জন্মদিন
৩১ জুলাই হ্যারি পটারের জন্মদিন। হ্যারি পটার সিরিজেই বলা আছে, হ্যারির জন্ম ১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই। এ ছাড়া চরিত্রটির লেখক জে কে রাউলিংয়েরও জন্ম ৩১ জুলাই। এডিনবরায় ক্যাফেতে বসে তিনি লিখেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এই সিরিজ।
মাহজাবিন নাফিসা

ছোটবেলায় প্রথম যখন ‘হ্যারি পটার’ হাতে পেলাম, তখন এর আবেদন ছিল শুধুই গল্পের বইয়ের মতো। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলাম ড্যায়াগন এ্যালিতে, হগোয়ার্টসের নাম না জানা করিডরে, কুইডিচ পিচের কুয়াশায়।
পড়াশোনার গণ্ডি ছাড়িয়ে কর্মজীবন শুরু হয়ে গেলেও বই বা সিনেমা একদিনের জন্যও পিছু ছাড়েনি। ছোটবেলায় তৈরি হওয়া সেই মুগ্ধতা এখনো না কাটলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রায় তিন দশক আগে শুরু হওয়া একটি বইয়ের সিরিজ আজ বিশ্বসংস্কৃতির অংশ। ৬০০ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হওয়া এই সিরিজ অনূদিত হয়েছে ৮০টিরও বেশি ভাষায়। সাতটি উপন্যাস থেকে নির্মিত হয়েছে আটটি ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র। পরে এসেছে ‘ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট’ চলচ্চিত্রমালা, ভিডিও গেম, লন্ডনের স্টুডিও ট্যুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও চীনের থিম পার্ক, অসংখ্য পণ্যসামগ্রী। নতুন প্রজন্মের জন্য বানানো হচ্ছে এইচবিওর টেলিভিশন সিরিজ। বইয়ের শেষ খণ্ড প্রকাশের প্রায় দুই দশক পরও হ্যারি পটারকে ঘিরে আগ্রহ কমেনি, বরং নতুন প্রজন্ম বারবার হগওয়ার্টসে ফিরছে।
কেন ফিরছে? শুধু কি জাদু, উড়ন্ত ঝাড়ু, জাদুদণ্ড কিংবা হগওয়ার্টসের রহস্যময় করিডরের জন্য? উত্তরটা বেশ জটিল।
শিশু বা কিশোর বয়সে হ্যারি পটার পড়লে মনে হয় গল্পটা বন্ধুত্ব, সাহস, জাদু আর অ্যাডভেঞ্চারের। কিন্তু একই বই যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আবার পড়া হয়, তখন মনে হয় যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্প পড়া হচ্ছে। সেখানে জাদুর পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈষম্য, ক্ষমতার রাজনীতি, রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা, আমলাতন্ত্র, ভয়কে পুঁজি করে ক্ষমতা দখল এবং ব্যক্তি-উপাসনার মতো বাস্তব পৃথিবীর বিষয়গুলো।
হ্যারি পটারকে তাই শুধু শিশুতোষ সাহিত্য বললে তার প্রতি অবিচার করা হয়। এই সাহিত্যকর্মটি পাঠকের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অর্থও বদলে ফেলে। শিশুরা পড়ে জাদুর গল্প আর বড়রা পড়ে রাজনীতি।
সাহিত্যের বড় শক্তি হলো, একটি গল্প একই থাকে, কিন্তু পাঠকের অভিজ্ঞতা বদলালে গল্পের অর্থও বদলে যায়। হ্যারি পটারের বইয়ের শুরু হয় ভলডেমর্টের পতনের দিন থেকে। সবাই স্বাধীন। সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে স্বাধীনতা উপভোগ করতে আর ছোট্ট হ্যারি এইসব কিছুর অন্তরালে বড় হচ্ছে ‘মাগল’ খালার বাড়িতে।
ছোটবেলায় ড্রাকো ম্যালফয়কে শুধু উদ্ধত এক সহপাঠী বলে মনে হয়। বড় হয়ে বোঝা যায়, সে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসকারী এক পরিবারের প্রতিনিধি। ছোটবেলার ভিলেন মিনিস্ট্রি অব ম্যাজিক, মন্ত্রীর সুবিধা পাওয়া আমব্রিজ বা ডেইলি প্রফেট বড়বেলায় হয়ে যায় আমাদের চেনা রাজনীতির অংশ।
ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, ভয় কীভাবে ছড়ায়, মানুষ কীভাবে বিভক্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠান কীভাবে সত্যকে আড়াল করতে পারে—এসব প্রশ্ন ছড়িয়ে আছে পুরো সিরিজজুড়ে। আর এভাবেই শিশুদের গল্প ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্কদের সাহিত্য হয়ে ওঠে।
হ্যারি পটার সিরিজের সবচেয়ে পরিচিত অপমানজনক শব্দগুলোর একটি হলো ‘মাডব্লাড’। ছোটবেলায় এটি শুধু ড্রাকো ম্যালফয়ের মুখে শোনা একটি খারাপ শব্দ মনে হলেও এটি পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে ছোট করার একটি রাজনৈতিক ভাষা।
জাদুর জগতে জন্মগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের একটি অদৃশ্য শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। যারা পুরোপুরি জাদুকর পরিবারে জন্মেছে, তারা নিজেদের ‘বিশুদ্ধ রক্ত’ বলে মনে করে। যাদের বাবা-মা দুজনই সাধারণ মানুষ, কিন্তু তারা জাদুশক্তি নিয়ে জন্মায়, তাই তাদের বলা হয় ‘মাগল’ আর তাদের অপমান করতে ব্যবহার করা হয় মাডব্লাড শব্দটি। এর উদ্দেশ্য একজন মানুষকে বোঝানো—তুমি আমাদের মতো নও, তাই তুমি আমাদের সমানও নও।

বাস্তব পৃথিবীতেও বৈষম্য বেশির ভাগ সময় এভাবেই শুরু হয়। কখনো জাতিগত পরিচয়, কখনো ধর্ম, কখনো বর্ণ, কখনো ভাষা বা বিশেষ পরিবারে জন্মপরিচয়—মানুষকে আলাদা করার জন্য আগে তৈরি হয় একটি ভাষা। সেই ভাষাই ধীরে ধীরে বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তোলে।
রাউলিংয়ের জাদুর জগতে এই ধারণা রক্ষা করতে ‘ডেথ ইটার’ নামে আলাদা বাহিনীও ছিল। এসব কিছুই যেন আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থা মনে করিয়ে দেয়।
মজার বিষয় হলো, ভলডেমর্ট নিজেই কিন্তু সেই আদর্শের নিখুঁত প্রতিনিধি নন। তিনি একজন ‘হাফ ব্লাড’। তবু তিনি জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে শ্রেষ্ঠ ও নিকৃষ্টে ভাগ করার মতাদর্শিক নেতা হয়ে ওঠেন। ইতিহাসে এমন বৈপরীত্য প্রায়ই দেখা যায়।
হগওয়ার্টসে হ্যারি, হারমায়োনি ও রনের বন্ধুত্বও এই বিভাজনের বিপরীত একটি অবস্থান তৈরি করে। হারমায়োনি একজন মাগল-বর্ন, রন একটি পুরোনো জাদুকর পরিবার থেকে এসেছে, আর হ্যারি নিজে দুই ভিন্ন জগতের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি চরিত্র। তাদের বন্ধুত্ব যেন দেখায়, পরিচয় নয়, মূল্যবোধই শেষ পর্যন্ত একজন মানুষকে সংজ্ঞায়িত করে।
ডবি পুরো সিরিজের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্রগুলোর একটি। প্রথমবার পড়ার সময় তাকে অনেকের কাছেই অদ্ভুত, মজার এবং একটু হাস্যকর মনে হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডবির গল্প অন্যভাবে ধরা দেয়।
হাউস এলফরা বছরের পর বছর কাজ করে, কিন্তু মজুরি পায় না। তারা স্বাধীন নয়। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মালিকের নির্দেশ অমান্য করলে নিজেরাই নিজেদের শাস্তি দেয়। তারা দাসত্বকেই তাদের স্বাভাবিক জীবন বলে বিশ্বাস করে। বাস্তব জীবনেও একটি ব্যবস্থা এত দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে যে শোষিতরাই সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।
এই বিষয়টি সবচেয়ে আগে বুঝতে পারে হারমায়োনি। সে হাউস এলফদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে এসপিইডব্লিউ (সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব এলফিশ ওয়েফেয়ার) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। তার এই উদ্যোগকে অধিকাংশ মানুষ গুরুত্বই দেয় না। এমনকি যাদের জন্য সে লড়ছে, তাদের অনেকেও পরিবর্তন চায় না।
হ্যারি পটার সিরিজের পঞ্চম বই ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য অর্ডার অব দ্য ফোনিক্স’ অনেক পাঠকের কাছেই কিছুটা ভিন্ন। কারণ সেখানে জাদুর চেয়ে অনেক বেশি জায়গা দখল করে আছে রাজনীতি।
এই বইয়ের শুরুতেই হ্যারি দাবি করে, ভলডেমর্ট ফিরে এসেছে। কিন্তু মিনিস্ট্রি অব ম্যাজিক সেই সত্য মানতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ সত্যটি স্বীকার করলে সরকারের ব্যর্থতা সামনে চলে আসবে, আতঙ্ক তৈরি হবে এবং ক্ষমতার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। তাই তারা সহজ পথ বেছে নেয়—সমস্যা অস্বীকার করা।
হ্যারিকে মিথ্যাবাদী বলা হয়। ডাম্বলডোরকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখানো হয়। যারা সত্য বলছে, তাদেরই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়। গল্প মিশে যায় বাস্তবের সঙ্গে।
হগওয়ার্টসের বাইরে জাদুর সমাজে সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘ডেইলি প্রফেট।’ ভলডেমর্টের প্রত্যাবর্তনের খবর যাচাই করার বদলে পত্রিকাটি দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রণালয়ের অবস্থানকেই গুরুত্ব দেয়। হ্যারিকে অস্থিতিশীল, মনোযোগপ্রার্থী বা বিভ্রান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ডাম্বলডোরকে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহ করা হয়। ভলডেমর্টের কোনো খবরই ছাপা হয় না।
রাউলিং এখানে দেখিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়লে বা রাষ্ট্রের বয়ানই যদি প্রধান সত্য হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হ্যারি পটারের ভক্তদের কাছে একটি প্রশ্ন বহু বছর ধরেই জনপ্রিয়—সবচেয়ে ঘৃণিত চরিত্র কে? অনেকের উত্তর ভলডেমর্ট নয়, ডলোরেস আমব্রিজ। কারণ ভলডেমর্ট প্রকাশ্য শত্রু। কিন্তু আমব্রিজ ক্ষমতার ভেতর থেকে অন্যায় করেন। তিনি হগওয়ার্টসে আসেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে। তার হাতে কোনো জাদুকরী সেনাবাহিনী নেই, নেই ডেথ ইটারের মতো বাহিনীও। তার অস্ত্র হলো প্রশাসনিক ক্ষমতা।

তিনি একের পর এক শিক্ষাগত স্বাধীনতা সীমিত করেন, ভিন্নমত দমন করেন, শিক্ষকদের ওপর নজরদারি বসান এবং ছাত্রদের প্রশ্ন করার সুযোগ কমিয়ে দেন। স্কুলে পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর উদ্দেশ্য।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কর্তৃত্ববাদ সব সময় উচ্চকণ্ঠে আসে না। অফিসিয়াল নোটিশ, বিধিমালা, অনুমতি, নিষেধাজ্ঞা কিংবা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমেও জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
শিশুদের কাছে ভলডেমর্ট সবচেয়ে শক্তিশালী অন্ধকার জাদুকর। তিনি মানুষকে ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায় করেন। তার অনুসারীরা তাকে প্রশ্ন করে না, তার নাম উচ্চারণ করতেও মানুষ ভয় পায়। ধীরে ধীরে সমাজ এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে সত্যের চেয়ে ভয় বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ভলডেমর্টের ক্ষমতা শুধু তার জাদুতে নয়; মানুষের মনে তৈরি হওয়া আতঙ্কেও। এই কারণেই ডাম্বলডোর শুরু থেকেই বলেন, নাম উচ্চারণ করতে ভয় পাওয়াটাই তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ভয় যখন মানুষের ভাষা, আচরণ এবং সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন ক্ষমতার সবচেয়ে বড় কাজ আর অস্ত্র ব্যবহার করা নয়, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা।
রাউলিং এমন একটি কাল্পনিক পৃথিবী তৈরি করেছিলেন, যেখানে বাস্তব পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত সংকটগুলো অন্য রূপে হাজির হয়েছে। জন্মপরিচয়ের অহংকার আছে, ক্ষমতার অপব্যবহার আছে, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আছে, সংবাদকে প্রভাবিত করার চেষ্টা আছে, অন্যায়কে স্বাভাবিক বানিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আছে, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও আছে। তাই সময় বদলালেও বইগুলোর অর্থ ফুরিয়ে যায় না।
এটি এমন একটি বই, যা দশ বছর বয়সে একভাবে পড়া যায়, বিশ বছর বয়সে আরেকভাবে, ত্রিশ বছর বয়সে আবার নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। রাউলিং জাদুর আড়ালে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছেন, যার উত্তর এখনো বাস্তব পৃথিবী খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ছোটবেলায় প্রথম যখন ‘হ্যারি পটার’ হাতে পেলাম, তখন এর আবেদন ছিল শুধুই গল্পের বইয়ের মতো। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলাম ড্যায়াগন এ্যালিতে, হগোয়ার্টসের নাম না জানা করিডরে, কুইডিচ পিচের কুয়াশায়।
পড়াশোনার গণ্ডি ছাড়িয়ে কর্মজীবন শুরু হয়ে গেলেও বই বা সিনেমা একদিনের জন্যও পিছু ছাড়েনি। ছোটবেলায় তৈরি হওয়া সেই মুগ্ধতা এখনো না কাটলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রায় তিন দশক আগে শুরু হওয়া একটি বইয়ের সিরিজ আজ বিশ্বসংস্কৃতির অংশ। ৬০০ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হওয়া এই সিরিজ অনূদিত হয়েছে ৮০টিরও বেশি ভাষায়। সাতটি উপন্যাস থেকে নির্মিত হয়েছে আটটি ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র। পরে এসেছে ‘ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট’ চলচ্চিত্রমালা, ভিডিও গেম, লন্ডনের স্টুডিও ট্যুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও চীনের থিম পার্ক, অসংখ্য পণ্যসামগ্রী। নতুন প্রজন্মের জন্য বানানো হচ্ছে এইচবিওর টেলিভিশন সিরিজ। বইয়ের শেষ খণ্ড প্রকাশের প্রায় দুই দশক পরও হ্যারি পটারকে ঘিরে আগ্রহ কমেনি, বরং নতুন প্রজন্ম বারবার হগওয়ার্টসে ফিরছে।
কেন ফিরছে? শুধু কি জাদু, উড়ন্ত ঝাড়ু, জাদুদণ্ড কিংবা হগওয়ার্টসের রহস্যময় করিডরের জন্য? উত্তরটা বেশ জটিল।
শিশু বা কিশোর বয়সে হ্যারি পটার পড়লে মনে হয় গল্পটা বন্ধুত্ব, সাহস, জাদু আর অ্যাডভেঞ্চারের। কিন্তু একই বই যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আবার পড়া হয়, তখন মনে হয় যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্প পড়া হচ্ছে। সেখানে জাদুর পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈষম্য, ক্ষমতার রাজনীতি, রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা, আমলাতন্ত্র, ভয়কে পুঁজি করে ক্ষমতা দখল এবং ব্যক্তি-উপাসনার মতো বাস্তব পৃথিবীর বিষয়গুলো।
হ্যারি পটারকে তাই শুধু শিশুতোষ সাহিত্য বললে তার প্রতি অবিচার করা হয়। এই সাহিত্যকর্মটি পাঠকের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অর্থও বদলে ফেলে। শিশুরা পড়ে জাদুর গল্প আর বড়রা পড়ে রাজনীতি।
সাহিত্যের বড় শক্তি হলো, একটি গল্প একই থাকে, কিন্তু পাঠকের অভিজ্ঞতা বদলালে গল্পের অর্থও বদলে যায়। হ্যারি পটারের বইয়ের শুরু হয় ভলডেমর্টের পতনের দিন থেকে। সবাই স্বাধীন। সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে স্বাধীনতা উপভোগ করতে আর ছোট্ট হ্যারি এইসব কিছুর অন্তরালে বড় হচ্ছে ‘মাগল’ খালার বাড়িতে।
ছোটবেলায় ড্রাকো ম্যালফয়কে শুধু উদ্ধত এক সহপাঠী বলে মনে হয়। বড় হয়ে বোঝা যায়, সে জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসকারী এক পরিবারের প্রতিনিধি। ছোটবেলার ভিলেন মিনিস্ট্রি অব ম্যাজিক, মন্ত্রীর সুবিধা পাওয়া আমব্রিজ বা ডেইলি প্রফেট বড়বেলায় হয়ে যায় আমাদের চেনা রাজনীতির অংশ।
ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, ভয় কীভাবে ছড়ায়, মানুষ কীভাবে বিভক্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠান কীভাবে সত্যকে আড়াল করতে পারে—এসব প্রশ্ন ছড়িয়ে আছে পুরো সিরিজজুড়ে। আর এভাবেই শিশুদের গল্প ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্কদের সাহিত্য হয়ে ওঠে।
হ্যারি পটার সিরিজের সবচেয়ে পরিচিত অপমানজনক শব্দগুলোর একটি হলো ‘মাডব্লাড’। ছোটবেলায় এটি শুধু ড্রাকো ম্যালফয়ের মুখে শোনা একটি খারাপ শব্দ মনে হলেও এটি পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে ছোট করার একটি রাজনৈতিক ভাষা।
জাদুর জগতে জন্মগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের একটি অদৃশ্য শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। যারা পুরোপুরি জাদুকর পরিবারে জন্মেছে, তারা নিজেদের ‘বিশুদ্ধ রক্ত’ বলে মনে করে। যাদের বাবা-মা দুজনই সাধারণ মানুষ, কিন্তু তারা জাদুশক্তি নিয়ে জন্মায়, তাই তাদের বলা হয় ‘মাগল’ আর তাদের অপমান করতে ব্যবহার করা হয় মাডব্লাড শব্দটি। এর উদ্দেশ্য একজন মানুষকে বোঝানো—তুমি আমাদের মতো নও, তাই তুমি আমাদের সমানও নও।

বাস্তব পৃথিবীতেও বৈষম্য বেশির ভাগ সময় এভাবেই শুরু হয়। কখনো জাতিগত পরিচয়, কখনো ধর্ম, কখনো বর্ণ, কখনো ভাষা বা বিশেষ পরিবারে জন্মপরিচয়—মানুষকে আলাদা করার জন্য আগে তৈরি হয় একটি ভাষা। সেই ভাষাই ধীরে ধীরে বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তোলে।
রাউলিংয়ের জাদুর জগতে এই ধারণা রক্ষা করতে ‘ডেথ ইটার’ নামে আলাদা বাহিনীও ছিল। এসব কিছুই যেন আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থা মনে করিয়ে দেয়।
মজার বিষয় হলো, ভলডেমর্ট নিজেই কিন্তু সেই আদর্শের নিখুঁত প্রতিনিধি নন। তিনি একজন ‘হাফ ব্লাড’। তবু তিনি জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে শ্রেষ্ঠ ও নিকৃষ্টে ভাগ করার মতাদর্শিক নেতা হয়ে ওঠেন। ইতিহাসে এমন বৈপরীত্য প্রায়ই দেখা যায়।
হগওয়ার্টসে হ্যারি, হারমায়োনি ও রনের বন্ধুত্বও এই বিভাজনের বিপরীত একটি অবস্থান তৈরি করে। হারমায়োনি একজন মাগল-বর্ন, রন একটি পুরোনো জাদুকর পরিবার থেকে এসেছে, আর হ্যারি নিজে দুই ভিন্ন জগতের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি চরিত্র। তাদের বন্ধুত্ব যেন দেখায়, পরিচয় নয়, মূল্যবোধই শেষ পর্যন্ত একজন মানুষকে সংজ্ঞায়িত করে।
ডবি পুরো সিরিজের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্রগুলোর একটি। প্রথমবার পড়ার সময় তাকে অনেকের কাছেই অদ্ভুত, মজার এবং একটু হাস্যকর মনে হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডবির গল্প অন্যভাবে ধরা দেয়।
হাউস এলফরা বছরের পর বছর কাজ করে, কিন্তু মজুরি পায় না। তারা স্বাধীন নয়। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মালিকের নির্দেশ অমান্য করলে নিজেরাই নিজেদের শাস্তি দেয়। তারা দাসত্বকেই তাদের স্বাভাবিক জীবন বলে বিশ্বাস করে। বাস্তব জীবনেও একটি ব্যবস্থা এত দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে যে শোষিতরাই সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।
এই বিষয়টি সবচেয়ে আগে বুঝতে পারে হারমায়োনি। সে হাউস এলফদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে এসপিইডব্লিউ (সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব এলফিশ ওয়েফেয়ার) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। তার এই উদ্যোগকে অধিকাংশ মানুষ গুরুত্বই দেয় না। এমনকি যাদের জন্য সে লড়ছে, তাদের অনেকেও পরিবর্তন চায় না।
হ্যারি পটার সিরিজের পঞ্চম বই ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য অর্ডার অব দ্য ফোনিক্স’ অনেক পাঠকের কাছেই কিছুটা ভিন্ন। কারণ সেখানে জাদুর চেয়ে অনেক বেশি জায়গা দখল করে আছে রাজনীতি।
এই বইয়ের শুরুতেই হ্যারি দাবি করে, ভলডেমর্ট ফিরে এসেছে। কিন্তু মিনিস্ট্রি অব ম্যাজিক সেই সত্য মানতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ সত্যটি স্বীকার করলে সরকারের ব্যর্থতা সামনে চলে আসবে, আতঙ্ক তৈরি হবে এবং ক্ষমতার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। তাই তারা সহজ পথ বেছে নেয়—সমস্যা অস্বীকার করা।
হ্যারিকে মিথ্যাবাদী বলা হয়। ডাম্বলডোরকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখানো হয়। যারা সত্য বলছে, তাদেরই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়। গল্প মিশে যায় বাস্তবের সঙ্গে।
হগওয়ার্টসের বাইরে জাদুর সমাজে সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘ডেইলি প্রফেট।’ ভলডেমর্টের প্রত্যাবর্তনের খবর যাচাই করার বদলে পত্রিকাটি দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রণালয়ের অবস্থানকেই গুরুত্ব দেয়। হ্যারিকে অস্থিতিশীল, মনোযোগপ্রার্থী বা বিভ্রান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ডাম্বলডোরকে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহ করা হয়। ভলডেমর্টের কোনো খবরই ছাপা হয় না।
রাউলিং এখানে দেখিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়লে বা রাষ্ট্রের বয়ানই যদি প্রধান সত্য হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হ্যারি পটারের ভক্তদের কাছে একটি প্রশ্ন বহু বছর ধরেই জনপ্রিয়—সবচেয়ে ঘৃণিত চরিত্র কে? অনেকের উত্তর ভলডেমর্ট নয়, ডলোরেস আমব্রিজ। কারণ ভলডেমর্ট প্রকাশ্য শত্রু। কিন্তু আমব্রিজ ক্ষমতার ভেতর থেকে অন্যায় করেন। তিনি হগওয়ার্টসে আসেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে। তার হাতে কোনো জাদুকরী সেনাবাহিনী নেই, নেই ডেথ ইটারের মতো বাহিনীও। তার অস্ত্র হলো প্রশাসনিক ক্ষমতা।

তিনি একের পর এক শিক্ষাগত স্বাধীনতা সীমিত করেন, ভিন্নমত দমন করেন, শিক্ষকদের ওপর নজরদারি বসান এবং ছাত্রদের প্রশ্ন করার সুযোগ কমিয়ে দেন। স্কুলে পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর উদ্দেশ্য।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কর্তৃত্ববাদ সব সময় উচ্চকণ্ঠে আসে না। অফিসিয়াল নোটিশ, বিধিমালা, অনুমতি, নিষেধাজ্ঞা কিংবা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমেও জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
শিশুদের কাছে ভলডেমর্ট সবচেয়ে শক্তিশালী অন্ধকার জাদুকর। তিনি মানুষকে ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায় করেন। তার অনুসারীরা তাকে প্রশ্ন করে না, তার নাম উচ্চারণ করতেও মানুষ ভয় পায়। ধীরে ধীরে সমাজ এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে সত্যের চেয়ে ভয় বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ভলডেমর্টের ক্ষমতা শুধু তার জাদুতে নয়; মানুষের মনে তৈরি হওয়া আতঙ্কেও। এই কারণেই ডাম্বলডোর শুরু থেকেই বলেন, নাম উচ্চারণ করতে ভয় পাওয়াটাই তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ভয় যখন মানুষের ভাষা, আচরণ এবং সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন ক্ষমতার সবচেয়ে বড় কাজ আর অস্ত্র ব্যবহার করা নয়, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা।
রাউলিং এমন একটি কাল্পনিক পৃথিবী তৈরি করেছিলেন, যেখানে বাস্তব পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত সংকটগুলো অন্য রূপে হাজির হয়েছে। জন্মপরিচয়ের অহংকার আছে, ক্ষমতার অপব্যবহার আছে, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আছে, সংবাদকে প্রভাবিত করার চেষ্টা আছে, অন্যায়কে স্বাভাবিক বানিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আছে, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও আছে। তাই সময় বদলালেও বইগুলোর অর্থ ফুরিয়ে যায় না।
এটি এমন একটি বই, যা দশ বছর বয়সে একভাবে পড়া যায়, বিশ বছর বয়সে আরেকভাবে, ত্রিশ বছর বয়সে আবার নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। রাউলিং জাদুর আড়ালে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছেন, যার উত্তর এখনো বাস্তব পৃথিবী খুঁজে বেড়াচ্ছে।
.png)

তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক। সোনালী সাভানার বুকে মা চিতা ও তার চার শাবকের সঙ্গে সাক্ষাৎ। বন্যপ্রাণীর রাজ্যে রোমাঞ্চ, বিস্ময় আর আজীবন মনে রাখার মতো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ভূ-পর্যটক তানভীর অপু।
২ ঘণ্টা আগে
অনেক ভাষাবিজ্ঞানী মানবভাষাকে ‘প্রপঞ্চ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে আমার কাছে অবশ্য ভাষাকে সব সময় বিস্ময় বলেই মনে হয়। কারণ দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে ভাষার রকমফের তো আছেই; আবার একই ভাষার মধ্যেও রয়েছে নানা রকম বৈচিত্র্য।
৫ ঘণ্টা আগে
সিনেমা তো সাধারণত আরাম করে বসে দেখার একটা ব্যাপার। পপকর্ন হাতে, মাথা একটু হালকা রেখে গল্পে ডুবে যাওয়া। কিন্তু নোলানের সিনেমার ক্ষেত্রে মনে হয়, পপকর্নের সঙ্গে খাতা-কলম, ক্যালকুলেটর আর দুই কাপ কফিও রাখা দরকার। কখন কী মিস হয়ে যায়, কে জানে!
৩০ জুলাই ২০২৬
বাংলা চলচ্চিত্রের নন্দিত অভিনেত্রী ববিতার জন্মদিন আজ।
৩০ জুলাই ২০২৬