ঢেউয়ের তোড়ে ছিটকে কেঁদেছিলেন ফাতেমা, লড়ছেন স্পন্সর ছাড়াই

Multiple Authors
কাজী মাকতাবার পান্থ ও স্ট্রিম সংবাদদাতা

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢেউয়ের তোড়ে বোর্ড থেকে ছিটকে অঝোরে কেঁদেছিলেন ফাতেমা আক্তার। সেই মেয়েটি এবার জাপানে লাল-সবুজের পতাকা তুলে ধরবেন। ১৭ বছরের ফাতেমা বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে অংশ নেবেন।

জাপান যাওয়ার আগে আক্ষেপ ঝরল ফাতেমার কণ্ঠে। এত বছর সার্ফিং করেও পর্যাপ্ত সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। এমনকি তাঁর ক্লাবের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত নেই। সার্ফিংয়ের খরচের বড় অংশ কোচ রাশেদ আলম নিজের পকেট থেকে বহন করছেন।

স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে ফাতেমা জানান, সার্ফিং সম্পর্কে শুরুতে তিনি কিছুই জানতেন না। প্রতিদিন বান্ধবীদের সমুদ্রে যেতে দেখে একদিন জানতে চান– ‘কোথায় যাও?’ বান্ধবীদের জবাব, সার্ফিং করতে। এরপর একদিন তাদের সঙ্গে লুকিয়ে সমুদ্রে যান ফাতেমা। পানিতে নামার পর প্রথম ঢেউয়েই ছিটকে পড়লে ভয়ে কান্না করেন। তবে বান্ধবীদের সান্ত্বনা এবং নিজের জেদ ফাতেমাকে আবার সার্ফিং বোর্ডে দাঁড়াতে সাহস জোগায়। ধীরে ধীরে ভালো লাগা তৈরি হয় এবং নিয়মিত সমুদ্রে অনুশীলন শুরু করেন।

খরচ চালাতে না পেরে মা আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধের কথা জোরেশোরে ভাবতে থাকেন। তখন কোচ রাশেদ মাকে বুঝিয়ে আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নেন।

সব ভালোই চলছিল। কিন্তু এরইমধ্যে বিপদ নেমে আসে পরিবার জেনে যাওয়ায়। পরিবারের বাধায় প্রায় দুই সপ্তাহ সার্ফিংয়ে যেতে পারেননি ফাতেমা। সমাজের নানা তীর্যক মন্তব্যও শুনতে হয়েছে পরিবারসহ তাঁকে। ফাতেমার ভাষ্য, ‘মেয়েরা কেন সার্ফিং করবে? এসব জানলে বিয়ে হবে না– আমার পরিবার এসব ভেবে চিন্তায় পড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘যে যা বলত, আমি সব ইগনোর করতাম। কিন্তু আম্মু তো তাদের সঙ্গে মেশে, তাদের কথায় আম্মু আমাকে প্রথমে সাফিংয়ে যেতে বাধা দিয়েছিলেন।’ তবে শেষ পর্যন্ত কোচ রাশেদ আলম পাশে দাঁড়ালে আবার সমুদ্রে নামেন ফাতেমা, ‘হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া কারও সমর্থন আমি পাইনি। আম্মু ও ভাইয়া সঙ্গে ছিলেন। তবে কোচের মতো কেউ আমাকে সহায়তা করেননি।’

অভাবে এক সময় পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয় ফাতেমার। তখনো তিনি সার্ফিংয়ের মতো পড়াশোনা করতে পাশে পান কোচ রাশেদ আলমকে। ফাতেমা বলেন, ‘খরচ চালাতে না পেরে মা আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধের কথা জোরেশোরে ভাবতে থাকেন। তখন কোচ রাশেদ মাকে বুঝিয়ে আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নেন।’

সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এখনো পাননি ফাতেমা। তিনি বলেন, ‘সাত-আট বছর ধরে আমি সার্ফিং করলেও, কারও পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। এমনকি আমাদের ক্লাবও পায়নি। রাশেদ ভাই নিজে চাকরি করে আমাদের ক্লাবের খরচ চালান। আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থাও উনি করেন।’

সামনেই এশিয়ান গেমস। তবে প্রস্তুতি নিয়ে ফাতেমার আক্ষেপ রয়ে গেছে। তাঁর ভাষ্যে, আমি তেমন প্র্যাকটিস করতে পারছি না। জাপানের ঢেউ অন্য রকম। আমরা যদি বাইরের কোনো দেশে গিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারতাম, তাহলে ভালো হতো। সেখানকার পরিবেশ বুঝতে পারতাম, নতুন ঢেউয়ের সঙ্গে পরিচিত হতাম।

সব ভালোই চলছিল। কিন্তু এরইমধ্যে বিপদ নেমে আসে পরিবার জেনে যাওয়ায়। পরিবারের বাধায় প্রায় দুই সপ্তাহ সার্ফিংয়ে যেতে পারেননি ফাতেমা। সমাজের নানা তীর্যক মন্তব্যও শুনতে হয়েছে পরিবারসহ তাঁকে।

সরকারের কাছে ফাতেমার চাওয়া, ক্লাব ও অনুশীলনের জায়গা। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ক্লাব সরাতে হয়। এমনকি সার্ফিং শেষে সেখানে গোসলের পানিও মেলে না। সরকার আমাদের একটি ক্লাব দিলে অনেক ভালো হতো।’

সময়ের সঙ্গে ফাতেমাকে নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। তিনি জানান, এক সময় যারা তাঁকে পানিতে নামতে দেখে খারাপ নজরে তাকাতেন, তারাই এখন অভিনন্দন জানান। ভালোই লাগে, যোগ করেন ফাতেমা।

নারী সার্ফারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সার্ফিং ভালো খেলা। এটি মানুষকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সাহস ও শক্তি জোগায়। যাদের আগ্রহ, তারা নির্বিঘ্নে সার্ফিংয়ে আসতে পারেন।’

ভবিষ্যতে অলিম্পিক সার্ফিংয়ে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াতে চান ফাতেমা। দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনাই স্বপ্ন বলে জানান তিনি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত