আজ থেকে ২২ বছর আগে ফেসবুকের যাত্রা শুরু হয়েছিল। হার্ভার্ডের একটি ডরমরুমে শুরু হওয়া সেই ছোট উদ্যোগ কীভাবে ধীরে ধীরে বদলে দিল যোগাযোগের ভাষা। আর কেন আজও সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় ফেসবুক সবচেয়ে প্রভাবশালী? ফেসবুকের জন্ম, উত্থান ও সাফল্যের সেই গল্পই আজকের আয়োজন।
ফাবিহা বিনতে হক

২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্কল্যান্ড হাউসের এইচ-৩৩ নম্বর ডরমরুমে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ ল্যাপটপের সামনে বসে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরের পৃথিবী তখনও জানত না, এই ছোট্ট ঘর থেকে নতুন ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনা হতে যাচ্ছে, যা যোগাযোগের ধারণায় নিয়ে আসবে যুগান্তকারী বিপ্লব।
সেই তরুণের নাম মার্ক জাকারবার্গ। আমরা তাঁকে চিনি ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। সেদিন তাঁর তৈরি করা সেই প্রজেক্টটির নাম ছিল ‘দ্য ফেসবুক’।
ফেসবুক তৈরির আগে মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ড ক্যাম্পাসে ‘ফ্যাশম্যাশ’ নামে একটি ওয়েবসাইট বানিয়েছিলেন। ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি এই সাইটটি তৈরি করেন। এটি ছিল অনেকটা ‘হট অর নট’ গেমের মতো। জাকারবার্গ হার্ভার্ডের সার্ভার হ্যাক করে শিক্ষার্থীদের ছবি সংগ্রহ করেন এবং ওয়েবসাইটে পাশাপাশি দুটি করে ছবি রাখেন। ব্যবহারকারীদের ভোট দিতে পারবেন পাশাপাশি থাকা দুইজনের মধ্যে ‘আকর্ষণীয়’ শিক্ষার্থীকে।
এই সাইটটি চালু হওয়ার মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার বার ছবিগুলোতে ক্লিক হয়েছিল। কিন্তু হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং কপিরাইট আইন ভঙ্গের অভিযোগে মার্ককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় বহিষ্কার করার উপক্রম হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চেয়ে এবারের যাত্রা বেঁচে যান তিনি। তবে এই ঘটনা মার্ককে দুটি জিনিস শিখিয়েছিল। প্রথমত, মানুষ একে অপরের ব্যাপারে জানতে আগ্রহী। আর এটি তৈরি করতে হবে গ্রাহকদের স্বেচ্ছায় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে। ফ্যাশম্যাশের সেই বিতর্ক থেকেই জন্ম নেয় ফেসবুকের মূল ধারণা।
ফ্যাশম্যাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মার্ক আবারও নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। হার্ভার্ডের কার্কল্যান্ড হাউসের এইচ-৩৩ নম্বর রুমে তখন টানটান উত্তেজনা। মার্ক জাকারবার্গ তার স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘দ্য ফেসবুক’ সবার জন্য উন্মুক্ত করতে যাচ্ছেন।
এই কাজটা মার্কের একার পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। তাঁর মেধা ছিল, কোড লেখার দক্ষতা ছিল, কিন্তু পকেটে ছিল না পর্যাপ্ত টাকা। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়ায় তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রুমমেট এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন। বন্ধুটি নিজের জমানো টাকা থেকে জাকারবার্গের হাতে প্রাথমিক খরচ হিসেবে প্রায় এক হাজার ডলার তুলে দেন। এই টাকায় কেনা হয় সার্ভার, শুরু হয় পথচলা। বিনিময়ে এডুয়ার্ডো হন কোম্পানির প্রথম ‘সিএফও’ এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
শুধু টাকা হলেই তো হবে না, সাইটটি দেখতেও তো আকর্ষণীয় হতে হবে। এই দায়িত্ব নেন আরেক বন্ধু অ্যান্ড্রু ম্যাককলাম। মার্ক তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন একটি লোগো বানিয়ে দিতে। অ্যান্ড্রু হলিউড অভিনেতা আল পাচিনোর একটি ছবিকে কম্পিউটারে এডিট করে বানিয়ে ফেললেন ফেসবুকের শুরুর দিকের সেই বিখ্যাত ‘নীল মানুষের’ লোগোটি।
সাইটটি চালু হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ শিক্ষার্থী এতে নিবন্ধন করেন। এক মাসের মধ্যে হার্ভার্ডের প্রায় অর্ধেক আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রী ফেসবুকের সদস্য হয়ে যায়। সাইটটি চালু হওয়ার পর যখন হু হু করে ব্যবহারকারী বাড়তে লাগল, তখন কোডিং সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন মার্ক। তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ডাস্টিন মস্কোভিটজ। তিনি দিন-রাত খেটে সাইটটিকে আরো উন্নত করতে লাগলেন। আর ক্রিস হিউজ নিলেন প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব, যাঁর কাজ ছিল শিক্ষার্থীদের মনের ভাব বুঝে সাইটটিকে জনপ্রিয় করার কৌশল ঠিক করা।

তবে সাইটটি চালু করার পরপরই মার্কের বিরুদ্ধে চুরির মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। হার্ভার্ডের তিন সিনিয়র ছাত্র ক্যামেরন উইঙ্কলভস, টাইলার উইঙ্কলভস এবং দিব্য নরেন্দ্র দাবি করেন, মার্ক তাঁদের আইডিয়া চুরি করেছেন। অভিযোগ ছিল, তাঁরা মার্ককে ‘হার্ভার্ড কানেকশন’ নামের একটি সাইট বানানোর জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মার্ক দিনের পর দিন নানা অজুহাতে কাজ ঝুলিয়ে রাখেন এবং তলে তলে তাঁদের আইডিয়া কাজে লাগিয়ে নিজের সাইট ‘দ্য ফেসবুক’ বানিয়ে ফেলেন। এই ঘটনাটি এতটাই গুরুতর ছিল যে তা আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং ফেসবুকের জন্মলগ্নেই একটি বড় আইনি ধাক্কা হয়ে আসে।
শুরুতে ফেসবুক শুধু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল। তবে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায়, মার্চ মাসের মধ্যেই এটি স্ট্যানফোর্ড, কলম্বিয়া এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে আমেরিকার অন্যান্য কলেজ, হাই স্কুল এবং বড় বড় কর্পোরেট অফিসগুলোতেও ফেসবুক ছড়িয়ে পড়ে।
২০০৫ সালে ন্যাপস্টার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা শন পারকারের পরামর্শে কোম্পানিটি নাম থেকে ‘দ্য’ শব্দটি বাদ দিয়ে দেয়। আর দুই লাখ ডলার দিয়ে ডোমেইন কিনে নেয়। ফেসবুকের জনপ্রিয়তা এতটাই বাড়তে থাকে যে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফেসবুক ১৩ বছরের বেশি বয়সী যেকোনো ব্যক্তির জন্য ই-মেইল আইডি থাকলেই ফেসবুক খোলার সুযোগ করে দেওয়া দেয়। মূলত এই একটি সিদ্ধান্তই ফেসবুককে একটি কলেজ প্রজেক্ট থেকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে আসে।
২০০৪ সালে আজকের মতো অনেকগুলো সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলেও সংখ্যাটি নিতান্তই কম নয়। ২০০২ সালে চালু হওয়া ‘ফ্রেন্ডস্টার’ এবং ২০০৩ সালে চালু হওয়া ‘মাইস্পেস’ তখন ইন্টারনেট জগতে রাজত্ব করছে। গুগলের মতো জায়ান্ট কোম্পানি ২০০৪ সালেই চালু করেছিল ‘অরকুট’। কিন্তু এত সব থাকার পরও কেন আনকোরা ফেসবুক সবাইকে ছাপিয়ে গেল?
প্রযুক্তিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত কিছু কারণ রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, মাইস্পেস বা ফ্রেন্ডস্টারে মানুষ প্রায়ই ছদ্মনাম, কার্টুন ছবি বা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করতে পারত। ইন্টারনেটে তখন ‘বেনামী’ থাকাটাই ছিল ট্রেন্ড। কিন্তু ফেসবুক শুরুতে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ই-মেইল আইডি (.edu) দিয়ে খোলার নিয়ম করায় এখানে ব্যবহারকারীরা তাঁদের আসল নাম ও পরিচয় ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘আসল মানুষ, আসল পরিচয়’-এর বিষয়টি ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করে। গ্রাহকরা বুঝতে পারে, স্ক্রিনের ওপাশে যার সঙ্গে কথা হচ্ছে, সে রক্ত-মাংসের আসল মানুষ।
এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ফ্রেন্ডস্টার যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর চাপে তাদের সার্ভার প্রায়ই ক্র্যাশ করত। একটি পেজ লোড হতে মিনিটখানেক সময় লাগত। ব্যবহারকারীরা বিরক্ত হয়ে বিকল্প খুঁজছিল। ফেসবুক শুরু থেকেই তাদের প্রযুক্তিগত স্ট্রাকচার খুব শক্তিশালী রাখে যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই হাজার হাজার নতুন গ্রাহক সাইটটি ব্যবহার করতে পারে।
তবে ফেসবুকের টিকে থাকার মূল কারণ হিসেবে প্রযুক্তিবিদরা ‘পরিবর্তন’ বা অ্যাডাপ্টেশনের কথা বলছেন। অর্থাৎ ফেসবুক কখনো এক জায়গায় থেমে থাকেনি।
২০০৬ সালে ফেসবুক যখন ‘নিউজফিড’ চালু করে, তখন সবাই এর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এটিই পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুনত্ব যোগ করে। কারণ আগে মানুষের প্রোফাইলে গিয়ে গিয়ে দেখতে হতো কে কী করছে, নিউজফিড সব তথ্য এক পাতায় নিয়ে আসে।
ফেসবুক টিকে থাকার আরেকটি শক্তিশালী কারণ হলো স্মার্টফোন আসার পর তারা দ্রুত অ্যাপ তৈরি করেছিল। ফেসবুক খুব দ্রুত নিজেকে ‘মোবাইল ফার্স্ট’ কোম্পানিতে রূপান্তর করে। যখনই কোনো নতুন অ্যাপ ফেসবুকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, মার্ক জাকারবার্গ অধিকাংশ সময় সেটাকে কিনে নিয়েছেন। ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপ কিনে নেওয়া ছিল ফেসবুকের ইতিহাসের সেরা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।
মার্ক জাকারবার্গের তৈরি ফেসবুক আজ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। বরং এটি এখন রাজনীতি, অর্থনীতি, এমনকি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিতর্ক ফেসবুকের পিছু ছাড়েনি, কিন্তু ২০০৪ সালে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের সেই উদ্যোগ যে পৃথিবীতে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্কল্যান্ড হাউসের এইচ-৩৩ নম্বর ডরমরুমে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ ল্যাপটপের সামনে বসে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরের পৃথিবী তখনও জানত না, এই ছোট্ট ঘর থেকে নতুন ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনা হতে যাচ্ছে, যা যোগাযোগের ধারণায় নিয়ে আসবে যুগান্তকারী বিপ্লব।
সেই তরুণের নাম মার্ক জাকারবার্গ। আমরা তাঁকে চিনি ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। সেদিন তাঁর তৈরি করা সেই প্রজেক্টটির নাম ছিল ‘দ্য ফেসবুক’।
ফেসবুক তৈরির আগে মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ড ক্যাম্পাসে ‘ফ্যাশম্যাশ’ নামে একটি ওয়েবসাইট বানিয়েছিলেন। ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি এই সাইটটি তৈরি করেন। এটি ছিল অনেকটা ‘হট অর নট’ গেমের মতো। জাকারবার্গ হার্ভার্ডের সার্ভার হ্যাক করে শিক্ষার্থীদের ছবি সংগ্রহ করেন এবং ওয়েবসাইটে পাশাপাশি দুটি করে ছবি রাখেন। ব্যবহারকারীদের ভোট দিতে পারবেন পাশাপাশি থাকা দুইজনের মধ্যে ‘আকর্ষণীয়’ শিক্ষার্থীকে।
এই সাইটটি চালু হওয়ার মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার বার ছবিগুলোতে ক্লিক হয়েছিল। কিন্তু হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং কপিরাইট আইন ভঙ্গের অভিযোগে মার্ককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় বহিষ্কার করার উপক্রম হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চেয়ে এবারের যাত্রা বেঁচে যান তিনি। তবে এই ঘটনা মার্ককে দুটি জিনিস শিখিয়েছিল। প্রথমত, মানুষ একে অপরের ব্যাপারে জানতে আগ্রহী। আর এটি তৈরি করতে হবে গ্রাহকদের স্বেচ্ছায় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে। ফ্যাশম্যাশের সেই বিতর্ক থেকেই জন্ম নেয় ফেসবুকের মূল ধারণা।
ফ্যাশম্যাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মার্ক আবারও নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। হার্ভার্ডের কার্কল্যান্ড হাউসের এইচ-৩৩ নম্বর রুমে তখন টানটান উত্তেজনা। মার্ক জাকারবার্গ তার স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘দ্য ফেসবুক’ সবার জন্য উন্মুক্ত করতে যাচ্ছেন।
এই কাজটা মার্কের একার পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। তাঁর মেধা ছিল, কোড লেখার দক্ষতা ছিল, কিন্তু পকেটে ছিল না পর্যাপ্ত টাকা। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়ায় তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রুমমেট এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন। বন্ধুটি নিজের জমানো টাকা থেকে জাকারবার্গের হাতে প্রাথমিক খরচ হিসেবে প্রায় এক হাজার ডলার তুলে দেন। এই টাকায় কেনা হয় সার্ভার, শুরু হয় পথচলা। বিনিময়ে এডুয়ার্ডো হন কোম্পানির প্রথম ‘সিএফও’ এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
শুধু টাকা হলেই তো হবে না, সাইটটি দেখতেও তো আকর্ষণীয় হতে হবে। এই দায়িত্ব নেন আরেক বন্ধু অ্যান্ড্রু ম্যাককলাম। মার্ক তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন একটি লোগো বানিয়ে দিতে। অ্যান্ড্রু হলিউড অভিনেতা আল পাচিনোর একটি ছবিকে কম্পিউটারে এডিট করে বানিয়ে ফেললেন ফেসবুকের শুরুর দিকের সেই বিখ্যাত ‘নীল মানুষের’ লোগোটি।
সাইটটি চালু হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ শিক্ষার্থী এতে নিবন্ধন করেন। এক মাসের মধ্যে হার্ভার্ডের প্রায় অর্ধেক আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র-ছাত্রী ফেসবুকের সদস্য হয়ে যায়। সাইটটি চালু হওয়ার পর যখন হু হু করে ব্যবহারকারী বাড়তে লাগল, তখন কোডিং সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন মার্ক। তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ডাস্টিন মস্কোভিটজ। তিনি দিন-রাত খেটে সাইটটিকে আরো উন্নত করতে লাগলেন। আর ক্রিস হিউজ নিলেন প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব, যাঁর কাজ ছিল শিক্ষার্থীদের মনের ভাব বুঝে সাইটটিকে জনপ্রিয় করার কৌশল ঠিক করা।

তবে সাইটটি চালু করার পরপরই মার্কের বিরুদ্ধে চুরির মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। হার্ভার্ডের তিন সিনিয়র ছাত্র ক্যামেরন উইঙ্কলভস, টাইলার উইঙ্কলভস এবং দিব্য নরেন্দ্র দাবি করেন, মার্ক তাঁদের আইডিয়া চুরি করেছেন। অভিযোগ ছিল, তাঁরা মার্ককে ‘হার্ভার্ড কানেকশন’ নামের একটি সাইট বানানোর জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মার্ক দিনের পর দিন নানা অজুহাতে কাজ ঝুলিয়ে রাখেন এবং তলে তলে তাঁদের আইডিয়া কাজে লাগিয়ে নিজের সাইট ‘দ্য ফেসবুক’ বানিয়ে ফেলেন। এই ঘটনাটি এতটাই গুরুতর ছিল যে তা আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং ফেসবুকের জন্মলগ্নেই একটি বড় আইনি ধাক্কা হয়ে আসে।
শুরুতে ফেসবুক শুধু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল। তবে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায়, মার্চ মাসের মধ্যেই এটি স্ট্যানফোর্ড, কলম্বিয়া এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে আমেরিকার অন্যান্য কলেজ, হাই স্কুল এবং বড় বড় কর্পোরেট অফিসগুলোতেও ফেসবুক ছড়িয়ে পড়ে।
২০০৫ সালে ন্যাপস্টার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা শন পারকারের পরামর্শে কোম্পানিটি নাম থেকে ‘দ্য’ শব্দটি বাদ দিয়ে দেয়। আর দুই লাখ ডলার দিয়ে ডোমেইন কিনে নেয়। ফেসবুকের জনপ্রিয়তা এতটাই বাড়তে থাকে যে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফেসবুক ১৩ বছরের বেশি বয়সী যেকোনো ব্যক্তির জন্য ই-মেইল আইডি থাকলেই ফেসবুক খোলার সুযোগ করে দেওয়া দেয়। মূলত এই একটি সিদ্ধান্তই ফেসবুককে একটি কলেজ প্রজেক্ট থেকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে আসে।
২০০৪ সালে আজকের মতো অনেকগুলো সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলেও সংখ্যাটি নিতান্তই কম নয়। ২০০২ সালে চালু হওয়া ‘ফ্রেন্ডস্টার’ এবং ২০০৩ সালে চালু হওয়া ‘মাইস্পেস’ তখন ইন্টারনেট জগতে রাজত্ব করছে। গুগলের মতো জায়ান্ট কোম্পানি ২০০৪ সালেই চালু করেছিল ‘অরকুট’। কিন্তু এত সব থাকার পরও কেন আনকোরা ফেসবুক সবাইকে ছাপিয়ে গেল?
প্রযুক্তিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত কিছু কারণ রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, মাইস্পেস বা ফ্রেন্ডস্টারে মানুষ প্রায়ই ছদ্মনাম, কার্টুন ছবি বা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করতে পারত। ইন্টারনেটে তখন ‘বেনামী’ থাকাটাই ছিল ট্রেন্ড। কিন্তু ফেসবুক শুরুতে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ই-মেইল আইডি (.edu) দিয়ে খোলার নিয়ম করায় এখানে ব্যবহারকারীরা তাঁদের আসল নাম ও পরিচয় ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘আসল মানুষ, আসল পরিচয়’-এর বিষয়টি ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করে। গ্রাহকরা বুঝতে পারে, স্ক্রিনের ওপাশে যার সঙ্গে কথা হচ্ছে, সে রক্ত-মাংসের আসল মানুষ।
এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ফ্রেন্ডস্টার যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর চাপে তাদের সার্ভার প্রায়ই ক্র্যাশ করত। একটি পেজ লোড হতে মিনিটখানেক সময় লাগত। ব্যবহারকারীরা বিরক্ত হয়ে বিকল্প খুঁজছিল। ফেসবুক শুরু থেকেই তাদের প্রযুক্তিগত স্ট্রাকচার খুব শক্তিশালী রাখে যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই হাজার হাজার নতুন গ্রাহক সাইটটি ব্যবহার করতে পারে।
তবে ফেসবুকের টিকে থাকার মূল কারণ হিসেবে প্রযুক্তিবিদরা ‘পরিবর্তন’ বা অ্যাডাপ্টেশনের কথা বলছেন। অর্থাৎ ফেসবুক কখনো এক জায়গায় থেমে থাকেনি।
২০০৬ সালে ফেসবুক যখন ‘নিউজফিড’ চালু করে, তখন সবাই এর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এটিই পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুনত্ব যোগ করে। কারণ আগে মানুষের প্রোফাইলে গিয়ে গিয়ে দেখতে হতো কে কী করছে, নিউজফিড সব তথ্য এক পাতায় নিয়ে আসে।
ফেসবুক টিকে থাকার আরেকটি শক্তিশালী কারণ হলো স্মার্টফোন আসার পর তারা দ্রুত অ্যাপ তৈরি করেছিল। ফেসবুক খুব দ্রুত নিজেকে ‘মোবাইল ফার্স্ট’ কোম্পানিতে রূপান্তর করে। যখনই কোনো নতুন অ্যাপ ফেসবুকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, মার্ক জাকারবার্গ অধিকাংশ সময় সেটাকে কিনে নিয়েছেন। ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপ কিনে নেওয়া ছিল ফেসবুকের ইতিহাসের সেরা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।
মার্ক জাকারবার্গের তৈরি ফেসবুক আজ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। বরং এটি এখন রাজনীতি, অর্থনীতি, এমনকি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিতর্ক ফেসবুকের পিছু ছাড়েনি, কিন্তু ২০০৪ সালে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের সেই উদ্যোগ যে পৃথিবীতে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

হিগস বোসন বা ‘ঈশ্বর কণা’ নামের পেছনে যে একজন বাঙালি বিজ্ঞানীর গল্প আছে, তা অনেকেই জানেন না। তাঁর নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। আজ ৪ ফেব্রুয়ারি এই বিজ্ঞানীর মৃত্যুদিন। তাঁর অবদান স্বীকার করে লিখেছিলেন স্বয়ং বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আবিষ্কারেই বিশ্বজয় বিজ্ঞানীদের, কিন্তু তারপরও সত্যেন বসু নোবেল
৩ ঘণ্টা আগে
ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর চতুর্থ পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। প্রতি বুধবার চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
৯ ঘণ্টা আগে
জঙ্গলে পথ হারিয়ে গেলে হাঁটতে থাকুন, কিছু না কিছু তো পাবেনই। না খেয়ে কয়েক সপ্তাহ বাঁচা যায়, তাই ক্ষুধা কোনো বড় বিষয় নয়। বন্যপ্রাণী আক্রমণ করলে মড়ার মতো পড়ে থাকুন। তাড়াতাড়ি সাহায্য না এলে ধরে নিতে হবে কেউ আসবে না।
১ দিন আগে
নির্বাচন এলেই চারদিকে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইতে শুরু করে। অনেক ভোটারের মনে এসবে আশার আলো জাগে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন রাজনীতিবিদও আছেন, যারা আলোচনায় থাকতে বা ভোটারদের চমকে দিতে দিয়েছেন একেবারেই অদ্ভুত সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।
১ দিন আগে