আজ মুন্ডা বিদ্রোহের নেতা বিরসা মুন্ডার জন্মদিন। তাঁর হাত ধরে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে আদিবাসী জাগরণ সূচিত হয়েছিল। বিরসা মুন্ডা তাঁর অনুসারীদের কাছে ছিলেন ‘ধরতি আবা’ অর্থাৎ ভগবান।
স্ট্রিম ডেস্ক

বিরসা মুন্ডা এমন একটি নাম, যে নাম শুধু ভারতীয় আদিবাসী ইতিহাসের নয়; উপমহাদেশের প্রতিরোধ-চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ঔপনিবেশিক শোষণ, জমিদারি নিপীড়ন, ধর্মীয় আগ্রাসন—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন তরুণ নেতা, যিনি স্বল্পায়ু জীবনেই তৈরি করেছিলেন নিজের পরিচিতি। তাঁর সংগ্রাম শুধু ভূখণ্ডের জন্য ছিল না; ছিল নিজেদের আত্মপরিচয়, সম্মান, ন্যায়বিচার আর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।
১৮৭৫ সালে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের উলিহাতু গ্রামে জন্ম নেওয়া বিরসা দারিদ্র্য, শোষণ ও দখলদারিত্বের বাস্তবতা শৈশবেই দেখেছিলেন। মুন্ডা সম্প্রদায়ের জমি তখন ধীরে ধীরে হাতছাড়া হচ্ছিল তথাকথিত ‘দিকু’—অ-আদিবাসী দালাল, মহাজন ও ব্রিটিশ প্রশাসনের ঢালাও নীতির কারণে। আদিবাসী জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ‘খুন্তকাট্টি’ জমির অধিকার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। জীবন যখন টিকে থাকার লড়াই হয়ে ওঠে, তখনই জন্ম নেয় প্রতিরোধের আগুন। বিরসা সেই আগুনেরই নাম।

যুবক বয়সেই তিনি প্রচার করতে শুরু করেন ‘উলগুলান’ মহাবিপ্লবের ডাক। বিরসার ধারণা ছিল পরিষ্কার। জমি মানুষের জন্মগত অধিকার, এবং এই অধিকার কারও অনুমতিতে নয়, সংগ্রামের মাধ্যমেই রক্ষা করতে হবে। তাঁর এই উলগুলান শুধু সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল না; ছিল সামাজিক পুনর্গঠনেরও চেষ্টা। তিনি মুণ্ডা সমাজকে বলতেন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে। ধর্মীয় আগ্রাসন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকেও কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেন। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ‘ধরতি আবা’ মানে পৃথিবীর বাবা নামে সম্বোধন করতে শুরু করে।
‘উলগুলান’ সেই বিদ্রোহ, যেখানে আদিবাসীরা নিজেদের জমি, অধিকার ও স্বাভাবিক জীবন রক্ষা করতে লড়াই শুরু করে। ১৮৯৫ সালে চালকার গ্রামে বিরসা মুন্ডা ইসাই ধর্ম ত্যাগ করেন। এরপর তিনি আদিবাসীদের নেতা ও তাঁদের অধিকার রক্ষায় নিজেকে ‘ভগবান’-এর প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলতেন, এবার রানি ভিক্টোরিয়ার শাসন শেষ হবে এবং মুন্ডাদের রাজ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ওই বছরের আগস্টে বিদ্রোহের সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৮৯৮ সালে জেল থেকে মুক্তির পর বিরসা আবারও সমাজ ও আদিবাসীদের কাজে যুক্ত হন। এবার তাঁর লক্ষ্য একটু ভিন্ন, ধর্মান্তর ও অনাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আওয়াজ তোলা। দিনের পর দিন তাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহ চলতে থাকে।
১৮৯৯-১৯০০ সালের কথা। বিরসার আন্দোলন তখন চরমে। হাজারো আদিবাসী তাঁর নেতৃত্বে ঘোষণা করেন, বনের মালিকানা সরকারের নয়। যারা বনকে নিজেদের প্রাণের মতো ভালোবাসে, তাঁদেরই। এই দাবি ব্রিটিশ রাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এরপর বিরসাসহ তাঁর শতাধিক সঙ্গী গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর ফাঁসির হুকুম হয়। ফাঁসির আগেই রাঁচি জেলে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটে।

বিরসা মুন্ডার জীবনকাহিনী কথিত আছে ‘অরণ্যের অধিকার' উপন্যাসে। যা রচনা করেছেন লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। তিনি দীর্ঘদিন মুন্ডাদের নিয়ে কাজ করেছেন। উপন্যাসটি নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘লেখক হিসাবে, সমকালীন সামাজিক মানুষ হিসাবে, একজন বস্তুবাদী ঐতিহাসিকের সমস্ত দায়দায়িত্ব বহনে আমরা সর্বদাই অঙ্গীকারবদ্ধ। দায়িত্ব অস্বীকারের অপরাধ সমাজ কখনোই ক্ষমা করে না। আমার বিরসা কেন্দ্রিক উপন্যাস সে অঙ্গীকারেরই ফলশ্রুতি।’
বিরসা মুন্ডার জীবন থেকে নেওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, প্রতিরোধ কখনো বয়স দেখে না, সংখ্যা দেখে না, অস্ত্র দেখে না। একটি সমাজের সামষ্টিক স্বপ্ন যখন এক মানুষের বুকের ভেতর আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে, তখন তা ইতিহাস বদলে দিতে পারে। তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদাকে রক্ষা করতে যেভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তা তাঁকে আজও দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশ-উত্তর ইতিহাসে এক অনন্য নায়ক করে রেখেছে। স্বল্পায়ু এই বিপ্লবী আমাদের শেখান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানবতার প্রথম শপথ।

বিরসা মুন্ডা এমন একটি নাম, যে নাম শুধু ভারতীয় আদিবাসী ইতিহাসের নয়; উপমহাদেশের প্রতিরোধ-চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ঔপনিবেশিক শোষণ, জমিদারি নিপীড়ন, ধর্মীয় আগ্রাসন—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন তরুণ নেতা, যিনি স্বল্পায়ু জীবনেই তৈরি করেছিলেন নিজের পরিচিতি। তাঁর সংগ্রাম শুধু ভূখণ্ডের জন্য ছিল না; ছিল নিজেদের আত্মপরিচয়, সম্মান, ন্যায়বিচার আর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।
১৮৭৫ সালে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের উলিহাতু গ্রামে জন্ম নেওয়া বিরসা দারিদ্র্য, শোষণ ও দখলদারিত্বের বাস্তবতা শৈশবেই দেখেছিলেন। মুন্ডা সম্প্রদায়ের জমি তখন ধীরে ধীরে হাতছাড়া হচ্ছিল তথাকথিত ‘দিকু’—অ-আদিবাসী দালাল, মহাজন ও ব্রিটিশ প্রশাসনের ঢালাও নীতির কারণে। আদিবাসী জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ‘খুন্তকাট্টি’ জমির অধিকার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। জীবন যখন টিকে থাকার লড়াই হয়ে ওঠে, তখনই জন্ম নেয় প্রতিরোধের আগুন। বিরসা সেই আগুনেরই নাম।

যুবক বয়সেই তিনি প্রচার করতে শুরু করেন ‘উলগুলান’ মহাবিপ্লবের ডাক। বিরসার ধারণা ছিল পরিষ্কার। জমি মানুষের জন্মগত অধিকার, এবং এই অধিকার কারও অনুমতিতে নয়, সংগ্রামের মাধ্যমেই রক্ষা করতে হবে। তাঁর এই উলগুলান শুধু সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল না; ছিল সামাজিক পুনর্গঠনেরও চেষ্টা। তিনি মুণ্ডা সমাজকে বলতেন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে। ধর্মীয় আগ্রাসন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকেও কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেন। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ‘ধরতি আবা’ মানে পৃথিবীর বাবা নামে সম্বোধন করতে শুরু করে।
‘উলগুলান’ সেই বিদ্রোহ, যেখানে আদিবাসীরা নিজেদের জমি, অধিকার ও স্বাভাবিক জীবন রক্ষা করতে লড়াই শুরু করে। ১৮৯৫ সালে চালকার গ্রামে বিরসা মুন্ডা ইসাই ধর্ম ত্যাগ করেন। এরপর তিনি আদিবাসীদের নেতা ও তাঁদের অধিকার রক্ষায় নিজেকে ‘ভগবান’-এর প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলতেন, এবার রানি ভিক্টোরিয়ার শাসন শেষ হবে এবং মুন্ডাদের রাজ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ওই বছরের আগস্টে বিদ্রোহের সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৮৯৮ সালে জেল থেকে মুক্তির পর বিরসা আবারও সমাজ ও আদিবাসীদের কাজে যুক্ত হন। এবার তাঁর লক্ষ্য একটু ভিন্ন, ধর্মান্তর ও অনাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আওয়াজ তোলা। দিনের পর দিন তাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহ চলতে থাকে।
১৮৯৯-১৯০০ সালের কথা। বিরসার আন্দোলন তখন চরমে। হাজারো আদিবাসী তাঁর নেতৃত্বে ঘোষণা করেন, বনের মালিকানা সরকারের নয়। যারা বনকে নিজেদের প্রাণের মতো ভালোবাসে, তাঁদেরই। এই দাবি ব্রিটিশ রাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এরপর বিরসাসহ তাঁর শতাধিক সঙ্গী গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর ফাঁসির হুকুম হয়। ফাঁসির আগেই রাঁচি জেলে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটে।

বিরসা মুন্ডার জীবনকাহিনী কথিত আছে ‘অরণ্যের অধিকার' উপন্যাসে। যা রচনা করেছেন লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। তিনি দীর্ঘদিন মুন্ডাদের নিয়ে কাজ করেছেন। উপন্যাসটি নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘লেখক হিসাবে, সমকালীন সামাজিক মানুষ হিসাবে, একজন বস্তুবাদী ঐতিহাসিকের সমস্ত দায়দায়িত্ব বহনে আমরা সর্বদাই অঙ্গীকারবদ্ধ। দায়িত্ব অস্বীকারের অপরাধ সমাজ কখনোই ক্ষমা করে না। আমার বিরসা কেন্দ্রিক উপন্যাস সে অঙ্গীকারেরই ফলশ্রুতি।’
বিরসা মুন্ডার জীবন থেকে নেওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, প্রতিরোধ কখনো বয়স দেখে না, সংখ্যা দেখে না, অস্ত্র দেখে না। একটি সমাজের সামষ্টিক স্বপ্ন যখন এক মানুষের বুকের ভেতর আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে, তখন তা ইতিহাস বদলে দিতে পারে। তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদাকে রক্ষা করতে যেভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তা তাঁকে আজও দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশ-উত্তর ইতিহাসে এক অনন্য নায়ক করে রেখেছে। স্বল্পায়ু এই বিপ্লবী আমাদের শেখান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানবতার প্রথম শপথ।
.png)

ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
২১ ঘণ্টা আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
২১ ঘণ্টা আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
২৫ জুলাই ২০২৬
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূ
২৫ জুলাই ২০২৬