জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ: পরীক্ষার মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি

কম্পোজিট: দুনিয়া জাহান

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আইনি লড়াইয়ের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্কনীতি এবং দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্কনীতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যে শুল্ক চাপানো হয়েছিল, সেটা আসলে ছিল খাঁটি অর্থনৈতিক জবরদস্তি। কিন্তু ট্রাম্প থামেননি। রায় আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্য একটি আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করলেন। বাংলাদেশের জন্য এই খবর একই সঙ্গে স্বস্তির এবং নতুন শঙ্কার।

ঘটনার শুরুটা ২০২৫ সালের এপ্রিলে। ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক চাপিয়ে দেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাম আমেরিকার বাজারে হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায়। ওয়ালমার্ট বা গ্যাপের মতো বিশাল ক্রেতারা বলতে শুরু করে, এত বেশি দামে বাংলাদেশ থেকে নেওয়ার দরকার নেই, ভিয়েতনাম বা অন্য দেশ থেকে নেওয়া যাবে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কয়েক হাজার কোটি টাকার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ দরকষাকষি। অনেক আলোচনার পর বাংলাদেশ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সই করে। শুল্ক ৩৫ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নামে। কিন্তু বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন এবং অন্তত চারটি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। দেশের অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী মহল চুক্তিটিকে ‘অসম’ বলে সমালোচনা করেন। আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে ছাড় বেশি, শর্তগুলো একতরফা, এমন অভিমত সব মহল থেকেই উঠে আসে।

তারপর এলো সেই রায়, যেটা পুরো হিসাবটা উলটে দিল। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের যে জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে শুল্ক বসিয়েছিলেন, সেই আইন তাঁকে এতটা ক্ষমতা দেয়নি। বাণিজ্যে শুল্ক আরোপের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে, প্রেসিডেন্টের নয়। ফলে চুক্তি আর কার্যকর থাকল না। রায় শুনে ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, বললেন আদালতের কিছু সদস্য দেশের স্বার্থে সঠিক কাজ করার সাহস দেখাতে পারেননি।

কিন্তু ট্রাম্প হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নন। ঘণ্টার মধ্যেই তিনি অন্য দরজা খুললেন। ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে ১৫০ দিনের জন্য সবার ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করলেন। হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হলো, শুল্কের সংখ্যা বদলালেও চুক্তি বাতিল হচ্ছে না, আগের শর্তগুলো মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশের জন্য মানে হলো, ১৯ শতাংশের জায়গায় এখন দিতে হবে ১০ শতাংশ।

এই ১৫০ দিনের মেয়াদে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ বাংলাদেশ সম্পর্কে গভীরভাবে খোঁজখবর নেবে। কারখানায় শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন কি না, নারী কর্মীরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করছেন কি না, পরিবেশ দূষণ হচ্ছে কি না, শিশুশ্রম হচ্ছে কি না, এসব বিষয় যাচাই করা হবে আমেরিকার নিজস্ব মানদণ্ডে। যদি কোনো ঘাটতি পাওয়া যায়, তাহলে ঠিক করার জন্য আরও ১৫০ দিন সময় দেওয়া হবে। কিন্তু সেই সময়ে শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চাপানোর ক্ষমতা থাকবে ট্রাম্পের হাতে। আর যদি কোনো সমস্যা না পাওয়া যায়, তাহলে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্যে ফিরতে হবে।

মানে, এই ১৫০ দিন আমাদের জন্য সুযোগ, একই সঙ্গে সতর্কতার সময়। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের নতুন সরকার এই পরিস্থিতিতে কী করবে? আমার মনে হয়, এখানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকা এখন সবচেয়ে জরুরি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ হবে সবচেয়ে চাপের। কারণ এই মুহূর্তে পুরনো চুক্তির শর্ত নিয়ে নতুন আলোচনায় বসাটা বুদ্ধিমানের হবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে কিন্তু চাপের মুখে তাড়াহুড়ো করে নতুন কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কটা স্বাভাবিক রেখে চুপচাপ ১৫০ দিনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাওয়াটাই এখন সবচেয়ে কার্যকর কূটনৈতিক কৌশল। একটা কথা মনে রাখা দরকার, আমেরিকার আসল লড়াই চীনের সঙ্গে, বাংলাদেশ সেই যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়। এই বাস্তবতাটাই আমাদের একটু সময় ও সুযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সময়ে শুধু আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার কাজ এখনই শুরু করতে হবে। রপ্তানি এক দেশেই আটকে থাকলে অর্থনীতি নড়বড়ে হয়।

রপ্তানিতে বৈচিত্র্য নেই, বাজারে নির্ভরতা একমুখী, কারখানার ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলার প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত এবং বড় শক্তির সঙ্গে দরকষাকষিতে আমাদের কূটনৈতিক শক্তি এখনও দুর্বল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন কাজটি। আমেরিকার বাণিজ্য বিভাগ যখন বাংলাদেশের কারখানার পরিবেশ, শ্রমিকের মজুরি এবং নারীর কর্মপরিবেশ নিয়ে তদন্তে নামবে, তখন যদি বড় ধরনের ঘাটতি ধরা পড়ে, সেটা বাংলাদেশকে মারাত্মক চাপে ফেলবে। এই ১৫০ দিনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেশের সব গার্মেন্ট কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই করতে হবে। যেখানে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হচ্ছে না, যেখানে নারী কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় আছেন, যেখানে পরিবেশগত মান মানা হচ্ছে না, সেগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। মার্কিন তদন্তকারীরা আসার আগেই যদি আমরা নিজেরা ঘর সাজিয়ে রাখতে পারি, তাহলে সেই তদন্তে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সামনেই ঈদ এবং প্রতিবারই এই সময়ে পোশাক খাতে বেতন-বোনাস নিয়ে এক ধরনের টালবাহানা ও অসন্তোষ তৈরির অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এবার যেহেতু মাথার ওপর ১৫০ দিনের 'খড়গ' ঝুলছে, তাই বেতন-বোনাস নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বেতন পরিশোধে দেরি বা শ্রম অসন্তোষের মতো ঘটনা ঘটলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অজুহাত তৈরি হবে। তাই সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে যেন মালিকপক্ষ বা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী শিল্পের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে না পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাটা হয়তো কম দৃশ্যমান, কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ বাংলাদেশকে একটা বড় সত্য সামনে এনে দিয়েছে। আমাদের রপ্তানি আয়ের বিশাল একটা অংশ আসে পোশাক খাত থেকে, এবং সেই পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার আমেরিকা। এই দুটো নির্ভরতা একসঙ্গে ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থ মন্ত্রণালয়কে এখনই ভাবতে হবে, শুধু পোশাক নয়, ওষুধ শিল্প, আইটি খাত, চামড়া শিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যকে সামনে আনতে কী ধরনের আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায়। বৈচিত্র্য না আনলে পরের ঝুঁকিতে আবার একই জায়গায় পড়তে হবে।

পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়কে খেয়াল রাখতে হবে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আমেরিকা থেকে তুলা, সয়াবিন এবং বোয়িং বিমান কেনার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, আদালতের রায়ের পর সেই দায়গুলো ঠিক কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। হোয়াইট হাউস বলেছে চুক্তি বাতিল হয়নি, শুধু শুল্কের হার বদলেছে। কাজেই এই শর্তগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনে আইনি পথে পর্যালোচনা করাটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়, ট্রাম্পের শুল্কনীতি আসলে একটা আয়না ধরে দিয়েছে বাংলাদেশকে। সেই আয়নায় দেখা যাচ্ছে আমাদের দুর্বলতাগুলো। রপ্তানিতে বৈচিত্র্য নেই, বাজারে নির্ভরতা একমুখী, কারখানার ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলার প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত এবং বড় শক্তির সঙ্গে দরকষাকষিতে আমাদের কূটনৈতিক শক্তি এখনও দুর্বল।

ইতোমধ্যেই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যে রদবদল বা ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাকে ইতিবাচক হিসেবেই গণ্য করা যায়। তবে গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে কারণ পোশাক শিল্পে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরির একটি পায়তারা বা 'কানাঘুষা' শোনা যাচ্ছে।

নতুন সরকারের দেশপ্রেম এবং 'সবার আগে দেশ' স্লোগানটি তখনই সার্থক হবে, যখন তারা মাথা ঠান্ডা রেখে সুচিন্তিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই শুল্কযুদ্ধের প্রভাব থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারবে। এই ১৫০ দিন আমাদের জন্য কেবল সতর্কবার্তা নয় বরং অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার একটি ঐতিহাসিক মওসুম।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত