চট্টগ্রামের ভাষার ভাব-স্বভাব

চট্টগ্রামের ভাষার ভাব-স্বভাব। স্ট্রিম গ্রাফিক

অনেক ভাষাবিজ্ঞানী মানবভাষাকে ‘প্রপঞ্চ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে আমার কাছে অবশ্য ভাষাকে সব সময় বিস্ময় বলেই মনে হয়। কারণ দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে ভাষার রকমফের তো আছেই; আবার একই ভাষার মধ্যেও রয়েছে নানা রকম বৈচিত্র্য। এইটুকুতে হয়তো বিস্ময়ের কিছু না-ও ঠেকতে পারে, তবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভাষার যে প্রভেদ, এতে তো বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না! বিষয়টা এমন যে প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপের মতো ভাষার ধরনেও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য থাকে। এ কারণে ভাষাবিজ্ঞানীরা কোনো ভাষার অঞ্চল বিশেষের রূপকে ‘ডায়েলেক্ট’ বলেন। আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ভাষার নামপরিচয় দিতে গিয়ে ‘ইডিয়োলেক্ট’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

ভাষাপ্রয়োগের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একজন ব্যক্তি কোন অঞ্চলের, কোন সমাজের, তাঁর বয়স কত, ধর্মীয় পরিচয় কী, শিক্ষাগত বা পেশাগত অবস্থান কী, এমনকি লিঙ্গপরিচয় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব। ব্যক্তির ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে উচ্চারণ ও ঔপভাষিক ছাঁচ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অধুনা ভাষাবিজ্ঞানে ‘ফরেনসিক ভাষাবিজ্ঞান’ নামে স্বতন্ত্র একটি শাখার উদ্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে অপরাধ তদন্তে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়। এ ধরনের ভাষাবিজ্ঞানে ভাষার ব্যবহার বিশ্লেষণ করে ব্যক্তির ভাষাকে চিহ্নিত করা হয়।

তবে একজন ব্যক্তির ভাষা শনাক্ত করা মূলত ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া বিশ্লেষণী প্রক্রিয়া। প্রথমে বক্তার ভাষা সনাক্ত করা হয়। এরপর উপভাষা, উপ-উপভাষা, আঞ্চলিক কথ্যরীতি, সামাজিক ভাষারীতি এবং সবশেষে ব্যক্তিগত ভাষারীতি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বক্তার পরিচয় ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ভাষার প্রতিটি স্তরই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা ভাষার একটি স্তর চট্টগ্রামের উপভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক ও অভাষাতাত্ত্বিক উভয় কারণে উপভাষাটি গুরুত্বপূর্ণ। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এতে বাংলার বিশেষ ঔপভাষিক রূপ ধরা পড়ে। চট্টগ্রামের ভাষার ঔপভাষিকতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত এখান থেকেই।

এমনকি চর্যাপদ যে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন, চট্টগ্রামের উপভাষার বাক্যগঠনের সঙ্গে সাদৃশ্য দিয়ে অনেকে তার যুক্তি খোঁজেন। যেমন, চর্যার ‘দুলি দুহি পীঠা ধরন না জাই’ বাক্যের সঙ্গে চট্টগ্রামের ‘আই ন খাঁইয়ুম’ বাক্যের সাংগঠনিক সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।

বাংলা ভাষার উপভাষাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে পূর্ববঙ্গীয় বিভাগ বলে যে আলাদা ভাগ রয়েছে, তার মধ্যে চট্টগ্রামের উপভাষা উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রম এতটাই স্পষ্ট যে বাংলা উপভাষার বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতে গিয়ে প্রথম দিককার একজন গবেষক জর্জ গ্রিয়ার্সন একে পূর্ববঙ্গীয় ভাগে ফেলতে পারেননি। বরং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার একটি স্বতন্ত্র ভাষারূপ হিসেবে ‘চাটগাঁইয়া’ নামে আলাদা পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রায় শত বছর পরে উপভাষাতাত্ত্বিক মনিরুজ্জামান একে চিহ্নিত করেছেন সাধারণ বাঙালির দূরবর্তী একটি ভাষারূপ হিসেবে। মনিরুজ্জামান একে বলেছেন বাংলার ‘অন্ত্য-প্রান্তিক ভাষা’। সেটা উপভাষাটির ঔপভাষিক স্বাতন্ত্র্য বা বিশেষত্বের কারণেই। এ স্বাতন্ত্র্য এতটাই যে ভাষাবিজ্ঞানের অনেক গবেষণায় চট্টগ্রামের ভাষাকে বাংলা ভাষার আঞ্চলিক রূপ না বলে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবেও আলোচনার চেষ্টা দেখা যায়।

সকলেই মনে করেন ধ্বনি-উচ্চারণের নিয়ম, রূপমূল, শব্দভান্ডার; এমনকি বাক্যগঠনের স্বতন্ত্রতার কারণে অপরাপর বাঙালির কাছে চাটগাঁইয়া দুর্বোধ্য ভাষা। এই স্বতন্ত্রতা বা দুর্বোধ্যতার পেছনে একদিকে যেমন রয়েছে ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক; অন্যদিকে ভাষার গাঠনিক ও প্রায়োগিক দিকও। অঞ্চলটির মানুষের ভাষাবোধের বিশেষত্বও গড়ে উঠেছে নানাবিধ সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায়, যা বাংলার অন্য অঞ্চলের মানুষের ভাষাবোধের তুলনায় বলতে গেলে আলাদাই।

বাংলার অন্যান্য উপভাষাগত বৈচিত্র্য ছাড়াও চাটগাঁইয়া ভাষার উল্লেখযোগ্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য। যেমন, নাগরিক চাটগাঁইয়া, গ্রামীণ চাটগাঁইয়া, কক্সবাজারের ভাষা, সন্দ্বীপের ভাষা, উপকূলীয় ভাষা ইত্যাদি। আর এসব রূপভেদের পেছনে ধ্বনি, রূপমূল, শব্দ ও বাক্যগঠনের পার্থক্য ছাড়াও সামাজিক রীতিনীতি ও লোকসংস্কৃতিগত প্রভাবও রয়েছে। ফলে চাটগাঁইয়া ভাষাকে একক কোনো ভাষারূপ হিসেবে বিবেচনা না করে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত একাধিক আঞ্চলিক ভাষা-ছাঁচের সমষ্টি বলা সম্ভব।

মোটা দাগে চট্টগ্রামের উপভাষার বিশেষত্ব এর সাংগঠনিক রূপে। ভাষার ক্ষুদ্রতম একক যে-ধ্বনি, চট্টগ্রামের ভাষার সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যও এই ধ্বনিগত বৈচিত্র্য। প্রমিত বাংলার অনেক ধ্বনি এখানে ভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ স্বরধ্বনির পরিবর্তন, ব্যঞ্জনধ্বনির রূপান্তর, স্বরাঘাতের বিশেষ ব্যবহার এবং কখনো কখনো সুরভিত্তিক উচ্চারণের প্রবণতা এই উপভাষাকে অন্য উপভাষা থেকে আলাদা করেছে। পাশাপাশি রূপমূলতাত্ত্বিক, বাগর্থিক ও বাক্যতাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের উপভাষা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে বহন করে। ক্রিয়ারূপ, সর্বনাম, বিভক্তি, নিজস্ব শব্দভান্ডার, বাগার্থ, নেতিবাচক অব্যয় ক্রিয়ার আগে বসিয়ে বাক্য গঠন, প্রশ্নবোধক বাক্যের বিন্যাস এবং পদক্রমে এমন অনেক বৈশিষ্ট্য এতে লক্ষণীয়, যা বাংলা ভাষার অন্যান্য আঞ্চলিক রূপে অনুপস্থিত কিংবা ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, এসব বৈশিষ্ট্যের একাংশ এসেছে ভারতীয় আর্যভাষার উত্তরাধিকার থেকে; অন্য অংশ গড়ে উঠেছে পার্শ্ববর্তী তিব্বত-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংস্পর্শের প্রভাবে।

প্রথমত, ধ্বনিতাত্ত্বিক দিক থেকে স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনির ব্যবহারগত বিশেষত্বই মূলত চট্টগ্রামের উপভাষাকে বাংলার অন্যান্য উপভাষা থেকে পৃথক করেছে। স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলার স্বরধ্বনিগুলো এখানে উচ্চারণে সূক্ষ্ম/আংশিক পরিবর্তন অথবা সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়ে অর্থের পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। যেমন, বর্গা>বাগা, ফড়িং>ফিরিং ইত্যাদি। আবার ‘অ’ ধ্বনি শব্দান্তেও যেমন নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে, কখনো-বা ‘ও’ প্রবণতাও দেখা যায়। বিভিন্ন ধ্বনির এরূপ হ্রস্বত্ব বা দীর্ঘত্ব স্বরের গুণগত পরিবর্তন বৈচিত্র্য যেমন, ভাষার নিজস্ব ছন্দও সৃষ্টি করে। স্বরধ্বনির অনুনাসিক উচ্চারণও যেমন, আঁই (আমি), আঁর (আমার) ইত্যাদি উপভাষাটিকে স্বতন্ত্র ধ্বনিগত পরিচয় দিয়েছে।

ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের উপভাষায় নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন ‘ক’ ধ্বনি শব্দারম্ভে আরবি ‘খ’ ধ্বনির মতো, কখনো-বা ‘গ’-এর মতো। করি>গরি। এভাবে বিভিন্ন ব্যঞ্জনের ‘হ’-উচ্চারণ প্রবণতা, অল্পপ্রাণীভবন, ঘোষতা, ভিন্ন ধ্বনিতে রূপান্তর, আন্তস্বরীয় ‘ম’ ধ্বনির আনুনাসিক স্বরে পরিণত হওয়া (আমি>আঁই) ইত্যাদি। এই ধরনের প্রবণতা ধ্বনিতাত্ত্বিক দিক থেকে ভাষাটিকে বিশেষত্ব দিয়েছে।

ধ্বনিখণ্ডের অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য, যেমন স্বরাঘাত, প্রমিত বাংলায় তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও চট্টগ্রামের ভাষায় তা অনেক বেশি অর্থবহ। একই শব্দ ভিন্ন স্বরাঘাতে উচ্চারণ করলে বক্তব্যের আবেগ, বিস্ময়, প্রশ্ন বা আদেশের অর্থ বদলে যেতে পারে। একইভাবে সুরধর্মিতাও চাটগাঁইয়া ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এতে প্রশ্ন, বিস্ময়, আনন্দ কিংবা রাগ ইত্যাদি অবস্থায় বাক্যের সুর স্পষ্টভাবে বদলে যায়। এই সুরধর্মিতার কারণে ভাষাটি অনেক সময় সাংগীতিক শোনায়, আবার অর্থের পার্থক্যও তৈরি করে। কিছু কিছু ধ্বনির টোনাল উচ্চারণ আমাদের চীনা ভাষার বিশেষত্বকে মনে করিয়ে দেয়। অনেক ভাষাবিদ মনে করেন, এসব বৈশিষ্ট্যের পেছনে চীনা-তিব্বত-বর্মী ইত্যাদি ভাষাগোষ্ঠীর সংস্পর্শের প্রভাব থাকতে পারে।

বিশেষ করে ভাষাটি এখন প্রমিতবাংলা অভিমুখী; একই সঙ্গে একটি বিশেষ শ্রেণির কাছে তা ঐতিহ্য, জ্ঞাতিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে,চট্টগ্রামের ভাষার বিভিন্ন ধ্বনি তুলনামূলকভাবে দ্রুতগতিতে উচ্চারিত হয়। ফলে কথা বলার সময় কোথাও কিছু ধ্বনি লোপ পায়, কোথাও নতুন ধ্বনি যুক্ত হয়, আবার কখনো একাধিক ধ্বনি বা শব্দ একত্রে মিলিত হয়। এ কারণেই চট্টগ্রামের স্বাভাবিক কথোপকথন বাংলার অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে অনেক সময় দুর্বোধ্য মনে হয়।

রূপমূলগত দিক থেকেও চট্টগ্রামের উপভাষা বাংলার অন্য যেকোনো উপভাষার তুলনায় বিচিত্র। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আগমন ঘটেছে। তাদের ভাষার নানা উপাদান চট্টগ্রামের উপভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। ফলে এখানে এমন অনেক রূপমূল পাওয়া যায়, যা বাংলার অন্য অঞ্চলে দেখা যায় না। এসবের সঙ্গে বাংলা ভাষার নিজস্ব রূপমূল এবং অপরাপর ভাষা থেকে আগত কিংবা কৃতঋণগত রূপমূল মিলে মিলে এমন এক বিচিত্র রূপমূলভান্ডার এতে তৈরি হয়েছে, যা বিস্ময়কর।

রূপমূলের এই বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে বিশেষ্য পদের বিভক্তি, সর্বনামের রূপ, বহুবচন গঠন ও ক্রিয়ার রূপে। এখানে সর্বনামের ক্ষেত্রে ব্যক্তি, সংখ্যা ও সামাজিক দূরত্ব অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রূপ ব্যবহৃত হয় এতে। ক্রিয়াপদের কাল, পুরুষ ও ভাব প্রকাশেও স্বতন্ত্র রূপমূল ব্যবহৃত হয়। ফলে একই অর্থবোধক শব্দ বা বাক্য প্রমিত বাংলা ও চট্টগ্রামের ভাষায় ভিন্ন রূপ ধারণ করে থাকে। এমন রূপগত বৈচিত্র্য দীর্ঘকালীন স্বাভাবিক ভাষাবিকাশের ফল হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি।

শব্দভান্ডার ও বাগর্থগত দিক থেকে চট্টগ্রামের উপভাষা বাংলা ভাষার অন্যতম সমৃদ্ধ উপভাষা। সাগর, পাহাড় ও নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগের ফলে বিভিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা ছাড়াও আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, আরাকানি, বার্মিজ ও ইংরেজি উৎসের বহু শব্দ স্থানীয় শব্দভান্ডারে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব কৃতঋণ শব্দ কেবল ঋণগত নয়; বরং স্থানীয় ধ্বনির প্রভাব এবং ভাষাতাত্ত্বিক নিয়ম অনুসারে অভিযোজিতও। এই প্রক্রিয়া তা উপভাষার নিজস্ব শব্দভান্ডারের অংশে পরিণত হয়েছে। বাগর্থিক দিক থেকে বাংলার তুলনায় ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় অথবা একই শব্দের অর্থক্ষেত্র প্রসারিত বা সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে আত্মীয়তাসূচক শব্দ, কৃষিজীবন, সামুদ্রিক পরিবেশ, মাছধরা, নৌযাত্রা ও পাহাড়ি জীবনসংক্রান্ত শব্দভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ, যা এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।

ধ্বনি যেখানে ভাষার ক্ষুদ্রতম একক, বাক্য সেখানে তার বৃহত্তম সংগঠন। বাক্যগঠনের দিক থেকেও চট্টগ্রামের ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যদিও মৌলিক পদক্রম বাংলা ভাষার সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে, তবু বাক্যের উপাদান বিন্যাস, নঞর্থক অব্যয়ের অবস্থান, প্রশ্নবোধক বাক্যের নির্মাণ এবং জোর আরোপের কৌশলে স্বতন্ত্রতা লক্ষ করা যায়। কথ্য ভাষায় সংক্ষিপ্ত বাক্য, উপবাক্যের সীমিত ব্যবহার এবং প্রাসঙ্গিক অর্থনির্ভর বাক্যগঠন যোগাযোগকে দ্রুত ও কার্যকর করে তোলে। একমাত্র চর্যাপদে ক্রিয়ার আগে নঞর্থক অব্যয়ের ব্যবহার করে বাক্যগঠনের প্রকৃতি চট্টগ্রামের বাক্যগঠনের সঙ্গে মেলে।

এমনকি চর্যাপদ যে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন, চট্টগ্রামের উপভাষার বাক্যগঠনের সঙ্গে সাদৃশ্য দিয়ে অনেকে তার যুক্তি খোঁজেন। যেমন, চর্যার ‘দুলি দুহি পীঠা ধরন না জাই’ বাক্যের সঙ্গে চট্টগ্রামের ‘আই ন খাঁইয়ুম’ বাক্যের সাংগঠনিক সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। এ ধরনের বাক্যগত বৈশিষ্ট্য চট্টগ্রামের উপভাষাকে প্রমিত বাংলা ও অন্যান্য উপভাষা থেকে আলাদা করেছে।

সমাজভাষাবিজ্ঞানের দিক থেকে চট্টগ্রামের উপভাষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা অঞ্চলটিতে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই নয়; বরং তা পরিচয়, মর্যাদা, ঐতিহ্য, জ্ঞাতিত্ব ও গোষ্ঠীগত আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান বাহক। চট্টগ্রামের একজন ঔপভাষী তাঁর ভাষার মাধ্যমেই নিজের আঞ্চলিক পরিচয় যেমন প্রকাশ করেন, তেমনিভাবে নগর ও গ্রামকেন্দ্রিক পার্থক্য, সামাজিক স্তরবিন্যাসগত বিশেষত্ব, লিঙ্গ ও ধর্মকেন্দ্রিক স্বতন্ত্রতাও তুলে ধরেন।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, প্রমিত বাংলার প্রসার এবং প্রযুক্তিগত কারণে ভাষার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্থানীয় ও প্রবাসী চট্টগ্রামবাসীর ভাষা-সংরক্ষণ উপভাষাটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় সমাজভাষাতাত্ত্বিক তাৎপর্য হচ্ছে একটি জীবন্ত ভাষাগত ঐতিহ্য হিসেবে উপভাষাটি ইতিহাস, বহুসাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও স্থানীয় মানুষের জীবনাভিজ্ঞতাকে ধারণ করে আছে। তাই আধুনিকতার চাপ, প্রমিত বাংলার প্রভাব এবং বিশ্বায়নের মধ্যেও ভাষাটি তার নিজস্ব পরিচয় ধরে রেখেছে কিংবা রাখতে চাচ্ছে।

সব শেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের ভাষা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামুদ্রিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। বাংলা ভাষার অন্যান্য আঞ্চলিক রূপের তুলনায় এটি অধিকতর বহুভাষিক সংস্পর্শে বিকশিত হয়েছে। অবস্থানগত দিক থেকে চট্টগ্রাম বহু শতাব্দী ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা জনগোষ্ঠী সহ আরব, ফারসি, আরাকানি, পর্তুগিজ, সুলতান, মুঘল, ব্রিটিশদের সংযোগস্থল ছিল। এই দীর্ঘ ভাষাসংস্পর্শ একে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলার প্রধান কারণ। আবার কালে কালে সমাজ-পরিবর্তনের সঙ্গে রূপান্তরিতও হয়ে আসছে ভাষারূপটি।

বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি ও নতুন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় চট্টগ্রামের ভাষা এখন পরিবর্তনশীল পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে ভাষাটি এখন প্রমিতবাংলা অভিমুখী; একই সঙ্গে একটি বিশেষ শ্রেণির কাছে তা ঐতিহ্য, জ্ঞাতিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে। তাই ভাষাবিজ্ঞানীদের কথায় এমন পরিস্থিতি পরিবর্তন ও সংরক্ষণের একটি সহাবস্থান। অর্থাৎ, ভাষাটি একদিকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখছে, তেমনি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন রূপও গ্রহণ করছে। ভাষার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই এমন।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত