কেন রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ২২: ৩৬
রবীন্দ্রনাথ। সংগৃহীত ছবি

জার্মানি কিংবা ইউরোপে যেমন গ্যেটে, বাংলাদেশ বা ভারতীয় জীবনে তেমনি রবীন্দ্রনাথ বার বার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন; বহু বিষয়ে, বহু কারণে। গ্যেটের প্রাসঙ্গিকতা আধুনিক ইউরোপীয় জীবনের নানা স্তরে বিদ্যমান; সাহিত্যিক, দার্শনিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র ছাড়াও আধুনিক মানুষের আত্মিক পরিচয়, জীবনাকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা, নৈতিক দ্বন্দ্ব, সমন্বয়-পন্থা, অনুভূতির ঐক্য, অভিজ্ঞান, বিশ্বদৃষ্টি প্রভৃতির প্রশ্নে গ্যেটে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশেষ করে গ্যেটের শিক্ষাদর্শ, আত্মগঠনতত্ত্ব, মনুষ্যত্ববোধ, মানুষের সম্ভাবনা ও দায়িত্বজ্ঞান জার্মান কিংবা ইউরোপীয় মানসগঠনের এক জীবন্ত শক্তি হিসেবে কাজ করে। ওই একই বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গ্যেটের তুলনা।

গ্যেটের মতো রবীন্দ্রনাথের বহু পরিচয় রয়েছে; তিনি একাধারে সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ইত্যাদি ছিলেন। কিন্তু একটি মূল লক্ষ্যে তিনি গোটা জীবনকে পরিচালিত করেছিলেন; সেটি হলো মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মানবীয় দায়িত্ব পালন। জীবনভর এই কর্মের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছিলেন, এবং প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিমূল তৈরি হয়েছিল জাতীয় জীবনের সুগভীর থেকে। হয়তো এ জন্যই আমাদের জাতীয় জীবনে তাঁর গুরুত্ব এত; তাঁকে বারবার দরকার পড়ে।

প্রথমেই বাঙালির জাতীয় সত্তা বা পরিচয় প্রসঙ্গ; এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। বাঙালির পরিচয় নানা ভাবে, নানা মাধ্যমে এবং নানা ব্যক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রধান উপাদান হচ্ছে ভূগোল, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজধারা, সাহিত্য ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ সমস্ত জীবন ধরে ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তা আমাদের অখণ্ড জাতীয় সত্তা গঠনে বড়ো ভূমিকা পালন করেছেন।

উনিশ শতকের বাঙালির জাগরণ যেখানে মধ্যবিত্ত হিন্দুর জাগরণে রূপ নিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ সেখানে মুসলমান-সহ অপরাপর ধর্মের সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষকে নিয়ে জাগরণকে তাৎপর্যপূর্ণ করতে চেয়েছেন। শুরুর দিকে আধুনিক বাংলা সাহিত্য যেখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল; বিশেষ করে বঙ্কিমের উপন্যাস কিংবা মহাকাব্যগুলো-রবীন্দ্রনাথ সে-সংকীর্ণতাকে ভেদ করে সমন্বয়ী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক হলেন।

প্রথমেই বাঙালির জাতীয় সত্তা বা পরিচয় প্রসঙ্গ; এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। বাঙালির পরিচয় নানা ভাবে, নানা মাধ্যমে এবং নানা ব্যক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।

বলা ভালো যে রবীন্দ্র-প্রণোদনায় আধুনিক বাংলা সাহিত্য হিন্দুয়ানি কবল থেকে মুক্ত হয়ে অসাম্প্রদায়িক হবার পথ খুঁজে পায়। অবশ্য এই পথ খুঁজে পেতে তাঁকে বেশ বেগও পেতে হয়; কেননা বিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ হিন্দুত্ববাদীই ছিলেন। রবীন্দ্র-বিদূষকদের কাছে এটাই ‘একিলিসের গোড়ালি’ হিসেবে কাজ করে। ঔপনিবেশিক বিভাজনের কালে যখন বঙ্গভঙ্গ হয়, সে সময়ে রবীন্দ্রনাথের গান ও বিভিন্ন রচনা বাঙালির ঐক্যবোধকে জাগ্রত করেছিল। পরবর্তীকালে যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কিংবা বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রবীন্দ্র-শরণ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

জাতীয় সত্তার সঙ্গে সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে রবীন্দ্রনাথ আজীবন বাঙালির সংস্কৃতির প্রবণতাকে অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর রচিত সাহিত্য, শিল্প, সংগীতে এই ভূখণ্ডের বহু যুগের বহু জাতির বহু ধর্মের বহু সংস্কৃতির সমন্বয়ী রূপ দেখতে পাওয়া যায়। ভূখণ্ডের চেতনা ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক জীবনধারা, লোকসংস্কৃতি তথা বাউল, সুফি, বৈষ্ণব, ভাটিয়ালি, কীর্তনের প্রভাব তাঁর সংস্কৃতি-চিন্তাকে পুষ্ট করে সাংস্কৃতিক ঐক্য তৈরি করেছে।

এই ঐক্যবোধ জাতীয় দুর্দিনে বারবার আমাদের প্রাণিত করে। সুদূর প্রাচীন কাল থেকে বাঙালি সংস্কৃতির ভিতর যে-একটা প্রতিরোধব্যবস্থা বিদ্যমান, যা মূলত বৈরী প্রকৃতি ও বিদেশি শাসককুল থেকে উদ্ভূত-রবীন্দ্রনাথ তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। সংস্কৃতির সেসব উপাদান তাঁর সংস্কৃতিচিন্তায় কোমলের মাঝে কড়ি বা কঠোরতারও আস্তরণ দিয়েছে। জাতীয় জীবনে যখনই প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের ব্যাপার দেখা দেয় রবীন্দ্রনাথ স্বাভাবিক নিয়মে রক্ষাকবচ হিসেবে আবির্ভূত হন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, আর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কথা বলি, কিংবা শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের কথা বলি-আমাদের প্রতিরোধের হাতিয়ার হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের গান, নাটক কিংবা অন্য অপর সাহিত্যকর্ম। অন্যদিকে রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রতিবাদী মানুষগুলোও উঠে এসেছে মামুলি জীবন থেকে। সে নারীচরিত্র হোক, আর পুরুষচরিত্রই হোক। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে আহূত বলেই আমাদের জীবনসংগ্রামে এসব চরিত্র আমাদেরই প্রতিনিধি হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা ও সুর স্বদেশের ভূমি থেকে উদ্গত বলে আমাদেরই কণ্ঠ থেকে নির্গত হয় যখন তখন; আমাদের আনন্দে, আমাদের জাগরণে, আমাদের বিষাদতায়।

ভারতবর্ষের জাতীয় জীবনের ট্রাজেডি ছিল জাতিতে জাতিতে বিরোধ। ঐতিহাসিক কারণে হোক আর ঔপনিবেশিক কারণে হোক এটা চলমান ছিল; বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ। প্রথম জীবনে হিন্দুমেলার একনিষ্ঠ কর্মী হলেও একসময় রামমোহনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন রবীন্দ্রনাথ। রামমোহন রায় মনুষ্যত্ববোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন, ছিলেন আধুনিক ও পশ্চিমের উদারনৈতিকতার সাধক।

অন্যদিকে ভারতবর্ষের বাস্তবতা ছিল হিন্দু-মুসলমান উভয়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমবিরোধিতা। সুতরাং যে-মনুষ্যত্বের ওপর ভিত্তি করে তখনকার ভারতকে সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে মিলিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন রামমোহন; আর সে জন্যে সকল প্রকার প্রথাকে পেছনে ফেলেছিলেন-তাতে অনুপ্রাণিত হন রবীন্দ্রনাথ। উদার হৃদয় ও মুক্তবুদ্ধি দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমের এমনরূপ মিলনে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ‘তিনিই (রামমোহন)... আমাদিগকে জানিতে দিয়াছেন....আমাদের জন্য বুদ্ধ, খৃষ্ট, মহম্মদ জীবন গ্রহণ ও জীবন দান করিয়া গিয়াছেন।’

কৈশোর পেরোনো রবীন্দ্রনাথের চিন্তা এতদূর প্রসারিত হয়েছিল যে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে যে চারি প্রধান ধর্মকে আশ্রয় করিয়া চার বৃহৎ সমাজ আছে-হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রীষ্টান-তাহারা সকলেই ভারতবর্ষে আসিয়া মিলিয়াছে। বিধাতা যেমন একটা বৃহৎ সামাজিক সম্মেলনের জন্য ভারতবর্ষেই একটা বড়ো রাসায়নিক কারখানাঘর খুলিয়াছেন।’ তাঁর চিন্তাটা এমন ছিল যে, ভারতে এই চার ধর্মের লোক ছাড়াও শিখ, পার্সি-সহ আর সকলে সমমর্যাদা স্থানলাভ করবে। সারাটা জীবন ধরে এটা ছিল রবীন্দ্রনাথের একটি নৈতিক যুদ্ধ। তাই যখনই তিনি ভারতে বা বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের সংকট দেখেছেন, তার নিরসনে কথা বলেছেন; লিখেছেন, যুগপৎ কাজ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিকভাবে দেখেননি। দেখেছিলেন মানবিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দিক থেকে। বিশ শতকের প্রথম দশকে এই বিভাজন তীব্র রূপ ধারণ করে এবং সাম্প্রদায়িকতা চরম রূপ নিতে থাকে। অথচ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন বাংলার মাটি, ভাষা ও সংস্কৃতি উভয় সম্প্রদায়েরই যৌথ সম্পদ। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি চালু করেছিলেন বিখ্যাত ‘রাখীবন্ধন উৎসব’।

এই উৎসবে হিন্দু-মুসলমান একে অপরের হাতে রাখী বেঁধে ঐক্যের প্রতীক তৈরি করেছিল। এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ, যা রাজনৈতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে মানবিক সংহতির বার্তা দেয়। রবীন্দ্রনাথের বিবেচনায় উভয় সমাজের সর্বার্থ মঙ্গলের জন্য মিলন আবশ্যক ছিল। ‘কালান্তরে’র প্রবন্ধগুলো এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা জাতীয় বিবেকের ভূমিকা নেয়। তাই দেশভাগের প্রাক্কালে কিংবা পরে যখনই সাম্প্রদায়িকতা মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ এসে হাজির হয়েছেন মিলনের প্রতীক হয়ে।

কৈশোর পেরোনো রবীন্দ্রনাথের চিন্তা এতদূর প্রসারিত হয়েছিল যে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে যে চারি প্রধান ধর্মকে আশ্রয় করিয়া চার বৃহৎ সমাজ আছে-হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রীষ্টান-তাহারা সকলেই ভারতবর্ষে আসিয়া মিলিয়াছে। বিধাতা যেমন একটা বৃহৎ সামাজিক সম্মেলনের জন্য ভারতবর্ষেই একটা বড়ো রাসায়নিক কারখানাঘর খুলিয়াছেন।’

বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বার্থবুদ্ধি ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি জাতীয় জীবনের বিভিন্ন পর্বে হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন অমঙ্গল হিসেবে দেখা দিয়েছে; আর তাতে রবীন্দ্রনাথের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের ধারণা উপশম হিসেবে কাজ করেছে।

শিক্ষা, মনুষ্যত্বের সাধনা ও মুক্তবুদ্ধিচর্চা রবীন্দ্রজীবনের চির আরাধ্য ছিল। তিনি মনে করতেন মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে মনুষ্যত্ব অর্জনই মানবের প্রধান সাধনা। এই সাধনার আছে নানা উপায়; এর মধ্যে একটি হচ্ছে শিক্ষা। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে চাকরি কিংবা পেশাজীবী তৈরি করা। এটা যে-জাতীয় জীবনে কত বড়ো দুর্যোগ বয়ে নিয়ে আসতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ সমকালীন বাংলাদেশ।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে ঔপনিবেশিক, ইংরেজরা দাস বানানোর অভিপ্রায়ে করণিক-শিক্ষা চালু করেছিল এদেশে। আজ ইংরেজ চলে গেলেও তার ব্যবস্থা রয়ে গেছে; মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিদ্যা। এতে না তৈরি হয় মানুষ, না তৈরি হয় পেশাজীবী। বরং এ শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসে কিছু দুর্বৃত্ত, হঠ ও দানব। রবীন্দ্র শিক্ষাদর্শনের মূলে ছিল জীবন তার সামগ্রিকতায়ই জানার ও উপলব্ধির, চর্চার ও সাধনার বিষয়-অথচ বাংলাদেশে শিক্ষার মূলে রয়েছে জীবনের বৈষয়িক ভোগ নিশ্চিতকরণ। ইংরেজ আমলেই রবীন্দ্রনাথ এ ধরনের শিক্ষার বিরোধিতা করেছেন। তিনি বারবার বলেছেন শিক্ষাচর্চার জন্য দরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত সাংস্কৃতিক বাতাবরণ।

একদা লিখেছিলেন, ‘আধুনিক শিক্ষা থেকে একটা জিনিস কেমন করে স্খলিত হয়ে পড়েছে। সে হচ্ছে সংস্কৃতি। চিত্তের ঐশ্বর্যকে অবজ্ঞা করে আমরা জীবনযাত্রার সিদ্ধিলাভকে একমাত্র প্রাধান্য দিয়েছি। কিন্তু সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে এই সিদ্ধিলাভ কি কখনো যথার্থভাবে সম্পূর্ণ হতে পারে?’ তাই নিজেই তৈরি করেছিলেন উৎকৃষ্ট উদাহরণ-শান্তিনিকেতনি শিক্ষা। মাতৃভাষায় শিক্ষাদান-পদ্ধতি চালু করে রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বদলে সৃজনশীল ও মানবিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন। এই ব্যবস্থায় মুক্তচিন্তা, শিল্প ও প্রকৃতির সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় করা হয়। যদিও এই ব্যবস্থা সফল হয়নি নানা কারণে; তবু যখনই জাতীয় জীবনে শিক্ষার হেরফের হয়, তখন রবীন্দ্র-অনুসৃত পথকে সঠিক বলেই মনে হয়।

বিশ্বায়নের যুগে ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সমান্তরালভাবে যে-ভাবে আমেরিকান ব্যবস্থা চালু হচ্ছে তার একমাত্র উদ্দেশ্য স্রেফ বাণিজ্য। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় না আছে দর্শন, না মনুষ্যত্ব। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত থাকে রাজনীতি; রবীন্দ্রনাথ এখানে গৌণ। কিন্তু শুভবোধসম্পন্ন মানুষ তেমন শিক্ষাই চান যাতে নিহিত রয়েছে মনুষ্যত্ব বিকাশে ক্রমাগত সুযোগ; বুদ্ধির মুক্তি-এবং বিচ্ছিন্নতার বদলে মানুষে মানুষে নিবিড় সম্পর্ক। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-দর্শন আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় বিকল্প চিন্তার পথ দেখায়। যখনই শিক্ষার সংস্কারের প্রয়োজন হয় আমরা তাঁর কাছে ফিরে তাকাই। যদিও আমাদের শক্তি ও সাহসে তা কুলিয়ে উঠতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথ রাজনীতিবিদ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ছিল সুগভীর ও দূরদর্শী। আবার, মানবতাবাদী সমাজচিন্তাবিদ হিসেবেও তাঁর পরিচয় পাওয়া যায় নানা ক্ষেত্রে। তিনি একদিকে অন্ধ জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের পক্ষে কাজ করে গেছেন। বলতে গেলে তাঁর চিন্তা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে। অর্থাৎ সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তায়ও রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন।

রবীন্দ্রচিন্তায় জাতীয় পরিচয় আর জাতীয়তাবাদ এক জিনিস নয়। প্রথমটিতে রবীন্দ্রনাথের আস্থা থাকলেও দ্বিতীয়টির বেলায় তাঁর চিন্তার পর্বান্তর ঘটেছে। প্রথমজীবনে জাতীয়তাবাদী হলেও পরে রবীন্দ্রনাথের মোহভঙ্গ হয়; আর প্রথাগত স্বদেশচিন্তা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন। ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি জাতীয়তাবাদের ভিতরে দেখতে পেয়েছিলেন উগ্রতা ও নিষ্ঠুরতা। জাতীয়তাবাদকে তিনি আখ্যায়িত করেছিলেন ‘জিওগ্রাফিক্যাল ডেমন’ নামে।

এই ‘দানব’ অপরের থেকে যেমন, নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও সে শুধু বিভক্তি ঘটায়। নিছক তাত্ত্বিক দিক থেকে এ সিদ্ধান্ত রবীন্দ্রনাথের ছিল না; এর পেছনে কাজ করেছিল স্বদেশের ইতিহাস, সমাজজীবনের নানা ভেদবুদ্ধি ইত্যাদির পীড়ন ও তিক্ততা। এর চেয়ে বরং ‘নো নেশন’ সমাজগড়নে তাঁর মনোযোগ ছিল বেশি। তিনি পশ্চিমা জাতীয়তাবাদী ধারণা ও জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশকে ‘সভ্যতার সংকট’ বলে অভিহিত করেন এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রাচ্যের সমাজবাদী ব্যবস্থার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

জাতিরাষ্ট্রের ‘ছলনা’ শুরু হয়েছিল রবীন্দ্র জীবদ্দশায়; প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এবং যে-বছর তাঁর প্রয়াণ হবে সে বছরই শুরু হয় এর চূড়ান্ত পরিণতিপর্ব। রবীন্দ্রনাথ তা দেখে যেতে পারেন নি। স্নায়ুযুদ্ধ-পর্ব শেষে বিশ্বায়নের পর সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন চলছে; আজকের ইসরায়েল-আমেরিকা বনাম ইরানের যে এক তরফা যুদ্ধ ও মানবতার চরম বিপর্যয়-রবীন্দ্রনাথ নিজে এর ভবিষ্যৎ-বাণী করেছিলেন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ বিষয়ক সতর্কতা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি জাতিপরিচয় ও স্বাদেশিকতাকে সমর্থন করলেও উগ্র জাতীয়তাবাদকে বিপজ্জনক বলে মনে করতেন। তাই বর্তমান বিশ্বে, এমনকি বাংলাদেশেও সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার ঝুঁকি দৃশ্যমান হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জাতীয়তাবাদ (তা যে ধরনেরই হোক না কেন) যেন মানবিকতা ও নৈতিকতার সীমাকে অতিক্রম না করে।

মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক ন্যায়বিচার চেতনা এবং মুক্তির দর্শন প্রসঙ্গে বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথের মূল শক্তি ছিল তাঁর জীবনমুখী ও সর্বজনীন মানবিকতা। জীবনমুখী মানবতাবাদ হচ্ছে জীবনকে যেমন আছে তেমন করেই গ্রহণ করা; পার্থিব জীবন ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে। রবীন্দ্রনাথের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জাতীয় জীবনে এক ধরনের বাস্তববাদী আদর্শের জন্ম দেয়; যেখানে উন্নয়ন, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতা একসঙ্গে বিকশিত হয়।

আজকের বাংলাদেশে একদিকে আধুকিতা, অন্যদিকে মৌলবাদ; একদিকে প্রাগ্রসর জীবন আর অন্যদিকে মূল্যবোধের সংকট-এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথে সমন্বয়বাদী চিন্তার প্রয়োগ খুব দরকার। তিনি মনে করতেন, মানুষ কেবল তখনই পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে যখন সে মুক্ত, সমানাধিকারভিত্তিক এবং শোষণমুক্ত পরিবেশে বাস করার সুযোগ পায়।

আমাদের জীবনে রাজনৈতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায়ের প্রশ্ন বিদ্যমান। তাই রবীন্দ্র-নির্দেশিত দরিদ্রের অর্থনৈতিক অধিকার, অশিক্ষিতের জ্ঞানের অধিকার, নারীর সমমর্যাদা এবং শিশুর স্বাধীন বিকাশ ইত্যাদি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক নির্দেশনা দেয়। এমনকি তাঁর অত্যাচারিত ও নিপীড়িতের প্রতি নৈতিক অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবৈষম্য, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ প্রভৃতির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যায়, দুর্নীতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গ্রহণে প্রেরণা জুগিয়ে আসছে।

রামমোহন কিংবা ঈশ্বরচন্দ্রের মতো রবীন্দ্রনাথ সমাজের সংস্কার চেয়েছেন। সমাজসংস্কারের মাধ্যমে সমাজের পরিবর্তন। তাঁর সমাজপরিবর্তন কোনো আদর্শ বাস্তবায়নের প্রজেক্ট ছিল না, ছিল মানুষের জন্য। বর্ণভেদ, লিঙ্গবৈষম্য, সামাজিক অবমাননা ইত্যাদির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পথপ্রদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অস্পৃশ্যতার মতো বৈষম্য তুলে দিয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। একইভাবে নারী-পুরুষ সমতা, শিশু অধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা ছিল অত্যন্ত আধুনিক। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি কেবল সম্পদের পুনর্বণ্টন নয়, বরং মানুষের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষের সক্ষমতা জাগিয়ে তোলাই প্রকৃত সমাধান।

মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের উন্নয়ন-চিন্তায় এই ধারণা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তাঁর এই চিন্তা অমর্ত্য সেন-সহ পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস ছিল সমষ্টিগত মানবসংহতি ও সহযোগিতায়। তিনি নিরাশার বিরুদ্ধে আশা এবং বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত শক্তির কথা বলেছেন। আমাদের জাতীয় জীবনে এই চেতনা সামাজিক সংহতি, সহনশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করে আসছে।

রবীন্দ্রচিন্তায় জাতীয় পরিচয় আর জাতীয়তাবাদ এক জিনিস নয়। প্রথমটিতে রবীন্দ্রনাথের আস্থা থাকলেও দ্বিতীয়টির বেলায় তাঁর চিন্তার পর্বান্তর ঘটেছে। প্রথমজীবনে জাতীয়তাবাদী হলেও পরে রবীন্দ্রনাথের মোহভঙ্গ হয়; আর প্রথাগত স্বদেশচিন্তা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন।

রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক নির্ভরতা গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ একা পূর্ণতা পায় না; পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পর্কের মধ্য দিয়েই সভ্যতা গড়ে ওঠে। আমাদের সামাজিক কাঠামোতে; বিশেষ করে গ্রামীণ সহযোগ, পারিবারিক বন্ধন, সমষ্টিগত সংস্কৃতি ইত্যাদি তাঁর দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। সামাজিক সংহতি ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী জাতি গঠনে রবীন্দ্রনাথের এই ধারণা কার্যকর।

এছাড়া রবীন্দ্রচিন্তায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জাতীয় জীবনে মানবাধিকারের ভিত্তিও তৈরি করে। শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা মনে করিয়ে দেয় যে, প্রত্যেক মানুষই মর্যাদার অধিকারী। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারী-অধিকার, শিশুর বিকাশ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর চিন্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে নারী-পুরুষের বৈষম্য রবীন্দ্রনাথকে খুব আহত করেছিল; তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন পুরুষশাসিত সমাজ শুধু নারীদেরই শোষণ করছে না, পুরো সমাজব্যবস্থাকে বিকলাঙ্গ করে ফেলেছে। এই প্রতিক্রিয়া তাঁর সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছে; যদিও প্রচলিত ‘নারীবাদী’ চিন্তা রবীন্দ্রনাথে ছিলনা। নারীর মুক্তির জন্য সমাজের আমূল পরিবর্তনও তিনি চাননি। পিতৃতন্ত্রের শোষণকে নারীপ্রগতির পথে তিনি অন্তরায় হিসেবে না দেখে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখেছেন অশিক্ষা ও পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গিকে। নারীর মুক্তির জন্য তাই তিনি ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটিই বরং নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার করতে পারে বলে তাঁর ধারণা ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নারীমুক্তির পথে প্রেরণা দেয়।

রবীন্দ্রনাথ নিজে বৈশ্বিক মানব ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়; নিজেকে ও দেশকে যুগোপযোগী করা যায়। বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতিরেকে অন্তর যে বড়ো হতে পারে না এই শিক্ষাও রবীন্দ্রনাথের। পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের মহামানব মানবজাতির জ্ঞাতি; যে-যেকোনো দেশের জ্ঞানই মানবজাতির সম্পদ-এই বোধে উদ্দীপিত হতে না পারলে মানবজাতির ভাগী হওয়া যায় না এও ছিল তাঁর প্রতীতি। দেশের মাটিতে পা রেখে সমস্ত জীবন তাই তিনি সারা পৃথিবীর নাগরিক হতে চেয়েছেন। নিজেকে, নিজের চিন্তাকে এবং নিজের সাহিত্যকে শাণিত ও বৈশ্বিক করে তোলার অভিপ্রায় সব সময় তাঁর মধ্যে দেখা যায়। আজকের বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশকেও নিজের সংস্কৃতি রক্ষা করে বৈশ্বিক সহযোগিতায় অংশগ্রহণ করার মানসিকতা তাই রবীন্দ্রচিন্তারই সম্পূরক।

রবীন্দ্রনাথ ঐক্য ও ঐকতানের সাধক ছিলেন। তাঁর বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণা বিশেষভাবে আমাদের ঋদ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথের মতে, সব পার্থক্য মুছে ফেলে একরূপতা সৃষ্টি করা নয়, বরং স্বাতন্ত্র্যকে মর্যাদা দিয়েই প্রকৃত ঐক্য গড়ে ওঠে। শুধু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নয়, চিন্তা ও ভাবনার ক্ষেত্রেও এই মনোভাব তাঁর জীবন ও কর্মকে প্রভাবিত করেছিল। মধ্যযুগীয় সাধক-সম্প্রদায় বলি, আর সমকালের বাউল-সুফি বলি-এঁদের তত্ত্বদর্শন যে মানবীয় গুণে গুণান্বিত এবং তার সার যে গ্রহণযোগ্য তা তিনি মনে করতেন। এও মনে করতেন যে নানা পথে ও মতে মনুষ্যত্বের সাধনা সম্ভব। তাই আমাদের দেশে যেখানে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বাব বার বিভক্তি ও বিভাজন রেখা তৈরি হয়; ভিন্ন পথ ও মতের মানুষকে যেভাবে অত্যাচার ও দমনের ভেতর রাখা হয়-তার নিরসনে উপযুক্ত পথের দিশা রবীন্দ্রনাথ থেকে নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের বহু সংস্কৃতি এবং বহু মত ও পথের সমাজে তাঁর ধারণা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহনশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে।

মানবসত্তার পূর্ণ বিকাশই মনুষ্যত্ব। রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের পূর্ণ বিকাশ ঘটে জ্ঞান, প্রেম ও কর্মের সমন্বয়ে। মানুষ হওয়া একদিনের বিষয় নয়; সমন্বিত মানবিক বিকাশে শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। মানুষ হওয়ার পথে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, মানবিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নও সমানভাবে প্রয়োজন-এই বোধ তিনি জাগ্রত করেন নিজের কর্মের মাধ্যমে। সংস্কৃতির ধারণা তাঁর কাছে অনেক বড়ো; মানুষের একের সহিত অন্যের আন্তঃসম্পর্কের ভিত্তিকেই তিনি সংস্কৃতি বলে মনে করতেন। সংস্কৃতির সাধনাই তাঁর কাছে মনুষ্যত্বের সাধনা। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত যেভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে নাজেহাল ও প্রতিরোধ করা হচ্ছে; যেভাবে অপ্রেম ও অকর্মণ্যতা ধেয়ে আসছে সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে, সেই পরিবেশে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে আদর্শ হতে পারেন।

সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে রবীন্দ্রচেতনায় আত্মজ্ঞান ও আত্মিক সমুন্নতি বরাবর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর এই চিন্তার সঙ্গে গ্যেটের আত্মগঠনতত্ত্বের মিল রয়েছে। গ্যেটের তত্ত্বটি (সেলফ ফরমেশান) মানুষের নিজস্ব বিকাশ, পরিপূর্ণতা ও মানবিক সত্তার ধাপে ধাপে গড়ে ওঠার এক দার্শনিক ধারণা। এটি একটি সমন্বয়বাদী মতাদর্শ। গ্যেটের মতে, প্রকৃতি ও জীবনের সংযোগ আত্মগঠনের অপরিহার্য উপাদান; আর এর সঙ্গে সমন্বয় ঘটে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সর্বজনীনতার। গ্যেটের সত্তাগঠনতত্ত্বে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথেরও দেখি সমান ধারণা ও উপলব্ধি। ভারতীয় চিন্তাপুষ্ট তাঁর আত্মজ্ঞান ও তার সুন্নতির প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ প্রতিবেশীকে জানার ও ভালোবাসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। নিজমাত্র নয়, মানব-অস্তিত্বের স্বার্থেই এ প্রয়োজনকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। আত্মিক বিকাশ ছাড়া মানুষের যেমন, সভ্যতারও মুক্তি নেই। এই বিকাশের পথ খুঁজতে তাই রবীন্দ্রনাথের শরণ নিতে হয়; অন্তত আজকের অন্তঃসারশূন্য সমাজ ও সভ্যতায়।

শুরুটা হয়েছিল গ্যেটেকে দিয়ে। শেষটাও হতে পারে তাঁকে স্মরণ করে। গ্যেটের মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল সাহিত্যিক নন; জার্মানি কিংবা ইউরোপে যে-বিশ্বজনীন মানুষের বার্তবাহক ছিলেন গ্যেটে, বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় কিংবা প্রাচ্যের দেশগুলোর জাতীয় জীবনের জন্য রবীন্দ্রনাথ তেমনি এক চিরন্তন দার্শনিক পথপ্রদর্শক। তাঁকে আমাদের বড়ো প্রয়োজন তাঁর জীবনমুখিতা, মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ, ন্যায়বোধ, স্বাধীনতা ও সাম্যের ধারণা, সামাজিক সহযোগিতা ও সমতার স্বপ্ন, গণতান্ত্রিক চেতনা, বৈশ্বিক চেতনা প্রভৃতিকে উপলব্ধি ও ধারণ করার জন্য। সেদিক থেকে আমাদের সামগ্রিক জীবনে তিনি শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, বরং পথনির্দেশক শক্তি হয়েই আছেন।

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক

সম্পর্কিত