সত্যজিতের হিউমারাস্ত্র

রাজীব নন্দী
রাজীব নন্দী

স্ট্রিম গ্রাফিক

গতকাল ছিল পয়লা মে, মেহনতের দিন। আজ ২ মে, মগজ-বুদ্ধি আর হাসির রাজা ‘জয় বাবা মানিকনাথ’-এর জন্মদিন। ‘মানিক’ মানে সত্যজিৎ রায়ের ডাক নাম। এই মানুষটা (মানে সত্যজিৎ রায়) আমাদের নিয়ে কত সুন্দর করে মজা করে গেছেন!

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা নিয়ে একটা ভুল ধারণা আছে— অনেকে ভাবেন, ওসব খুব সিরিয়াস, দেখলে নাকি গম্ভীর হয়ে যেতে হয় বা গম্ভীর না হলে দেখা যায় না। আসলে উল্টোটাই সত্যি। মনোযোগ দিয়ে দেখলেই বুঝি, তিনি আসলে আমাকে-আপনাকে নিয়ে হেসেই খুন। তবে সত্যজিতের সৃষ্টি সেই হাসি খুব ভদ্র, খুব চাপা—যেন পাশের সিটে বসে কেউ কনুই মেরে বলছে, ‘দেখছ? এটাই আমরা!’ সত্যজিতের হিউমার হচ্ছে ওই ‘মগজাস্ত্র’। জোর করে হাসাবে না, কিন্তু মাথায় ঢুকে যাবে। হিউমারের এই অস্ত্রকে বলা যেতে পারে ‘হিউমারাস্ত্র’।

‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ রূপকথার মোড়কে দারুণ এক স্যাটায়ার। ভূতের রাজা এসে তিনটে বর দিলেন—খাওয়া, পোশাক, আর গান গেয়ে সবাইকে কাবু করা। মানে জীবনটা একেবারে শর্টকার্টে চালানোর ফর্মুলা! ‘মহারাজা তোমারে সেলাম…’—শুনতে যতটা ভদ্র, ভেতরে ততটাই খোঁচা। তেল দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এমনভাবে যে আপনি বুঝেও হাসছেন। আর যুদ্ধের দৃশ্যটা? সৈন্যরা নাচতে শুরু করল! সত্যজিৎ যেন বলছেন—তোরা এতক্ষণ মারামারি করেছিলি, এবার একটু নাচে মন দে! যুদ্ধকে এর চেয়ে মজারভাবে অপমান করা যায় না।

‘হীরক রাজার দেশে’তে এসে সেই হাসিটা হয়ে যায় অনেক বেশি ধারালো। ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান’—ছোটবেলায় ক্যাচি, বড় হয়ে দেখি পিউর বিদ্রূপ। অত্যাচারী রাজার বচনে পাঠশালায় শেখানো হচ্ছে—‘বিদ্যা লাভে লোকসান, নাহি অর্থ নাহি মান’—শুনে হাসি পায়, কিন্তু একটু পরে গায়ে লাগে। সত্যজিৎ এখানে ক্ষমতাকে এমনভাবে ‘ওভার দ্য টপ’ সংলাপ বানিয়েছেন যে সেটাই নিজে একটা কৌতুক হয়ে গেছে, আর সেই কৌতুকটাই ভয়ংকর।

ফেলুদা সিরিজে হিউমার একেবারে ঠান্ডা, পরিশীলিত। ফেলুদা খুব বেশি হাসি-তামাশা করে না, কিন্তু যখন করে তখন সোজা গিয়ে লাগে। ‘মগজাস্ত্র’—এই এক শব্দেই পুরো চরিত্রটা। মাথা ঠান্ডা, কথা কম, কিন্তু খোঁচা নিখুঁত। পাশে তোপসে, আর সামনে রহস্য—এই পুরো সেটআপটাই মাঝে মাঝে এমনভাবে মজার হয়ে ওঠে যে আপনি টেরই পান না কখন হেসে ফেললেন।

জয় বাবা ফেলুনাথ সিনেমায় মগনলাল মেঘরাজকে দেখলে বোঝা যায়, সত্যজিৎ ভিলেনদেরও একটু হাস্যকর করে তুলতে ভালোবাসেন। লোকটা ভয়ংকর, কিন্তু এতটাই নাটুকে যে মাঝে মাঝে মনে হয়—ভাই, একটু কম শোঅফ করলেও পারত! ফেলুদার সামনে বসে তাঁর সেই ওভার কনফিডেন্ট দেখনোর চালবাজি—দেখতে দেখতে বুঝি, এ একেবারে ইগোইস্টিক কমেডি।

এবার আসি জটায়ুতে। লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু ঢুকলেই দৃশ্যের হাওয়া বদলে যায়। উনি হাসান, নিজে হাসির পাত্র হন, দর্শক তবুও ভালোবাসেন তাঁকে। কোথায় যেন একটা সরল জীবনের জটায়ু।

এটাই আসল জাদু। তাঁর বইয়ের নাম শুনলেই বোঝা যায়—তিনি নিজেই নিজের প্যারোডি। ‘সাহারায় সীতাহরণ’ কি সিরিয়াসলি লিখতে পারেন? তবু তিনি লেখেন, আর দারুণ আত্মবিশ্বাসে ভুলভাল লেখেন। জটায়ুর সবচেয়ে বড় কমেডি হলো তাঁর ভয়। তিনি ভীষণ ভয় পান, কিন্তু সেটা মানতে চান না। বিপদে পড়লেই সেই ক্লাসিক লাইন—‘আরে না না, আমি ভয় পাইনি… একটু নার্ভাস!’ এই অস্বীকারটাই আসল ঠাট্টা। সবাই জানে তিনি ভয় পেয়েছেন, তিনিও জানেন—তবু চালিয়ে যাচ্ছেন। আর তাঁর ভাষা—বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, নিজের বানানো শব্দ—সব মিশিয়ে একেবারে ‘হররিফিক!’ শুনলেই বোঝা যায়, ভয়ও আছে, এক্সাইটমেন্টও আছে।

তবু শেষ পর্যন্ত জটায়ু শুধু কমিক রিলিফ না। তিনি লয়াল, সরল, আর অসম্ভব রসিক। মাঝে মাঝে তিনিই এমন কিছু ক্লু দেন, যা কেসে কাজে লাগে—নিজেও বুঝতে পারেন না! ফেলুদার বুদ্ধি, তোপসের যুক্তি, আর জটায়ু হচ্ছে রসবোধ—যেন জবর দোস্তি!

রায়ের তথাকথিত ‘গম্ভীর’ ছবিগুলোতেও হিউমার কম নেই। ‘অপুর সংসার’-এ অপু আর অপর্ণার সম্পর্কের ছোট ছোট মুহূর্ত—নতুন বিয়ের লাজুকতা, খুনসুটি—এসব এত স্বাভাবিক যে হাসিটা নিজে থেকেই আসে। ‘মহানগর’-এ অফিসের পরিবেশ, বসের কথা বলার ভঙ্গি—সবকিছুতেই সীমিত কমেডি।

সত্যজিৎ রায়ের সংলাপে হাস্যরসের আরেকটা দারুণ দিক হলো—তিনি চরিত্রের সামাজিক অবস্থান আর মানসিকতার ভেতর থেকেই মজা বের করেন। যেমন ‘সীমাবদ্ধ’-তে কর্পোরেট দুনিয়ার লোকজন এত গম্ভীর হয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি নিয়ে কথা বলে যে সেটাই আসলে হাস্যকর হয়ে ওঠে। কেউ সরাসরি হাসির কথা বলছে না, কিন্তু তাদের কথাবার্তার ভেতরকার ফাঁপা গুরুত্বটাই আসল মজা। আবার ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-তে চাকরির সাক্ষাৎকারে যে ধরনের প্রশ্ন-উত্তর হয়, সেখানে একটা অদ্ভুত অস্বস্তিকর হাসি আছে—যেন সবাই জানে খেলাটা ভণ্ডামির, তবু সবাই নিয়ম মেনে খেলছে।

আর সত্যজিতের সংলাপে নিজের অজান্তেই নিজের অবস্থা নিয়ে মজা করার প্রবণতাও খুব লক্ষণীয়। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-তে শহুরে চার বন্ধু জঙ্গলে গিয়ে নিজেদের খুব আধুনিক আর পরিশীলিত প্রমাণ করতে চায়, আর সেই চেষ্টার মধ্যেই বারবার ফাঁস হয়ে যায় তাদের অস্বস্তি। তারা যা বলছে আর তারা আসলে যেমন—এই দুয়ের ফারাকটাই সংলাপের মধ্যে হাস্যরস তৈরি করে। সত্যজিৎ এখানে কাউকে সরাসরি বিদ্রূপ করেন না, কিন্তু সংলাপ এমনভাবে বসান যে দর্শক নিজেই সেই ফাঁকটা দেখে হেসে ফেলে।

‘পরশ পাথর’ পুরোটেই মধ্যবিত্তীয় বিদ্রূপ। একজন মানুষ হঠাৎ কেরামতিতে ধনী হয়ে গেলেন—তারপর কী করবেন বুঝতেই পারছেন না! এই ‘অকোয়ার্ড’ অবস্থাটাই আসল জোক। আবার ‘মহাপুরুষ’-এ ভণ্ড গুরুর আত্মবিশ্বাস—তিনি যত বলেন, ততই বোঝা যায় কিছুই জানেন না। তবু সবাই বিশ্বাস করছে—এই জায়গাটাই খাঁটি রস।

শেষ পর্যন্ত মনে হয়, সত্যজিৎ রায়ের হিউমার আসলে অন্য কাউকে নিয়ে না—আমাদের নিয়েই। আমাদের ভয়, আমাদের লোভ, আমাদের বোকামি—সবকিছু নিয়ে তিনি মজা করেন।

সত্যজিৎ শিখিয়ে গেছেন—রস গড়িয়ে পড়া আনন্দে হাসতে জানতে হয়, তবেই আসল বুদ্ধি। যে হাসি মুখে দেখা যায় না, লুকিয়ে থাকে মগজে। ওহে মগজাস্ত্রের গুরু মানিকনাথ, জন্মদিনে তোমারে সেলাম!

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক; নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ের গবেষক

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত