
শার্ল বোদলেয়ারের ‘লে ফ্লোর দ্যু ম্যাল’-এ সভ্যতার যে ক্লেদ সাধারণ চোখ এড়িয়ে যায়, কবির চোখ সেখানে আবিষ্কার করেছে সত্য ও সুন্দর। বাংলা সাহিত্যে প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখাতেও এমন পঙ্কে কুসুম ফোটার প্রবণতা দৃশ্যমান। মানবজীবনের নিমজ্জমান পাঁকের ভেতর থেকে তিনি খুঁজে নেন ভালোবাসা, মমতা আর আত্মত্যাগের মহত্ত্ব। তাঁর সাহিত্য যেন এই বার্তা দেয়, মানুষকে তার কলঙ্ক দিয়ে বিচার করলে সত্য দেখা হয় না; তাকে দেখতে হয় সেই কলঙ্কের গভীরে, যেখানে প্রতিটি পঙ্কে কুসুমিত সুন্দর শ্বাস নেয়, বাঁচে প্রেমে।
এমনটা ভেবেছেন কেন তিনি? মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত পেরিয়ে পৃথিবী যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিতে উন্মাদ, সেই ক্লেদাক্ত সময়ে জন্ম নেওয়া প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই ভাবনা বড় বিসদৃশ ঠেকে। কারণ বড় হতে হতে তিনি দেখেছেন পৃথিবীর উদগ্র আধুনিকতার দিকে যাত্রা, দেখেছেন বিবেকহীন, অনুতাপহীন ভোগী মানুষ। তিনি সাহিত্যজগতে এসেছিলেন রবীন্দ্র-বিরোধী কল্লোলের উন্মেষপর্বে, যে সময়ে মানুষের শরীর, যৌনতা, ক্ষুধা, নগরজীবন, দারিদ্র্য ও মানসিক সংকট প্রভাব ফেলেছিল লেখকদের অন্তর্জগতে।
প্রেমেন্দ্র মিত্রও সেই নঞর্থকতার বাইরে যেতে পারেননি। কিন্তু এরপরও তাঁর মৌলিক মানবতাবাদই এসব প্রভাবকে একত্র করে অমঙ্গলের মাঝে জ্বালিয়েছে চেতনার মঙ্গলদ্বীপ। কেমন করে? মূলত এই সূত্রই তাঁর শিল্পরহস্য।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতায় যে পথ, রাস্তা, শ্রম, শহর, ক্ষুধা ও গতি বারবার ফিরে আসে আলো-অন্ধকারের দৃশ্যকল্পে, ফলে তাঁর নন্দনতত্ত্বে ভালো ও মন্দ একই সমান্তরালের প্রসঙ্গ। যে জীবন সামাজিক বিধি, দারিদ্র্য, যৌনতা, অপরাধ, অস্পৃশ্যতা, ক্ষুধা ও অপমানের দ্বারা কলুষিত, প্রেমেন্দ্র মিত্র সেই জীবনকে পরিশুদ্ধ করে কোনো আদর্শলোক নির্মাণ না করে তার মধ্যেই মানুষের এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা, স্নেহ, প্রেম, মাতৃত্ব ও আত্মত্যাগ আবিষ্কার করেন, যা সমাজের আরোপিত নৈতিকতার চেয়ে অধিক মৌলিক। ধরা যাক তাঁর ‘মুখ’ কবিতার কবিতার প্রথম স্তবকেই তিনি যে মুখের সন্ধান করেন, তা কোনো রাজা-উজিরের নয়; তা সমাজের প্রান্তিক, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের সম্মিলিত মুখ:
‘মেলায় বাজিকরের খেলায় একটি মুখ মুখোশ প’রে হাসায়।
খেয়ার নায়ে ওপারে যেতে কবে যে কোন ভিড়ে
একটা মুখ এক নিমেষে অকূল স্রোতে ভাসায়!
কার সে মুখ, কার?
জানে কি তারা-ছিটানো অন্ধকার!’
কিন্তু কবি সেই অন্ধকারকে কেবল করুণার বিষয় না করে রেখে পরবর্তী অংশে মানুষের অন্তর্গত বেদনার মধ্যেই এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছেন:
‘সে মুখ যার পড়েছে চোখে ঘরে-ই থাকে যায় না সেও বনে,
বসত করে পাঁচিল ঘিরে, হিসেব করে পুঁজি যা আছে ভাঙায়।
তবুও কোন হতাশ হাওয়া একটা ছেঁড়া ছায়া
তারার ছুঁচে সেলাই ক’রে রাত্রি জুড়ে টাঙায়।
কার সে ছায়া, কার?
প্রাণেশ্বরী পরমা যন্ত্রণার।’
এখানে ‘ছেঁড়া ছায়া’ মানুষের বিদীর্ণ জীবন এবং তারার ছুঁচে সেলাই সেই বিদীর্ণ জীবনের মধ্যেই সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রতীক। শেষ পর্যন্ত তাই ‘প্রাণেশ্বরী পরমা’ যন্ত্রণার কাছে এসে যন্ত্রণা নিজেই হয়ে ওঠে সৌন্দর্যের উৎস; পঙ্কের গভীরতম স্তর থেকেই ফুটে ওঠে কুসুম।
‘আজ এই রাস্তার গান গাইব’ কবিতার ঘোষণায় রাস্তার প্রতি যে আকর্ষণ, তা আসলে প্রতিষ্ঠিত সৌন্দর্যের বাইরে জীবনের দিকে ফিরে যাওয়া। তাঁর কবি রাজপ্রাসাদের জানালা দিয়ে পৃথিবীকে দেখেন না; বরং রাস্তার ধুলো, চলমান মানুষ আর নাগরিক জীবনের অস্থিরতার ভেতর দাঁড়িয়ে জীবনের সৌন্দর্য দেখেন। বলেন,
‘আজ এই রাস্তায় গান গাইব, — এই নগরের শিরা উপশিরার
এই রাস্তার ধূলির গান !
—তার কাঁকর, তার খোয়া তার পাথরের—
আজ কিচ্ছু তুচ্ছ নয়।’
এখানে কবির দৃষ্টিভঙ্গিতে রাস্তা বা তার পথের ধূলি, কাঁকর কিংবা তুচ্ছ বস্তুও অবহেলার না হয়ে মানবজীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ ও সৃষ্টির দ্যোতক হয়ে উঠেছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র মূলত জীবনের তথাকথিত নিম্নতাকে সাহিত্যের বাইরে না রেখে জীবনের স্বাভাবিকতার অংশ করেছেন। তাঁর কবিতার কুসুম তাই বিপ্লবী পতাকার জাজ্বল্যমান উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা না হয়ে অন্ধকারের ভিতর মানুষের বেঁচে থাকার ছোট্ট অথচ অনমনীয় ইচ্ছারই প্রতিরূপ হয়ে উঠেছে।
এই জীবনবোধ যখন তাঁর ছোটগল্পে প্রবেশ করে, তখন ক্লেদাক্ত জীবনের বহুস্তরীয় দমন-পীড়নেও বেঁচে থাকার দুর্দমনীয় ইচ্ছায় তা সুরভিত কুসুম হয়ে ফোটে বহুরূপে। ‘সংসার সীমান্তে’ তার সবচেয়ে তীব্র উদাহরণ। অঘোর চোর, রজনী পতিতা; দুজনেই ভদ্রসমাজের নৈতিক অভিধানে বাতিল। কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁদের সেই সামাজিক নামের ভেতরে আটকে রাখেন না।
গল্পটির অসামান্যতা এখানেই যে, যারা সংসারের সীমানার বাইরে পড়ে গেছে, তারাই সংসারের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষা বহন করে। অঘোরের চুরি তাকে নৈতিকভাবে মহৎ করে না, এ কথা সত্য; কিন্তু রজনীর জন্য তার উদ্বেগ, তার সামান্য সঞ্চয় রক্ষা করার চেষ্টা, নিজের বিপদ স্বীকার করে নেওয়া—এসবের মধ্যে যে ভালোবাসা প্রকাশিত হয়, তা তার অপরাধী পরিচয়কে অতিক্রম করে। গল্পের শেষে রজনীর অপেক্ষা এবং ক্ষীণ আলোর উপস্থিতি তাই কেবল বিষাদ নয়; তা পঙ্কের ভিতর মানবিকতার শেষ দ্বীপশিখা।
ফিওদোর দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ কিংবা ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর মতো রচনাতেও অপরাধ ও মানবিকতার এই পাশাপাশি অবস্থান দেখা যায় যে মানুষকে সম্পূর্ণ ভালো বা মন্দ বলে ভাগ করা যায় না। কিন্তু প্রেমেন্দ্রের অঘোর দস্তয়েভস্কীয় আত্মদ্বন্দ্বের পুনরাবৃত্তি নয়; সে কলকাতার সামাজিক বাস্তবতায় জন্ম নেওয়া এক মানুষ, যার অপরাধের ভেতরও ভালোবাসার প্রয়োজন জেগে থাকে। পঙ্ক এখানে চরিত্রের নৈতিক পরিচয়; কুসুম তার মানবিক আকাঙ্ক্ষা।
‘সাগর সংগম’ গল্পে এই দ্বন্দ্ব আরও গভীর, কারণ এখানে পঙ্কের সঙ্গে কুসুমের সংঘাত ঘটে মানুষের বাইরের পরিচয় ও ভেতরের অনুভূতির মধ্যে। দাক্ষায়ণী ধর্মীয় সংস্কার ও জাতিগত শুচিতাবোধে আবদ্ধ; বাতাসি পতিতার কন্যা বলে জন্ম থেকেই সামাজিকভাবে কলঙ্কিত। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে দাক্ষায়ণীর ভিতরের মাতৃত্ব সমস্ত সামাজিক বিধিকে অতিক্রম করে। বাতাসির পরিচয় বদলায় না, তার জন্মের কলঙ্ক মুছে যায় না; বদলে যায় তাকে দেখার চোখ। যে সমাজ বাতাসিকে পঙ্ক বলে চিহ্নিত করেছে, সেই সমাজের তথাকথিত পবিত্রতার ভেতরেই শেষ পর্যন্ত মানবতার ঘাটতি ধরা পড়ে।
এখানে প্রেমেন্দ্র মিত্রের মানবতাবাদ রবীন্দ্রীয় মানবতাবাদের সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’, ‘দেনাপাওনা’ বা ‘স্ত্রীর পত্র’-এর মতো রচনায়ও সামাজিক বিধির ভেতর থেকে ব্যক্তিমানুষের মর্যাদা ও মুক্তির প্রশ্ন উঠে আসে; কিন্তু প্রেমেন্দ্রের মানুষ অনেক বেশি কাদামাটির কাছাকাছি। তার মুক্তি পূর্ণ হয় না, সামাজিক কাঠামোও ভেঙে পড়ে না; শুধু একটি মুহূর্তে মানুষ সামাজিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। দাক্ষায়ণীর মাতৃত্ব সেই মুহূর্তেরই কুসুম।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই জীবনদৃষ্টি বাংলা ছোটগল্পে তাঁর সমকালীনদের থেকে তাঁকে আলাদা করে। কল্লোল-পর্বের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের জীবনকে ক্ষুধা, যৌনতা, অর্থনৈতিক নিয়তি ও শরীরের বাস্তবতার ভেতর দেখেছেন; ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বা ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ -র মানুষ নৈতিকভাবে নির্মল নয়, তারা প্রবৃত্তি ও প্রয়োজনের দ্বারা চালিত। তারাশঙ্করের প্রান্তিক মানুষের মধ্যেও কামনা, হিংসা, কুসংস্কার ও জীবনীশক্তি পাশাপাশি থাকে।

প্রেমেন্দ্রের কাছেও মানুষ এই দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু তাঁর বিশেষত্ব হলো, তিনি সেই দ্বন্দ্বের ভিতর থেকে একটি মানবিক আলোকরেখা খুঁজে নেন। মানিক যেখানে মানুষের নিয়তিকে অনেক সময় শরীর ও অর্থনীতির কাছে সমর্পিত দেখান, প্রেমেন্দ্র সেখানে সেই নিয়তির মধ্যেও ভালোবাসার সম্ভাবনাটুকু উদ্ধার করেন। তারাশঙ্করের পঙ্কে মাটির গন্ধ, প্রেমেন্দ্রের পঙ্কে নগরের ধুলো; কিন্তু দুজনেরই শিল্পে প্রান্তিক জীবন ভদ্রসমাজের নন্দনতত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।
এই একই সূত্রে ‘শুধু কেরানী’-র মতো গল্পের সামান্য ঘটনাও প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে গভীর মানবিক তাৎপর্য পায়। অর্থাভাবের মধ্যে সামান্য উপহার, সংসারের ক্ষুদ্র আনন্দ কিংবা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মমতা—এগুলো বাহ্যিকভাবে এতই ছোট যে সাহিত্যিক বিষয় বলে মনে নাও হতে পারে। কিন্তু অভাবের পটভূমিতে সামান্য ফুলও তখন বিরাট হয়ে ওঠে। কারণ কুসুমের সৌন্দর্য তার আকারে নয়, যে পঙ্ক থেকে সে উঠে এসেছে তার গভীরতায়। এই জায়গায় প্রেমেন্দ্রের সাহিত্যিক কৌশল অত্যন্ত সূক্ষ্ম: তিনি দারিদ্র্যকে রোমান্টিক করেন না, কিন্তু দারিদ্র্যের ভিতর ভালোবাসাকে অস্বীকারও করেন না। ক্ষুধা মানুষকে নিষ্ঠুর করতে পারে, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষ যে ভালোবাসতে পারে, এই আপাতসাধারণ সত্যটিই তাঁর কাছে অসাধারণ হয়ে ওঠে।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের উপন্যাসের মানুষেরাও অভাব, ক্ষুধা, সামাজিক অসমতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ক্ষতবিক্ষত। কখনো কখনো তাদের জীবনও অপরাধ ও নৈতিক সংকটেও জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই পঙ্কিল বাস্তবতার মধ্যেই প্রেম, সহমর্মিতা, সংহতি ও বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা আবার তাদের ফিরিয়ে আনে মানবিক মর্যাদায়।
‘পাঁক’ উপন্যাসে এসে এই ব্যক্তিগত মানবিকতার সামাজিক মাত্রার অনন্য রূপ দেখতে পাওয়া যায়। কলকাতার বস্তি, নিম্নবর্গীয় জীবন, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অবক্ষয়কে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসের পাঁক তাই শুধু কাদা নয়; এটি একটি শ্রেণিগত ও নাগরিক বাস্তবতার নাম। এই মানুষগুলো পঙ্কে বাস করে বলে পঙ্কিল হয়ে ওঠেনি, বরং সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোই তাদের অনিবার্য পঙ্কের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এখানেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের দৃষ্টির সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার মিল দেখা যায়।
ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজেরেবল’-এ জাঁ ভালজাঁ-এর মতো চরিত্রের মাধ্যমে যেমন অপরাধীর সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে মানুষের সম্ভাবনা আবিষ্কৃত হয়, প্রেমেন্দ্রও প্রান্তিক মানুষকে তার অপরাধ বা দারিদ্র্যের পরিচয়ে শেষ করেন না। তবে হুগোর মানুষ অনেক সময় নৈতিক পুনর্জন্মের দিকে এগোয়; প্রেমেন্দ্রের মানুষ তেমন পূর্ণ মুক্তি পায় না। তার পাঁক থেকেই তাকে বাঁচতে হয়। ফলে তাঁর মানবতাবাদ আরও নির্মোহ; মানুষ মহৎ হতে পারে, অথচ তার জীবন একই সঙ্গে দুর্বিষহ থেকে যেতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্য কেবল দারিদ্র্যের আখ্যান হয়ে ওঠে না, আবার সস্তা মানবতাবাদও হয় না। তিনি দরিদ্রকে মহৎ বানানোর জন্য তার ক্ষুধা মুছে দেন না, পতিতাকে পবিত্র করার জন্য তার সামাজিক পরিচয় বদলে দেন না, চোরকে নায়ক বানানোর জন্য তার অপরাধ অস্বীকার করেন না। বরং তাঁর শিল্পের শক্তি হলো, অন্ধকারকে অন্ধকার রেখেই তার ভেতর থেকে আলোর জন্ম দেখানো। এই কারণেই পঙ্কে কুসুম ফোটানো তাঁর কাছে নিছক শিল্প নয়, মানুষের অস্তিত্বকে দেখার একটি পদ্ধতি। পঙ্ক ও কুসুম এখানে পরস্পরের বিপরীত হলেও বিচ্ছিন্ন নয়; কুসুমের সৌন্দর্য পঙ্কের কারণেই তীব্র হয়ে প্রকাশ পায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখায়।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতাও শেষ পর্যন্ত এই জায়গাতেই। তাঁর সময়ের দারিদ্র্য, নগর-সংকট, সামাজিক বিভাজন কিংবা মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তার রূপ বদলেছে, কিন্তু মানুষের প্রান্তিকতা বদলায়নি; সমাজ এখনও মানুষকে তার পরিচয়, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক মর্যাদা দিয়ে বিচার করে। সেই পৃথিবীতে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্য আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়— মানুষের দৃশ্যমান পরিচয়ই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। পাঁকের গভীরে আরও একটি জীবন আছে, যে জীবন ভালোবাসতে চায়, আপন করতে চায়, কারও জন্য অপেক্ষা করতে চায়, বিপদের মুহূর্তে অন্যের পাশে দাঁড়াতে চায়। সেই জীবনই তাঁর কুসুম।
বোদলেয়ারের ক্লেদজ কুসুমের মতো প্রেমেন্দ্র মিত্রও সৌন্দর্যকে নির্মলতার একচেটিয়া অধিকার থেকে মুক্ত করেছিলেন; কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল সৌন্দর্যের চেয়েও গভীর কিছু—মানুষের মহত্ত্ব। তাই তাঁর সাহিত্যে পঙ্ক নোংরা বাস্তবতা হয়ে থাকেনি, আবার কুসুমও কোনো অলীক স্বর্গ হয়ে কল্পনায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পঙ্কের মধ্যেই কুসুম ফুটেছে, অন্ধকারের মধ্যেই আলো জ্বলেছে, অপরাধের ভেতরেও এসেছে ভালোবাসা, কলঙ্কের ভেতরে মাতৃত্ব, অভাবের ভেতরে মমতা। তাঁর চরিত্ররা পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে না, নিজেদের ভাগ্যও সবসময় বদলাতে পারে না; তবু তারা এক মুহূর্তের জন্য মানুষ হয়ে ওঠে—আর সেই মুহূর্তটিই প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্যে পঙ্কে ফোটা কুসুমের সবচেয়ে উজ্জ্বল পাপড়ি।
.png)

সেটাই যথার্থ কবিতা, যা যে ভাষায় আমাদের সবার চৈতন্যকে করে বাঙ্ময়, অবচেতনকে জ্যোতির্ময়, মন্ত্রে পরিণত করে মানবিক প্রত্যয় ও শপথ। কেননা আজ, বিবেকী কবির অনুভব—‘শীতের মতই রক্ত মিশে আছে কবিতায়/ মৃত্যুর মতই রক্ত মিশে আছে কবিতায়।’ —বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইতিহাসের প্রতি আমার এক ধরনের টান আছে। ২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আগে প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলাম। ব্যস্ত এই মহানগরীতে প্রথম যে জায়গা দেখতে গিয়েছিলাম সেটি ছিল জাতীয় জাদুঘর। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ব্রিসবেন। আর এই শহরের প্রাণকেন্দ্র কুইন স্ট্রিট।
৩১ আগস্ট ২০২৬
এই ছোট শোকগাথা লিখেছেন ঢাকার কবি শামিম জামানভি। তাঁর কবিবন্ধু সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমির মৃত্যুতে। ফ্যাহমি গত হয়েছেন ৩০ আগস্ট ২০২৬ সালে।
৩১ আগস্ট ২০২৬
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬। সন্ধ্যা ছয়টা। ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। ষ্টেজের সামনে পানি জমে গেছে। দর্শকদের অনেকেই ভিজে একাকার। তবু কেউ চলে যাচ্ছে না। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, ভিড় ততই বাড়ছে। এই ভিড়েরই একজন ২২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলিফ। আতিফ আসলামকে সামনে থেকে দেখবেন বলে ১০৯ কিলোমিটার পথ প
৩০ আগস্ট ২০২৬