বেকারি পণ্যের দাম ২০% বাড়ছে, ‘পেটে লাথি’ শ্রমজীবীর

বেকারি পণ্যের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর হতে পারে। স্ট্রিম গ্রাফিক
বেকারি পণ্যের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর হতে পারে। স্ট্রিম গ্রাফিক

চিনি বেশি দিয়ে দুধ চা। সঙ্গে একটি কলা ও পাউরুটি। চায়ে রুটি চুবিয়ে খাচ্ছেন হান্নান মিয়া। রাজধানীর রামপুরা এলাকায় রিকশা চালান তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন সংলগ্ন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, হালকা ক্ষুধায় চা-রুটি ভালো কাজ দেয়। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, রুটির সাইজ ছোট হচ্ছে। একটি খেলে পেট কিছুই টের পায় না।

আক্ষেপ করে স্ট্রিমকে হান্নান মিয়া বলেন, ‘আমাদের মতো গরিবেরা দুই বেলার নাস্তা ৪০ টাকার চা-রুটিতে সারে। দোকানেই বলাবলি হচ্ছে– রুটির দাম নাকি বাড়বে। শ্রমজীবীদের পাশে কেউ নেই। সবাই পেটে লাথি দিয়ে শান্তি পান।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সমিতির সবার মতামত নিয়ে বেকারি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন দর আগামী সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর হতে পারে।’

রাজধানীর কারওয়ানবাজারে মিন্তির কাজ করেন শাহ আলম সাজু। আলাপকালে বেকারি পণ্যের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। স্ট্রিমকে সাজু বলেন, ‘কেক-রুটির দাম বাড়বে– প্রায় এক মাস ধরে শুনতেছি। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হবে খেটে খাওয়াদের। কারণ, হালকা খিদে মেটাতে রুটি-কলাই আমাদের ভরসা।’

সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারি প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে রাজধানীতে সাত শতাধিক। কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে উৎপাদন খরচ ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে গ্যাস-বিদ্যুৎ ঠিকমতো না থাকায় উৎপাদন ১০-১৫ শতাংশ কমে গেছে।

উৎপাদন খরচ মেটাতে হিমশিম

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মধুমিতা ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরি। তাদের পাউরুটি, কেক, বিস্কুট ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হয়। সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদনে ধস নেমেছে। বিকল্প উপায়ে উৎপাদন ঠিক রাখতে খরচ বেড়েছে। ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানান মধুমিতা ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরির কর্ণধার বোরহান উদ্দিন।

স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘বেকারি পণ্যের এমন কোনো কাঁচামাল নেই, যার দাম বাড়েনি। আদা-ময়দার দাম চড়া। গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় বানাতে পারছি না। সিলিন্ডার ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুণতে হচ্ছে। বাড়ছে ব্যাংক ঋণ। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যবসা গোটাতে হবে।’

বেকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে তাঁরা ৫০ কেজি বস্তার ময়দা ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনছেন, যা বছরখানেক আগে ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা। বস্তাপ্রতি চিনি ১ হাজার ২০০, ডালডা ১৬ কেজির কার্টন ৮০০ এবং সয়াবিন তেল ১৮৫ কেজির ড্রামে বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা।

সমিতির তথ্যে, সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারি প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে রাজধানীতে সাত শতাধিক। কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে উৎপাদন খরচ ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে গ্যাস-বিদ্যুৎ ঠিকমতো না থাকায় উৎপাদন ১০-১৫ শতাংশ কমে গেছে। চলমান সংকট দীর্ঘ হলে ছয় মাসের মধ্যে বেকারি খাত ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সমিতির নেতারা।

টিকে থাকতে বিকল্প নেই

বেকারি পণ্যের মূল কাঁচামাল ময়দা, ভোজ্যতেল, ডালডা ও চিনি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য, গত ছয় মাসে সবকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। খুচরায় প্রতিকেজি খোলা ময়দার দাম গত ছয় মাসে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। খোলা সয়াবিন ৫ ও চিনির দাম গড়ে বেড়েছে ১১ শতাংশ। বর্তমান বাজারে প্রতিকেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়, যা এক মাস আগেও ছিল ১০০-১০৫। খোলা আটার দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫০ টাকায়। খোলা ময়দা কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ঠেকেছে ৬৫-৭০ টাকায়।

বেকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে তাঁরা ৫০ কেজি বস্তার ময়দা ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনছেন, যা বছরখানেক আগে ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা। বস্তাপ্রতি চিনি ১ হাজার ২০০, ডালডা ১৬ কেজির কার্টন ৮০০ এবং সয়াবিন তেল ১৮৫ কেজির ড্রামে বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা।

রায়েরবাজারে খাজা বেকারির ব্যবস্থাপক আবুল খায়ের স্ট্রিমকে বলেন, বেকারি চালাতে গিয়ে আমাদের মূলধন শেষ। প্রত্যেক জিনিসের দাম বেড়েছে। এমন অবস্থায় বেকারি পণ্যের দাম না বাড়লে পথে বসতে হবে। লাইনের গ্যাস নেই। সিলিন্ডার ব্যবহারে ব্যয় বাড়ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় ওভেনের পণ্যও নষ্ট হচ্ছে।

সরকার দাম বৃদ্ধিতে বাগড়া দিলে বেকারি বন্ধ করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কয়েক মাসে ঢাকার প্রায় অর্ধশত বেকারি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ফ্যাক্টরি চালালে দিনে গড়ে আমার ৩ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। বন্ধ রাখলে হবে এক হাজার।’

সমিতির সবার মতামত নিয়ে বেকারি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন দর আগামী সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর হতে পারে। জালাল উদ্দিন, সভাপতি, বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি

দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা– প্রশ্নে জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সরকারের স্টেকহোল্ডাররা তো আমাদের সঙ্গে না বসেই তেল, ময়দা, চিনির দাম বাড়িয়েছেন। আমাদের এই ক্ষুদ্র শিল্প নিয়ে সরকার ভাবেও না; অনুদানও নেই। ফলে দাম সরকার ঠিক করে দেয় না, সমিতিই সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের এই শিল্পে ২৫ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন। কারখানা বন্ধ হলে তারা কোথায় যাবেন? সরকারের এই দিকে নজর দেওয়া উচিত।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত