leadT1ad

‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচনের লক্ষণ কি দেখা যাচ্ছে

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ

প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ৫২
ভোটদানের প্রতীকী ছবি। ডয়চে ভেলে থেকে নেওয়া

ইতিহাসের সেরা নির্বাচন করার একটা প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতি প্রধান উপদেষ্টার তরফে জানানো হয়েছিল একাধিকবার। নির্বাচন কমিশনেরও প্রত্যাশা এটি। কিন্তু আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যে ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচন হবে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। অতীতের একাধিক নির্বাচন যেসব কারণে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল, তার অনেক লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে ময়দানে। একটি অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী শাসকের পতনের পরে সত্যিকারার্থে জনগণের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ‍শুরুর আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। সেটি পূরণ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাসের সেরা নির্বাচন বলতে প্রধান উপদেষ্টা সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসকে বুঝিয়েছেন। দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। তার মধ্যে মাত্র পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১) জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া বাকি সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট (১৯৭৭, ১৯৮৫, ১৯৯১) গ্রহণযোগ্য ছিল। প্রধান উপদেষ্টা হয়তো এই সবগুলো নির্বাচনের চেয়ে ভালো নির্বাচনের কথাই বুঝিয়েছেন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যে নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোপরি বিশ্বাসযোগ্য; যে নির্বাচনের ফলাফল পরাজিত প্রার্থীও মেনে নেন—সেটিই ভালো নির্বাচন। এবার যদি সত্যিই সেরকম একটি নির্বাচন করা সম্ভব হয়, তাহলে বলা যাবে যে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হয়েছে। তবে ভোটের সপ্তাহ খানেক আগেও মাঠের পরিস্থিতি কী বলেছে?

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় গত বছরের ১২ জানুয়ারি নরওয়ের রাষ্ট্রদূতকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন যে আগামী জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ তৈরি করতে চান। (ইত্তেফাক, ১২ জানুয়ারি ২০২৫) ।

এর বছর খানেক পর একই প্রত্যয় জানান প্রধান উপদেষ্টা। গত ডিসেম্বরের শুরুতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কমিশনারদের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতিকে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রত্যয়ে তারা এগিয়ে চলেছেন। এর মাস খানেক পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বলেন, এবার কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না। সবার জন্য লেভেল-প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করবে ইসি। গত ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছেন, এই নির্বাচন ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচন কমিশনও আশাবাদী, সত্যি সত্যি এবার ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এর আগে গত বছরের ২৫ নভেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংলাপকালে আরেক নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বচ্ছ। নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটানোর চেষ্টা করলে তাকে ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এগুলো হচ্ছে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রত্যয়, প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দল ও জোট কি মনে করে যে এবার ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে? নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগে থেকেই বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির তরফে যেসব বক্তব্য আসছে, পরস্পরকে দোষারোপ করে যেসব কথা বলা হচ্ছে; নির্বাচনের প্রশাসনিক ক্যু বা জালিয়াতির যেসব শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে; এরইমধ্যে যেসব সহিংসতা শুরু হয়েছে—তাতে কি জনমনে কি এই প্রতীতি জন্মাবে যে, এবার সত্যিই ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে? নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে? মাঠ প্রশাসন কি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে?

যারা দেড় বছর ধরে মবসন্ত্রাস প্রতিরোধেই ব্যর্থ হলো, তাদের মাধ্যমে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর ধরে দেশে যে মবসন্ত্রাস চলছে; বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও কট্টরপন্থা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সেসব প্রতিহত করতে বা এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে গত দেড় বছরে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা কি তাদের দক্ষতা ও আন্তরিকতার প্রমাণ রাখতে পেরেছে? যারা দেড় বছর ধরে মবসন্ত্রাস প্রতিরোধেই ব্যর্থ হলো, তাদের মাধ্যমে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এবার একদিনে তিনশো আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এদিন যদি গোটা পঞ্চাশেক আসনেও সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয় বা নির্দিষ্ট কোনো দল বা প্রার্থীর বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করা হয়, সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেসব প্রতিহত করে ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে পারবে?

গত ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন যে, তারা ভোট নিয়ে আতঙ্কিত। ভোট নিয়ে এই আতঙ্ক অতীতের নির্বাচনগুলোয় ছিল। আওয়ামী লীগের আমলে পরপর তিনটি (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) নির্বাচন যেহেতু একতরফা হয়েছে। যেহেতু বাস্তব কোন নির্বাচন হয়নি তাই সেখানে খুব বেশি আতঙ্ক ছিল না। কারণ অধিকাংশ মানুষের ভোট দেওয়ারই প্রয়োজন পড়েনি। এবার মানুষ একটা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশে ২৭৪টি সহিংস ঘটনা আর পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণেই সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এমন সংঘর্ষের সংখ্যা ৮৯টি। গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ভীতি প্রদর্শন বা আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি। প্রার্থীর ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা ১৫টি এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পাঁচটি। এছাড়া অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা পাওয়া গেছে তিনটি। এছাড়া হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ৯টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে সহিংসতার ঘটনা ৭০টি। সরকারের হিসাবে তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনি সহিংসতায় চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ।

সংঘর্ষ বা সহিংসতা কখনো একপক্ষীয় হয় না। অন্তত দুটি পক্ষ মুখোমুখি হলেই কেবল সহিংসতা হতে পারে। এবারের নির্বাচনে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেই। যারা নির্বাচনের মাঠে আছে, তাদের মধ্যে জাতীয় পার্টি ছাড়া বাকি সবাই সরাসরি অভ্যুত্থানের পক্ষের সক্রিয় শক্তি। অভ্যুত্থানের পরে সেই শক্তিগুলোই কেন পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়াচ্ছে? তার মানে দিন শেষে সবই ক্ষমতা বা চেয়ারে বসার খেলা? নতুন বাংলাদেশ, নতুন বন্দোবস্ত, সংস্কার, পরিবর্তন—এসব কেবলই কথার কথা? রাজনৈতিক বুলি? নির্বাচনি ইশতেহারের মতো ভোটের পরে ভুলে যাওয়া প্রতিশ্রুতি?

দেশের ইতিহাসে এবার সত্যিই একটা অনুকরণীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তা হলে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস, আস্থা, শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা এবং সর্বোপরি পরমত সহিষ্ণুতার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠতো। পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির অবসান ঘটতো। রাজনৈতিক দলগুলো মাসের পর মাস জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের টেবিলে বসে জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু দিন শেষে তারা চূড়ান্ত সনদে একমত হতে পারেনি। অনেকগুলো জায়গায় ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট রেখে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং সেই আদেশের বলে গণভোটের আয়োজনটিও প্রশ্নাতীত হলো না। ভবিষ্যতে কী পুরো প্রক্রিয়াটিই আইনিভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে? অভ্যুত্থানের পরে সর্বদলীয় মতামতের ভিত্তিতে গঠিত সরকার কেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্তত জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে ঐক্য স্থাপনে ব্যর্থ হলো? ‍

এরইমধ্যে এই নির্বাচনের প্রশাসনিক ক্যু হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলের একাধিক সিনিয়র নেতা অভিযোগ করেছেন, সরকার দুটি দলকে (জামায়াত ও এনসিপি) ক্ষমতায় আনার জন্য ‍নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা করছে। নির্বাচনের মাঠে অনেক কথায় উঠে। তবুও, ড. ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বাধীন একটি নির্দলীয় সরকারের বিরুদ্ধে এরকম একটি অভিযোগ যে উঠলো, সেটিই বিপজ্জনক ও শঙ্কার।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
Ad 300x250

সম্পর্কিত