবার একইসাথে, ২০২২ পরবর্তী ধারা দুইটার প্রাথমিক পর্যায় বা পূর্বাভাসও বলতে পারি।
২০১৮ পরবর্তী সময়ে সুবোধ ‘হবেকি’র মাধ্যমে না আসলেও ভক্তদের হাত ধরে অনেকবার এসেছে। বিভিন্ন আন্দোলনেই ভক্তদের মাধ্যমে সুবোধ দেখা দিয়েছে। কেউ বলেছে সুবোধকে ফিরে আসতে দেশকে বাঁচানোর জন্য, কেউ বলেছে সুবোধকে আপস না করতে, কেউ বলেছে সুবোধকে তৈরি হতে, কেউ বলেছে সময়টাকে পক্ষে আনতে, কেউ আবার আন্দোলনে কল্পনা করে নিয়েছে সুবোধও তাদের সঙ্গে রাস্তাতেই আছে। শুধু বাংলাদেশেই না, কলকাতাতেও সুবোধ প্রতিবাদে, আন্দোলনে ভক্তদের মাধ্যমে ফেরত এসেছে অনেকবার। খেয়াল করলে দেখা যাবে হবেকির সুবোধ নিজে যতটুকু প্রতিবাদী, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিবাদী ও ভিশনারি ভক্তদের সুবোধ। যেন বাউল আব্দুল করিমের গানের কথার মতোই ভক্তদের অধীন হয়েই সুবোধ ভক্তদের অন্তরে ঠাঁই পেয়েছে, আরও শক্তিশালী হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পরে, ২০২২ সালে সিলেটে আমরা সুবোধের পরবর্তী পর্বের শুরু দেখি। বিরতি দিয়ে দিয়ে যা ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলমান। এর মাঝে ২০২০ সালে ‘হবেকি’র একটা গ্রাফিতি পাওয়া যায়। যেখানে লুঙ্গি ও মাথাল পরে বালক কিউপিড বা ফেরেশতা হাতে রঙের রোলার ব্রাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাশে লেখা ‘HOBEKI IS THE ANSWER’। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো গ্রাফিতি এ সময়ে হবেকি করেছে বলে আমার জানা নেই।

২০২২ পরবর্তী পর্বে, আমরা খেয়াল করলে দুইটা প্রধান ধারা দেখতে পাব। এর একটা ধারাতে নতুন যে আমরা বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, তা হলো চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনা বা ইস্যু নিয়ে ভাষ্য। অপর ধারাটাতে আমরা দেখতে পাই দ্ব্যর্থকতা বা অস্পষ্টতার মাধ্যমে অর্থের প্রসারণ। দুইটা ব্যাপারই ‘হবেকি’র কাজে নতুন। ২০২২ পূর্ববর্তী কাজগুলোতে অর্থের জায়গায় দর্শকের জন্য ইন্টারপ্রেটেশনের খুব একটা জায়গা ছিল না। বার্তাগুলো ছিল ডিরেক্ট। যেমন, সময় পক্ষে নেই, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে, কবে হবে ভোর ইত্যাদি। গ্রাফিতি ছিল লেখাপ্রধান, সাথে চিত্রগুলো ছিল সহায়ক। ২০২২-এ সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় দুইটা গ্রাফিতি হয়। এই দুইটা গ্রাফিতিই মূলত পরবর্তী বছরগুলোতে ‘হবেকি’র গ্রাফিতির দুইটা ধারার স্পষ্ট পূর্বাভাস বলা যায়।
একটা গ্রাফিতিতে দেখা যায় একটা অন্ধকার ঘরের জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে একটা হলুদ ফুল দেওয়া হচ্ছে। তা থেকে একটা পাপড়ি ঝরে যাচ্ছে। সাথে আর্টিস্ট ট্যাগ ছাড়া আর কোনো টেক্সট নেই। প্রেক্ষাপট ও স্থান বিচার করলে সেই ফুল সমসাময়িক চলমান সাস্ট আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের প্রতি তা অনুমান করা যায়। অথবা হয়তো অন্ধকার সময়ে সেই আন্দোলন ‘হবেকি’র জন্য আসার আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, তারই চিত্রায়ন।

এর আগেও আমরা অনুরূপ অর্থে দেখেছি হলুদ সূর্যের ব্যবহার। তবে, অর্থ যেটাই হোক, মূল লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে টেক্সট ছাড়া শুধু ইমেজপ্রধান এই গ্রাফিতি, যা দর্শকের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, ‘হবেকি’র কাজে এটা প্রায় নতুন বলা যায়। ২০২২ পূর্ববর্তী সময়ে শুধু দুইটা কাকের যে গ্রাফিতিটা ছিল সেটাতেই এমন ইমেজের প্রাধান্য ও দর্শকের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ছিল। একই সময়ের অপর গ্রাফিতিটাতে দেখা যায় সুবোধ অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বলমুখে টেলিফোনে কথা বলছে।
এর আগের কোনো গ্রাফিতিতে আমরা সুবোধকে হাসতে দেখিনি। গ্রাফিতির সামনে দাঁড়ালে অনুমান করা যায় সাস্টের প্রতিরোধই ছিল সুবোধের আনন্দের কারণ। এটাতেও আর্টিস্ট ট্যাগ ছাড়া কোনো লেখা নেই, চিত্রপ্রধান। প্রথমবারের মতো এই গ্রাফিতি দুইটা ছিল চলমান কোনো ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। যেখানে ‘হবেকি’ ঘটমান মুহূর্তের সামাজিক-রাজনৈতিক ভাষ্যই করছে। এই দুইটা কাজেই আমরা দেখতে পাই সুবোধের আশাবাদী রূপ, বাস্তব প্রতিবাদের সাথে সংহতি প্রকাশ এবং নতুন রকমের কর্তাসত্তার প্রয়োগ।
এই সময়ে আরেকটা শিল্পকর্ম ডিজিটাল ভার্সনে পাওয়া যায়, যেটা তখনো কোনো ওয়ালে করা হয়নি (বছর কয়েক পরে এটা দেয়ালে করা হবে)। সম্ভবত সেটা অপর দুইটা শিল্পকর্মের আগেই ‘হবেকি’ অনলাইনে পোস্ট করেছিল আন্দোলনের সাথে সংহতি জানিয়ে। যেখানে সুবোধ একটা চেয়ারকে লাথি মেরে উল্টে দিচ্ছে। অর্থাৎ এই পর্যায়ে সুবোধ আর প্যাসিভ বা পলায়নপর না। তার প্রকাশও কেবল ক্ষোভ বা অভিমান আশ্রিত না। বরং বৈপ্লবিক না হলেও তাতে প্রতিরোধের সাথে স্পষ্ট সংহতি আছে। এটা প্রথম পর্বের দ্বিতীয় ধারাটার আরও পরিণত রূপ বলা যায়।

২০২২-এই আরও দুইটা গ্রাফিতি মিরপুরে দেখা যায়। মিরপুর সিরামিকসের দেয়ালে। সম্পূর্ণ কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপরে একচোখে নীল কালশিটে পড়া আহত এক নারী, দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানাচ্ছে (Mute sign-কে Unmute করার মাধ্যমে)। নারীর খোলা চুলে একটা ফুলও শোভা পাচ্ছে। পাশে হবেকি ট্যাগের ওপরে লেখা “#STOP WAR”। এটা নতুন পর্বের সামাজিক-রাজনৈতিক ভাষ্যের ধারারই কাজ।
সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে এটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কেন্দ্র করে আঁকা। যদিও, পরে ‘হবেকি’ নিজেই চিঠির মাধ্যমে একরকমের ব্যাখ্যা দিয়েছে, তবু আলাদাভাবে অনুমানগুলো উল্লেখ করার কারণ- গ্রাফিতিগুলোর সামনে দাঁড়ালে দর্শক সাধারণত সমসাময়িক ঘটনাবলি ও অভিজ্ঞতা থেকেই পাঠ করে, তাই।
এটাই হবেকির প্রথম কাজ যেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতি কেন্দ্র করে। এই গ্রাফিতিটা ঠিক লেখা-প্রধান নাকি চিত্র-প্রধান তা নির্ধারণ করা যায় না। যদিও এতে সরাসরি যুদ্ধ থামানোর কথাটা লেখা আছে, কিন্তু ইমেজেও সেই যুদ্ধ থামানোর কথাটার সৃজনশীল দৃশ্যায়ন আছে। ইমেজটাকে আগের অনেক কাজের মতোই শুধু টেক্সটের সহায়ক বলা যাবে না। কিছুটা ইন্টারপ্রেটেশনের বা অনুসন্ধানের সুযোগ আছে দর্শকের জন্য। তবে ‘হবেকি’ শিল্পী আবার একটা ফ্যানপেজের কাছে লিখিত বার্তা দেওয়ার মাধ্যমে যতটুকু ইন্টারপ্রেটেশনের জায়গা ছিল তা অনেকটাই খোলাসা করে দিয়েছিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘মিরপুরের ছবিটা মূলত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হলেও, সেটা আমি মূলত ধর্ষণের জন্যে এঁকেছিলাম। পরে চোখে ব্ল্যাক কালার বসিয়েছি। কিছু চেঞ্জ করেছি আরকি। এটা যেকোনো সহিংসতাকে বোঝাতে পারে। আনমিউট করছে। শব্দ করতে চাইছে। প্রতিবাদ এবং ফুল আছে। ব্ল্যাক খারাপ সময়কে বোঝাচ্ছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদকে বোঝাচ্ছে, অস্থির সময়কে বোঝাচ্ছে। বোমারু বিমানগুলো আর ড্রোন রাতে আক্রমণ করে। সারা বিশ্বের যুদ্ধাবস্থার বিরুদ্ধে আঁকা বলা যেতে পারে। ইউক্রেনের কিয়েভের একটা ভাস্কর্য আছে, সেটাও বলতে পারেন, আবার গডেস অব আনমিউটও বলতে পারেন। এটার বহু ইন্টারপ্রেটেশন আছে। আমি একক অর্থ দিয়ে খোলাসা করি না। এটাই আমার ধারণা, আমার ব্যাখ্যা।’ যদিও, গ্রাফিতিতে যুদ্ধ থামাও হ্যাশট্যাগ দেওয়া এবং মেসেজে আর্টের ব্যাখ্যা দেওয়ার পরে দর্শকের ইন্টারপ্রেটেশনের আর কতটুকু সুযোগ থাকে সেটা একটা প্রশ্ন।
এ সময়ে ‘হবেকি’র আরেকটা জনপ্রিয় গ্রাফিতি ‘বেকারের জীবনডাটা’। এটার অবস্থানও মিরপুরে। সাথে একটা কিউআর কোড, যেখানে কবিতার আকারে একজন বেকারের গ্লানি ও দুর্দশার বর্ণনা। এটাতে একইসাথে প্রথম পর্বের প্রথম ধারার ডিরেক্ট টেক্সটের মাধ্যমে হতাশাবাদী, প্যাসিভ ও অভিমানী বার্তার প্রবণতাটা আছে, আবার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম ধারার সামাজিক ধারাভাষ্যের প্রবণতাও আছে, অর্থাৎ, চলমান তীব্র বেকারত্বের সমস্যাটা কোন রূপক ছাড়াই তুলে আনা। এখানে গ্রাফিতিটাতে আরও দুইটা বিষয় খেয়াল করার আছে। এক হলো, বেকারের জীবনডাটার আর্ট মিডিয়াম আগের মতো স্টেনসিলের ওপর স্প্রে পেইন্ট হলেও, আর্ট স্টাইল বদলে গেছে। ফ্রি হ্যান্ড স্টাইলে নেই, যেমনটা হাতে আঁকা ড্রয়িং স্টেন্সিলের জন্য কাটলে হয়। এই ফিগার অ্যানাটমিক্যালি আরও রিয়ালিস্টিক, ডিজিটাল আর্ট প্রভাবিত, যান্ত্রিক।
আগের ‘হবেকি’র আগের আর্ট স্টাইলের ধারাবাহিকতা এটা না। যেখানে সুবোধের ফিগার এনাটমিক্যালি অতোটা কারেক্ট করার প্রবণতা ছিল না, সুবোধের ফিগার ছিল এক্সপ্রেসিভ ঘরানার। আমার অনুমান, এই সময় শিল্পী লেআউট বা স্কেচ করতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ফটোশপের সহায়তা নেওয়া শুরু করেছেন। সেগুলোই প্রিন্ট করে কেটে স্টেন্সিল বানিয়েছেন। এই আর্ট স্টাইলের ধারাবাহিকতা আমরা সামনে দেখতে পাব। মিরপুরের দুইটা গ্রাফিতিরই ক্ষেত্রে আরেকটা খেয়াল করার বিষয় হলো, এই দুইটা সুবোধকে কেন্দ্র করে নয়। এরও ধারাবাহিকতা আমরা সামনে আরও দেখতে পাব।

এরপর আবার বিরতি দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১৮ তারিখ অনলাইনে আরেকবার সুবোধের দেখা পাওয়া যায়। যেখানে ২০২২-এর গদিতে লাথি মারার ছবিটার একটা গ্রাফিক ফাইল হবেকি শেয়ার করে এবং ভক্তদেরকে উদ্দেশ্য করে জানান কীভাবে সেটা ব্যবহার করে দেয়ালে গ্রাফিতি করা যাবে।

আগস্টের ৫ বা ৬ তারিখে ঢাবি টিএসসির পাশে সুবোধের গ্রাফিতিটা দেখা গিয়েছিল, সেটা মূলত এই লেআউট থেকেই করা। তবে তা হুবহু নয়। ঢাবির গ্রাফিতিটাতে দেখা যায় সুবোধের নিজের মাথাতেই মুকুট। অনুমান করা যায়, জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাকে পিপলের ক্ষমতায়ন হিসেবে হবেকি সুবোধের মাথায় এই মুকুট পরিয়েছিল। এটার ড্রয়িং স্টাইল হবেকির পূর্বপরিচিত ফ্রি হ্যান্ড আঁকা এক্সপ্রেসিভ ফর্মে ছিল। শুধু মুকুটটা দেখে বোঝা যায় ডিজিটাল কোনো আইকন থেকে সেটা করা। প্রতিরোধ ও বিদ্রোহী মনোভাব এই কাজটাতে লক্ষ করা যায় সহজেই। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সুবোধের মাথায় মুকুটকে জনগণের মাথাতেই মুকুট হিসেবেও পাঠ করা সম্ভব। তবে জুলাইয়ে ঘটে যাওয়ার পরে এই গ্রাফিতি যতটা না আহ্বান ছিল, তার চেয়ে বেশি ঘোষণাই ছিল। এতে বিদ্রোহী চেতনা আছে নিঃসন্দেহে। এবং প্রথমবারের মতো হয়তো হবেকির কোনো গ্রাফিতি ছিল এটা, যেখানে খুঁজলে বৈপ্লবিক চেতনাও কিছু মাত্রায় পাওয়া যাবে।

এরপর, ২০২৫-এ চট্টগ্রামে দুইটা গ্রাফিতি দেখা যায়। এর মাঝে একটা বাদশা মিয়া লেনে, যেটা মূলত সিলেটের সেই হলুদ ফুলের গ্রাফিতিটারই একটা নবায়িত রূপ।

অপরটা চট্টগ্রামের সিআরবির শিরীষতলায়। ২০ ফুট লম্বা আর প্রায় ১২ ফুট উঁচু সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া দেয়ালে দেখা যায়, গাধার পিঠে বসে গালে হাত দিয়ে বসে আছে ফরাসি ভাস্কর অগুস্ত রোঁদ্যার ‘দ্য থিংকার’ ভাস্কর্যের অনুরূপ এক ভাবুক।

সম্ভবত হবেকি সিরিজের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও ভাবনা-উদ্রেককারী কাজ এটাই। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা বেশ ‘ওপেন টু ইন্টারপ্রেটেশন’ শিল্পকর্ম ছিল। দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় ধারার ধারাবাহিকতা এটা। বাদশা মিয়া লেনের কাজটাও সেই দিকেই নির্দেশ করে। এটাতেও ‘হবেকি’ ট্যাগ থাকলেও সুবোধ উপস্থিত নেই। সাথে কোনো টেক্সটও নেই। আর্ট স্টাইলের দিক থেকে এটাও এক্সপ্রেসিভ ফর্মের হাতে আঁকা স্টাইলের না। মনে হচ্ছে, লেআউট এআই দিয়ে জেনারেট করা বা ডিজিটালি ফটো কোলাজ করা, ফটোশপে দুই কালারে রূপান্তর করা হয়েছে।
দীর্ঘকাল প্রথাগত ও ডিজিটাল মিডিয়ামে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই এই অনুমান। তবে ভুলও হতে পারে। পর্যবেক্ষণ হিসেবে বলা। আমার কাছে মনে হয়েছে এই যে শিল্পীর স্বকীয় এক্সপ্রেসিভ ফর্ম ও স্টাইল ছেড়ে সিনথেটিক, মেকানিক্যাল, জেনারেটেড ফর্ম ও স্টাইলের দিকে যাওয়া, এটা হবেকি সিরিজের শিল্পকর্মগুলোর মাধ্যমের রাজনীতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ সুতা হতে পারে। শিল্পী তার স্টাইল বদলানোর কারণে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্কের ধরণে কোন পরিবর্তন এসেছে কি না, সেটাও অনুসন্ধান করা যেতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের জন্য উল্লেখ রাখা।
এই কাজটার মধ্যে আমার মতে স্যাটায়ার আকারে কিছুটা বৈপ্লবিক চেতনা আছে। এমনকি তা জুলাই- আগস্টের লাথি মেরে চেয়ার ভেঙে ফেলার শিল্পকর্মটার চেয়ে অন্তত বেশি মাত্রায়। কারণ, যখন চেয়ারটা ভেঙে ফেলাই যখন সাধারণ প্রবণতা, বা ইতোমধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়েছে, তখন চেয়ার ভাঙাকে চিত্রায়িত করার মাঝে বিদ্রোহী চেতনা থাকলেও তাকে খুব একটা বৈপ্লবিক বলা যায় না। তবে একটা গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যখন চিন্তকেরা চিন্তার ভারে অচল হয়ে যাচ্ছে, ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হয়ে অথর্ব হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, তখন তাদেরকে একটু গাধার পিঠে চড়ানোর মাধ্যমে যদি প্রশ্ন করা যায় তবে তা একটা মাত্রায় অবশ্যই বৈপ্লবিক।
এই শিল্পকর্মটিতে আরেকটি খেয়াল করার বিষয় হলো ইউরোকেন্দ্রিক প্রতীকের ব্যবহার। এর আগেও আমরা হবেকির কাজে ইউরোকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতীক বা অনুপ্রেরণা দেখেছি। যেমন কিউপিড বা কিয়েভের মাদার ইউক্রেন ভাস্কর্য। লুঙ্গি ও মাথাল মাথায় কিউপিডের একটা দেশি রূপও আমরা দেখেছিলাম। পশ্চিমা আর্ট ক্যাননের ইনফ্লুয়েন্স হবেকির কাজে যে আছে তা স্পষ্টই। দেশীয় প্রতীক ও পুরাণ আশ্রয় করে নিজস্ব দৃশ্য-ভাষার পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমরা যদি বাংলাদেশের গ্রাফিতি সংস্কৃতিতে দেখতে পেতাম, সেটা বাংলাদেশের আর্টে একটা বৈপ্লবিক ঘটনা হতে পারতো। যার কিছুটা লক্ষণ আমরা জুলাইয়ের গণ-গ্রাফিতি-চর্চায় দেখেছি।

২০২৫-এর ডিসেম্বরেই আগারগাঁওয়ে ‘হবেকি’র আরেকটা গ্রাফিতির দেখা পাওয়া যায়। একজন যোদ্ধা, অস্ত্রের বদলে তার কোমরে রঙের ব্রাশ, হাঁটু গেড়ে বসে শিশুকে আলিঙ্গন করছে। শিশুর মাথায় যোদ্ধাদের হেলমেট এবং হাতে বাংলাদেশের পতাকা। বিজয় দিবস উপলক্ষেই এই গ্রাফিতি। আর্ট স্টাইলের দিক থেকে এটাও ডিজিটাল আর্ট প্রভাবিত ধারারই। সেসময়ে বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলমান নানান বিতর্কে হবেকির রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রকাশ হিসেবে এটাকে ধরা যায়।
২০২৬-এ দুইটা গ্রাফিতি পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত। প্রথমটা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে আগারগাঁও পুরান এয়ারপোর্ট এলাকায়। সেখানে দেখা যায়, সুঠামদেহী সুবোধ লাফ দিয়ে মিসাইল ধরে থামিয়ে দিচ্ছে। আর্ট স্টাইলের দিক থেকে এটাও রিয়ালিস্টিক ঘরানার, ডিজিটাল মিডিয়া প্রভাবিত। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটা রাজনৈতিক ধারাভাষ্যের মধ্যে পড়ে। বলা যায়, আগের যুদ্ধবিরতি গ্রাফিতির ধারাবাহিকতা। আর্ট স্টাইলের মতো বিষয়বস্তুর জায়গাতেও এই ধারাটা অত্যন্ত গতানুগতিক ও ভাসাভাসা মাত্রার। কোন পক্ষ যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, আর কোন পক্ষ বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করছে তার কোনো ভেদাভেদ নেই। ফলে লিবারেল হিউম্যানিজমের এই পিস অ্যাক্টিভিস্ট ধারাটা বৈপ্লবিক তো নয়ই, বরং তার বিপরীত কিছুই বলা চলে। এই চিন্তাপদ্ধতি কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবির বদলে মানবিক আবেদন করে, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার বিরোধিতা করে না, বরং তার সীমার মধ্যে যুদ্ধবিরতি চায়, যেখানে শান্তি মানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তির স্বার্থে প্রতিরোধ না করা। এরমানে এই না যে শিল্প হিসেবে তার সার্থকতা শুধু বার্তার কারণে কমে যাবে। তবে বার্তাটা যে বৈপ্লবিক না, সেটাই লক্ষ্য করার বিষয়।

তবে এরপরের গ্রাফিতিটাই, অর্থাৎ, বহুল আলোচিত ২০২৬-এরই জুন মাসে ইন্ডিয়ার সিকিমে করা গ্রাফিতিটাই আবার স্টাইল ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এতে আবার আমরা সেই আগের পরিচিত হাতে আঁকা, অনেকটা এক্সপ্রেসিভ ফর্মের সুবোধকেই দেখতে পাই। তার হাতে ওয়্যার কাটার, সে ঝুলে আছে কাঁটাতার দিয়ে বানানো একটা হ্যামকে। মাটিতে একটা বালতি। সাথে শুধু ‘হবেকি’ আর্টিস্ট ট্যাগ। আর কোনো টেক্সট নেই।
বৈশিষ্ট্য দেখলে আমরা এটা দ্বিতীয় পর্বের টেক্সটবিহীন, কিছুটা ইনডিরেক্ট, দর্শকের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ধারার হিসেবেই ধরতে পারি। অনুমান করা যেতে পারে যে রাষ্ট্রের সীমানাকে সুবোধ চ্যালেঞ্জ করছে। সুবোধ যদি এখানে শুধু বাংলাদেশ বা ইন্ডিয়ার সীমানা শুধু না, সরাসরি রাষ্ট্রের ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসে, তবে তাকে বৈপ্লবিক না বলে উপায় থাকে না। আবার প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অংশের উভয়েরই যেহেতু বিভিন্ন কমন স্ট্রাগল আছে, সংহতির জায়গা আছে, সেটাকেও যদি ইন্ডিকেট করতে চায় তবে তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তার মাঝে প্রতিরোধ তো অবশ্যই, বৈপ্লবিক উপাদানও পাওয়া যাবে। তবে, কাজটি যে অতিমাত্রায় ওপেন টু ইন্টারপ্রেটেশন, এটাও খেয়াল করার বিষয়। ‘হবেকি’র সমসাময়িক স্পষ্ট লিবারেল হিউম্যানিজম প্রভাবিত অন্যান্য গ্রাফিতি গুলো বিবেচনায় রাখলে এই গ্রাফিতিটির বৈপ্লবিক ইন্টারপ্রেটেশনের সম্ভাবনা অনেকটা কমিয়ে দেয়।

সামগ্রিকভাবে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমরা যদি ‘হবেকি’র উল্লেখযোগ্য কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখি, তবে তার মাঝে পরিণত, বিকশিত ও রূপান্তরিত হওয়ার একটা যাত্রা দেখতে পাই। তার দিক নির্ধারণে নিঃসন্দেহে দর্শক ও ভক্তদের অবদান আছে। আমি এখানে হবেকি বা সুবোধের অন্তরালে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আছে তার বা তাদের কথা বলছি না। বরঞ্চ, প্রতিবার হবেকির কোন গ্রাফিতির সামনে দাঁড়ালে সুবোধ ও অন্যান্য যেসকল চরিত্রের সামনে আমরা দাঁড়াই, গ্রাফিতিগুলোর লেখার মধ্য দিয়ে যেই কথক বা ওরেটর আমাদের সাথে কথা বলে, তার বা তাদের যাত্রাটার কথা বলছি। শুরুতে যে ছিল একেবারেই অভিমানী, হতাশাগ্রস্ত, দ্বিধাগ্রস্ত, পলায়নপর, প্যাসিভ বা কর্তাসত্তাহীন, সে কিছুদিনের মাঝেই ভোরের খোঁজ করছে। যে ছিল সমাজবিচ্ছিন্ন, সে দেশের নানান প্রতিরোধে সরাসরি যোগ দিচ্ছে। সম্পূর্ণ আবেগনির্ভরতা থেকে সে এমন বিষয়বস্তুর দিকে শিফট করছে, যা দর্শককে কোনো সিদ্ধান্ত না, বরং নিজের সময়টাকে নিয়ে গভীর ভাবনা ও প্রশ্নের দিকে তাড়িত করে। আবার এই রূপান্তর সরলরৈখিকও না। সেই একই শিল্পী আবার এক কথায় 'যুদ্ধ থামাও' টাইপের অগভীর ও স্থূল প্রপাগান্ডা ট্র্যাপেও পা দিয়ে সেগুলো রিসার্কুলেটও করছে।
হবেকি বা সুবোধকে কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়নের চেষ্টা এই লেখায় করলাম। হবেকির সুবোধ সিরিজ সমসাময়িক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অন্তত পক্ষে, আমাদের মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে। তাই, হবেকি ডিজার্ভ করে যে আমরা তাকে গুরুত্ব দিয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠ করব। সেই পাঠ শুরু করার একটা চেষ্টা এই লেখায় আমি করেছি। নিশ্চয়, পাঠকরাও এই উছিলায় তাদের নিজ নিজ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চেষ্টা করবেন।
শুরুটা করেছিলাম, ‘হবেকি’ বা সুবোধ কি বৈপ্লবিক কি না, সেই প্রশ্ন দিয়ে। কারণ, এই প্রশ্নের গুরুত্ব আমার কাছে এতটুকুই যে, যতদিন আমরা কোনো শিল্পী বৈপ্লবিক হওয়ার আগেই তাকে বিপ্লবী বলে আখ্যায়িত করব, তা যতই ভালোবাসা থেকে হোক না কেন তা তার এবং অন্যান্য শিল্পীর বৈপ্লবিক হওয়ার পথে বাধাই তৈরি করবে। আমার সিদ্ধান্ত হলো, হবেকি+সুবোধের গ্রাফিতিগুলোর দৃশ্য ও লেখার বিষয়বস্তু ও বক্তব্য 'বৈপ্লবিক' হওয়ার শর্ত যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ করে না। এই ধারাবাহিক সিরিজে সাম্প্রতিক সময়ে বৈপ্লবিক উপাদান সমেত কয়েকটা কাজ হাজির হয়েছে। তবে, সামগ্রিক কাজের যেই প্রবণতা, তাকে এই অল্প সংখ্যক সাম্প্রতিক কাজ অফসেট করতে পারে না। বৈপ্লবিক হিসেবে সিদ্ধান্ত দিতে গেলে বৈপ্লবিক উপাদান বিশিষ্ট কাজগুলোর আরো ধারাবাহিকতা প্রয়োজন রয়েছে। আশা করি ‘হবেকি’ ও সুবোধ যাত্রা চলমান রাখবে। ‘হবেকি’ ও সুবোধের জন্য শুভকামনা।

কী কী শর্তপূরণ হলে আমরা কোনো শিল্পকর্মকে বৈপ্লবিক বলতে পারি? শিল্পের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক হওয়ার একটা জায়গা থাকে শিল্পশৈলী ও শিল্প-মাধ্যমের দিক থেকে। সেই দিক বিবেচনায় সুবোধ সিরিজটা অতিপরিচিত সীমিত রঙে করা স্টেনসিল পদ্ধতির গ্রাফিতি। মূলত জনপরিসরে যখন এই সিরিজ নিয়ে আলাপ হয় তা এর শিল্পশৈলী না, বরঞ্চ এর বিষয়বস্তু ও বক্তব্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের জায়গা থেকেই।
আবার গ্রাফিতি মাধ্যমের কারণেও এর আলাদা একটা গুরুত্ব তৈরি হয়। আমরা মূলত অনুসন্ধান করব ‘হবেকি’ বা ‘সুবোধ’ কি দৃশ্য বা লেখায় আমাদের কোনো বৈপ্লবিক বার্তা দিয়েছে কি না, তা নিয়ে।
বৈপ্লবিক হওয়া কাকে বলি? নিশ্চয় তার বহু শর্ত আছে। এই আলাপের জন্য আমি যেই শর্তটাকে প্রাধান্য দিব তা হলো সমাজ বা রাষ্ট্রে, মানুষের চিন্তা-বুদ্ধি-বিশ্বাসে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বা প্রক্রিয়াতে প্রকাশ্যে বা গোপনে যা যা স্বাভাবিক, প্রতিষ্ঠিত বা সত্যায়িত হিসেবে বিদ্যমান, সেগুলোকে প্রশ্ন করা, আঘাত করা বা সেগুলোর বিকল্প দেখানো। এই দিকটা যদি আমরা মাথায় রাখতে পারি তাহলে আমরা দেখব কোনো কিছুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা, কোনো কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা বিদ্রোহ করা কখনো কখনো বৈপ্লবিক হলেও ক্ষোভপ্রকাশ বা প্রতিরোধ বা বিদ্রোহ করা মানেই তা বৈপ্লবিক নাও হতে পারে। যেমন, উচ্চদ্রব্যমূল্য নিয়ে আমি গ্রাফিতির মাধ্যমে সবার দুরবস্থার কথা শক্ত ভাষায় তুলে ধরতে পারি। তবে তা যদি শুধু ক্ষোভটাই প্রকাশ করে, কিন্তু ক্ষোভটা কোনো উৎস বা কর্তৃপক্ষের অভিমুখী না হয়, মানুষকে অসংগঠিত ক্ষোভকে সংগঠিত না করে— তবে তাকে বিদ্রোহী বা প্রতিরোধমূলক বলার উপায় নেই। আবার সেই গ্রাফিতি বা চিত্রকর্ম যদি কর্তৃপক্ষ বা বাজার সিন্ডিকেটকে তাক করে হয়, কিন্তু তা যদি বিদ্যমান বৈষম্যমূলক উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাকে প্রশ্ন না করে, ভিন্ন কোনো ন্যায্য সমাজের কল্পনা বা সম্ভাবনা দর্শকের মনে না জাগাতে পারে, তবে তাকে প্রতিরোধমূলক বা বিদ্রোহী বলা গেলেও বৈপ্লবিক বলার সুযোগ থাকে না।

প্রথমে আমরা যদি ‘সুবোধ’ সিরিজের আইকনোগ্রাফি দেখি তবে তাতে নিয়মিত উপাদান হিসেবে যা যা পাই তা হলো ছেঁড়া জিনসের প্যান্ট পরিহিত একজন যুবক, তার হাতে খাঁচা, খাঁচায় রক্তিম বা হলুদাভ সূর্য। এ ছাড়াও কখনো জেলখানা, কখনো মোরগ বা কখনো কৌতূহলী শিশুচরিত্র প্রভৃতিরও আবির্ভাব ঘটে। আমাদের সম্মিলিত মানসে এসব প্রতীকের কিছু অর্থ আছে। যেমন সূর্যের বদলে যদি চাঁদ থাকত তবে আমাদের দর্শকদের অনুভূতি ভিন্ন হতো। খাঁচার বদলে যদি থাকত বাজারের ব্যাগ তাতেও আমরা একইরকম অনুভব করতাম না। জিনসের পরিবর্তে লুঙ্গি থাকলে আমরা সুবোধকে ভিন্ন কেউ হিসেবেই দেখতে পেতাম।
এ ছাড়া আর্টিস্ট ট্যাগ হিসেবে আছে ‘হবেকি’ এবং অধিকাংশ গ্রাফিতির সঙ্গে যুক্ত লেখা বা টাইপোগ্রাফিগুলো থেকে যুবকের একটা নাম পাই, তা হলো ‘সুবোধ’। ‘হবেকি’ ট্যাগটাতে স্পষ্টতই একটা কিছু ঘটার আকাঙ্ক্ষা আছে। আবার সুবোধ নামটা হয়তো উত্তম, শুভ বা সৎ বোধের দিকে নির্দেশ করে, নির্বোধ বা বোধহীনের বিপরীতে। আমি যখন প্রথম সুবোধ সম্বোধনটা দেখছিলাম গ্রাফিতিগুলোতে, আমার কাছে মনে হয়েছিল সুবোধ বলতে বিবেককে বোঝানো হয়েছে।

যদি লেখাগুলো খেয়াল করি তবে দেখব লেখায় সুবোধকে যে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, ছবির যুবকটা তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিছুই করছে। যেমন, যেখানে সুবোধকে বলা হচ্ছে পালিয়ে যেতে, সেখানে যুবককে আমরা দেখি দর্শকের দিকে পিঠ ফিরিয়ে আছে। যেখানে লেখা আছে ‘সুবোধ এখন জেলে!’ সেখানে আমরা সেই যুবককেই দেখতে পাই গারদের পেছনে। অর্থাৎ, শিল্পকর্মগুলো থেকে এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে ছবির বিধ্বস্ত যুবক সুবোধ নামের কাউকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে না। বরং, অন্য কেউ, হয়তো শিল্পী নিজে বা পরিস্থিতি কিংবা সিস্টেম (সমাজ, রাষ্ট্র, বাজার ইত্যাদি) ওই যুবককে সুবোধ নামে সম্বোধন করে কথাগুলো বলছে। সিস্টেম যে বলছে না তা ধারাবাহিক বক্তব্যগুলো দেখলে নিশ্চিত হওয়া যায়। কেন না, যে বলছে সে সুবোধের প্রতি সহানুভূতিশীল। এই চলে যেতে বলা দমনমূলক নয়। শিল্পী বা পরিস্থিতি দুইয়ের কে কথাগুলো বলছে তাতে খুব একটা পার্থক্য হয় না। কারণ, শিল্পী বললেও তা যে পরিস্থিতি সুবিধার না দেখেই বলছে, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। এ ছাড়াও থাকে খাঁচায় বন্দি সূর্য। আমাদের সংস্কৃতিতে সূর্য সাধারণত সুবোধ-এরই প্রতীক। আবার আশা বা নতুন সূচনারও প্রতীক।

তবে এই ক্ষেত্রে হয়তো সূর্যটা সুবোধের হৃদয়ের প্রতীক। এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে বলা যায় সুবোধের প্রথম দিককার অন্তত দুটি গ্রাফিতির কথা। যার একটাতে সুবোধ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, খাঁচার ভেতর সূর্যের বদলে একটা লাল হার্ট প্রতীক। আরেকটাতে খাঁচার ভেতর একটা লাল হার্ট প্রতীক এবং খাঁচার ওপর বসে আছে রোমান পুরাণের প্রেমের দেবদূত ছোট্ট কিউপিড।

কিন্তু সেই খাঁচাটা আবার সুবোধেরই হাতে। তার সূর্যটাকে কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে এমন না। যেন পরিস্থিতিই এমন যে সুবোধ তার হৃদয়টাকে নিজেই খাঁচায় বন্দি করতে বাধ্য হয়েছে। খাঁচার বদলে যদি বাক্স বা সিন্দুক হতো তবে হয়তো এভাবে পাঠ করার সুযোগ থাকত যে সুবোধ নিজ হৃদয়টাকে বাইরের দুনিয়া থেকে রক্ষা করতে সিন্দুকে আগলে রাখছে। খাঁচা যেহেতু, তাই বন্দিদশা হিসেবেই পাঠ করাটা বেশি উপযুক্ত। ‘সুবোধ এখন জেলে’ শীর্ষক গ্রাফিতিটাও সেই অর্থই ইশারা করে।

‘হবেকি’ সিরিজের গ্রাফিতিগুলোর কয়েকটি ধারা দেখা যায়। ২০১৭-এর দিকে সুবোধ সিরিজের প্রাথমিক পর্বের কাজে অর্থের দিক থেকে দুইটা ধারা দেখা যাবে। প্রথম ধারাটা সবচেয়ে বিখ্যাত। যেখানে একাধিক চিত্রের সঙ্গে যে লাইনগুলো দেখা যায়, সেগুলো এমন যে—‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নাই’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, ভুলেও ফিরে আসিস না’, ‘এখানে সাপ ভরা চাপ চাপ রুচি! কাপ ভরা পাপ পাপ চা! সুবোধ… তুই পালিয়ে যাহ্’ ইত্যাদি।

চিত্রগুলোতেও দেখা যায় সুবোধ চলে যাচ্ছে, দৌড়াচ্ছে বা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। তার হাতে খাঁচাবন্দি সূর্য। কাছাকাছি সময়ে আরেকটা গ্রাফিতিতে দেখা যায়, সুবোধ গারদের পেছনে। ওপরে লেখা—‘সুবোধ এখন জেলে, পাপবোধ নিশ্চিন্তে করছে বাস মানুষের হৃদয়ে।’
প্রথম ধারায় আমরা মূলত দেখতে পাই অসহায়ত্ব ও হতাশা থেকে উদ্ভূত ক্ষোভ বা অভিমান। সেই ক্ষোভ নির্দিষ্ট কারও প্রতি উদ্দিষ্ট নয়। সময় কেন পক্ষে না, কেন সুবোধের ভাগ্যে কিছু নেই তা নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষের দিকে আঙুল তোলা নেই। বলা আছে, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে। কিন্তু মানুষ কেন ভালোবাসতে ভুলে গেছে, কেন মানুষের হৃদয় সুবোধের মতোই খাঁচায় বন্দি তা নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসা নেই। এই যে সময়, যা সুবোধ কিংবা মানুষ কারও পক্ষেই নেই, তার মুখোমুখি হওয়ার বার্তাও এই ধারাতে নেই। আছে সতর্কবার্তা, সুবোধ যেন ভুলেও না ফিরে আসে। আবার, সুবোধকে কোথায় যেতে বলা হচ্ছে তার কোনো দিকনিশানা এখানে নেই।
চিত্রগুলোতেও দেখা যায়, সুবোধ চলে যাচ্ছে। তবে সুবোধ যেন পিছুটান ছাড়তে পারে না। তাকে পালিয়ে যেতে বলা হলেও বারবার সে পেছন ফিরে চায়, মাটিতে বসে মাথায় হাত রেখে অঝোরে কাঁদে। এই ধারাতে ‘সুবোধ’ কিংবা ‘হবেকি’ কেউই প্রতিবাদী, প্রতিরোধী কিংবা বিপ্লবী নয়। সে অসহায়, দিশেহারা, পলায়নপর এবং যাবতীয় পরিস্থিতির মধ্যে সুবোধ প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয়।
এই যে ‘হবেকি’ তার ও অন্যদের অনুভূতিগুলো প্রকাশের জন্য দেয়ালে দেয়ালে বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে গ্রাফিতি করছে, এটাও কর্তাসত্তার পরিচয়। কিন্তু সময়, পরিস্থিতি ও বাস্তবতার সামনে তার যে আত্মসমর্পণমূলক বার্তা, তাতে কর্তাসত্তার পরিচয় দুর্বল।
আমরা যদি দেখি সুবোধের চেহারা বা শরীর শিল্পী কতখানি দরদ নিয়ে এঁকেছে, তাতে আমরা উপহাস পাব না। তাহলে, খোঁচাটা কি দর্শকের দিকে? হ্যাঁ, একটা অভিমানী খোঁচা দর্শকের দিকে আছে। তবে সেই উদ্দিষ্ট দর্শকও তো ভিক্টিম বা ভুক্তভোগী। ‘হবেকি’ নিজে তার অংশ। ফলে এই অভিমান মূলত অগঠনমূলক আত্মগ্লানি হিসেবেই পাঠ করা বেশি যৌক্তিক বলে মনে করি।
এই প্রবণতা অনেকটা নিজেকে বদলে দিয়ে দুনিয়া বদলে দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গিরই অনুরূপ। যেখানে কাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যার দায়ভার চলে আসে ব্যক্তি মানুষের ওপরে। যেহেতু কাঠামোগুলোর চালকেরাও সেটাই প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ফলে ভুক্তভোগীদের এই সব ধারণাতে সাবস্ক্রাইব করার মধ্যে কর্তাসত্তার প্রয়োগ খুব একটা নেই। যদিও বক্তব্য ও দৃশ্যের বাইরে ওই সময়ের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু মাধ্যমের কারণেই হবেকি’র এই শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে একটা রেবেল বা বিদ্রোহী স্পিরিট লোকেট করা সম্ভব। কারণ একটা দমনমূলক সরকার যখন সবকিছু স্বাভাবিক দেখাতে ভয়াবহ মাত্রায় তৎপর, তখন তার কড়া পাহারা এড়িয়ে দুঃখটুকু প্রকাশ করার মাধ্যমে সেই কৃত্রিম স্বাভাবিকতায় ছেদ ঘটানোও কম রেজিস্ট্যান্স নয়। আবার বেদখল পাবলিক স্পেসকে রিক্যাপচার করার মধ্যেও একটা স্পষ্ট স্পর্ধা আছে। তবে এই স্পর্ধা মূলত শিল্প মাধ্যম বা আর্ট মিডিয়ামের পলিটিক্সের অন্তর্ভুক্ত।
সুবোধকে উদ্দেশ্য করে ‘হবেকি’র এই নির্দেশনা কি সর্বজনীন? মানে সকল বর্গের মানুষের জন্য নাকি কোনো নির্দিষ্ট বর্গের মানুষের জন্য? খেয়াল করলে দেখব, এই পালিয়ে যাওয়ার বার্তা সকল শ্রেণির মানুষের কাছে একইরকম অর্থবহ নয়। বাংলাদেশের একেবারে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষদের জন্য দেশ-বিদেশের সীমানা তুলনামূলক আবছা। তাদের যখন খুশি তারা এই দেশ ছেড়ে মুহূর্তেই চলে যেতে পারে, তাদের এক পা দেশে থাকলে আরেক পা থাকে বিদেশে। ফলে তাদের এখান ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়াটা পালিয়ে যাওয়া নয়। তাদের বেছে নেওয়ার বিশেষাধিকার আছে।
অপরদিকে একেবারেই যারা নিম্নশ্রেণির, তাদের ক্ষেত্রেও এই পালিয়ে যাওয়াটা কোনো অর্থ রাখে না। কারণ দুনিয়ার যেখানেই তারা যাক না কেন, তাদের কফিনে করে এই দেশের মাটিতেই নামতে হয়। তারা তাদের কবর এই দেশ ভিন্ন অন্য কোনো দেশে কল্পনা করে না। ভিন্ন কোনো দেশ মানে তাদের কাছে ভিন্ন কোনো চাকরিই কেবল। সেখানে গেলেই সে ভিন্ন কোনো শর্তের বা ভিন্ন বাস্তবতার জীবন পায় না। ফলে পালিয়ে যাওয়া সবচেয়ে অর্থবহ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির জন্য। কারণ তাদের জন্য অন্য দেশ মানে কিছুটা হলেও অন্য বাস্তবতা।
প্রশ্ন জাগতে পারে, সুবোধকে পালিয়ে যেতে বলাটা আক্ষরিক অর্থে নেব কেন আমরা। এটা হয়তো শুধু বোধকে উদ্দেশ্য করে বলা, মানুষটাকে নয়। কিন্তু ছবিতে আমরা দেখব, শুধু সূর্যটাকে ছুঁড়ে ফেলতে বলা হচ্ছে না, বন্দি করে রাখতে বলা হচ্ছে না; বরং সুবোধ নামের মানুষটাকেই হৃদয় হাতে প্রস্থান করতে বলা হচ্ছে। তবে এই শিল্পকর্ম গুলো সর্বজনীন নয় বলে যে শিল্প হিসেবে এর গুরুত্ব নেই, এমন না। এমনকি শিল্প হিসেবে এটা এর সীমাবদ্ধতাও না। একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শক যখন তার জন্য প্রাসঙ্গিক বলেই যেকোনো শিল্পকর্মকে সর্বজনীন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটা প্রধানত ঐ নির্দিষ্ট দর্শক শ্রেণির সীমাবদ্ধতা। তবে, এই সীমাবদ্ধতাকে হবেকি কখনো অ্যাড্রেস করেনি। প্রতিষ্ঠিত ‘মধ্যবিত্ত ডিকশনারির’ ভাষা ও বোধ কাঠামোর ভেতরেই খেলা না করে যদি হবেকি বা সুবোধ তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো সেটা একটা বৈপ্লবিক ব্যাপার হতো।
আবার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও হবেকি বা সুবোধের যে হতাশা, বেকারত্বের অনুভব, পলায়নপরতা, আবার ত্রাণকর্তার ভূমিকা তা প্রধানত ম্যাস্কুলিনিটির সংকট হিসেবেও পাঠ করা সম্ভব। ছেঁড়া জিনস পরা, এলোমেলো চুল, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে ভাব—এগুলো আমাদের মানসে রোমান্টিসাইজড মেল-অ্যাংস্ট হিসেবে আবির্ভূত হয় সাধারণত। এই পাঠকে আরও জোরদার করে ‘হবেকি’ সিরিজের গ্রাফিতি গুলোতে নারীদের উপস্থিতি দেখলে।

যেমন আমরা দেখতে পাব নারী শিশু এসে সুবোধকে ভোর কবে হবে জিজ্ঞেস করছে। পরবর্তীতেও আমরা আরেকটা গ্রাফিতিতে দেখব, পুরুষ যোদ্ধা হয়তো তার শিশু কন্যাকে আলিঙ্গন করছে। দুই ক্ষেত্রেই পুরুষ চরিত্রটি ডমিন্যান্ট, নারী এসেছে অবুঝ ও নিষ্পাপ শিশুরূপে। তবে সেটাকে এভাবে পাঠ করা যেতে পারে যে শিল্পীর নিজের জীবনে হয়তো তেমন নারী শিশু কেউ আছে, যে কি না চিত্রকর্মে চলে আসছে। হয়তো এটা ‘হবেকি’র সাধারণ মেল ডমিন্যান্ট ভাবনার প্রকাশ না। তবে দর্শকের যেহেতু ‘হবেকি’র ব্যক্তিগত জীবন জেনে দৃশ্য পাঠের সুযোগ নেই, সেহেতু তেমন হলেও তা অতটা প্রাসঙ্গিক না। পরবর্তী সময়ে আমরা যুদ্ধবিরোধী দুটি গ্রাফিতি দেখতে পাব; যেখানে নারী চরিত্রটির বেলায় সে আহত, ভুক্তভোগীরূপে আসে। কিন্তু একই যুদ্ধবিরোধী থিমে আবার পুরুষ চরিত্রটিকে দেখা যায় সুপারহিরোর মতো আকাশে দুই হাত দিয়ে মিসাইল থামিয়ে দিচ্ছে। এখানে একই থিমে একই মেসেজের ক্ষেত্রেও আমরা নারী ও পুরুষের দুই রকম রিপ্রেজেন্টেশন দেখতে পাই। তবে ‘This is my masterpiece’ শিরোনামের গ্রাফিতিতে নারী শিশুর বাংলাদেশের পতাকা বুকে নিয়ে যে প্রবল ঘোষণা, সেখানে নারীকে শিশু হিসেবে আনা হলেও, তার উপস্থিতিটা শক্তিশালী এবং কোনো পুরুষকে আশ্রয় করে না।

‘হবেকি’র কাজগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলো খেয়াল করার উদ্দেশ্যে এই বিশ্লেষণ। যদি সে পুরুষ শিল্পী হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার পুরুষ জীবনের অভিজ্ঞতাই তার শিল্পকর্মে সঞ্চারিত হবে। তাতে নানান বায়াস থাকাটাও অস্বভাবিক না। তবে এই বায়াসনেস বৈপ্লবিক হওয়ার পথে সীমাবদ্ধতাও বটে। এই ধরনের বায়াসগুলোকে অতিক্রম করার ভেতর দিয়ে শিল্পকর্ম বৈপ্লবিক হওয়ার সুযোগ থাকে, যা ‘হবেকি’ সিরিজে দৃশ্যমান না। আমরা যেন এগুলো পাঠ করার সময় শ্রেণি বা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হিসেবে ধরে সর্বজনীন প্রকাশ হিসেবে না দেখি সেই সচেতনতা আমাদের দরকার আছে। আমরা আশাবাদী হব যে হবেকির মতোই আমরা ভিন্ন লিঙ্গ ও শ্রেণির গ্রাফিতি আর্টিস্টদেরকেও পাব, যারা তাদের জীবন অভিজ্ঞতাকে গ্রাফিতি শিল্পকর্মে সঞ্চারিত করবে। পুরুষতান্ত্রিক দুনিয়া-কল্পনার বাইরে সেই অভিজ্ঞতার দৃশ্যায়ন নিশ্চয় বৈপ্লবিক হবে।
প্রথম ধারাতে ‘হবেকি’ বা সুবোধ কাউকেই সম্পূর্ণ বন্দি করে ফেলার সুযোগ হয়তো নেই। অন্তত পক্ষে, যতক্ষণ না আমরা বাকি কাজগুলোও দেখছি। যেমন প্রথম দিকের গ্রাফিতিগুলোর মধ্যেই সংখ্যায় কম হলেও, আরেকটা ধারা আছে। ২০১৭ সালেই আগারগাঁও শিশুমেলা রোডে আরেকটা গ্রাফিতি দেখা যায়। যেখানে দুইটা কাক, যেন কোনো কিছুর অপেক্ষায় ওপরে চেয়ে আছে, ওপরে লেখা ‘হবেকি?’

কী হওয়ার অপেক্ষায় তীর্থের কাক হয়ে বসে আছে তারা, তারই একটা নিশানা পাওয়া যায় আবার কাছাকাছি সময়ে আগারগাঁওয়ের এয়ারপোর্ট রোডের দুইটা গ্রাফিতিতে। যার একটাতে আগের মতো সুবোধ খাঁচা হাতে মাটিতে বসে থাকলে তার পাশে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে একটা মেয়ে শিশু, যার পাশে লেখা—‘সুবোধ, কবে হবে ভোর’। অপর গ্রাফিতিটাতে দেখা যায়, আকাশে খাঁচায় বন্দি সূর্য, মাটিতে একটা মোরগ ডেকে যেন ভোরের বার্তা দিচ্ছে।

এ ছাড়াও একই সময়ে আরেকটা গ্রাফিতিতে দেখা যায় সুবোধকে বলা হচ্ছে ‘তবুও সুবোধ রাখিস সূর্য ধরে’। ফলে এক কথায় হবেকি বা সুবোধকে পলায়নপর কিংবা হতাশাবাদী বলার সুযোগ নেই। একটা নতুন ভোরের আকাঙ্ক্ষা তার মাঝে আছে। বরং এই সময় পর্যন্ত, এই দুই ধারাতে বরং যেকোনো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের অন্তর্গত টানাপোড়েনটাই দৃশ্যমান। যার জন্য সময়টা অসহনীয়, তবু সে পালানোর সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান, যে কি না একটা ভোরের অপেক্ষা করে। তবে, আশাবাদ দেখতে পেলেও, এই সময়কাল পর্যন্ত আমরা সুবোধ বা হবেকির মাঝে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রতিবাদী, বিদ্রোহী বা বিপ্লবী কোনো অভিব্যক্তি পাই না।

পরবর্তী পর্বে ২০১৮-এর দিকে হবেকির একটা দেয়াললিখনে আমরা পাই— ‘THE BEAUTIFUL PAINTINGS ARE THOSE WHICH SPEAK OF THE UGLIEST’ কথাটা।

এতে কোনো চিত্র ছিল না। তবে, এই কথার মাঝে কুৎসিত সত্যকে উন্মোচিত করার, পলায়নপর না হয়ে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার একটা তাড়না ‘হবেকি’র মধ্যে দেখা যাবে। চিত্ররূপেও একই সময়কালে ‘This is my Masterpiece’ শিরোনামে একটা গ্রাফিতি দেখা যায়। যা প্রথম ধারাটা থেকে অনেকটাই আলাদা। এতে দেখা যায়, একটা মেয়েশিশু, হয়তো সুবোধকে কবে ভোর হবে জিজ্ঞাসা করা সেই মেয়েটাই, বুকে আঁকড়ে ধরে আছে ফ্রেমে বাঁধাই করা একটা বাংলাদেশের পতাকা। এতে হয়তো বিপ্লব বা বিদ্রোহ সেভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে, একটা শক্ত প্রতিরোধ এখানে আছে। তা বাইরের কোনো শক্তির বিরুদ্ধে না হলেও, হয়তো পলায়নপর আপনার প্রতি। এই দুইটাকে আমরা ‘হবেকি’র সুবোধ সিরিজের দ্বিতীয় ধারারই ধারাবাহিকতা বলতে পারি। আবার একইসাথে, ২০২২ পরবর্তী ধারা দুইটার প্রাথমিক পর্যায় বা পূর্বাভাসও বলতে পারি।
২০১৮ পরবর্তী সময়ে সুবোধ ‘হবেকি’র মাধ্যমে না আসলেও ভক্তদের হাত ধরে অনেকবার এসেছে। বিভিন্ন আন্দোলনেই ভক্তদের মাধ্যমে সুবোধ দেখা দিয়েছে। কেউ বলেছে সুবোধকে ফিরে আসতে দেশকে বাঁচানোর জন্য, কেউ বলেছে সুবোধকে আপস না করতে, কেউ বলেছে সুবোধকে তৈরি হতে, কেউ বলেছে সময়টাকে পক্ষে আনতে, কেউ আবার আন্দোলনে কল্পনা করে নিয়েছে সুবোধও তাদের সঙ্গে রাস্তাতেই আছে। শুধু বাংলাদেশেই না, কলকাতাতেও সুবোধ প্রতিবাদে, আন্দোলনে ভক্তদের মাধ্যমে ফেরত এসেছে অনেকবার। খেয়াল করলে দেখা যাবে হবেকির সুবোধ নিজে যতটুকু প্রতিবাদী, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিবাদী ও ভিশনারি ভক্তদের সুবোধ। যেন বাউল আব্দুল করিমের গানের কথার মতোই ভক্তদের অধীন হয়েই সুবোধ ভক্তদের অন্তরে ঠাঁই পেয়েছে, আরও শক্তিশালী হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পরে, ২০২২ সালে সিলেটে আমরা সুবোধের পরবর্তী পর্বের শুরু দেখি। বিরতি দিয়ে দিয়ে যা ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলমান। এর মাঝে ২০২০ সালে ‘হবেকি’র একটা গ্রাফিতি পাওয়া যায়। যেখানে লুঙ্গি ও মাথাল পরে বালক কিউপিড বা ফেরেশতা হাতে রঙের রোলার ব্রাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাশে লেখা ‘HOBEKI IS THE ANSWER’। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো গ্রাফিতি এ সময়ে হবেকি করেছে বলে আমার জানা নেই।

২০২২ পরবর্তী পর্বে, আমরা খেয়াল করলে দুইটা প্রধান ধারা দেখতে পাব। এর একটা ধারাতে নতুন যে আমরা বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, তা হলো চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনা বা ইস্যু নিয়ে ভাষ্য। অপর ধারাটাতে আমরা দেখতে পাই দ্ব্যর্থকতা বা অস্পষ্টতার মাধ্যমে অর্থের প্রসারণ। দুইটা ব্যাপারই ‘হবেকি’র কাজে নতুন। ২০২২ পূর্ববর্তী কাজগুলোতে অর্থের জায়গায় দর্শকের জন্য ইন্টারপ্রেটেশনের খুব একটা জায়গা ছিল না। বার্তাগুলো ছিল ডিরেক্ট। যেমন, সময় পক্ষে নেই, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে, কবে হবে ভোর ইত্যাদি। গ্রাফিতি ছিল লেখাপ্রধান, সাথে চিত্রগুলো ছিল সহায়ক। ২০২২-এ সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় দুইটা গ্রাফিতি হয়। এই দুইটা গ্রাফিতিই মূলত পরবর্তী বছরগুলোতে ‘হবেকি’র গ্রাফিতির দুইটা ধারার স্পষ্ট পূর্বাভাস বলা যায়।
একটা গ্রাফিতিতে দেখা যায় একটা অন্ধকার ঘরের জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে একটা হলুদ ফুল দেওয়া হচ্ছে। তা থেকে একটা পাপড়ি ঝরে যাচ্ছে। সাথে আর্টিস্ট ট্যাগ ছাড়া আর কোনো টেক্সট নেই। প্রেক্ষাপট ও স্থান বিচার করলে সেই ফুল সমসাময়িক চলমান সাস্ট আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের প্রতি তা অনুমান করা যায়। অথবা হয়তো অন্ধকার সময়ে সেই আন্দোলন ‘হবেকি’র জন্য আসার আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, তারই চিত্রায়ন।

এর আগেও আমরা অনুরূপ অর্থে দেখেছি হলুদ সূর্যের ব্যবহার। তবে, অর্থ যেটাই হোক, মূল লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে টেক্সট ছাড়া শুধু ইমেজপ্রধান এই গ্রাফিতি, যা দর্শকের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, ‘হবেকি’র কাজে এটা প্রায় নতুন বলা যায়। ২০২২ পূর্ববর্তী সময়ে শুধু দুইটা কাকের যে গ্রাফিতিটা ছিল সেটাতেই এমন ইমেজের প্রাধান্য ও দর্শকের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ছিল। একই সময়ের অপর গ্রাফিতিটাতে দেখা যায় সুবোধ অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বলমুখে টেলিফোনে কথা বলছে।
এর আগের কোনো গ্রাফিতিতে আমরা সুবোধকে হাসতে দেখিনি। গ্রাফিতির সামনে দাঁড়ালে অনুমান করা যায় সাস্টের প্রতিরোধই ছিল সুবোধের আনন্দের কারণ। এটাতেও আর্টিস্ট ট্যাগ ছাড়া কোনো লেখা নেই, চিত্রপ্রধান। প্রথমবারের মতো এই গ্রাফিতি দুইটা ছিল চলমান কোনো ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। যেখানে ‘হবেকি’ ঘটমান মুহূর্তের সামাজিক-রাজনৈতিক ভাষ্যই করছে। এই দুইটা কাজেই আমরা দেখতে পাই সুবোধের আশাবাদী রূপ, বাস্তব প্রতিবাদের সাথে সংহতি প্রকাশ এবং নতুন রকমের কর্তাসত্তার প্রয়োগ।
এই সময়ে আরেকটা শিল্পকর্ম ডিজিটাল ভার্সনে পাওয়া যায়, যেটা তখনো কোনো ওয়ালে করা হয়নি (বছর কয়েক পরে এটা দেয়ালে করা হবে)। সম্ভবত সেটা অপর দুইটা শিল্পকর্মের আগেই ‘হবেকি’ অনলাইনে পোস্ট করেছিল আন্দোলনের সাথে সংহতি জানিয়ে। যেখানে সুবোধ একটা চেয়ারকে লাথি মেরে উল্টে দিচ্ছে। অর্থাৎ এই পর্যায়ে সুবোধ আর প্যাসিভ বা পলায়নপর না। তার প্রকাশও কেবল ক্ষোভ বা অভিমান আশ্রিত না। বরং বৈপ্লবিক না হলেও তাতে প্রতিরোধের সাথে স্পষ্ট সংহতি আছে। এটা প্রথম পর্বের দ্বিতীয় ধারাটার আরও পরিণত রূপ বলা যায়।

২০২২-এই আরও দুইটা গ্রাফিতি মিরপুরে দেখা যায়। মিরপুর সিরামিকসের দেয়ালে। সম্পূর্ণ কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপরে একচোখে নীল কালশিটে পড়া আহত এক নারী, দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানাচ্ছে (Mute sign-কে Unmute করার মাধ্যমে)। নারীর খোলা চুলে একটা ফুলও শোভা পাচ্ছে। পাশে হবেকি ট্যাগের ওপরে লেখা “#STOP WAR”। এটা নতুন পর্বের সামাজিক-রাজনৈতিক ভাষ্যের ধারারই কাজ।
সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে এটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কেন্দ্র করে আঁকা। যদিও, পরে ‘হবেকি’ নিজেই চিঠির মাধ্যমে একরকমের ব্যাখ্যা দিয়েছে, তবু আলাদাভাবে অনুমানগুলো উল্লেখ করার কারণ- গ্রাফিতিগুলোর সামনে দাঁড়ালে দর্শক সাধারণত সমসাময়িক ঘটনাবলি ও অভিজ্ঞতা থেকেই পাঠ করে, তাই।
এটাই হবেকির প্রথম কাজ যেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতি কেন্দ্র করে। এই গ্রাফিতিটা ঠিক লেখা-প্রধান নাকি চিত্র-প্রধান তা নির্ধারণ করা যায় না। যদিও এতে সরাসরি যুদ্ধ থামানোর কথাটা লেখা আছে, কিন্তু ইমেজেও সেই যুদ্ধ থামানোর কথাটার সৃজনশীল দৃশ্যায়ন আছে। ইমেজটাকে আগের অনেক কাজের মতোই শুধু টেক্সটের সহায়ক বলা যাবে না। কিছুটা ইন্টারপ্রেটেশনের বা অনুসন্ধানের সুযোগ আছে দর্শকের জন্য। তবে ‘হবেকি’ শিল্পী আবার একটা ফ্যানপেজের কাছে লিখিত বার্তা দেওয়ার মাধ্যমে যতটুকু ইন্টারপ্রেটেশনের জায়গা ছিল তা অনেকটাই খোলাসা করে দিয়েছিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘মিরপুরের ছবিটা মূলত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হলেও, সেটা আমি মূলত ধর্ষণের জন্যে এঁকেছিলাম। পরে চোখে ব্ল্যাক কালার বসিয়েছি। কিছু চেঞ্জ করেছি আরকি। এটা যেকোনো সহিংসতাকে বোঝাতে পারে। আনমিউট করছে। শব্দ করতে চাইছে। প্রতিবাদ এবং ফুল আছে। ব্ল্যাক খারাপ সময়কে বোঝাচ্ছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদকে বোঝাচ্ছে, অস্থির সময়কে বোঝাচ্ছে। বোমারু বিমানগুলো আর ড্রোন রাতে আক্রমণ করে। সারা বিশ্বের যুদ্ধাবস্থার বিরুদ্ধে আঁকা বলা যেতে পারে। ইউক্রেনের কিয়েভের একটা ভাস্কর্য আছে, সেটাও বলতে পারেন, আবার গডেস অব আনমিউটও বলতে পারেন। এটার বহু ইন্টারপ্রেটেশন আছে। আমি একক অর্থ দিয়ে খোলাসা করি না। এটাই আমার ধারণা, আমার ব্যাখ্যা।’ যদিও, গ্রাফিতিতে যুদ্ধ থামাও হ্যাশট্যাগ দেওয়া এবং মেসেজে আর্টের ব্যাখ্যা দেওয়ার পরে দর্শকের ইন্টারপ্রেটেশনের আর কতটুকু সুযোগ থাকে সেটা একটা প্রশ্ন।
এ সময়ে ‘হবেকি’র আরেকটা জনপ্রিয় গ্রাফিতি ‘বেকারের জীবনডাটা’। এটার অবস্থানও মিরপুরে। সাথে একটা কিউআর কোড, যেখানে কবিতার আকারে একজন বেকারের গ্লানি ও দুর্দশার বর্ণনা। এটাতে একইসাথে প্রথম পর্বের প্রথম ধারার ডিরেক্ট টেক্সটের মাধ্যমে হতাশাবাদী, প্যাসিভ ও অভিমানী বার্তার প্রবণতাটা আছে, আবার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম ধারার সামাজিক ধারাভাষ্যের প্রবণতাও আছে, অর্থাৎ, চলমান তীব্র বেকারত্বের সমস্যাটা কোন রূপক ছাড়াই তুলে আনা। এখানে গ্রাফিতিটাতে আরও দুইটা বিষয় খেয়াল করার আছে। এক হলো, বেকারের জীবনডাটার আর্ট মিডিয়াম আগের মতো স্টেনসিলের ওপর স্প্রে পেইন্ট হলেও, আর্ট স্টাইল বদলে গেছে। ফ্রি হ্যান্ড স্টাইলে নেই, যেমনটা হাতে আঁকা ড্রয়িং স্টেন্সিলের জন্য কাটলে হয়। এই ফিগার অ্যানাটমিক্যালি আরও রিয়ালিস্টিক, ডিজিটাল আর্ট প্রভাবিত, যান্ত্রিক।
আগের ‘হবেকি’র আগের আর্ট স্টাইলের ধারাবাহিকতা এটা না। যেখানে সুবোধের ফিগার এনাটমিক্যালি অতোটা কারেক্ট করার প্রবণতা ছিল না, সুবোধের ফিগার ছিল এক্সপ্রেসিভ ঘরানার। আমার অনুমান, এই সময় শিল্পী লেআউট বা স্কেচ করতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ফটোশপের সহায়তা নেওয়া শুরু করেছেন। সেগুলোই প্রিন্ট করে কেটে স্টেন্সিল বানিয়েছেন। এই আর্ট স্টাইলের ধারাবাহিকতা আমরা সামনে দেখতে পাব। মিরপুরের দুইটা গ্রাফিতিরই ক্ষেত্রে আরেকটা খেয়াল করার বিষয় হলো, এই দুইটা সুবোধকে কেন্দ্র করে নয়। এরও ধারাবাহিকতা আমরা সামনে আরও দেখতে পাব।

এরপর আবার বিরতি দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১৮ তারিখ অনলাইনে আরেকবার সুবোধের দেখা পাওয়া যায়। যেখানে ২০২২-এর গদিতে লাথি মারার ছবিটার একটা গ্রাফিক ফাইল হবেকি শেয়ার করে এবং ভক্তদেরকে উদ্দেশ্য করে জানান কীভাবে সেটা ব্যবহার করে দেয়ালে গ্রাফিতি করা যাবে।

আগস্টের ৫ বা ৬ তারিখে ঢাবি টিএসসির পাশে সুবোধের গ্রাফিতিটা দেখা গিয়েছিল, সেটা মূলত এই লেআউট থেকেই করা। তবে তা হুবহু নয়। ঢাবির গ্রাফিতিটাতে দেখা যায় সুবোধের নিজের মাথাতেই মুকুট। অনুমান করা যায়, জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাকে পিপলের ক্ষমতায়ন হিসেবে হবেকি সুবোধের মাথায় এই মুকুট পরিয়েছিল। এটার ড্রয়িং স্টাইল হবেকির পূর্বপরিচিত ফ্রি হ্যান্ড আঁকা এক্সপ্রেসিভ ফর্মে ছিল। শুধু মুকুটটা দেখে বোঝা যায় ডিজিটাল কোনো আইকন থেকে সেটা করা। প্রতিরোধ ও বিদ্রোহী মনোভাব এই কাজটাতে লক্ষ করা যায় সহজেই। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সুবোধের মাথায় মুকুটকে জনগণের মাথাতেই মুকুট হিসেবেও পাঠ করা সম্ভব। তবে জুলাইয়ে ঘটে যাওয়ার পরে এই গ্রাফিতি যতটা না আহ্বান ছিল, তার চেয়ে বেশি ঘোষণাই ছিল। এতে বিদ্রোহী চেতনা আছে নিঃসন্দেহে। এবং প্রথমবারের মতো হয়তো হবেকির কোনো গ্রাফিতি ছিল এটা, যেখানে খুঁজলে বৈপ্লবিক চেতনাও কিছু মাত্রায় পাওয়া যাবে।

এরপর, ২০২৫-এ চট্টগ্রামে দুইটা গ্রাফিতি দেখা যায়। এর মাঝে একটা বাদশা মিয়া লেনে, যেটা মূলত সিলেটের সেই হলুদ ফুলের গ্রাফিতিটারই একটা নবায়িত রূপ।

অপরটা চট্টগ্রামের সিআরবির শিরীষতলায়। ২০ ফুট লম্বা আর প্রায় ১২ ফুট উঁচু সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া দেয়ালে দেখা যায়, গাধার পিঠে বসে গালে হাত দিয়ে বসে আছে ফরাসি ভাস্কর অগুস্ত রোঁদ্যার ‘দ্য থিংকার’ ভাস্কর্যের অনুরূপ এক ভাবুক।

সম্ভবত হবেকি সিরিজের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও ভাবনা-উদ্রেককারী কাজ এটাই। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা বেশ ‘ওপেন টু ইন্টারপ্রেটেশন’ শিল্পকর্ম ছিল। দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় ধারার ধারাবাহিকতা এটা। বাদশা মিয়া লেনের কাজটাও সেই দিকেই নির্দেশ করে। এটাতেও ‘হবেকি’ ট্যাগ থাকলেও সুবোধ উপস্থিত নেই। সাথে কোনো টেক্সটও নেই। আর্ট স্টাইলের দিক থেকে এটাও এক্সপ্রেসিভ ফর্মের হাতে আঁকা স্টাইলের না। মনে হচ্ছে, লেআউট এআই দিয়ে জেনারেট করা বা ডিজিটালি ফটো কোলাজ করা, ফটোশপে দুই কালারে রূপান্তর করা হয়েছে।
দীর্ঘকাল প্রথাগত ও ডিজিটাল মিডিয়ামে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই এই অনুমান। তবে ভুলও হতে পারে। পর্যবেক্ষণ হিসেবে বলা। আমার কাছে মনে হয়েছে এই যে শিল্পীর স্বকীয় এক্সপ্রেসিভ ফর্ম ও স্টাইল ছেড়ে সিনথেটিক, মেকানিক্যাল, জেনারেটেড ফর্ম ও স্টাইলের দিকে যাওয়া, এটা হবেকি সিরিজের শিল্পকর্মগুলোর মাধ্যমের রাজনীতি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ সুতা হতে পারে। শিল্পী তার স্টাইল বদলানোর কারণে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্কের ধরণে কোন পরিবর্তন এসেছে কি না, সেটাও অনুসন্ধান করা যেতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের জন্য উল্লেখ রাখা।
এই কাজটার মধ্যে আমার মতে স্যাটায়ার আকারে কিছুটা বৈপ্লবিক চেতনা আছে। এমনকি তা জুলাই- আগস্টের লাথি মেরে চেয়ার ভেঙে ফেলার শিল্পকর্মটার চেয়ে অন্তত বেশি মাত্রায়। কারণ, যখন চেয়ারটা ভেঙে ফেলাই যখন সাধারণ প্রবণতা, বা ইতোমধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়েছে, তখন চেয়ার ভাঙাকে চিত্রায়িত করার মাঝে বিদ্রোহী চেতনা থাকলেও তাকে খুব একটা বৈপ্লবিক বলা যায় না। তবে একটা গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যখন চিন্তকেরা চিন্তার ভারে অচল হয়ে যাচ্ছে, ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হয়ে অথর্ব হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, তখন তাদেরকে একটু গাধার পিঠে চড়ানোর মাধ্যমে যদি প্রশ্ন করা যায় তবে তা একটা মাত্রায় অবশ্যই বৈপ্লবিক।
এই শিল্পকর্মটিতে আরেকটি খেয়াল করার বিষয় হলো ইউরোকেন্দ্রিক প্রতীকের ব্যবহার। এর আগেও আমরা হবেকির কাজে ইউরোকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতীক বা অনুপ্রেরণা দেখেছি। যেমন কিউপিড বা কিয়েভের মাদার ইউক্রেন ভাস্কর্য। লুঙ্গি ও মাথাল মাথায় কিউপিডের একটা দেশি রূপও আমরা দেখেছিলাম। পশ্চিমা আর্ট ক্যাননের ইনফ্লুয়েন্স হবেকির কাজে যে আছে তা স্পষ্টই। দেশীয় প্রতীক ও পুরাণ আশ্রয় করে নিজস্ব দৃশ্য-ভাষার পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমরা যদি বাংলাদেশের গ্রাফিতি সংস্কৃতিতে দেখতে পেতাম, সেটা বাংলাদেশের আর্টে একটা বৈপ্লবিক ঘটনা হতে পারতো। যার কিছুটা লক্ষণ আমরা জুলাইয়ের গণ-গ্রাফিতি-চর্চায় দেখেছি।

২০২৫-এর ডিসেম্বরেই আগারগাঁওয়ে ‘হবেকি’র আরেকটা গ্রাফিতির দেখা পাওয়া যায়। একজন যোদ্ধা, অস্ত্রের বদলে তার কোমরে রঙের ব্রাশ, হাঁটু গেড়ে বসে শিশুকে আলিঙ্গন করছে। শিশুর মাথায় যোদ্ধাদের হেলমেট এবং হাতে বাংলাদেশের পতাকা। বিজয় দিবস উপলক্ষেই এই গ্রাফিতি। আর্ট স্টাইলের দিক থেকে এটাও ডিজিটাল আর্ট প্রভাবিত ধারারই। সেসময়ে বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলমান নানান বিতর্কে হবেকির রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রকাশ হিসেবে এটাকে ধরা যায়।
২০২৬-এ দুইটা গ্রাফিতি পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত। প্রথমটা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে আগারগাঁও পুরান এয়ারপোর্ট এলাকায়। সেখানে দেখা যায়, সুঠামদেহী সুবোধ লাফ দিয়ে মিসাইল ধরে থামিয়ে দিচ্ছে। আর্ট স্টাইলের দিক থেকে এটাও রিয়ালিস্টিক ঘরানার, ডিজিটাল মিডিয়া প্রভাবিত। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটা রাজনৈতিক ধারাভাষ্যের মধ্যে পড়ে। বলা যায়, আগের যুদ্ধবিরতি গ্রাফিতির ধারাবাহিকতা। আর্ট স্টাইলের মতো বিষয়বস্তুর জায়গাতেও এই ধারাটা অত্যন্ত গতানুগতিক ও ভাসাভাসা মাত্রার। কোন পক্ষ যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, আর কোন পক্ষ বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করছে তার কোনো ভেদাভেদ নেই। ফলে লিবারেল হিউম্যানিজমের এই পিস অ্যাক্টিভিস্ট ধারাটা বৈপ্লবিক তো নয়ই, বরং তার বিপরীত কিছুই বলা চলে। এই চিন্তাপদ্ধতি কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবির বদলে মানবিক আবেদন করে, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার বিরোধিতা করে না, বরং তার সীমার মধ্যে যুদ্ধবিরতি চায়, যেখানে শান্তি মানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তির স্বার্থে প্রতিরোধ না করা। এরমানে এই না যে শিল্প হিসেবে তার সার্থকতা শুধু বার্তার কারণে কমে যাবে। তবে বার্তাটা যে বৈপ্লবিক না, সেটাই লক্ষ্য করার বিষয়।

তবে এরপরের গ্রাফিতিটাই, অর্থাৎ, বহুল আলোচিত ২০২৬-এরই জুন মাসে ইন্ডিয়ার সিকিমে করা গ্রাফিতিটাই আবার স্টাইল ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এতে আবার আমরা সেই আগের পরিচিত হাতে আঁকা, অনেকটা এক্সপ্রেসিভ ফর্মের সুবোধকেই দেখতে পাই। তার হাতে ওয়্যার কাটার, সে ঝুলে আছে কাঁটাতার দিয়ে বানানো একটা হ্যামকে। মাটিতে একটা বালতি। সাথে শুধু ‘হবেকি’ আর্টিস্ট ট্যাগ। আর কোনো টেক্সট নেই।
বৈশিষ্ট্য দেখলে আমরা এটা দ্বিতীয় পর্বের টেক্সটবিহীন, কিছুটা ইনডিরেক্ট, দর্শকের ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ধারার হিসেবেই ধরতে পারি। অনুমান করা যেতে পারে যে রাষ্ট্রের সীমানাকে সুবোধ চ্যালেঞ্জ করছে। সুবোধ যদি এখানে শুধু বাংলাদেশ বা ইন্ডিয়ার সীমানা শুধু না, সরাসরি রাষ্ট্রের ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসে, তবে তাকে বৈপ্লবিক না বলে উপায় থাকে না। আবার প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অংশের উভয়েরই যেহেতু বিভিন্ন কমন স্ট্রাগল আছে, সংহতির জায়গা আছে, সেটাকেও যদি ইন্ডিকেট করতে চায় তবে তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তার মাঝে প্রতিরোধ তো অবশ্যই, বৈপ্লবিক উপাদানও পাওয়া যাবে। তবে, কাজটি যে অতিমাত্রায় ওপেন টু ইন্টারপ্রেটেশন, এটাও খেয়াল করার বিষয়। ‘হবেকি’র সমসাময়িক স্পষ্ট লিবারেল হিউম্যানিজম প্রভাবিত অন্যান্য গ্রাফিতি গুলো বিবেচনায় রাখলে এই গ্রাফিতিটির বৈপ্লবিক ইন্টারপ্রেটেশনের সম্ভাবনা অনেকটা কমিয়ে দেয়।

সামগ্রিকভাবে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমরা যদি ‘হবেকি’র উল্লেখযোগ্য কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখি, তবে তার মাঝে পরিণত, বিকশিত ও রূপান্তরিত হওয়ার একটা যাত্রা দেখতে পাই। তার দিক নির্ধারণে নিঃসন্দেহে দর্শক ও ভক্তদের অবদান আছে। আমি এখানে হবেকি বা সুবোধের অন্তরালে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আছে তার বা তাদের কথা বলছি না। বরঞ্চ, প্রতিবার হবেকির কোন গ্রাফিতির সামনে দাঁড়ালে সুবোধ ও অন্যান্য যেসকল চরিত্রের সামনে আমরা দাঁড়াই, গ্রাফিতিগুলোর লেখার মধ্য দিয়ে যেই কথক বা ওরেটর আমাদের সাথে কথা বলে, তার বা তাদের যাত্রাটার কথা বলছি। শুরুতে যে ছিল একেবারেই অভিমানী, হতাশাগ্রস্ত, দ্বিধাগ্রস্ত, পলায়নপর, প্যাসিভ বা কর্তাসত্তাহীন, সে কিছুদিনের মাঝেই ভোরের খোঁজ করছে। যে ছিল সমাজবিচ্ছিন্ন, সে দেশের নানান প্রতিরোধে সরাসরি যোগ দিচ্ছে। সম্পূর্ণ আবেগনির্ভরতা থেকে সে এমন বিষয়বস্তুর দিকে শিফট করছে, যা দর্শককে কোনো সিদ্ধান্ত না, বরং নিজের সময়টাকে নিয়ে গভীর ভাবনা ও প্রশ্নের দিকে তাড়িত করে। আবার এই রূপান্তর সরলরৈখিকও না। সেই একই শিল্পী আবার এক কথায় 'যুদ্ধ থামাও' টাইপের অগভীর ও স্থূল প্রপাগান্ডা ট্র্যাপেও পা দিয়ে সেগুলো রিসার্কুলেটও করছে।
হবেকি বা সুবোধকে কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়নের চেষ্টা এই লেখায় করলাম। হবেকির সুবোধ সিরিজ সমসাময়িক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অন্তত পক্ষে, আমাদের মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে। তাই, হবেকি ডিজার্ভ করে যে আমরা তাকে গুরুত্ব দিয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠ করব। সেই পাঠ শুরু করার একটা চেষ্টা এই লেখায় আমি করেছি। নিশ্চয়, পাঠকরাও এই উছিলায় তাদের নিজ নিজ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চেষ্টা করবেন।
শুরুটা করেছিলাম, ‘হবেকি’ বা সুবোধ কি বৈপ্লবিক কি না, সেই প্রশ্ন দিয়ে। কারণ, এই প্রশ্নের গুরুত্ব আমার কাছে এতটুকুই যে, যতদিন আমরা কোনো শিল্পী বৈপ্লবিক হওয়ার আগেই তাকে বিপ্লবী বলে আখ্যায়িত করব, তা যতই ভালোবাসা থেকে হোক না কেন তা তার এবং অন্যান্য শিল্পীর বৈপ্লবিক হওয়ার পথে বাধাই তৈরি করবে। আমার সিদ্ধান্ত হলো, হবেকি+সুবোধের গ্রাফিতিগুলোর দৃশ্য ও লেখার বিষয়বস্তু ও বক্তব্য 'বৈপ্লবিক' হওয়ার শর্ত যথেষ্ট মাত্রায় পূরণ করে না। এই ধারাবাহিক সিরিজে সাম্প্রতিক সময়ে বৈপ্লবিক উপাদান সমেত কয়েকটা কাজ হাজির হয়েছে। তবে, সামগ্রিক কাজের যেই প্রবণতা, তাকে এই অল্প সংখ্যক সাম্প্রতিক কাজ অফসেট করতে পারে না। বৈপ্লবিক হিসেবে সিদ্ধান্ত দিতে গেলে বৈপ্লবিক উপাদান বিশিষ্ট কাজগুলোর আরো ধারাবাহিকতা প্রয়োজন রয়েছে। আশা করি ‘হবেকি’ ও সুবোধ যাত্রা চলমান রাখবে। ‘হবেকি’ ও সুবোধের জন্য শুভকামনা।
.png)

মিম কালচারে বিটলসের ড্রামার রিঙ্গো স্টাররে নিয়া মজার একটা লাইন আছে। লাইনটা হইল—‘রিঙ্গো ওয়াজ নট ইভেন দ্য বেস্ট ড্রামার ইন দ্য বিটলস।’ আমার কাছে মনে হয়, পপ কালচারের সবচেয়ে ক্লিশে জিনিসটা হইলো, পপ কালচার সবসময় ‘ফ্রন্টম্যান’ আর ‘মাস্টারমাইন্ড’ ন্যারেটিভ সেল করতে পছন্দ করে।
০৭ জুলাই ২০২৬
একটা বাংলা সিনেমা তৈরি হইছে আর এই জন্য সারাদেশ থিকা ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষেরা শহরে ভিড় করতে শুরু করছেন। সিনেমা হল খুঁজতেছে সবাই, সিনেমা দেখবে। কেউ কেউ তো কাঁথা বালিশও নিয়া আসছেন। শুয়ে পড়ছেন সিনেমা হলের গেটে। সকাল সকাল টিকেট পাইতে হবে, যদি টিকেট শেষ হইয়া যায়। গ্রামেও এই সিনেমার ক্রেজ ছড়ায় পড়ছে।
০৫ জুলাই ২০২৬
গতকাল ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ এক ‘সৃজনশীল’ কাজের দেখা পেলাম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩ সালের যুগান্তকারী কালি-কলমে আঁকা দুর্ভিক্ষ সিরিজকে তুলে আনা হয়েছে নেকলেসে। ক্লে-এর ওপর অ্যাক্রিলিকে আঁকা, তাতে রেজিনের প্রলেপ, আর সঙ্গত দিচ্ছে কাঠের পুঁতি। আজকের পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এ অবশ্য নতুন কিছু
০২ জুলাই ২০২৬
হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন সেই ২০১২ সালে। কোনো রাইটার মইরা যাওয়ার পরে ইউজুয়ালি তার লিটারেরি জনরার সার্কুলেশনে একটা ন্যাচারাল ডিজরাপশন আসে। কিন্তু মারা যাওয়ার ১৪ বছর পরেও দেখা যাইতেছে, বাংলাদেশের কালচারাল পেরিফেরিতে 'হুমায়ূনীয়' লিটারেরি জনরার সার্কুলেশন বহাল তবিয়তেই আছে।
২৩ জুন ২০২৬