১৯৮৩ সালে আলোড়ন উঠল একটি ডায়েরিকে ঘিরে। জার্মান সাময়িকী ‘স্টার্ন’ ও ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য সানডে টাইমস’ ঘোষণা দেয়, তারা খুঁজে পেয়েছে হিটলারের ‘গোপন’ ডায়েরি। তবে পরে ডায়েরিটা ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু কীভাবে সামনে এল এই ডায়েরি, ইতিহাসবিদকে বিভ্রান্ত করার কৌশল কী ছিল আর কীভাবে সংবাদমাধ্যমের প্রতারণা ফাঁস হলো?
স্ট্রিম ডেস্ক

১৯৮৩ সালের বসন্ত। হঠাৎ ব্রিটিশ গণমাধ্যমে আলোড়ন উঠল একটি ডায়েরিকে ঘিরে। জার্মান সাময়িকী ‘স্টার্ন’ আর ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য সানডে টাইমস’ ঘোষণা দিল, তারা নাকি খুঁজে পেয়েছে এক যুগান্তকারী নথি; অ্যাডলফ হিটলারের ‘গোপন’ ব্যক্তিগত ডায়েরি।
কয়েক সপ্তাহ ধরে হিটলারের কথিত ডায়েরিকে ঘিরে যেন ঝড় উঠল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নামকরা গবেষকরা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে পড়লেন। পাঠকেরা আগ্রহের সঙ্গে গিলতে থাকেন স্বৈরশাসক হিটলারের এক ভিন্ন রূপ। মুখের দুর্গন্ধের মতো জাগতিক উদ্বেগ ও ইভা ব্রাউনের সঙ্গে সম্পর্কের চাপ নিয়ে জর্জরিত একজন ‘সাধারণ’ হিটলারের গল্প। হিটলারের আঁকাবাঁকা গথিক হস্তাক্ষরে লেখা এই পৃষ্ঠাগুলো দেখে সবার মনে হচ্ছিল, এটা বোধহয় হিটলারের মনের ‘ভেতরে’ উঁকি দেওয়ার বিরল সুযোগ। এমনকি সেখানে ইঙ্গিত ছিল, হলোকাস্টের ভয়াবহতার পুরোটা নাকি হিটলার জানতেনই না।
এই ‘আবিষ্কার’ সাংবাদিকতার দুনিয়ায় এক বিরাট সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছিল। একজন খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ ডায়েরির সত্যতা যাচাই করেছিলেন। আর রুপার্ট মারডকের মতো মিডিয়া মুঘলও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানা গেল, এই ডায়েরিটা ইতিহাসের এক বিরাট প্রতারণা। কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হলো। সঙ্গে যারা এতে বিশ্বাস করেছিলেন, তাদের সুনাম মুছে গেল কলঙ্কে। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটি থেকে গেল এক ভয়াবহ ও লজ্জাজনক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে।
ডায়েরিতে ছিল রহস্য, যুদ্ধকালীন ইতিহাস ও হিটলারের জীবনী নতুন করে লেখার সম্ভাবনা। স্টার্নের দাবি, ডায়েরিগুলো ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার করা। তারপর তা লুকিয়ে রাখা হয় এবং অবশেষে পূর্ব জার্মানি থেকে বিক্রির জন্য প্রস্তাব করা হয়। কনরাড কুজাউ নামের এক ব্যক্তি এই ডায়েরিটা স্টার্নের সাংবাদিক গার্ড হেইডম্যানের কাছে বিক্রি করেন। স্টার্ন পাণ্ডুলিপিগুলোর জন্য ৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডয়েচমার্ক (প্রায় ২৩ লাখ পাউন্ড) খরচ করে।
দ্য সানডে টাইমসের জন্য এই ডায়েরি ছিল এক অভাবনীয় পুরস্কার। রুপার্ট মারডকের মালিকানায় থাকা এই ট্যাবলয়েড জায়ান্টের জন্য ব্রিটেন ও কমনওয়েলথে প্রকাশের অধিকার পাওয়া মানে ছিল একদিকে সম্মান, অন্যদিকে বিশাল ব্যবসায়িক লাভের সম্ভাবনা। হিটলারের নিজের লেখা, তাঁর ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ, শৌচাগারের ঝামেলা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত চিঠি—এসবই সাধারণ মানুষের কল্পনাকে তীব্রভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
এই ডায়েরিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে দ্য সানডে টাইমস ব্রিটেনের এক নামকরা ইতিহাসবিদ হিউ ট্রেভর-রোপারকে (লর্ড ড্যাক্রে নামেও পরিচিত) নিযুক্ত করে। তিনি ইতোমধ্যেই হিটলার এবং নাৎসি জার্মানির ওপর ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব হিটলার’-এর মতো বই লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। যদিও হিউ শুরুতে সন্দিহান ছিলেন, তবে ডায়েরিগুলোর বিশাল কলেবর এবং স্টার্নের পক্ষ থেকে পাওয়া ‘হস্তাক্ষর পরীক্ষা করা হয়েছে’—এই আশ্বাস তাঁকে বিশ্বাস যোগায়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্টার্নের আশ্বাস ছিল বিভ্রান্তিকর। হাতের লেখা মেলানোর জন্য হিটলারের হাতে লেখা যে ‘আসল’ নথিগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, তার কয়েকটি ছিল সেই কনরাড কুজাউয়েরই তৈরি। সুতরাং লেখা না মেলার প্রশ্নই ওঠে না।

আবার কাগজ ও কালির পরীক্ষা হয়েছিল বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তার স্বপক্ষে তখন কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। তবু এসব না ভেবেই ট্রেভর-রোপার দ্য টাইমসে একটি প্রবন্ধ লিখে ডায়েরিগুলোকে সমর্থন করেন। আর সেটিই সাহস যোগায় দ্য সানডে টাইমসকে পরপর কিস্তিতে ডায়েরির অংশ ছাপতে শুরু করতে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্টার্নের অতিরিক্ত গোপনীয়তা। হস্তাক্ষর পরীক্ষার নামে বিশেষজ্ঞদের সামনে ডায়েরির অল্প কয়েকটি পাতা আনা হয়েছিল। পুরো সংগ্রহ পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমনকি নির্বাচিত কয়েকজনের বাইরে অন্য কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করার অনুমতিও ছিল না। এর ফলে, অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আসা অনেক সতর্কতা বা সন্দেহ আমলে আসে নি।
দ্য সানডে টাইমস পত্রিকার সাংবাদিকদের ভেতরেও প্রথমে সন্দেহ ছিল। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ফিলিপ নাইটলি আর কয়েকজন সহকর্মী বারবার সতর্ক করেছিলেন, এমন দাবিকে সত্য প্রমাণ করতে হলে উপযুক্ত প্রমাণ দরকার। আগের জালিয়াতির ঘটনাগুলোও তাঁরা সম্পাদককে স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু সম্ভাব্য মুনাফার কথা মাথায় রেখে মারডক তাঁর কর্মীদের কথাকে গুরুত্ব দেননি।

কথিত আছে, শেষ মুহূর্তে যখন হিউ ট্রেভর নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করে ডায়েরি প্রকাশ বন্ধ করার অনুরোধ জানান, তখন মারডক নাকি সোজাসাপটা বলেছিলেন,‘ওর কথা ভুলে যাও। এটা ছাপাও।’
এই ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয় যখন ডায়েরিগুলো নিয়ে আরও গভীরভাবে ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। কাগজ, কালি, আঠা আর বাঁধাই খুঁটিয়ে দেখা হলে বোঝা যায়, এসব উপকরণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক পরের। সেগুলো পঞ্চাশের দশক কিংবা তারও পর তৈরি।
ডায়েরিতে হস্তাক্ষরে নানা ভুল ধরা পড়ে। সময়ের সঙ্গে নানান অসঙ্গতিও দেখা যায়। আবার ডায়েরিতে এমন কিছু শব্দ ও তথ্য ছিল, যা হিটলারের জীবদ্দশায় তাঁর জানারই কথা নয়। কিছু অংশ আবার সরাসরি তুলে দেওয়া হয়েছিল ম্যাক্স ডোমারাসের বই ‘হিটলার: স্পিচেস অ্যান্ড প্রোক্লেমেশনস ১৯৩২-১৯৪৫’ থেকে। এমনকি নোটবুকের মলাটেও ভুল ধরা পড়ে। যেখানে গথিক অক্ষরে ‘এএইচ’ (অ্যাডলফ হিটলার) থাকার কথা, সেখানে লেখা ছিল ‘এফএইচ’।
এরপর ক্রমশ চাপ বাড়তে থাকায় ১৯৮৩ সালের ২৫ এপ্রিল হিউ ট্রেভর এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান বদলান। তিনি স্বীকার করেন, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল। তাঁর হাতে কোনো শক্ত প্রমাণ ছিল না। আর চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশের তাগিদে ইতিহাস যাচাইয়ের নিয়মিত প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করা হয়নি। এরপর দ্রুত দ্য সানডে টাইমস ধারাবাহিক প্রকাশ বন্ধ করে ক্ষমা চায়। স্টার্নও বাধ্য হয়ে ভুল স্বীকার করে নেয়।
এই কেলেঙ্কারির পর স্টার্নের সম্পাদকরা তাঁদের চাকরি হারান। সাংবাদিক গার্ড হেইডম্যান এবং কনরাড কুজাউ উভয়কেই জালিয়াতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হিউ ট্রেভর সুনামে ভাটা পড়ে। দ্য সানডে টাইমসের সম্পাদকীয় বিভাগেও আসে বড় ধরনের পরিবর্তন।
তবে এই ঘটনা গণমাধ্যমের নৈতিকতা, প্রমাণ যাচাই এবং চটকদার খবরের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে সাংবাদিকতাকে বিপথগামী করতে পারে, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। দেখিয়েছে, আর্থিক প্রণোদনা এবং কর্তৃপক্ষের চাপ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায়।
(বিবিসি অবলম্বনে তুফায়েল আহমেদ)

১৯৮৩ সালের বসন্ত। হঠাৎ ব্রিটিশ গণমাধ্যমে আলোড়ন উঠল একটি ডায়েরিকে ঘিরে। জার্মান সাময়িকী ‘স্টার্ন’ আর ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য সানডে টাইমস’ ঘোষণা দিল, তারা নাকি খুঁজে পেয়েছে এক যুগান্তকারী নথি; অ্যাডলফ হিটলারের ‘গোপন’ ব্যক্তিগত ডায়েরি।
কয়েক সপ্তাহ ধরে হিটলারের কথিত ডায়েরিকে ঘিরে যেন ঝড় উঠল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নামকরা গবেষকরা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে পড়লেন। পাঠকেরা আগ্রহের সঙ্গে গিলতে থাকেন স্বৈরশাসক হিটলারের এক ভিন্ন রূপ। মুখের দুর্গন্ধের মতো জাগতিক উদ্বেগ ও ইভা ব্রাউনের সঙ্গে সম্পর্কের চাপ নিয়ে জর্জরিত একজন ‘সাধারণ’ হিটলারের গল্প। হিটলারের আঁকাবাঁকা গথিক হস্তাক্ষরে লেখা এই পৃষ্ঠাগুলো দেখে সবার মনে হচ্ছিল, এটা বোধহয় হিটলারের মনের ‘ভেতরে’ উঁকি দেওয়ার বিরল সুযোগ। এমনকি সেখানে ইঙ্গিত ছিল, হলোকাস্টের ভয়াবহতার পুরোটা নাকি হিটলার জানতেনই না।
এই ‘আবিষ্কার’ সাংবাদিকতার দুনিয়ায় এক বিরাট সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছিল। একজন খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ ডায়েরির সত্যতা যাচাই করেছিলেন। আর রুপার্ট মারডকের মতো মিডিয়া মুঘলও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানা গেল, এই ডায়েরিটা ইতিহাসের এক বিরাট প্রতারণা। কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হলো। সঙ্গে যারা এতে বিশ্বাস করেছিলেন, তাদের সুনাম মুছে গেল কলঙ্কে। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটি থেকে গেল এক ভয়াবহ ও লজ্জাজনক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে।
ডায়েরিতে ছিল রহস্য, যুদ্ধকালীন ইতিহাস ও হিটলারের জীবনী নতুন করে লেখার সম্ভাবনা। স্টার্নের দাবি, ডায়েরিগুলো ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার করা। তারপর তা লুকিয়ে রাখা হয় এবং অবশেষে পূর্ব জার্মানি থেকে বিক্রির জন্য প্রস্তাব করা হয়। কনরাড কুজাউ নামের এক ব্যক্তি এই ডায়েরিটা স্টার্নের সাংবাদিক গার্ড হেইডম্যানের কাছে বিক্রি করেন। স্টার্ন পাণ্ডুলিপিগুলোর জন্য ৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডয়েচমার্ক (প্রায় ২৩ লাখ পাউন্ড) খরচ করে।
দ্য সানডে টাইমসের জন্য এই ডায়েরি ছিল এক অভাবনীয় পুরস্কার। রুপার্ট মারডকের মালিকানায় থাকা এই ট্যাবলয়েড জায়ান্টের জন্য ব্রিটেন ও কমনওয়েলথে প্রকাশের অধিকার পাওয়া মানে ছিল একদিকে সম্মান, অন্যদিকে বিশাল ব্যবসায়িক লাভের সম্ভাবনা। হিটলারের নিজের লেখা, তাঁর ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ, শৌচাগারের ঝামেলা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত চিঠি—এসবই সাধারণ মানুষের কল্পনাকে তীব্রভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
এই ডায়েরিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে দ্য সানডে টাইমস ব্রিটেনের এক নামকরা ইতিহাসবিদ হিউ ট্রেভর-রোপারকে (লর্ড ড্যাক্রে নামেও পরিচিত) নিযুক্ত করে। তিনি ইতোমধ্যেই হিটলার এবং নাৎসি জার্মানির ওপর ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব হিটলার’-এর মতো বই লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। যদিও হিউ শুরুতে সন্দিহান ছিলেন, তবে ডায়েরিগুলোর বিশাল কলেবর এবং স্টার্নের পক্ষ থেকে পাওয়া ‘হস্তাক্ষর পরীক্ষা করা হয়েছে’—এই আশ্বাস তাঁকে বিশ্বাস যোগায়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্টার্নের আশ্বাস ছিল বিভ্রান্তিকর। হাতের লেখা মেলানোর জন্য হিটলারের হাতে লেখা যে ‘আসল’ নথিগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, তার কয়েকটি ছিল সেই কনরাড কুজাউয়েরই তৈরি। সুতরাং লেখা না মেলার প্রশ্নই ওঠে না।

আবার কাগজ ও কালির পরীক্ষা হয়েছিল বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তার স্বপক্ষে তখন কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। তবু এসব না ভেবেই ট্রেভর-রোপার দ্য টাইমসে একটি প্রবন্ধ লিখে ডায়েরিগুলোকে সমর্থন করেন। আর সেটিই সাহস যোগায় দ্য সানডে টাইমসকে পরপর কিস্তিতে ডায়েরির অংশ ছাপতে শুরু করতে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্টার্নের অতিরিক্ত গোপনীয়তা। হস্তাক্ষর পরীক্ষার নামে বিশেষজ্ঞদের সামনে ডায়েরির অল্প কয়েকটি পাতা আনা হয়েছিল। পুরো সংগ্রহ পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমনকি নির্বাচিত কয়েকজনের বাইরে অন্য কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করার অনুমতিও ছিল না। এর ফলে, অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আসা অনেক সতর্কতা বা সন্দেহ আমলে আসে নি।
দ্য সানডে টাইমস পত্রিকার সাংবাদিকদের ভেতরেও প্রথমে সন্দেহ ছিল। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ফিলিপ নাইটলি আর কয়েকজন সহকর্মী বারবার সতর্ক করেছিলেন, এমন দাবিকে সত্য প্রমাণ করতে হলে উপযুক্ত প্রমাণ দরকার। আগের জালিয়াতির ঘটনাগুলোও তাঁরা সম্পাদককে স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু সম্ভাব্য মুনাফার কথা মাথায় রেখে মারডক তাঁর কর্মীদের কথাকে গুরুত্ব দেননি।

কথিত আছে, শেষ মুহূর্তে যখন হিউ ট্রেভর নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করে ডায়েরি প্রকাশ বন্ধ করার অনুরোধ জানান, তখন মারডক নাকি সোজাসাপটা বলেছিলেন,‘ওর কথা ভুলে যাও। এটা ছাপাও।’
এই ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয় যখন ডায়েরিগুলো নিয়ে আরও গভীরভাবে ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। কাগজ, কালি, আঠা আর বাঁধাই খুঁটিয়ে দেখা হলে বোঝা যায়, এসব উপকরণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক পরের। সেগুলো পঞ্চাশের দশক কিংবা তারও পর তৈরি।
ডায়েরিতে হস্তাক্ষরে নানা ভুল ধরা পড়ে। সময়ের সঙ্গে নানান অসঙ্গতিও দেখা যায়। আবার ডায়েরিতে এমন কিছু শব্দ ও তথ্য ছিল, যা হিটলারের জীবদ্দশায় তাঁর জানারই কথা নয়। কিছু অংশ আবার সরাসরি তুলে দেওয়া হয়েছিল ম্যাক্স ডোমারাসের বই ‘হিটলার: স্পিচেস অ্যান্ড প্রোক্লেমেশনস ১৯৩২-১৯৪৫’ থেকে। এমনকি নোটবুকের মলাটেও ভুল ধরা পড়ে। যেখানে গথিক অক্ষরে ‘এএইচ’ (অ্যাডলফ হিটলার) থাকার কথা, সেখানে লেখা ছিল ‘এফএইচ’।
এরপর ক্রমশ চাপ বাড়তে থাকায় ১৯৮৩ সালের ২৫ এপ্রিল হিউ ট্রেভর এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান বদলান। তিনি স্বীকার করেন, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল। তাঁর হাতে কোনো শক্ত প্রমাণ ছিল না। আর চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশের তাগিদে ইতিহাস যাচাইয়ের নিয়মিত প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করা হয়নি। এরপর দ্রুত দ্য সানডে টাইমস ধারাবাহিক প্রকাশ বন্ধ করে ক্ষমা চায়। স্টার্নও বাধ্য হয়ে ভুল স্বীকার করে নেয়।
এই কেলেঙ্কারির পর স্টার্নের সম্পাদকরা তাঁদের চাকরি হারান। সাংবাদিক গার্ড হেইডম্যান এবং কনরাড কুজাউ উভয়কেই জালিয়াতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হিউ ট্রেভর সুনামে ভাটা পড়ে। দ্য সানডে টাইমসের সম্পাদকীয় বিভাগেও আসে বড় ধরনের পরিবর্তন।
তবে এই ঘটনা গণমাধ্যমের নৈতিকতা, প্রমাণ যাচাই এবং চটকদার খবরের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে সাংবাদিকতাকে বিপথগামী করতে পারে, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। দেখিয়েছে, আর্থিক প্রণোদনা এবং কর্তৃপক্ষের চাপ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায়।
(বিবিসি অবলম্বনে তুফায়েল আহমেদ)
.png)

ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
১৮ ঘণ্টা আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
১৯ ঘণ্টা আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
২১ ঘণ্টা আগে
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূ
২১ ঘণ্টা আগে