leadT1ad

‘সোশ্যাল জেটল্যাগ’: ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুম কি ভালো

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমরা অনেকেই চাই শান্তির ঘুম। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেই তবে সেই ঘুম ভাঙবে। কারণ, আমরা অনেকেই ভাবি, সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি থাকলে আজ তা পুষিয়ে নেব। এই ধারণা কি সঠিক?

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ৪৪
‘সোশ্যাল জেটল্যাগ’: ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুম কি ভালো। স্ট্রিম গ্রাফিক

সারা সপ্তাহ অফিসের কাজের চাপ, ট্রাফিক জ্যাম আর নানান দৌড়ঝাঁপ শেষে আমাদের ক্লান্ত মন মুখিয়ে থাকে ছুটির দিনের আশায়। একদিনের সাপ্তাহিক ছুটিতে আমরা অনেকেই আর বেড়াতে যেতে চাই না, আমরা চাই শান্তির ঘুম।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেই তবে সেই ঘুম ভাঙবে। কারণ, অনেকেই ভাবি সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি থাকলে আজ তা পুষিয়ে নেব। এই ধারণাটিকে বলা হয় ‘স্লিপ ব্যাংকিং’।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। ছুটির দিনের এই অনিয়মিত দীর্ঘ ঘুম শরীরকে রিচার্জ করার বদলে উল্টো বড় ধরনের গোলমাল পাকাতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যার নাম ‘সোশ্যাল জেটল্যাগ’। চলুন, এ বিষয়ে কী বলছে বিশেষজ্ঞরা, বিস্তারিত জেনে নিই।

সোশ্যাল জেটল্যাগ কী

আমরা জানি, এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিমানে ভ্রমণ করলে সময়ের ব্যবধানের কারণে আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবে যে নিয়মকানুন মেনে চলে তা এলোমেলো হয়ে যায়, সেটাই জেটল্যাগ। রুটিনমাফিক কার্যকলাপের সঙ্গে শরীরের এই অভ্যস্ততাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘দেহঘড়ি’ বা ‘বডি ক্লক’। আপনি যখন কোনো দেশ ভ্রমণ না করেও কেবল সপ্তাহের একেক দিন একেক সময়ে ঘুমাচ্ছেন, তখন আপনার শরীরও সেই বিভ্রান্তিতে পড়ে।

প্রতিটি মানুষের শরীরের একটি নিজস্ব ছন্দ আছে, যাকে বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’। এটি সূর্যের আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের ঘুমের সময় নির্ধারণ, ক্ষুধার অনুভূতি থেকে শুরু করে হরমোনের ওঠানামা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে।

কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সারা সপ্তাহ কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে বেশি ঘুমান, তাঁদের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ধরুন, কর্মদিবসে আপনি সকাল ৭টায় ওঠেন, কিন্তু ছুটির দিনে ওঠেন বেলা ১২টায়। অর্থাৎ শুক্রবার সকালে দেরি করে ওঠার পর শরীর অন্য রিদমে চলতে শুরু করে। কিন্তু রবিবার সকালে যখন আবার অফিসের জন্য ৭টায় অ্যালার্ম বাজে, তখন শরীরকে জোর করে আবার ‘আগের সময়ে’ ফিরে আসতে হয়।

‘ঘুম পুষিয়ে নেওয়া’ একটি ভুল ধারণা

আমরা ভাবি, রোজ ৫ ঘণ্টা করে ঘুমালাম অর্থাৎ প্রতিদিন ঘুমের ঘাটতি হলো। কিন্তু শুক্রবার অনেক বেশি ঘুমিয়ে সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করলাম। এতে কি আসলেই ঘুমের ঘাটতি পূরণ হলো?

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমালে আপনার ‘তন্দ্রাভাব’ বা ঝিমুনি হয়ত কাটে, কিন্তু মস্তিষ্কের গভীরে কম ঘুমানোর কারণে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুরোপুরি সারে না। ঘুমের অভাবে আমাদের মনোযোগ ও দক্ষতার যে ক্ষতি হয়, তা একদিনের লম্বা ঘুমে ঠিক হয় না।

কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সারা সপ্তাহ কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে বেশি ঘুমান, তাঁদের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, ঘুমের ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করলেও শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবোলিজম সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে না। বরং এই অনিয়মে ওজন বাড়ার ঝুঁকিতে পড়ে আমাদের দেহ।

শরীর ও মনের ওপর সোশ্যাল জেটল্যাগের প্রভাব

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের নিজস্ব ‘সাইকেল’ বা চক্র আছে। যখন আমরা ঘুমের সময় বারবার বদলাই, তখন কোষগুলো বিভ্রান্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল জেটল্যাগে ভোগা মানুষদের মধ্যে স্থূলতা বা মেদভুঁড়ির সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। এটি সরাসরি টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠলে যদি খুব ক্লান্তি লাগে, তবে সকাল ১১টা বা ১২টা পর্যন্ত না ঘুমিয়ে, দুপুরে ১৫-২০ মিনিটের একটি ছোট্ট ন্যাপ বা তন্দ্রা নিতে পারেন। এটি রাতের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়েই আপনাকে সতেজ করতে সাহায্য করবে।

লক্ষ করে দেখবেন, ছুটির দিন বেলা করে ঘুম থেকে ওঠার পর রবিবার রাতে আর ঠিক সময়ে ঘুম আসতে চায় না। কারণ, আপনার শরীর তখন দেরিতে ওঠায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ফলে শুক্রবার রাতে আপনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেন, আর পরদিন সকালে তীব্র ক্লান্তি নিয়ে অফিস শুরু করেন।

এছাড়, কিংস কলেজ লন্ডনের সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, সোশ্যাল জেটল্যাগ আমাদের পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা ‘গাট মাইক্রোবায়োম’-এর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঘুমের সময় বদলালে আমাদের খাদ্যাভ্যাসও বদলে যায়, যা হজমশক্তি দুর্বল করে দেয়।

ছুটির দিনে কি তবে বিশ্রাম নেব না

ছুটির দিনে বিশ্রাম নিতে হবে, তবে তা শরীরকে বিভ্রান্ত না করে। ছুটির দিনেও চেষ্টা করুন অন্য দিনের সময়ের কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে উঠতে। খুব বেশি হলে ১ ঘণ্টার এদিক-সেদিক হতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর যত দ্রুত সম্ভব দিনের আলো বা রোদের সংস্পর্শে আসুন। সূর্যের আলো আমাদের মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে দিন শুরু হয়েছে, যা মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) কমিয়ে শরীরকে চাঙ্গা করে।

তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠলে যদি খুব ক্লান্তি লাগে, তবে সকাল ১১টা বা ১২টা পর্যন্ত না ঘুমিয়ে, দুপুরে ১৫-২০ মিনিটের একটি ছোট্ট ন্যাপ বা তন্দ্রা নিতে পারেন। এটি রাতের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়েই আপনাকে সতেজ করতে সাহায্য করবে।

আসল কথা হলো, ঘুমের ঘাটতি মেটাতে চাইলে সকালে দেরি করে না উঠে, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস করুন। এতে আপনার দেহঘড়িটি যেকোনো দিনেই সঠিকভাবে চলবে, তা হোক সপ্তাহের কোন কর্মমুখর দিন কিংব ছুটির দিন। কারণ ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া যা আপনার শরীরকে সুস্থ রাখতে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত