leadT1ad

বিশ্বরাজনীতিতে অদ্ভুত সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি

নির্বাচন এলেই চারদিকে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইতে শুরু করে। অনেক ভোটারের মনে আশার আলো জাগে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন রাজনীতিবিদও আছেন, যারা আলোচনায় থাকতে বা ভোটারদের চমকে দিতে দিয়েছেন একেবারেই অদ্ভুত সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন রাজনীতিবিদও আছেন, যারা আলোচনায় থাকতে বা ভোটারদের চমকে দিতে দিয়েছেন একেবারেই অদ্ভুত সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এআই জেনারেটেড ছবি

নির্বাচন এলেই চারদিকে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইতে শুরু করে। কেউ বলেন বেকারত্ব দূর করবেন, কেউ ভাঙা রাস্তাঘাট ঠিক করবেন, আবার কেউ কোনো জেলাকে বিভাগের মর্যাদা দেওয়ার আশ্বাস দেন। এসব বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি অনেক ভোটারের মনে আশার আলো জাগায়। আবার অনেকেই এগুলোকে শুধু ভোট পাওয়ার কৌশল বলে উড়িয়ে দেন।

কিন্তু ভোটের মাঠে যে সব সময় বাস্তবতার হিসাব চলে, তা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনও রাজনীতিবিদ আছেন, যারা আলোচনায় থাকতে বা ভোটারদের চমকে দিতে দিয়েছেন একেবারেই অদ্ভুত সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এসব প্রতিশ্রুতি শুনলে হাসি পায়, আবার অবাকও হতে হয়। ইকোনমিক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এমনই কিছু বিচিত্র নির্বাচনী ইশতেহারের কথা উঠে এসেছে।

মাসে ১০ লিটার ‘ব্র্যান্ডি’ ও মাসিক ২৫ হাজার টাকা ভাতা

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের তিরুপুর আসনে লোকসভা নির্বাচনে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন, যার নাম এ.এম. শেখ দাউদ। তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার ছিল রীতিমতো চমকপ্রদ। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, যদি এমপি নির্বাচিত হন, তাহলে তাঁর এলাকার প্রতিটি ভোটারকে মাসে ১০ লিটার করে ‘বিশুদ্ধ ব্র্যান্ডি’ দেওয়া হবে। অবশ্য তিনি এটাও বলেছিলেন, এই ব্র্যান্ডি নাকি শুধু ‘ওষুধ হিসেবে’ ব্যবহারের জন্য!

এখানেই শেষ নয়। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচনে জিতলে প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২৫ হাজার টাকা করে ভাতা দেবেন। এমন অদ্ভুত আর লোভনীয় প্রতিশ্রুতি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। তবে শেষ পর্যন্ত এসব ঘোষণা তাঁকে ভোটের লড়াইয়ে জিততে সাহায্য করতে পারেনি।

প্রতিদিন গড়ে ৮২২টি বাড়ি তৈরির প্রতিশ্রুতি

জিম্বাবুয়ের রাজনৈতিক দল জানু-পিএফের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল বেশ চমকপ্রদ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলটি ঘোষণা দিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে তারা পাঁচ বছরে ১৫ লাখ নতুন বাড়ি তৈরি করবে। শুনতে বিষয়টি জনবান্ধব মনে হলেও, একটু হিসাব করলেই বোঝা যায় প্রতিশ্রুতিটি কতটা অলীক।

হিসাব করে দেখা যায়, এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সরকারকে প্রতিদিন অর্থাৎ গড়ে ৮২২টি করে বাড়ি তৈরি করতে হবে। যা কার্যত অসম্ভব।

২০২০ সালের মধ্যে চাঁদে আমেরিকান কলোনি

আমেরিকার রাজনীতিবিদরাও অদ্ভুত প্রতিশ্রুতি দিতে পিছিয়ে নেই। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার সময় নিউট গিংরিচ ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে ২০২০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি স্থায়ী আমেরিকান কলোনি স্থাপন করবেন।

তিনি বলেছিলেন, যখন চাঁদে আমেরিকান জনসংখ্যা ১৩ হাজার অতিক্রম করবে, তখন তারা চাঁদের ওই অংশটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আবেদন করতে পারবে।

তিনি আরও বলেছিলেন, ১৯৭২ সালের পর মানুষ আর চাঁদে যায়নি ঠিকই, কিন্তু তাঁর শাসনামলে চাঁদ হয়ে উঠবে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। ২০২০ সাল অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে, কিন্তু চাঁদে স্থায়ী কলোনি তো দূরের কথা—মানুষই সেখানে আর যায়নি।

অ্যান্টার্কটিকায় গিয়ে মানুষ আইসবার্গের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলবে ’স্টপ মেল্টিং’

মানুষটির নাম ডেভিড বিশপ। রাজনীতির মাঠে ‘লর্ড বিরো’ বা ‘বাস-পাস এলভিস’ নামেই বেশি পরিচিত। অদ্ভুত আর ব্যঙ্গধর্মী রাজনীতির জন্য তিনি বেশ আলোচিত ছিলেন। ২০০১ সালে তিনি পরিবেশ রক্ষা আর রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে একসঙ্গে মিলিয়ে গড়ে তোলেন ‘চার্চ অফ দ্য মিলিট্যান্ট এলভিস পার্টি’।

তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো যেমন অভিনব, তেমনি হাস্যকর। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে দেশের সব সরকারি স্কুলকে সস্তা পণ্যের দোকান বা ‘পাউন্ড শপ’-এ রূপান্তর করবেন। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো।

পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনাগুলো বেশ অভিনব, তবে হাস্যকর। মাউন্ট এভারেস্টের আবর্জনা সমস্যা সমাধানে তিনি অভিনব শাস্তির প্রস্তাব দেন। তাঁর ইশতেহারে বলা হয়, যারা এভারেস্টে আবর্জনা ফেলবে, তাঁদেরকে জনসমক্ষে পচা চিজ-বার্গার ছুড়ে মারা হবে! এখানেই শেষ নয়, জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে তিনি অ্যান্টার্কটিকায় বিশেষ ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে গিয়ে মানুষ আইসবার্গের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলবে—’স্টপ মেল্টিং’!

রাস্তা উপড়ে ফেলার প্রতিশ্রুতি

১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যের অ্যাস্পেন শহরে শেরিফ পদে নির্বাচন করেছিলেন বিখ্যাত লেখক হান্টার এস. থম্পসন। তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল একেবারেই অদ্ভুত। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে শহরের নাম বদলে রাখবেন ‘ফ্যাট সিটি’। এখানেই শেষ নয়। তিনি আরও ঘোষণা দেন, শহরের সব রাস্তাঘাট উপড়ে ফেলা হবে, যাতে কেউ গাড়ি চালাতে না পারে। মানুষ বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে চলাফেরা করবে।

পরিবেশের দিক থেকে চিন্তা করলে ভাবনাটা অভিনব হলেও ভোটারদের কাছে ‘রাস্তা উপড়ে ফেলা’র আইডিয়া খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি। এর বাইরে তিনি পুলিশ বাহিনীকে নিরস্ত্র করার এবং মাদকসংক্রান্ত আইন শিথিল করার কথাও বলেছিলেন, যা তখন বেশ বিতর্ক তৈরি করেছিল। প্রচারণার সময় তিনি নিজের মাথা পুরোপুরি কামিয়ে ফেলেন, শুধু তার ছোট চুলের প্রতিদ্বন্দ্বী শেরিফকে কটাক্ষ করে ‘আমার লম্বা চুলের প্রতিপক্ষ’ বলার জন্য।

শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে মাছ ধরার ছিপ বা বড়শি উপহার দেওয়া হবে

যুক্তরাজ্যের ২০১৭ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল ব্রেক্সিট নিয়ে উত্তেজনায় ভরপুর। কিন্তু সেই গম্ভীর পরিবেশে এক পশলা হাসির বাতাস নিয়ে আসেন এক অদ্ভুত প্রার্থী। তিনি কেবল ছদ্মনাম ব্যবহার করেননি, বরং আইনিভাবে ‘ডিপ পোল’-এর মাধ্যমে নিজের নাম পরিবর্তন করে রেখেছিলেন ‘মিস্টার ফিশ ফিঙ্গার’।

ভোটের মাঠে তিনি নেমেছিলেন একটি বিশাল কমলা রঙের ফিশ ফিঙ্গার বা মাছের ভাজার পোশাক পরে, যা দেখে ভোটাররা হাসি আটকে রাখতে পারেননি। তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টোকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘ম্যানি-ফিশ-টো’। সেই ইশতেহারে ছিল অদ্ভুত সব প্রতিশ্রুতি।

তিনি ঘোষণা দেন, নির্বাচিত হলে ফিশ অ্যান্ড চিপসের দোকানগুলোর ওপর থেকে সব ধরনের ট্যাক্স তুলে নেওয়া হবে। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, রোগীদের খাবারে আরও বেশি করে ফিশ ফিঙ্গার বা মাছের পদ যুক্ত করা হবে। শুধু তাই নয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তিনি বিনামূল্যে মাছ ধরার ছিপ বা বড়শি উপহার দেওয়ার কথাও বলেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত