মায়েরা আসলে মাকড়শা: যেভাবে মায়েদের খেয়ে ফেলে মাতৃত্ব

কার্টুন: চন্দ্রিকা নূরানী ইরাবতী

গতকাল এক সহকর্মীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথা হচ্ছিল আজকের মা দিবসে পত্রিকায় কী কাজ হবে, নিজেরা কী করব— এসব নিয়েই। হঠাৎ তিনি বলে বসলেন, ‘মায়েরা আসলে মাকড়সা’।

শুনলেই কেমন পিলে চমকে ওঠে। মাকড়সা নিয়ে আমার চিরকালের ভীতি, তাই তুলনাটা কানে বেশ অদ্ভুত ঠেকল। কেমন একটা শীতল আর নিষ্ঠুর ব্যাপার আছে এতে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তাঁর কথাটার মাজেজা বুঝতে পারলাম নিজেই।

প্রাণিবিজ্ঞানে ‘ম্যাট্রিকফ্যাগি’ বলে একটা শব্দ আছে— যেখানে মা মাকড়সা নিজের শরীরকে সঁপে দেয় সন্তানদের আহার হিসেবে। আমাদের সমাজও মায়েদের ওপর ঠিক একই ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। এখানে মা হওয়ার অর্থই হলো নিজের যাবতীয় পুরোনো পরিচয় মুছে ফেলা। মাতৃত্বকে উদযাপন করার নাম করে সমাজ আসলে সুকৌশলে নারীর স্বতন্ত্র সত্তাটুকুর বিসর্জন চায়।

সমাজের চোখে নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলো মাতৃত্ব বা ‘ম্যাট্রেসেন্স’। এটা ঠিক বয়ঃসন্ধির মতোই একটা উত্তরণ। কিন্তু ফারাকটা আকাশ-পাতাল। বয়ঃসন্ধি যেখানে আত্মবিকাশ আর নতুন স্বপ্নের ডালি সাজিয়ে আনে, মাতৃত্ব সেখানে ঠিক উল্টোটা করে— স্বকীয় সত্তার এক চূড়ান্ত বিলুপ্তি।

সন্তানের জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমাদের এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ঠিক করে দেয়, নারীর পেশাদারি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সৃজনশীল মন বা ব্যক্তিগত জীবন— সবই এখন গৌণ। সমাজ চায়, নারী তার পূর্বতন সত্তাটিকে থালায় সাজিয়ে উৎসর্গ করুক পরবর্তী প্রজন্মের বেড়ে ওঠার জন্য। আমরা সেই ত্যাগের মহিমা গাইতে গাইতে মুর্ছা যাই, কিন্তু একবারও উঁকি দিয়ে দেখি না পড়ে থাকা সেই রিক্ত খোলসটির দিকে।

মজার বিষয় হলো, এই সত্তা-হরণের খেলায় সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো নারীকে ‘অযৌন’ করে তোলা। নারী একবার মায়ের পবিত্র সিংহাসনে বসলে সমাজ তাকে এক নিস্পৃহ, সেবাময়ী মূর্তি হিসেবে দেগে দেয়। তার নিজের যে জটিল মন আছে, কামনা-বাসনা আছে, পুরুষের মতোই যে সে-ও একজন রক্তমাংসের মানুষ— এই সত্যিটা মাতৃত্বের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়।

একে বলা যেতে পারে ‘ইনটেনসিভ মাদারিং’। সমাজ আশা করে, একজন মা তার সমস্ত আবেগ আর বুদ্ধি উজাড় করে দেবে সন্তানের পেছনে, নিজের প্রয়োজনকে ছাঁটাই করে। এই অলিখিত নিয়মে যে মা নিজেকে পুরোপুরি সন্তানের মধ্যে বিলীন করতে পারেন, তিনিই ‘আদর্শ’।

আর ‘খারাপ মা’? তার সংজ্ঞাও বেশ অদ্ভুত। যে মা সন্তানের জন্য তিন বেলা রান্না করেন না, নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভাবেন বা মাঝেমধ্যে দোকান থেকে খাবার কিনে আনেন— তাকেই এই তকমা দেওয়া হয়। অথচ ভেবে দেখুন, অফিস ফেরত বাবা যদি একই খাবার নিয়ে বাড়ি ফেরেন, তবে তাকে গণ্য করা হয় ভালোবাসার নিদর্শন। সোশ্যাল মিডিয়ায় একবার পড়েছিলাম—একজন ‘নিকৃষ্টতম মা’-কে সমাজ যে নিক্তিতে বিচার করে, একজন ‘গড়পড়তা বাবা’র মানদণ্ডতার চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়।

এই সামাজিক ছক একদিকে মায়েদের ওপর দুস্তর কাজের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে বাবারা তাদের সন্তানদের সঙ্গে নিবিড় মানসিক বন্ধন তৈরির সুযোগ হারাচ্ছেন। এই লিঙ্গভেদে তৈরি করে দেওয়া কাজের ভাগ আগামী প্রজন্মের জন্য কোনও সুখবর বয়ে আনে না।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মা হওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে নারীর দক্ষতা বা দায়বদ্ধতাকে খাটো করে দেখা হয়। মনে করা হয়, সন্তানের জন্যই সে সময় দেবে, ফলে ক্যারিয়ারে তাঁর থেকে তেমন বিশেষ আশা করা বৃথা। কয়েক বছরের শিক্ষা আর শ্রমে গড়ে তোলা তার পেশাদার পরিচয়টা ‘মা’ তকমার আড়ালে ধুঁকতে থাকে।

কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না, এটা কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নয়, স্রেফ সমাজ-নির্মিত এক দায়। ঠিক যেমন পেলিক্যান পাখির মিথ— একসময় মনে করা হত নিজের বুক চিরে রক্ত খাইয়ে সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখে এই পাখি। এই আত্মোৎসর্গের গল্পগুলো আমাদের আবেগতাড়িত করলেও আসলে তা নারীর আত্মবিসর্জনের বিপজ্জনক পথকেই প্রশস্ত করে।

মাতৃত্বকে ‘সুপারহিরো’র তকমা দেওয়াটা আসলে এক ধরনের চালাকি। এটা আসলে সমাজ আর রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর মোড়ক মাত্র। আমরা নারীকে এই তকমা দিয়ে আসলে তার ব্যক্তিমানুষ হয়ে ওঠার অধিকারটুকু কেড়ে নিচ্ছি।

মাকড়সা হয়তো তার জৈবিক নিয়তির কাছে অসহায়, কিন্তু মানুষ তো নয়। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলতেই পারি যেখানে মা হওয়ার শর্ত হিসেবে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলা বাধ্যতামূলক হবে না।

আজ মা দিবসে কেবল ফুল আর কার্ডের ত্যাগের জয়গান নয়, বরং আমাদের উচিত মাতৃত্বের এই ভূমিকার নিচে যে রক্তমাংসের মানুষটি ছটফট করছেন, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। মাতৃত্ব যেন নারীর জগতকে সঙ্কুচিত না করে বরং আরও বিস্তৃত করে। আসুন, পিতৃতন্ত্রের এই মাকড়শার জালের বাইরেও যে নারীর জন্য বিস্তৃত আকাশ আর পৃথিবী আছে, তাকেই আজ কুর্নিশ জানাই।

  • রাতুল আল আহমেদ: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত