ভালোবাসলেই সব সময় ঘর বাঁধা যায় না কেন: সম্পর্কের ‘অ্যাংজাইটি-অ্যাভয়েডেন্ট লুপ’

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ২২: ১৩
নিজের নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে উঠে সম্পর্কের ভয় নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অর্জিত নিরাপদ আসক্তি’ বলা হয়। সংগৃহীত ছবি

সম্পর্ক নিয়ে আমাদের সবারই অনেক স্বপ্ন থাকে। আমরা চাই ভালোবাসার মানুষটি আমাদের পাশে থাকুক। কিন্তু বাস্তবে কি সব সময় এমন হয়? দেখা যায়, সম্পর্কে গভীর ভালোবাসা থাকার পরও দু’জনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্বই ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভাঙন ধরায়।

হয়তো একজন সবকিছু শেয়ার করতে চায়। অন্যদিকে আরেকজন নিজেকে গুটিয়ে নেয়, চুপচাপ হয়ে যায়। এই অবস্থাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যাংজাইটি-অ্যাভয়েডেন্ট লুপ’। চলুন, সম্পর্কের এই জটিল সমীকরণ সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

‘অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’ বা ভালোবাসার ধরন

আমরা ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করব, অনেক ক্ষেত্রে তা নির্ভর করে আমাদের ‘অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’ বা ভালোবাসার ধরনের ওপর। ছোটবেলায় বাবা-মা বা কাছের মানুষের কাছ থেকে আমরা যেমন যত্ন পেয়েছি, তার ওপর ভিত্তি করেই এই ধরন তৈরি হয়।

ছোটবেলায় যারা পর্যাপ্ত ভালোবাসা ও যত্ন পায়, তাঁরা পরবর্তী সময়ে অন্যদের সহজে বিশ্বাস করতে পারে। তাঁদের মধ্যে সাধারণত ‘সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’ বা ‘নিরাপদ আসক্তি’ তৈরি হয়। কিন্তু যারা শৈশবে পর্যাপ্ত যত্ন পায়নি, সাধারণত তাঁদের মনে তৈরি হয় নিরাপত্তাহীনতা বা ‘অনিরাপদ আসক্তি’।

পাশাপাশি উদ্বিগ্ন মানুষেরা মনে করে, ভালোবাসা হয়তো এমনি এমনি পাওয়া যায় না। সংগৃহীত ছবি
পাশাপাশি উদ্বিগ্ন মানুষেরা মনে করে, ভালোবাসা হয়তো এমনি এমনি পাওয়া যায় না। সংগৃহীত ছবি

এই অনিরাপদ আসক্তি প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে। এর একটি হলো ‘উদ্বিগ্ন আসক্তি’। এই ধরনের মানুষরা সম্পর্কের ব্যাপারে খুব বেশি সংবেদনশীল হয়। তাঁরা সবসময় ভয় পায় যে ভালোবাসার মানুষটি হয়তো তাঁদের ছেড়ে চলে যেতে পারে। তাই বারবার সঙ্গীর কাছে আশ্বাস পেতে চায়।

অন্যদিকে অনিরাপদ আসক্তির আরেকটি ধরন হলো ‘এড়িয়ে চলা আসক্তি’ বা ‘এভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট’। এমন মানুষরা আবেগ প্রকাশ করতে বা খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে ভয় পায়। তাঁরা সবসময় নিজের স্বাধীনতা ও সীমা নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। সম্পর্ক গভীর হলে তাঁদের মনে হয় যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। ফলে সঙ্গীর থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে দূরে সরে যেতে শুরু করে।

বিপরীত স্বভাবের মানুষ কেন সম্পর্কে জড়ায়

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, স্বভাব সম্পূর্ণ আলাদা হলে একসঙ্গে থাকতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, উদ্বিগ্ন ও এড়িয়ে চলা স্বভাবের মানুষেরাই বেশি একে অপরের প্রেমে পড়ে। এর কারণ প্রেমে পড়ার সময় দুইজনের মনেই এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে।

শৈশবের অভিজ্ঞতার জন্য তাঁদের ধারণা হয় যে হয়তো তাঁরা ভালোবাসার যোগ্য নয়। তাই যখন একে অপরকে পায়, তখন স্বস্তি পায়। কাছাকাছি আসা দুটো মানুষের মনে হয়, এই পৃথিবীতে একা নয়, তাঁদের মতো আরও একজন আছে।

সম্পর্কে এই ধরনের সমস্যা থাকলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আসক্তির ধরন কোনো ব্যক্তির কোনো স্থায়ী স্বভাব নয়, চাইলেই এটা পরিবর্তন করা সম্ভব। তর্কে জিতে বা সঙ্গীকে দোষারোপ করে এই চক্র ভাঙা যাবে না। এর জন্য দুই জনেরই মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

পাশাপাশি উদ্বিগ্ন মানুষেরা মনে করে, ভালোবাসা হয়তো এমনি এমনি পাওয়া যায় না। কষ্ট করে অর্জন করে নিতে হয়। তাই সঙ্গীকে প্রচুর ভালোবাসে। অন্যদিকে ‘এড়িয়ে চলা’ স্বভাবের সঙ্গী যখন দূরে সরে যায়, তখন উদ্বিগ্ন সঙ্গীর মনে হয়, তাঁকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়ে আটকে রাখতে পারলেই তা হবে সবচেয়ে বড় জয়।

আবার, এড়িয়ে চলা মানুষেরাও মনে মনে ভালোবাসা চায়। কিন্তু তাঁরা তা প্রকাশ করতে পারে না। যখন একজন উদ্বিগ্ন সঙ্গী কোনো প্রতিদান ছাড়াই তাঁদের ভালোবাসতে থাকে, তখন তাঁদের কাছে সম্পর্ক একদম নিখুঁত মনে হয়। কারণ, এখানে তাঁদের নিজের কোনো আবেগ প্রকাশ করতে হচ্ছে না, অথচ অঢেল ভালোবাসা পাচ্ছে।

কিন্তু সম্পর্কের শুরুতে সবকিছু ভালো লাগলেও, কিছুদিন পর সমস্যা শুরু হয়। তৈরি হয় জটিল চক্র। কোনো বিষয় নিয়ে মতের অমিল বা মানসিক দূরত্ব তৈরি হলে উদ্বিগ্ন সঙ্গী ভয় পেয়ে যায়। সে বারবার সঙ্গীর কাছে গিয়ে বুঝতে চায় যে সবকিছু ঠিক আছে কি না। এই অতিরিক্ত চাপ বা ঘনিষ্ঠতার চেষ্টায় এড়িয়ে চলা সঙ্গী ঘাবড়ে যায়। সে তখন নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে দূরে সরে যায়।

সঙ্গীকে দূরে সরে যেতে দেখে উদ্বিগ্ন সঙ্গীর ভয় আরও বেড়ে যায়। সে তখন রেগে যায়, কান্নাকাটি করে বা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার কথা বলে। এই তীব্র আবেগের প্রকাশ দেখে এড়িয়ে চলা সঙ্গী মানসিক চাপে আরও বেশি দূরে সরে যায়। এভাবেই চক্রটি বারবার ঘুরতে থাকে। সম্পর্কে তিক্ততা বাড়ে।

নিজেকে এবং সঙ্গীকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সংগৃহীত ছবি
নিজেকে এবং সঙ্গীকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সংগৃহীত ছবি

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই দুই জনের মধ্যে হয়ত সত্যিই গভীর ভালোবাসা থাকে। কিন্তু এমন বিপরীতমুখী চাহিদার কারণে তাঁদের মনে হয়, এই সম্পর্ক কখনো সুখের হবে না। তাঁদের কেউ বুঝছে না। এ কারণে অনেক ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্কও নিজেদের স্বভাবের জন্য পরিণতি পায় না।

চক্র ভাঙার উপায়

সম্পর্কে এই ধরনের সমস্যা থাকলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আসক্তির ধরন কোনো ব্যক্তির কোনো স্থায়ী স্বভাব নয়, চাইলেই এটা পরিবর্তন করা সম্ভব। তর্কে জিতে বা সঙ্গীকে দোষারোপ করে এই চক্র ভাঙা যাবে না। এর জন্য দুই জনেরই মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

প্রথমেই বুঝতে হবে যে আপনারা নেতিবাচক চক্রে আটকে আছেন। কখন এবং কীভাবে এই সমস্যা শুরু হচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।

এরপর নিজেকে এবং সঙ্গীকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। উদ্বিগ্ন সঙ্গীকে বুঝতে হবে, দূরে সরে যাওয়ার মানে এই নয় যে সে ভালোবাসে না। এটা তাঁর মানসিক চাপ মোকাবিলার একটি ধরন মাত্র। অন্যদিকে, এড়িয়ে চলা সঙ্গীকে বুঝতে হবে, দূরে সরে যাওয়ার আগে সঙ্গীকে আশ্বস্ত করা জরুরি। রাগের মাথায় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শান্ত হয়ে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে।

নিজের নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে উঠে সম্পর্কের ভয় নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অর্জিত নিরাপদ আসক্তি’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও চেষ্টা থাকলে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যায়। আর প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা থেরাপির সাহায্য নেওয়াও কার্যকর হতে পারে।

সূত্র: পজেটিভ সাইকোলজি

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত