আপসহীন রাষ্ট্র গঠনসহ জামায়াতের ইশতেহারে ২৬ অগ্রাধিকার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হোটেল শেরাটনে ইশতেহার ঘোষণা করছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সংগৃহীত ছবি

সরকার পরিচালনায় ২৬ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এতে বলা হয়েছে, দলটি ক্ষমতায় গেলে আগামী পাঁচ বছরের সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে দলটি।

আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বনানীর হোটেল শেরাটনে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ঘোষিত ইশতেহারকে জামায়াত ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার’ বলে অভিহিত করেছে।

ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতাসহ বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতের ২৬ অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশে’র কথা। দলটি বলছে এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন করবে তারা।

দ্বিতীয় অগ্রাধিকারে রয়েছে ‘বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন’। ‘ইয়ুথ ফার্স্ট’ স্লোগান দিয়ে যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছে জামায়াত।

নির্বাচনের আগে নারী বিষয়ে জামায়াত আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ইশতেহারে দলটি বলেছে, নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক (ওমেন পার্টিসিপেন্ট) রাষ্ট্র গঠন করবে তারা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র তৈরির কথা বলেছে দলটি।

জামায়াত তাদের ইশতেহারে টেক বেজড বা প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠনের কথা বলেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলটি বলেছে, সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ করবে জামায়াত।

ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণের কথা বলেছে দলটি। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করার কথা জানানো হয়েছে ইশতেহারে।

বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা; একই সঙ্গে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত।

জামায়াতের ইশতেহারে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা হবে বলে জানানো হয়েছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলেছে দলটি।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত বলেছে, ক্ষমতায় গেলে তারা শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

ইশতেহারে প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।

ইনক্লুসিভ ন্যাশন তৈরির কথা বলে ইশতেহারে বলা হয়েছে, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়; বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা জামায়াতের লক্ষ।

আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে বলেছে জামায়াত। সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলেছে তারা।

ক্ষমতায় গেলে জামায়াত দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা দেবে। যাতায়াত ব্যবস্থাকে তারা ঢেলে সাজিয়ে রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনার কথা বলেছে। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা বা যাতায়াত ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জামায়াত বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করবে।

জামায়াতে ইশতেহারে অগ্রাধিকারের তালিকায় ফ্যাসিবাদের পুনর্জন্ম রোধের কথা বলা হয়েছে। দলটি বলেছে, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা হবে।

জামায়াত তার অগ্রাধিকারের সর্বশেষ দুই প্রতিশ্রুতিতে বলেছে, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

একই সঙ্গে তারা সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সম্পর্কিত