স্ট্রিম প্রতিবেদক

মা দিবসের কথা উঠতেই জানকী চিসিমের মনে পড়ে নিজের মাকে। তবে মায়ের স্মৃতি তার কাছে শুধু শোক বা ভালোবাসার নয়, নিজের পরিচয়েরও উৎস। শেরপুরের এই গারো তরুণীর নামের শেষ অংশ, মাহারি, বংশপরিচয়, সবই এসেছে মায়ের দিক থেকে।
মায়ের মৃত্যুর সময় জানকী দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বাবার বাড়িতে জন্ম হলেও মায়ের মৃত্যুর পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বসে দুই মাহারি। বাবা ছিলেন চাম্বুগং মাহারির, আর জানকী মায়ের দিক থেকে চিসিম মাহারির কন্যা। তাই প্রশ্ন ওঠে, চিসিম মাহারির এই মেয়ের দায়িত্ব নেবে কে?
শেষ পর্যন্ত বাবার কাছে নয়, জানকীকে বড় হতে হয় মায়ের বড় বোনের কাছে। সেই ছোট বয়সে বিষয়টি তার কাছে কষ্টের ছিল। বাবা বেঁচে থাকতেও কেন বাবার সঙ্গে থাকতে পারছেন না, তা বুঝতে পারেননি। পরে বুঝেছেন, গারো সমাজে মায়ের পরিচয় শুধু নামের সঙ্গে যুক্ত কোনো পদবি নয়; সেটি দায়িত্ব, আত্মীয়তা ও বংশের ধারাবাহিকতারও সূত্র।
জানকী বলেন, ‘তখন বুঝেছিলাম, আমি যেহেতু মাতৃসূত্রীয়, তাই বাবার সঙ্গে না থেকে বড় মায়ের সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। চিসিম মাহারির কন্যা হিসেবে আমার দায়িত্ব চিসিম মাহারির কাঁধে চলে আসে।’
বাংলাদেশে মা দিবস সাধারণত মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ ও স্মৃতির গল্পে ঘেরা। কিন্তু গারো বা মান্দি সমাজে ‘মা’ শুধু আবেগের মানুষ নন। মায়ের নামেই গড়ে ওঠে সন্তানের মাহারি, গোত্র, পদবি ও বংশপরিচয়। মা দিবসের প্রেক্ষাপটে তাই গারো সমাজের এই মাতৃসূত্রীয় বাস্তবতা মায়ের আরেক সামাজিক অর্থ সামনে আনে।
মাতৃসূত্রীয় সমাজে মেয়ের দায়িত্ব
গারো সমাজ মাতৃসূত্রীয়। সন্তানরা মায়ের পদবি গ্রহণ করে এবং গারো রীতি অনুযায়ী মেয়েরা পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। সাধারণত নির্বাচিত কন্যা, যাকে গারো ভাষায় ‘নকনা’ বলা হয়, পরিবারে উত্তরাধিকার বহন করেন।
জানকীর ভাষায়, গারো সমাজে মেয়েদের দায়িত্ব অনেক বেশি। তার মতে, ছেলে-মেয়ে উভয়েরই দায়িত্ব থাকে, তবে সামাজিক রীতির কারণে নারীকে মানসিকভাবে উচ্চস্থানে দেখা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি যখন দেখি, আমি আমার মায়ের বংশপরিচয়ে বড় হচ্ছি, তখন অটোমেটিক্যালি মাথায় আসে যে আমাদের সমাজে নারীদের অবস্থান ভালো পর্যায়ে আছে।’
তবে মায়ের নামে বংশ চললেই কি ক্ষমতাও নারীর হাতে থাকে? জানকীর অভিজ্ঞতায় বিষয়টি এত সরল নয়। তিনি বলেন, ‘একসময় আমি খুব গর্ব করে বলতাম আমরা মাতৃতান্ত্রিক। পরে একটি কর্মশালায় শুনলাম, আমরা আসলে মাতৃতান্ত্রিক নই, মাতৃসূত্রীয়। কারণ নারীরা সব সিদ্ধান্ত ১০০ ভাগ নিতে পারেন না।’
জানকী জানান, গারো সমাজে ‘মানক’ ও ‘চ্রা’ ধারণা আছে। জানকীর ভাষায়, মানক বলতে বোন বা মাতৃসূত্রের নারী আত্মীয়দের, আর চ্রা বলতে মামা, ভাই বা মাতৃসূত্রের পুরুষ আত্মীয়দের বোঝানো হয়। তার মতে, অনেক সিদ্ধান্তে ভাই বা মামার মতামত গুরুত্বপূর্ণ থাকে। এমনকি সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও চ্রা হিসেবে ভাইয়ের ভূমিকা থাকে।
পুরুষের চোখে মাতৃসূত্র
গারো সমাজের পুরুষদের দৃষ্টিতেও এই বাস্তবতা জটিল। জামালপুরের বকশীগঞ্জের গারো তরুণ পঙ্কজ খোকশি নিজের মায়ের পদবি বহন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মায়ের পদবি ব্যবহার করি। গারো হিসেবে ছোটবেলা থেকেই এটা সবাই করে থাকে, আমিও সেভাবেই ব্যবহার করছি।’
পঙ্কজের কাছে মায়ের পদবি বহন করা ব্যক্তিগতভাবেও অর্থবহ। তার জন্মের আগেই বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাই তার ভাষায়, ‘আমি মায়ের অবদানেই আমার সবকিছু। সেই দিক থেকে মায়ের টাইটেল আমার জন্য খুবই প্রযোজ্য।’ তবে তিনি মনে করেন, আধুনিক সময়ে বাবা ও মা দুজনের অবদান কীভাবে পরিচয়ে প্রতিফলিত হতে পারে, সেটিও ভাবার বিষয়।
গারো সমাজে মেয়েদের উত্তরাধিকার বেশি পাওয়া নিয়ে পঙ্কজের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিধামিশ্রিত। তার মতে, এই ব্যবস্থায় অনেক পুরুষ নিজেদের অবহেলিত মনে করেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা অনেক সময় শোষণের শিকার না হলেও অবহেলিত হয় কিছু ক্ষেত্রে। তাদের অংশগ্রহণ আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করা উচিত।’
নারীর নামে সম্পত্তি থাকলেও বাস্তব নিয়ন্ত্রণের জায়গায় পুরুষের ভূমিকা নিয়ে পঙ্কজ একটি তুলনা দেন। তিনি বলেন, ‘একটি কোম্পানির মালিক এক জন হতে পারে, কিন্তু পরিচালক অন্য কেউ হতে পারে। গারো সমাজেও মালিকানা নারীর নামে থাকলেও ম্যানিপুলেশনের সুযোগ অনেক সময় পুরুষের হাতে থাকে।’
এই বক্তব্য গারো সমাজের ভেতরের দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে মা বংশের উৎস, নারী উত্তরাধিকারের ধারক। অন্যদিকে জমি, সালিশ, সামাজিক সিদ্ধান্ত ও বাইরের জগতের দর-কষাকষিতে পুরুষের প্রভাব বহু ক্ষেত্রে রয়ে গেছে।
গবেষণায় বদলের ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক গবেষণাতেও গারো সমাজে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে জেকেকেএনআইইউ জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত কলমাকান্দা উপজেলার গারো সমাজ নিয়ে এক গবেষণায় ১৩০ জন উত্তরদাতার ওপর সার্ভে, ২টি কি ইনফরম্যান্ট ইন্টারভিউ এবং ৮টি ইন-ডেপথ ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৬৯ দশমিক ২০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ঐতিহ্যগতভাবে কনিষ্ঠ কন্যা বা নকনা প্রধান উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হন। তবে ৭৬ দশমিক ২০ শতাংশ বলেছেন, নকনা উত্তরাধিকার নিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হলে সম্পত্তি অন্য ভাইবোনদের মধ্যে বণ্টিত হয়। আর ৮০ শতাংশ বলেছেন, কন্যা সন্তান না থাকলে মা ছেলেদের কাছে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন।
গবেষণাটির লেখক ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, বিশ্বায়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের প্রভাবে মান্দি সমাজের নকনা ও মাতৃসূত্রীয় প্রথায় পরিবর্তন এলেও প্রথাটি এখনও শক্তভাবে টিকে আছে।
পরিবর্তনের মুখে পরিচয় ও সংস্কৃতি
ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অলেন অরণ্য চিরান বলেন, গারো সমাজকে মাতৃতান্ত্রিক ও মাতৃসূত্রীয়, দুইভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। তার মতে, মেয়েদের উত্তরাধিকার ও নকনা প্রথা এখনও আছে, তবে আগের তুলনায় কমেছে। সম্পত্তির ক্ষেত্রে এখনও মায়ের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষা, শহরমুখী জীবন ও বৃহত্তর সমাজের প্রভাবে গারো মাতৃসূত্রীয় সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
তিনি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা, পরিচয় ও সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা আছে। ওয়ানগালা উৎসব এখনও সেই ধারাবাহিকতার একটি বড় উদাহরণ। ভবিষ্যতে গারো সমাজের ভাষা, নিজস্ব খাবার ও সাংস্কৃতিক চর্চা ধরে রাখা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
গারো সংস্কৃতি পরিবর্তনের পেছনে শিক্ষা, শহরমুখী জীবন, বৃহত্তর পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব, জমি হারানো এবং নতুন পারিবারিক চিন্তাধারাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জানকী ও পঙ্কজ দুজনই। জানকী বলেন, ‘বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পিতৃতান্ত্রিক। তার প্রভাব অবশ্যই আছে।’ তার মতে, শিক্ষিত গারো পুরুষদের অনেকেই এখন স্ত্রীর বাড়িতে যেতে চান না, কারণ সমাজে ‘ঘরজামাই’ ধারণাটিকে ছোট করে দেখা হয়।
পঙ্কজও মনে করেন, বাঙালি সমাজের প্রভাব গারো তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তার কথায়, ‘অনেকে ইনসিকিউর ফিল করে। বাবার পদবি নেওয়ার প্রবণতাও সেই জায়গা থেকে আসছে।’
তবু পরিবর্তনের মধ্যেও জানকীর কাছে মা দিবসের অর্থ আলাদা। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য তো প্রতিদিনই মাদারস ডে। মা যেহেতু আমাদের বংশপরিচয়ের মূল, তাই প্রতিটা দিনই স্পেশাল।’
মা দিবসে গারো সমাজের গল্প তাই শুধু মাকে শুভেচ্ছা জানানোর গল্প নয়। এটি এমন এক সংস্কৃতির দিকে তাকানোর সুযোগ, যেখানে মায়ের নামেই বংশ এগোয়, মায়ের সূত্রেই পরিচয় গড়ে ওঠে, আর মেয়ের হাতে থাকে উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা। তবে সেই পরিচয়ের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক কতটা নারীর হাতে থাকছে, বদলে যাওয়া সময় সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। মা এখানে শুধু মমতার প্রতীক নন; তিনি পরিচয়ের উৎস, বংশের ধারক এবং পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক সংস্কৃতির কেন্দ্র।

মা দিবসের কথা উঠতেই জানকী চিসিমের মনে পড়ে নিজের মাকে। তবে মায়ের স্মৃতি তার কাছে শুধু শোক বা ভালোবাসার নয়, নিজের পরিচয়েরও উৎস। শেরপুরের এই গারো তরুণীর নামের শেষ অংশ, মাহারি, বংশপরিচয়, সবই এসেছে মায়ের দিক থেকে।
মায়ের মৃত্যুর সময় জানকী দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বাবার বাড়িতে জন্ম হলেও মায়ের মৃত্যুর পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বসে দুই মাহারি। বাবা ছিলেন চাম্বুগং মাহারির, আর জানকী মায়ের দিক থেকে চিসিম মাহারির কন্যা। তাই প্রশ্ন ওঠে, চিসিম মাহারির এই মেয়ের দায়িত্ব নেবে কে?
শেষ পর্যন্ত বাবার কাছে নয়, জানকীকে বড় হতে হয় মায়ের বড় বোনের কাছে। সেই ছোট বয়সে বিষয়টি তার কাছে কষ্টের ছিল। বাবা বেঁচে থাকতেও কেন বাবার সঙ্গে থাকতে পারছেন না, তা বুঝতে পারেননি। পরে বুঝেছেন, গারো সমাজে মায়ের পরিচয় শুধু নামের সঙ্গে যুক্ত কোনো পদবি নয়; সেটি দায়িত্ব, আত্মীয়তা ও বংশের ধারাবাহিকতারও সূত্র।
জানকী বলেন, ‘তখন বুঝেছিলাম, আমি যেহেতু মাতৃসূত্রীয়, তাই বাবার সঙ্গে না থেকে বড় মায়ের সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। চিসিম মাহারির কন্যা হিসেবে আমার দায়িত্ব চিসিম মাহারির কাঁধে চলে আসে।’
বাংলাদেশে মা দিবস সাধারণত মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ ও স্মৃতির গল্পে ঘেরা। কিন্তু গারো বা মান্দি সমাজে ‘মা’ শুধু আবেগের মানুষ নন। মায়ের নামেই গড়ে ওঠে সন্তানের মাহারি, গোত্র, পদবি ও বংশপরিচয়। মা দিবসের প্রেক্ষাপটে তাই গারো সমাজের এই মাতৃসূত্রীয় বাস্তবতা মায়ের আরেক সামাজিক অর্থ সামনে আনে।
মাতৃসূত্রীয় সমাজে মেয়ের দায়িত্ব
গারো সমাজ মাতৃসূত্রীয়। সন্তানরা মায়ের পদবি গ্রহণ করে এবং গারো রীতি অনুযায়ী মেয়েরা পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। সাধারণত নির্বাচিত কন্যা, যাকে গারো ভাষায় ‘নকনা’ বলা হয়, পরিবারে উত্তরাধিকার বহন করেন।
জানকীর ভাষায়, গারো সমাজে মেয়েদের দায়িত্ব অনেক বেশি। তার মতে, ছেলে-মেয়ে উভয়েরই দায়িত্ব থাকে, তবে সামাজিক রীতির কারণে নারীকে মানসিকভাবে উচ্চস্থানে দেখা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি যখন দেখি, আমি আমার মায়ের বংশপরিচয়ে বড় হচ্ছি, তখন অটোমেটিক্যালি মাথায় আসে যে আমাদের সমাজে নারীদের অবস্থান ভালো পর্যায়ে আছে।’
তবে মায়ের নামে বংশ চললেই কি ক্ষমতাও নারীর হাতে থাকে? জানকীর অভিজ্ঞতায় বিষয়টি এত সরল নয়। তিনি বলেন, ‘একসময় আমি খুব গর্ব করে বলতাম আমরা মাতৃতান্ত্রিক। পরে একটি কর্মশালায় শুনলাম, আমরা আসলে মাতৃতান্ত্রিক নই, মাতৃসূত্রীয়। কারণ নারীরা সব সিদ্ধান্ত ১০০ ভাগ নিতে পারেন না।’
জানকী জানান, গারো সমাজে ‘মানক’ ও ‘চ্রা’ ধারণা আছে। জানকীর ভাষায়, মানক বলতে বোন বা মাতৃসূত্রের নারী আত্মীয়দের, আর চ্রা বলতে মামা, ভাই বা মাতৃসূত্রের পুরুষ আত্মীয়দের বোঝানো হয়। তার মতে, অনেক সিদ্ধান্তে ভাই বা মামার মতামত গুরুত্বপূর্ণ থাকে। এমনকি সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও চ্রা হিসেবে ভাইয়ের ভূমিকা থাকে।
পুরুষের চোখে মাতৃসূত্র
গারো সমাজের পুরুষদের দৃষ্টিতেও এই বাস্তবতা জটিল। জামালপুরের বকশীগঞ্জের গারো তরুণ পঙ্কজ খোকশি নিজের মায়ের পদবি বহন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মায়ের পদবি ব্যবহার করি। গারো হিসেবে ছোটবেলা থেকেই এটা সবাই করে থাকে, আমিও সেভাবেই ব্যবহার করছি।’
পঙ্কজের কাছে মায়ের পদবি বহন করা ব্যক্তিগতভাবেও অর্থবহ। তার জন্মের আগেই বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাই তার ভাষায়, ‘আমি মায়ের অবদানেই আমার সবকিছু। সেই দিক থেকে মায়ের টাইটেল আমার জন্য খুবই প্রযোজ্য।’ তবে তিনি মনে করেন, আধুনিক সময়ে বাবা ও মা দুজনের অবদান কীভাবে পরিচয়ে প্রতিফলিত হতে পারে, সেটিও ভাবার বিষয়।
গারো সমাজে মেয়েদের উত্তরাধিকার বেশি পাওয়া নিয়ে পঙ্কজের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিধামিশ্রিত। তার মতে, এই ব্যবস্থায় অনেক পুরুষ নিজেদের অবহেলিত মনে করেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা অনেক সময় শোষণের শিকার না হলেও অবহেলিত হয় কিছু ক্ষেত্রে। তাদের অংশগ্রহণ আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করা উচিত।’
নারীর নামে সম্পত্তি থাকলেও বাস্তব নিয়ন্ত্রণের জায়গায় পুরুষের ভূমিকা নিয়ে পঙ্কজ একটি তুলনা দেন। তিনি বলেন, ‘একটি কোম্পানির মালিক এক জন হতে পারে, কিন্তু পরিচালক অন্য কেউ হতে পারে। গারো সমাজেও মালিকানা নারীর নামে থাকলেও ম্যানিপুলেশনের সুযোগ অনেক সময় পুরুষের হাতে থাকে।’
এই বক্তব্য গারো সমাজের ভেতরের দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে মা বংশের উৎস, নারী উত্তরাধিকারের ধারক। অন্যদিকে জমি, সালিশ, সামাজিক সিদ্ধান্ত ও বাইরের জগতের দর-কষাকষিতে পুরুষের প্রভাব বহু ক্ষেত্রে রয়ে গেছে।
গবেষণায় বদলের ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক গবেষণাতেও গারো সমাজে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে জেকেকেএনআইইউ জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত কলমাকান্দা উপজেলার গারো সমাজ নিয়ে এক গবেষণায় ১৩০ জন উত্তরদাতার ওপর সার্ভে, ২টি কি ইনফরম্যান্ট ইন্টারভিউ এবং ৮টি ইন-ডেপথ ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৬৯ দশমিক ২০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ঐতিহ্যগতভাবে কনিষ্ঠ কন্যা বা নকনা প্রধান উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হন। তবে ৭৬ দশমিক ২০ শতাংশ বলেছেন, নকনা উত্তরাধিকার নিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হলে সম্পত্তি অন্য ভাইবোনদের মধ্যে বণ্টিত হয়। আর ৮০ শতাংশ বলেছেন, কন্যা সন্তান না থাকলে মা ছেলেদের কাছে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন।
গবেষণাটির লেখক ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, বিশ্বায়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের প্রভাবে মান্দি সমাজের নকনা ও মাতৃসূত্রীয় প্রথায় পরিবর্তন এলেও প্রথাটি এখনও শক্তভাবে টিকে আছে।
পরিবর্তনের মুখে পরিচয় ও সংস্কৃতি
ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অলেন অরণ্য চিরান বলেন, গারো সমাজকে মাতৃতান্ত্রিক ও মাতৃসূত্রীয়, দুইভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। তার মতে, মেয়েদের উত্তরাধিকার ও নকনা প্রথা এখনও আছে, তবে আগের তুলনায় কমেছে। সম্পত্তির ক্ষেত্রে এখনও মায়ের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষা, শহরমুখী জীবন ও বৃহত্তর সমাজের প্রভাবে গারো মাতৃসূত্রীয় সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
তিনি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা, পরিচয় ও সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা আছে। ওয়ানগালা উৎসব এখনও সেই ধারাবাহিকতার একটি বড় উদাহরণ। ভবিষ্যতে গারো সমাজের ভাষা, নিজস্ব খাবার ও সাংস্কৃতিক চর্চা ধরে রাখা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
গারো সংস্কৃতি পরিবর্তনের পেছনে শিক্ষা, শহরমুখী জীবন, বৃহত্তর পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব, জমি হারানো এবং নতুন পারিবারিক চিন্তাধারাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জানকী ও পঙ্কজ দুজনই। জানকী বলেন, ‘বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পিতৃতান্ত্রিক। তার প্রভাব অবশ্যই আছে।’ তার মতে, শিক্ষিত গারো পুরুষদের অনেকেই এখন স্ত্রীর বাড়িতে যেতে চান না, কারণ সমাজে ‘ঘরজামাই’ ধারণাটিকে ছোট করে দেখা হয়।
পঙ্কজও মনে করেন, বাঙালি সমাজের প্রভাব গারো তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তার কথায়, ‘অনেকে ইনসিকিউর ফিল করে। বাবার পদবি নেওয়ার প্রবণতাও সেই জায়গা থেকে আসছে।’
তবু পরিবর্তনের মধ্যেও জানকীর কাছে মা দিবসের অর্থ আলাদা। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য তো প্রতিদিনই মাদারস ডে। মা যেহেতু আমাদের বংশপরিচয়ের মূল, তাই প্রতিটা দিনই স্পেশাল।’
মা দিবসে গারো সমাজের গল্প তাই শুধু মাকে শুভেচ্ছা জানানোর গল্প নয়। এটি এমন এক সংস্কৃতির দিকে তাকানোর সুযোগ, যেখানে মায়ের নামেই বংশ এগোয়, মায়ের সূত্রেই পরিচয় গড়ে ওঠে, আর মেয়ের হাতে থাকে উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা। তবে সেই পরিচয়ের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক কতটা নারীর হাতে থাকছে, বদলে যাওয়া সময় সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। মা এখানে শুধু মমতার প্রতীক নন; তিনি পরিচয়ের উৎস, বংশের ধারক এবং পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক সংস্কৃতির কেন্দ্র।

উপায় জানা থাকলে যেকোনো জায়গা থেকেই এই আঠা তোলা সম্ভব। চলুন জেনে নিই বিভিন্ন জিনিস থেকে সুপার গ্লু তোলার কিছু কৌশল।
৩৩ মিনিট আগে
আজ মা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি একটি বিশেষ তারিখ মাত্র। কিন্তু বাংলা গানের ভুবনে ‘মা’ শব্দটি নিয়ে যখনই কোনো হাহাকার বা আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে, তখনই একটি গানের সুর অজান্তেই কানে বেজে ওঠে। গিটারের সেই চিরচেনা আর্তনাদ আর জেমসের ভরাট কণ্ঠের গান—‘মা’।
৩ ঘণ্টা আগে
মায়ের হাতের রান্নার গোপন রহস্যটা আসলে কী? মা দিবসের এই মুহূর্তে পৃথিবীর সকল মমতাময়ী মায়ের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে আজকের এই লেখা।
২০ ঘণ্টা আগে
ছোটবেলায় দাদীর মুখে শুনতাম, রাতের বেলা যদি চোখের সামনে দিয়ে কোনো কালো বিড়াল চলে যায়, তবে সেখানেই থেমে যেতে হবে। নিয়ম ছিল, অন্য কেউ ওই পথ দিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।
১ দিন আগে