বর্তমান বিশ্বে দিবসকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে অভাবনীয় গতিতে। এক দশক আগেও মা দিবস, বাবা দিবস কিংবা ভালোবাসা দিবসের মতো দিনগুলোতে উপহার লেনদেনের এমন জোয়ার কল্পনা করা কঠিন ছিল। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ বছরের ভালোবাসা দিবসে শুধু শাহবাগেই অন্তত ১ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে।’ সারা দেশে তাহলে কত টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে, এই সংখ্যা থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
ভালোবাসা দিবসের পরেই ব্যবসার দিক থেকে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে ‘মা দিবস’। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে এই দিবসটি উদযাপনের ধরণ বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেবল ছবি পোস্ট করাই নয়, এখন মায়েরা সন্তানদের কাছ থেকে পাচ্ছেন দামী উপহার, রেস্তোরাঁয় বিশেষ ডিনার কিংবা পছন্দের জায়গায় ভ্রমণের সুযোগ। যদিও বাংলাদেশে মা দিবসের বাণিজ্যের সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা হয়নি, তবে পশ্চিমা বিশ্বের চিত্রটি বেশ স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশন (এনআরএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মা দিবসে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যা এ বছর ৩৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এনআরএফ-এর প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ শাই জানান, প্রায় ৮৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান মা দিবস পালন করেন এবং তারা মায়েদের জন্য গড়ে ২৫৪ ডলার ব্যয় করেন।
বাবা দিবসের চেয়ে মা দিবস কেন এগিয়ে?
পরিসংখ্যান বলছে, দিবসকেন্দ্রিক কেনাকাটায় বাবার চেয়ে মায়েরা অনেক এগিয়ে আছেন। জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিসটার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে আমেরিকায় একজন ব্যক্তি মা দিবসে গড়ে ২৫৪ ডলার খরচ করলেও বাবা দিবসে খরচ করেছেন মাত্র ১৯৯ ডলার। ২০১৯ সাল থেকে এই ব্যবধানটি নিয়মিতভাবে বজায় আছে।
বাবা দিবসের চেয়ে মা দিবসে বেচাকেনা বেশি হয়। ছবি: এনআরএফ থেকে নেওয়াবিশ্লেষকদের মতে, উপহারের ‘বৈচিত্র্য’ মা দিবসের বাজারকে বড় করে তুলেছে। গত বছর আমেরিকায় মা দিবসে কেবল জুয়েলারি বা গয়না বিক্রি হয়েছে ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের। এছাড়া ভ্রমণ খাতে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন, ইলেকট্রনিক্সে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং ফুলে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে, বাবা দিবসে সাধারণত জুয়েলারি বা প্রসাধনী সামগ্রীর চাহিদা থাকে না বললেই চলে, যা বাণিজ্যের আকার ছোট হওয়ার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। মা দিবসে রান্নাঘরের সরঞ্জাম কিংবা প্রসাধনী সামগ্রীর যে বিশাল বাজার তৈরি হয়, বাবা দিবসে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। মার্কিন রিটেইল প্রতিষ্ঠান ‘ডিল নিউজ’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশ আমেরিকান মা দিবসে উপহার কেনেন, যেখানে বাবা দিবসে উপহার কেনেন মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ।
উপহারের ধরনে আধুনিকতার ছোঁয়া
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপহারের ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে মায়েদের উপহার হিসেবে শাড়ি বা বইয়ের প্রাধান্য থাকলেও, এখন যুক্ত হয়েছে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, নোটপ্যাড কিংবা স্মার্টওয়াচের মতো প্রযুক্তি পণ্য। বিশ্বায়ন এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মও এখন বইয়ের বদলে ‘কিন্ডল’ কিংবা সাধারণ ঘড়ির বদলে ‘স্মার্টওয়াচ’ উপহার দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এই সুযোগে বিভিন্ন গ্যাজেটে বিশেষ ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।
মানুষের আবেগ ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বাজার ভবিষ্যতে আরও বড় হবে। আর এই দিবসকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় বৈচিত্র্যময় উপহারের দৌলতে মায়েরা যে বাবাদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন, তা স্পষ্ট।