রাহাত মিনহাজ

ইন্টারনেট আধিপত্যের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, কুৎসা, ঘৃণা বাক্য, চরিত্রহনন, গুজব, ভুয়া খবর, ডিপ ফেক, চিপ ফেক কনটেন্ট প্রকাশ করে কারও ভাবমূর্তি নষ্ট, চাকুরি এবং রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস নতুন কিছু নয়। এমনকি ব্যক্তিগত তথ্য (অডিও, ভিডিও, ছবি) প্রকাশ করে একজন নাগরিককে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ারও উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্প গণমাধ্যম সাক্ষরতার দেশে এসব ঘৃণ্য অপরাধের প্রবণতা বেশি। এছাড়া সার্বিকভাবে বাংলাদেশের সামাজিক সমীকরণও জটিল-কুটিল ও প্রতিশোধপরায়ণ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান নির্বাহীর কন্যাকে নিয়ে অনলাইনে ঘৃণ্য ও কুৎসিত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়তেও আমরা দেখেছি। এছাড়া প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী, শিশু, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, রাজনীতিবিদ, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ও অফিসার, এমনকি অতি সাধারণ নাগরিক নানাভাবে হয়রানি, মানহানির শিকার হচ্ছেন। এই প্রবণতা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। এটা বাস্তবতা।
অনলাইন পরিসরের এই ধরনের অপরাধ রোধে আইনের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ধরনের অপরাধ দমনে শক্ত আইনী কাঠামো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই ধরনের অপরাধ দমনের জন্য আইন করা হলেও বাংলাদেশে সবসময়ই এসব আইন প্রয়োগ করা হয়েছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি ও ভিন্ন মত দমনে। মুক্তমনের, মুক্তচিন্তার মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করতে। যে ভীতিকর প্রবণতা বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চার বদলে শক্তিশালী করেছে কর্তৃত্বপারয়ণ শাসনব্যবস্থা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরেকটু বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা যাক। অপতথ্য, অর্ধ-সত্য তথ্য, গুজব, ফেক নিউজ, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, ডিপ ফেক ভিডিও কারা ছড়ায়?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন পরিসরে এই ধরনের তথ্য ক্ষমতাসীন, ক্ষমতাহীন, ষড়যন্ত্রকারী, পেশাদার অপরাধী, অপেশাদার, সাধারণ নাগরিক সবাই ছড়ায়। লক্ষ্য নিজের স্বার্থসিদ্ধি করা। কিন্তু এইসব অপরাধের শাস্তি কারা পান? কোনোদিন শুনেছেন ক্ষমতাকাঠামোর সমর্থক, ক্ষমতাসীনদের বয়ান প্রচার ও প্রতিষ্ঠাকারী অথবা সরকার-সংশ্লিষ্ট কেউ অপতথ্য ছড়ানোর জন্য শাস্তি পেয়েছেন? অথবা কোনো জবাবদিহির সম্মুখীন হয়েছেন।
শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনামলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০১৩ (সংশোধিত), ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ কার্যকর ছিল। একবার খেয়াল করে দেখুন তো আওয়ামী লীগ আমলে যারা দিনরাত ফেসবুক ও টেলিভিশনের টক শোতে অপতথ্য, অর্ধ-সত্য তথ্য এমনকি কুৎসা ছড়িয়েছেন তাঁরা কি কেউ কোনো জবাবদিহি বা বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন? না কখনোই নয়। বরং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও অপরাধকে জায়েজ করতে মিথ্যা বলে, মিথ্যা বয়ান হাজির করে, ক্ষমতা কাঠামোর পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে তাঁরা পুরস্কৃত হয়েছেন। পদ-পদবী বাগিয়েছেন। আর বিপরীতে স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়েছে মুক্তমত ও বাকস্বাধীনতা।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। একজন ব্যাংক লুটেরার বিরুদ্ধে আঁকা একটি কার্টুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন লেখক মোশতাক আহমেদ। এ ‘অপরাধে’ শেখ হাসিনার র্যাব কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও লেখক মোশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিল। যার ধকল সহ্য করতে না পেরে ২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন লেখক মোশতাক আহমেদ।
একটু মনে করিয়ে দেই—এই দুই ভিন্নমতের অধিকারকর্মীকে আটক করা হয়েছিল কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। শুধু অধিকারকর্মীই নন, ভিন্নমত ও ভিন্নচিন্তার শিক্ষার্থীরাও বাদ যাননি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরাকে কারারুদ্ধ করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। খাদিজাতুল কুবরাসহ অন্যান্য ঘটনায় সেসময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য বৈশ্বিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। তৈরি হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার বিরোধী জনমত।
এবার আসা যাক, সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করেছিল অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অধ্যাদেশ শেখ হাসিনার দানবীয় আইন কাঠামোর পরিবর্তন করলেও কিছুটা দ্বৈততা তৈরি করেছিল। কিছু অপপ্রয়োগের সুযোগও রেখেছিল। তবে সরকার গঠনের পরপরই সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাশ করে বিএনপি। কিন্তু আবার মাত্র তিন মাসের মধ্যে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যাতে যুক্ত করা হচ্ছে আরও কঠোর সাজার বিধান।
নতুন সংশোধনীতে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর তথ্য—এ চারটি শব্দকে অপরাধের সংজ্ঞায় এনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য সংস্থাকে যুক্ত করা হচ্ছে। (সূত্র: প্রথম আলো, অনলাইন ৩০ জুলাই ২০২৬)
নতুন সংশোধনীতে ঠিক আর কী কী নিবর্তনমূলক ধারা ও শাস্তি যোগ করা হতে যাচ্ছে তা জানতে ৩১ জুলাই শুক্রবার বিকেলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে ঢুকি। কিন্তু সংশোধিত হতে যাওয়া এই আইনের কোনো খসড়া পেলাম না। প্রত্যাশা ছিল পাশ হওয়ার আগে সংশোধনী প্রস্তাবগুলো একটু পড়ে দেখার। কিন্তু সে সুযোগ হলো না।
একটা নির্বাচিত সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্য নতুন আইন করবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আইনটির ধারাগুলো যদি নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে, মানুষের মুক্তমত প্রকাশে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে থাকে তাহলে অবশ্যই সেটা নিয়ে আপত্তি উঠবে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এই আইন কার্যকরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য সংস্থা হিসেবে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) ঠিক কোন পরিসরে কোন পরিপ্রেক্ষিতে আইনটির প্রয়োগ করবে সেটা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া সাজা ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কতটা সংবিধানের চেতনাসমৃদ্ধ—তাও বিবেচনার প্রয়োজন আছে। এছাড়া গুজবের সংজ্ঞা, অপতথ্য, ভুয়া ভিডিও, অডিও, বিভ্রান্তিকর ছবি নিয়েও আলোচনা ও পর্যালোচনা করার দরকার আছে। হয়তো সরকার ভেতরে ভেতরে এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রকাশ্যে হলে ভাল হতো।
আইনের প্রধান লক্ষ্য জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বিপর্যয়টি ঘটে প্রয়োগের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বেশির ভাগ আইন প্রয়োগ করা হয় সরকারের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বা দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। অনেক ক্ষেত্রে আইন হয়ে ওঠে মুক্তমত প্রকাশের প্রতিবন্ধক ও নিপীড়নের হাতিয়ার। সম্ভাব্য সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইনে ঠিক কি পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে আর এর প্রয়োগ ঠিক কীভাবে হতে যাচ্ছে সেদিকে নজর থাকবে অনেকের। কারণ এর সাথে মানুষের সার্বজনীন অধিকার—মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতাও যুক্ত।
আশা করি, সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইন জনবান্ধব হবে, আইনের প্রয়োগ হবে যথাযথ। হবে মুক্তমত প্রকাশের সহায়ক। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা ও নিকট অতীত নিঃসন্দেহে কলঙ্কজনক—সে কারণেই, সিঁদুরে মেঘ বা রক্তবর্ণের মেঘ দেখলে সবাই ভীত হয়।

ইন্টারনেট আধিপত্যের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, কুৎসা, ঘৃণা বাক্য, চরিত্রহনন, গুজব, ভুয়া খবর, ডিপ ফেক, চিপ ফেক কনটেন্ট প্রকাশ করে কারও ভাবমূর্তি নষ্ট, চাকুরি এবং রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস নতুন কিছু নয়। এমনকি ব্যক্তিগত তথ্য (অডিও, ভিডিও, ছবি) প্রকাশ করে একজন নাগরিককে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ারও উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্প গণমাধ্যম সাক্ষরতার দেশে এসব ঘৃণ্য অপরাধের প্রবণতা বেশি। এছাড়া সার্বিকভাবে বাংলাদেশের সামাজিক সমীকরণও জটিল-কুটিল ও প্রতিশোধপরায়ণ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান নির্বাহীর কন্যাকে নিয়ে অনলাইনে ঘৃণ্য ও কুৎসিত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়তেও আমরা দেখেছি। এছাড়া প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী, শিশু, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, রাজনীতিবিদ, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ও অফিসার, এমনকি অতি সাধারণ নাগরিক নানাভাবে হয়রানি, মানহানির শিকার হচ্ছেন। এই প্রবণতা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। এটা বাস্তবতা।
অনলাইন পরিসরের এই ধরনের অপরাধ রোধে আইনের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ধরনের অপরাধ দমনে শক্ত আইনী কাঠামো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই ধরনের অপরাধ দমনের জন্য আইন করা হলেও বাংলাদেশে সবসময়ই এসব আইন প্রয়োগ করা হয়েছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি ও ভিন্ন মত দমনে। মুক্তমনের, মুক্তচিন্তার মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করতে। যে ভীতিকর প্রবণতা বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চার বদলে শক্তিশালী করেছে কর্তৃত্বপারয়ণ শাসনব্যবস্থা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরেকটু বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা যাক। অপতথ্য, অর্ধ-সত্য তথ্য, গুজব, ফেক নিউজ, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, ডিপ ফেক ভিডিও কারা ছড়ায়?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন পরিসরে এই ধরনের তথ্য ক্ষমতাসীন, ক্ষমতাহীন, ষড়যন্ত্রকারী, পেশাদার অপরাধী, অপেশাদার, সাধারণ নাগরিক সবাই ছড়ায়। লক্ষ্য নিজের স্বার্থসিদ্ধি করা। কিন্তু এইসব অপরাধের শাস্তি কারা পান? কোনোদিন শুনেছেন ক্ষমতাকাঠামোর সমর্থক, ক্ষমতাসীনদের বয়ান প্রচার ও প্রতিষ্ঠাকারী অথবা সরকার-সংশ্লিষ্ট কেউ অপতথ্য ছড়ানোর জন্য শাস্তি পেয়েছেন? অথবা কোনো জবাবদিহির সম্মুখীন হয়েছেন।
শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনামলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০১৩ (সংশোধিত), ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ কার্যকর ছিল। একবার খেয়াল করে দেখুন তো আওয়ামী লীগ আমলে যারা দিনরাত ফেসবুক ও টেলিভিশনের টক শোতে অপতথ্য, অর্ধ-সত্য তথ্য এমনকি কুৎসা ছড়িয়েছেন তাঁরা কি কেউ কোনো জবাবদিহি বা বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন? না কখনোই নয়। বরং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও অপরাধকে জায়েজ করতে মিথ্যা বলে, মিথ্যা বয়ান হাজির করে, ক্ষমতা কাঠামোর পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে তাঁরা পুরস্কৃত হয়েছেন। পদ-পদবী বাগিয়েছেন। আর বিপরীতে স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়েছে মুক্তমত ও বাকস্বাধীনতা।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। একজন ব্যাংক লুটেরার বিরুদ্ধে আঁকা একটি কার্টুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন লেখক মোশতাক আহমেদ। এ ‘অপরাধে’ শেখ হাসিনার র্যাব কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও লেখক মোশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিল। যার ধকল সহ্য করতে না পেরে ২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন লেখক মোশতাক আহমেদ।
একটু মনে করিয়ে দেই—এই দুই ভিন্নমতের অধিকারকর্মীকে আটক করা হয়েছিল কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। শুধু অধিকারকর্মীই নন, ভিন্নমত ও ভিন্নচিন্তার শিক্ষার্থীরাও বাদ যাননি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরাকে কারারুদ্ধ করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। খাদিজাতুল কুবরাসহ অন্যান্য ঘটনায় সেসময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য বৈশ্বিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। তৈরি হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার বিরোধী জনমত।
এবার আসা যাক, সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করেছিল অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অধ্যাদেশ শেখ হাসিনার দানবীয় আইন কাঠামোর পরিবর্তন করলেও কিছুটা দ্বৈততা তৈরি করেছিল। কিছু অপপ্রয়োগের সুযোগও রেখেছিল। তবে সরকার গঠনের পরপরই সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাশ করে বিএনপি। কিন্তু আবার মাত্র তিন মাসের মধ্যে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যাতে যুক্ত করা হচ্ছে আরও কঠোর সাজার বিধান।
নতুন সংশোধনীতে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর তথ্য—এ চারটি শব্দকে অপরাধের সংজ্ঞায় এনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য সংস্থাকে যুক্ত করা হচ্ছে। (সূত্র: প্রথম আলো, অনলাইন ৩০ জুলাই ২০২৬)
নতুন সংশোধনীতে ঠিক আর কী কী নিবর্তনমূলক ধারা ও শাস্তি যোগ করা হতে যাচ্ছে তা জানতে ৩১ জুলাই শুক্রবার বিকেলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে ঢুকি। কিন্তু সংশোধিত হতে যাওয়া এই আইনের কোনো খসড়া পেলাম না। প্রত্যাশা ছিল পাশ হওয়ার আগে সংশোধনী প্রস্তাবগুলো একটু পড়ে দেখার। কিন্তু সে সুযোগ হলো না।
একটা নির্বাচিত সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্য নতুন আইন করবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আইনটির ধারাগুলো যদি নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে, মানুষের মুক্তমত প্রকাশে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে থাকে তাহলে অবশ্যই সেটা নিয়ে আপত্তি উঠবে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এই আইন কার্যকরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য সংস্থা হিসেবে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) ঠিক কোন পরিসরে কোন পরিপ্রেক্ষিতে আইনটির প্রয়োগ করবে সেটা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া সাজা ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কতটা সংবিধানের চেতনাসমৃদ্ধ—তাও বিবেচনার প্রয়োজন আছে। এছাড়া গুজবের সংজ্ঞা, অপতথ্য, ভুয়া ভিডিও, অডিও, বিভ্রান্তিকর ছবি নিয়েও আলোচনা ও পর্যালোচনা করার দরকার আছে। হয়তো সরকার ভেতরে ভেতরে এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রকাশ্যে হলে ভাল হতো।
আইনের প্রধান লক্ষ্য জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বিপর্যয়টি ঘটে প্রয়োগের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বেশির ভাগ আইন প্রয়োগ করা হয় সরকারের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বা দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। অনেক ক্ষেত্রে আইন হয়ে ওঠে মুক্তমত প্রকাশের প্রতিবন্ধক ও নিপীড়নের হাতিয়ার। সম্ভাব্য সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইনে ঠিক কি পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে আর এর প্রয়োগ ঠিক কীভাবে হতে যাচ্ছে সেদিকে নজর থাকবে অনেকের। কারণ এর সাথে মানুষের সার্বজনীন অধিকার—মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতাও যুক্ত।
আশা করি, সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইন জনবান্ধব হবে, আইনের প্রয়োগ হবে যথাযথ। হবে মুক্তমত প্রকাশের সহায়ক। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা ও নিকট অতীত নিঃসন্দেহে কলঙ্কজনক—সে কারণেই, সিঁদুরে মেঘ বা রক্তবর্ণের মেঘ দেখলে সবাই ভীত হয়।
.png)

বাজারে যাওয়া মানুষ মাত্রই জানেন, দাম কেবল সংখ্যা নয়; সংসারের খরচের হিসাব। নিত্যপণ্যের দাম যখন সপ্তাহে সপ্তাহে বদলায়, তখন সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন সীমিত আয়ের মানুষ। বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি চার-পাঁচ বছর ধরে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে আছে।
১ ঘণ্টা আগে
৭-৮ মাত্রার বড় ভূমিকম্প হলে ভবনের নিচে চাপা পড়ে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষেরই মৃত্যু হবে। ভবনগুলোকে যদি আমরা মজবুত করতে না পারি, তবে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আর লাখো স্বেচ্ছাসেবক দিয়েও এই বিপুল প্রাণহানি ঠেকানো যাবে না।
৭ ঘণ্টা আগে
মাহি, পরীমনি, স্নিগ্ধা—প্রত্যেকেই একা দাঁড়িয়েছেন, আর প্রতিবারই একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে অপরাধ নয়, অভিযোগকারীর দিকেই। যতদিন এই ক্রম না পাল্টাবে, ততদিন এই বৃত্ত ভাঙবে না।
৯ ঘণ্টা আগে
আমাদের মোট আর্থিক ব্যবস্থার ৯০ শতাংশের বেশিই ব্যাংকনির্ভর। বাকি ১০ শতাংশের কম জুড়ে রয়েছে শেয়ারবাজার, বিমা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। সুতরাং, এমন একটি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোকে ভালো অবস্থানে না নিতে পারলে নিশ্চিতভাবেই দেশের পুরো আর্থিক কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়বে।
১০ ঘণ্টা আগে