
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তিথিতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। দিনটি ‘জন্মাষ্টমী’ নামে পরিচিত। নানা ধর্মীয় আচার, ব্রত ও আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দিনটি পালন করেন।
হিন্দুপুরাণ অনুসারে, দ্বাপর যুগে মথুরার রাজা কংসের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তাঁর শাসনে চারদিকে অরাজকতা, নিপীড়ন ও নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। কংসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মানুষ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল।
একদিন কংস তাঁর ছোট বোন দেবকী ও তাঁর স্বামী বসুদেবকে নিয়ে রথে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি আকাশ থেকে একটি দৈববাণী শুনতে পান। সেই বাণীতে জানানো হয়, দেবকীর অষ্টম সন্তানই একদিন কংসের মৃত্যুর কারণ হবে।
এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে কংস ভয় পেয়ে যান এবং দেবকী ও বসুদেবকে হত্যা করতে উদ্যত হন। তখন বসুদেব তাঁকে প্রস্তাব দেন, তাঁদের কারাগারে বন্দী করে রাখা হোক। সন্তান জন্ম নিলে তাঁরা প্রত্যেক সন্তানকে কংসের হাতে তুলে দেবেন। কংস সেই প্রস্তাবে রাজি হন। কিন্তু পরে দেবকীর একের পর এক সন্তান
জন্ম নিলে তিনি তাদের হত্যা করতে থাকেন। এভাবে দেবকীর ছয় সন্তানকে জন্মের পরই হত্যা করা হয়।
জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণের জন্মের আনন্দের পাশাপাশি স্মরণ করা হয় ধর্ম প্রতিষ্ঠা, ভক্তি এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের বিশ্বাস। অন্ধকার কারাগারে জন্ম নেওয়া সেই কৃষ্ণই সনাতন ধর্মীয় ভাবনায় হয়ে উঠেছেন ভগবান, অবতার ও পুরুষোত্তম।
পৌরাণিক কাহিনিমতে, দৈবশক্তির মাধ্যমে সেই সন্তানকে দেবকীর গর্ভ থেকে রোহিণীর গর্ভে স্থানান্তর করা হয়। পরে তাঁর নাম হয় বলরাম।
এরপর আসে ভগবান কৃষ্ণের জন্মের রাত। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দেবকীর অষ্টম সন্তান হিসেবে কৃষ্ণের জন্ম হয়। সেই রাতে বাইরে চলছিল প্রবল ঝড়-বৃষ্টি। এমন পরিস্থিতিতেই আবার দৈববাণী আসে। বসুদেবকে বলা হয়, সদ্যোজাত শিশুকে গোকুলে নন্দ ও যশোদার কাছে রেখে আসতে হবে। বিনিময়ে যশোদার সদ্যোজাত কন্যাশিশুকে নিয়ে ফিরে আসতে হবে কারাগারে।
বসুদেব শিশুকৃষ্ণকে নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে পড়েন। দৈবশক্তির কারণে কারাগারের শিকল খুলে যায়। প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই তিনি শিশুকে নিয়ে যমুনার দিকে এগিয়ে যান। তখন যমুনার জল দুই কূল ছাপিয়ে উঠেছিল। বসুদেব প্রার্থনা করলে যমুনা তাঁর জন্য পথ করে দেয় বলে কাহিনিতে বলা হয়েছে। বিষ্ণু সপ্তমুখী সাপের রূপ নিয়ে শিশু কৃষ্ণ ও বসুদেবকে ঝড়-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করেন বলেও এই বর্ণনায় উল্লেখ আছে।
শেষ পর্যন্ত বসুদেব গোকুলে পৌঁছান। সেখানে কৃষ্ণকে যশোদার কাছে রেখে তাঁর কন্যাশিশুকে নিয়ে আবার কারাগারে ফিরে আসেন।
কংস তখনও বিষয়টি জানতে পারেননি। দেবকীর কোলে কন্যাশিশুকে দেখে তিনি আগের মতো তাকেও হত্যা করতে উদ্যত হন। কিন্তু শিশুটি তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে শূন্যে উঠে যায়। এরপর কংসকে সতর্ক করে জানায়, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!’ পৌরাণিক কাহিনিতে এই কন্যাশিশুকে দেবী যোগমায়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কাহিনি থেকেই পরে অন্যায়কারী বা অত্যাচারী শাসককে সতর্ক করে এই প্রবচন বলা হয়।
এদিকে গোকুলে তখন কৃষ্ণের জন্মকে কেন্দ্র করে আনন্দ-উৎসব শুরু হয়। তাঁর জন্মতিথিকে স্মরণ করেই জন্মাষ্টমী পালন করা হয়।
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, কৃষ্ণ বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। তাঁকে পূর্ণাবতার হিসেবেও মানা হয়। ভগবদ্গীতার বক্তব্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে যখন অধর্মের বিস্তার ঘটে এবং দুর্জনের প্রভাব বাড়ে, তখন ধর্ম ও সজ্জনদের রক্ষার জন্য ঈশ্বর অবতার হিসেবে পৃথিবীতে আসেন।
কৃষ্ণের জন্মকাহিনিকেও এই ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে দেখা হয়। কংসের অত্যাচার ও অশুভ শক্তির বিস্তারের সময় তাঁর জন্মকে ধর্ম প্রতিষ্ঠা এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির আবির্ভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
কৃষ্ণের শৈশবের নানা কাহিনিতেও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের কথা রয়েছে। কংসের নির্দেশে পুতনা নামে এক রাক্ষসী শিশুদের হত্যা করতে শুরু করেছিল। বিষাক্ত দুধ পান করানোর ছলে সে কৃষ্ণকেও হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু
কৃষ্ণ তাঁর বিষ শুষে নিয়ে তাঁকে পরাস্ত করেন। পরে কালীয় নাগ, রাজা কংসসহ আরও নানা অশুভ শক্তিকে কৃষ্ণ পরাস্ত করেছিলেন।
জন্মাষ্টমীর ধর্মীয় তাৎপর্য শুধু কৃষ্ণের জন্মদিন উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে এটি অশুভের ওপর শুভবুদ্ধির জয় এবং অধর্মের ওপর ধর্মের প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ভক্তদের মধ্যে এমন বিশ্বাসও রয়েছে যে, এই দিনে ব্রত পালন করলে মনের মলিনতা দূর হয়, সৎ গুণের বিকাশ ঘটে এবং মৃত্যুর পর আত্মা মুক্তি লাভ করে।
কৃষ্ণের সঙ্গে ‘পুরুষোত্তম’ ধারণাটিও যুক্ত। গীতায় এই শব্দের একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ক্ষর পুরুষ, অক্ষর পুরুষ এবং উত্তম পুরুষ বা পুরুষোত্তম—এই তিন ধারণার কথা বলা হয়েছে। কৃষ্ণ নিজেকে ক্ষরের অতীত এবং অক্ষরের চেয়েও উত্তম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এ কারণেই তাঁকে পুরুষোত্তম বলা হয়।
পুরুষোত্তমের এই ধারণার ব্যাখ্যায় শাস্ত্রজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি ব্যাখ্যায় ক্ষর হলো পরিবর্তনশীল জগতের প্রকাশ, অক্ষর হলো অপরিবর্তনীয় ও নীরব সত্তা, আর এ দুটির ঊর্ধ্বে যে পরম সত্তা, তিনিই পুরুষোত্তম। অন্য একটি ব্যাখ্যায় ক্ষরকে প্রকৃতি, অক্ষরকে পুরুষ বা জীবাত্মা এবং উভয়ের অতীত পরব্রহ্মকে পুরুষোত্তম বলা হয়েছে।
তাই কৃষ্ণের পুরুষোত্তম পরিচয়ের সঙ্গে শুধু তাঁর দেবত্বের বিষয়টি নয়, আত্মা, প্রকৃতি ও পরম সত্তা নিয়ে একটি দার্শনিক ধারণাও জড়িয়ে আছে।
সনাতন ধর্মীয় ভাবনায় কৃষ্ণ আবার ভক্তদের কাছে খুব আপন সত্তা। তাঁকে নানা নামে ডাকা হয়, নানা রূপে ভাবা হয়। বিশ্বাস করা হয়, ভক্ত যে নামে তাঁকে ডাকেন, তিনি সেই নামেই সাড়া দেন; যে রূপে তাঁকে পেতে চান, সেই রূপেই ধরা দেন।
দেবকী ও বসুদেবের কাছে সন্তানরূপে তাঁর আবির্ভাবও এই ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ। কংসের কারাগারের অন্ধকারে জন্ম নেওয়া সেই শিশুকে ঘিরেই পরে তৈরি হয়েছে আনন্দের উৎসব জন্মাষ্টমী।
তাই জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণের জন্মের আনন্দের পাশাপাশি স্মরণ করা হয় ধর্ম প্রতিষ্ঠা, ভক্তি এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের বিশ্বাস। অন্ধকার কারাগারে জন্ম নেওয়া সেই কৃষ্ণই সনাতন ধর্মীয় ভাবনায় হয়ে উঠেছেন ভগবান, অবতার ও পুরুষোত্তম।
লেখক: শিক্ষক
.png)