নিউরোপ্লাস্টিসিটি
আমরা শুধু আমাদের মস্তিষ্কের বাসিন্দা নই। আমরা এর স্থপতিও হতে পারি। নিজেদের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা নিজেদের নতুন করে গড়ার ক্ষমতা রাখি। প্রকৃতি আমাদের হাতে পরিবর্তনের চাবি তুলে দিয়েছে। সেই চাবি দিয়ে আমরা কোন দরজা খুলব তা একান্তই আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।
গোলাম মুনতাকা

মানুষ নিজের ভাগ্য নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। মানুষ ভাবে, গায়ের রং বা উচ্চতা কিংবা ভবিষ্যতে কোন রোগ শরীরে বাসা বাঁধবে তা সব লেখা আছে জিনে। বিজ্ঞান বহু বছর ধরে আমাদের এমন ধারণাই দিয়ে এসেছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন এক শাখা সেই পুরোনো বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে জিন আমাদের সম্ভাবনার কথা বলে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাবে কি না, তা নির্ভর করে পরিবেশ, অভ্যাস, অভিজ্ঞতা আর মস্তিষ্কের নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর। আধুনিক বিজ্ঞান দেখাচ্ছে, আমাদের মস্তিষ্ক স্থির কোনো কাঠামো নয়। শেখা, অভ্যাস আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। এই ক্ষমতার নামই ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’।
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল মস্তিষ্ক একবার তৈরি হয়ে গেলে আর বদলায় না। তাঁরা মনে করতেন শৈশব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মস্তিষ্কের বিকাশ থেমে যায়। এরপর শুধু ক্ষয়ের গল্প। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমবে বা বুদ্ধি লোপ পাবে। এটাই ছিল ধ্রুব সত্য। এই ধারণাটি শক্ত ভিত্তি পেয়েছিল স্পেনের বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী সান্তিয়াগো রামোন ই কাহালের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। তিনি প্রথম মাইক্রোস্কোপে নিউরনের স্পষ্ট ছবি দেখান। তাঁর ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, বয়স হলে নতুন কিছু শেখা যায় না, মস্তিষ্কের আঘাত সারে না, আর মানুষ জন্মগত সীমার মধ্যেই আটকে থাকে।
এই ধারণাকে প্রশ্ন করার প্রথম বড় চেষ্টা আসে ১৯৪৯ সালে। কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ওল্ডিং হেব শেখা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এক নতুন তত্ত্ব দেন। তিনি বলেন, দুটি নিউরন যদি বারবার একসঙ্গে সক্রিয় হয়, তাহলে তাদের মধ্যে সংযোগ আরও শক্ত হয়। এই ধারণাই পরে ‘হেবের নিয়ম’ নামে পরিচিত হয়। হেব দেখান, শেখা মানে শুধু মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন নয়। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভেতরের গঠনও বদলে যায়। শুরুতে অনেকেই এই কথা বিশ্বাস করতে চাননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়।
হেবের ধারণা থেকেই ষাটের দশকে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারিয়ান ডায়মন্ড এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেন। তিনি মানতে চাননি যে মস্তিষ্কের গঠন শুধু জিনই ঠিক করে দেয়। তিনি জানতে চাইলেন পরিবেশ কি মস্তিষ্কের গড়ন বদলে দিতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি ইঁদুর নিয়ে কাজ শুরু করেন। ইঁদুরদের তিন ধরনের পরিবেশে রাখা হয়। এক দল থাকে খেলনা আর সঙ্গীদের সঙ্গে ‘সমৃদ্ধ’ পরিবেশে। আরেক দল থাকে একঘেয়ে, সঙ্গীহীন খাঁচায়। তৃতীয় দল থাকে সাধারণ ল্যাবরেটরির পরিবেশে।
কয়েক সপ্তাহ পর ফলাফল দেখে সবাই অবাক হয়ে যান। সমৃদ্ধ পরিবেশে থাকা ইঁদুরদের সেরেব্রাল কর্টেক্স বা চিন্তার স্তর অনেক পুরু হয়ে গেছে। সেখানে নিউরনের সংযোগ আরো জটিল হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায় পরিবেশ বা অভিজ্ঞতা সরাসরি মস্তিষ্কের শরীরকে পুনর্গঠন করতে পারে। ডায়মন্ড দেখান, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করে সে কেমন পরিবেশে থাকে তার ওপর। একঘেয়েমি মস্তিষ্ককে দুর্বল করে দেয়, আর উদ্দীপনা ও সক্রিয়তা মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর একটি অদৃশ্য মানচিত্র বা ম্যাপ আঁকা থাকে। কোন অঙ্গের সিগন্যাল কোথায় যাবে তা সেখানে ঠিক করা থাকে। একসময় মনে করা হতো এই মানচিত্র কখনো বদলায় না। কিন্তু আশির দশকে বিজ্ঞানী মাইকেল মেরজেনিচ দেখান, এই ধারণা ভুল।
মেরজেনিচ গবেষণার জন্য বানরের হাতের একটি নির্দিষ্ট আঙুল অচল করে দেন। সবাই ভেবেছিল মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট আঙুলের জন্য বরাদ্দ অংশটি অকেজো হয়ে পড়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টোটা। পাশের আঙুলের সংকেত ওই অচল অংশে আসতে শুরু করেছে। অর্থাৎ মস্তিষ্ক নিজের মানচিত্র নিজেই বদলে ফেলে। যে অংশ ব্যবহার হচ্ছিল না, সেটাকে সে অন্য কাজে লাগিয়ে নেয়। এখান থেকেই মেরজেনিচ বলেন, ‘ইউজ ইট অর লুজ ইট’। অর্থাৎ, যা ব্যবহার করবেন না তা দুর্বল হয়ে যাবে, আর যা নিয়মিত ব্যবহার করবেন তা আরও শক্ত হবে।
এই একই সত্য মানুষের মস্তিষ্কেও খাটে। বিংশ শতাব্দীর বড় অংশজুড়েই বিশ্বাস ছিল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কে নতুন নিউরন জন্মায় না। শৈশবে যা নিয়ে মানুষ জন্মায় তা খরচ করেই তাকে জীবন পার করতে হয়। কিন্তু ১৯৯৮ সালে পিটার এরিকসন ও তাঁর দল এই ধারণা ভেঙে দেন। তাঁরা দেখেন বয়স্ক মানুষের হিপোক্যাম্পাসে নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নিউরোজেনেসিস’। তবে পরবর্তী গবেষণায় এ নিয়ে কিছুটা বিতর্কও আছে।
তবে এর পক্ষে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় লন্ডনের ট্যাক্সিচালকদের ওপর করা এক গবেষণায়। লন্ডনের রাস্তাঘাট চেনা খুব কঠিন কাজ। অলিগলি মনে রাখতে চালকদের এক কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। একে বলা হয় ‘দ্য নলেজ’। গবেষক এলিনর ম্যাগুইয়ার এমআরআই করে দেখেন অভিজ্ঞ চালকদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের পেছনের অংশ সাধারণ মানুষের চেয়ে বড়। যারা যত বেশি দিন গাড়ি চালিয়েছেন তাঁদের ওই অংশ তত বিশাল। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের মানসিক কসরত মানুষের মগজের গড়নই বদলে দিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করলে মস্তিষ্কের সেই অংশের দখল বাড়ে। এই পরিবর্তন শুধু চালকদের মধ্যেই নয়। পেশাদার বেহালাবাদক বা সংগীতশিল্পীদের মধ্যেও দেখা যায়। দীর্ঘদিনের অনুশীলন তাঁদের আঙুলের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী কর্টেক্সকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে।
নিউরোপ্লাস্টিসিটির সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যবহার দেখা যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে। এই ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখেন এডওয়ার্ড টাউব। স্ট্রোকের পর অনেক মানুষের হাত বা পা আংশিক কিংবা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়। আগে মনে করা হতো, একবার অচল হলে সেই হাত আর কখনো ঠিক হবে না। ফলে রোগী নিজেই সেই হাত ব্যবহার করা বন্ধ করে দিতেন। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কও ওই হাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভুলে যেত।
টাউব এই অবস্থার নাম দেন ‘লার্নড নন-ইউজ’, অর্থাৎ ব্যবহার না করতে করতে হাতকে অকেজো করে ফেলা। তিনি এক নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি বের করেন। এতে রোগীর সুস্থ হাতটি বেঁধে রাখা হয়, যেন রোগী বাধ্য হয়ে দুর্বল হাতটি ব্যবহার করেন। দিনের পর দিন এই চর্চার ফলে মস্তিষ্ক আবার ওই হাতের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। ধীরে ধীরে নতুন স্নায়ুপথ তৈরি হয়। অনেক রোগী হারানো শক্তি ও নড়াচড়ার ক্ষমতা ফিরে পান।
নিউরোপ্লাস্টিসিটির আরেকটি আশ্চর্য ব্যবহার দেখা যায় ‘ফ্যান্টম লিম্ব পেইন’-এর চিকিৎসায়। অনেক মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলার পরও মনে হয়, সেই অঙ্গটি এখনো শরীরে আছে। শুধু তাই নয়, সেখানে তীব্র ব্যথাও অনুভূত হয়। বিজ্ঞানী ভি. এস. রামচন্দ্রন এর ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, অঙ্গ কেটে গেলেও মস্তিষ্কের ভেতরের মানচিত্রে সেই অঙ্গের জায়গাটি থেকে যায়। কিন্তু সেখানে আর কোনো সংকেত পৌঁছায় না। তখন পাশের অংশের সংকেত ভুল করে ওই জায়গায় ঢুকে পড়ে।
ফলে গাল বা কাঁধে স্পর্শ লাগলেও রোগীর মনে হয়, কাটা হাতে কেউ স্পর্শ করছে। এই বিভ্রান্তিই অনেক সময় ব্যথার কারণ হয়। রামচন্দ্রন এই সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করেন খুব সাধারণ একটি আয়না। রোগী আয়নায় নিজের সুস্থ হাতের প্রতিবিম্ব দেখে ভাবেন, সেটিই তাঁর হারানো হাত। এই দৃশ্য মস্তিষ্ককে ভুল বার্তা দেয়। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শান্ত হয়, আর ব্যথাও কমে আসে।
বিজ্ঞানীরা এখন নিউরোপ্লাস্টিসিটিকে কাজে লাগিয়ে অসাধ্য সাধনের পথে হাঁটছেন। স্টেম সেল দিয়ে নষ্ট নিউরন মেরামতের চেষ্টা চলছে। ইলন মাস্কের নিউরালিংক প্রজেক্ট মস্তিষ্কের সঙ্গে কম্পিউটার যোগ করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ শুধু চিন্তা দিয়ে হুইলচেয়ার বা কম্পিউটার চালাবেন। এমন দিনের আর বেশি দেরি নেই। জিন এডিটিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মস্তিষ্ককে আরও উন্নত করার গবেষণাও চলছে। আমরা হয়ত একদিন আমাদের বুদ্ধিমত্তা বা স্মৃতিশক্তিকে ইচ্ছামতো বাড়াতে পারব।
নিউরোপ্লাস্টিসিটির এই গল্প আমাদের এক নতুন আশার কথা শোনায়। আমরা জেনেছি অতীত আমাদের ভবিষ্যতকে পুরোপুরি বেঁধে রাখতে পারে না। আমাদের জন্মগত মেধা বা ক্ষমতা স্থির নয়। আজ আমরা যা ভাবব বা যা করব তাই আমাদের আগামী দিনের মস্তিষ্ক গড়ে দেবে। প্রতিটি নতুন চিন্তা ও নতুন কাজ আমাদের মাথার ভেতরে নতুন সংযোগ তৈরি করে। আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই শেষ পর্যন্ত আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ঠিক করে দেয়।
তাই আমরা শুধু আমাদের মস্তিষ্কের বাসিন্দা নই। আমরা এর স্থপতিও হতে পারি। নিজেদের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা নিজেদের নতুন করে গড়ার ক্ষমতা রাখি। প্রকৃতি আমাদের হাতে পরিবর্তনের চাবি তুলে দিয়েছে। সেই চাবি দিয়ে আমরা কোন দরজা খুলব তা একান্তই আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।

মানুষ নিজের ভাগ্য নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। মানুষ ভাবে, গায়ের রং বা উচ্চতা কিংবা ভবিষ্যতে কোন রোগ শরীরে বাসা বাঁধবে তা সব লেখা আছে জিনে। বিজ্ঞান বহু বছর ধরে আমাদের এমন ধারণাই দিয়ে এসেছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন এক শাখা সেই পুরোনো বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে জিন আমাদের সম্ভাবনার কথা বলে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাবে কি না, তা নির্ভর করে পরিবেশ, অভ্যাস, অভিজ্ঞতা আর মস্তিষ্কের নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর। আধুনিক বিজ্ঞান দেখাচ্ছে, আমাদের মস্তিষ্ক স্থির কোনো কাঠামো নয়। শেখা, অভ্যাস আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। এই ক্ষমতার নামই ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’।
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল মস্তিষ্ক একবার তৈরি হয়ে গেলে আর বদলায় না। তাঁরা মনে করতেন শৈশব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মস্তিষ্কের বিকাশ থেমে যায়। এরপর শুধু ক্ষয়ের গল্প। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমবে বা বুদ্ধি লোপ পাবে। এটাই ছিল ধ্রুব সত্য। এই ধারণাটি শক্ত ভিত্তি পেয়েছিল স্পেনের বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী সান্তিয়াগো রামোন ই কাহালের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। তিনি প্রথম মাইক্রোস্কোপে নিউরনের স্পষ্ট ছবি দেখান। তাঁর ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, বয়স হলে নতুন কিছু শেখা যায় না, মস্তিষ্কের আঘাত সারে না, আর মানুষ জন্মগত সীমার মধ্যেই আটকে থাকে।
এই ধারণাকে প্রশ্ন করার প্রথম বড় চেষ্টা আসে ১৯৪৯ সালে। কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ওল্ডিং হেব শেখা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এক নতুন তত্ত্ব দেন। তিনি বলেন, দুটি নিউরন যদি বারবার একসঙ্গে সক্রিয় হয়, তাহলে তাদের মধ্যে সংযোগ আরও শক্ত হয়। এই ধারণাই পরে ‘হেবের নিয়ম’ নামে পরিচিত হয়। হেব দেখান, শেখা মানে শুধু মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন নয়। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভেতরের গঠনও বদলে যায়। শুরুতে অনেকেই এই কথা বিশ্বাস করতে চাননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়।
হেবের ধারণা থেকেই ষাটের দশকে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারিয়ান ডায়মন্ড এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেন। তিনি মানতে চাননি যে মস্তিষ্কের গঠন শুধু জিনই ঠিক করে দেয়। তিনি জানতে চাইলেন পরিবেশ কি মস্তিষ্কের গড়ন বদলে দিতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি ইঁদুর নিয়ে কাজ শুরু করেন। ইঁদুরদের তিন ধরনের পরিবেশে রাখা হয়। এক দল থাকে খেলনা আর সঙ্গীদের সঙ্গে ‘সমৃদ্ধ’ পরিবেশে। আরেক দল থাকে একঘেয়ে, সঙ্গীহীন খাঁচায়। তৃতীয় দল থাকে সাধারণ ল্যাবরেটরির পরিবেশে।
কয়েক সপ্তাহ পর ফলাফল দেখে সবাই অবাক হয়ে যান। সমৃদ্ধ পরিবেশে থাকা ইঁদুরদের সেরেব্রাল কর্টেক্স বা চিন্তার স্তর অনেক পুরু হয়ে গেছে। সেখানে নিউরনের সংযোগ আরো জটিল হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায় পরিবেশ বা অভিজ্ঞতা সরাসরি মস্তিষ্কের শরীরকে পুনর্গঠন করতে পারে। ডায়মন্ড দেখান, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করে সে কেমন পরিবেশে থাকে তার ওপর। একঘেয়েমি মস্তিষ্ককে দুর্বল করে দেয়, আর উদ্দীপনা ও সক্রিয়তা মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর একটি অদৃশ্য মানচিত্র বা ম্যাপ আঁকা থাকে। কোন অঙ্গের সিগন্যাল কোথায় যাবে তা সেখানে ঠিক করা থাকে। একসময় মনে করা হতো এই মানচিত্র কখনো বদলায় না। কিন্তু আশির দশকে বিজ্ঞানী মাইকেল মেরজেনিচ দেখান, এই ধারণা ভুল।
মেরজেনিচ গবেষণার জন্য বানরের হাতের একটি নির্দিষ্ট আঙুল অচল করে দেন। সবাই ভেবেছিল মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট আঙুলের জন্য বরাদ্দ অংশটি অকেজো হয়ে পড়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টোটা। পাশের আঙুলের সংকেত ওই অচল অংশে আসতে শুরু করেছে। অর্থাৎ মস্তিষ্ক নিজের মানচিত্র নিজেই বদলে ফেলে। যে অংশ ব্যবহার হচ্ছিল না, সেটাকে সে অন্য কাজে লাগিয়ে নেয়। এখান থেকেই মেরজেনিচ বলেন, ‘ইউজ ইট অর লুজ ইট’। অর্থাৎ, যা ব্যবহার করবেন না তা দুর্বল হয়ে যাবে, আর যা নিয়মিত ব্যবহার করবেন তা আরও শক্ত হবে।
এই একই সত্য মানুষের মস্তিষ্কেও খাটে। বিংশ শতাব্দীর বড় অংশজুড়েই বিশ্বাস ছিল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কে নতুন নিউরন জন্মায় না। শৈশবে যা নিয়ে মানুষ জন্মায় তা খরচ করেই তাকে জীবন পার করতে হয়। কিন্তু ১৯৯৮ সালে পিটার এরিকসন ও তাঁর দল এই ধারণা ভেঙে দেন। তাঁরা দেখেন বয়স্ক মানুষের হিপোক্যাম্পাসে নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নিউরোজেনেসিস’। তবে পরবর্তী গবেষণায় এ নিয়ে কিছুটা বিতর্কও আছে।
তবে এর পক্ষে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় লন্ডনের ট্যাক্সিচালকদের ওপর করা এক গবেষণায়। লন্ডনের রাস্তাঘাট চেনা খুব কঠিন কাজ। অলিগলি মনে রাখতে চালকদের এক কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। একে বলা হয় ‘দ্য নলেজ’। গবেষক এলিনর ম্যাগুইয়ার এমআরআই করে দেখেন অভিজ্ঞ চালকদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের পেছনের অংশ সাধারণ মানুষের চেয়ে বড়। যারা যত বেশি দিন গাড়ি চালিয়েছেন তাঁদের ওই অংশ তত বিশাল। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের মানসিক কসরত মানুষের মগজের গড়নই বদলে দিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করলে মস্তিষ্কের সেই অংশের দখল বাড়ে। এই পরিবর্তন শুধু চালকদের মধ্যেই নয়। পেশাদার বেহালাবাদক বা সংগীতশিল্পীদের মধ্যেও দেখা যায়। দীর্ঘদিনের অনুশীলন তাঁদের আঙুলের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী কর্টেক্সকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে।
নিউরোপ্লাস্টিসিটির সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যবহার দেখা যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে। এই ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখেন এডওয়ার্ড টাউব। স্ট্রোকের পর অনেক মানুষের হাত বা পা আংশিক কিংবা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়। আগে মনে করা হতো, একবার অচল হলে সেই হাত আর কখনো ঠিক হবে না। ফলে রোগী নিজেই সেই হাত ব্যবহার করা বন্ধ করে দিতেন। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কও ওই হাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভুলে যেত।
টাউব এই অবস্থার নাম দেন ‘লার্নড নন-ইউজ’, অর্থাৎ ব্যবহার না করতে করতে হাতকে অকেজো করে ফেলা। তিনি এক নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি বের করেন। এতে রোগীর সুস্থ হাতটি বেঁধে রাখা হয়, যেন রোগী বাধ্য হয়ে দুর্বল হাতটি ব্যবহার করেন। দিনের পর দিন এই চর্চার ফলে মস্তিষ্ক আবার ওই হাতের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। ধীরে ধীরে নতুন স্নায়ুপথ তৈরি হয়। অনেক রোগী হারানো শক্তি ও নড়াচড়ার ক্ষমতা ফিরে পান।
নিউরোপ্লাস্টিসিটির আরেকটি আশ্চর্য ব্যবহার দেখা যায় ‘ফ্যান্টম লিম্ব পেইন’-এর চিকিৎসায়। অনেক মানুষের হাত বা পা কেটে ফেলার পরও মনে হয়, সেই অঙ্গটি এখনো শরীরে আছে। শুধু তাই নয়, সেখানে তীব্র ব্যথাও অনুভূত হয়। বিজ্ঞানী ভি. এস. রামচন্দ্রন এর ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, অঙ্গ কেটে গেলেও মস্তিষ্কের ভেতরের মানচিত্রে সেই অঙ্গের জায়গাটি থেকে যায়। কিন্তু সেখানে আর কোনো সংকেত পৌঁছায় না। তখন পাশের অংশের সংকেত ভুল করে ওই জায়গায় ঢুকে পড়ে।
ফলে গাল বা কাঁধে স্পর্শ লাগলেও রোগীর মনে হয়, কাটা হাতে কেউ স্পর্শ করছে। এই বিভ্রান্তিই অনেক সময় ব্যথার কারণ হয়। রামচন্দ্রন এই সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করেন খুব সাধারণ একটি আয়না। রোগী আয়নায় নিজের সুস্থ হাতের প্রতিবিম্ব দেখে ভাবেন, সেটিই তাঁর হারানো হাত। এই দৃশ্য মস্তিষ্ককে ভুল বার্তা দেয়। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শান্ত হয়, আর ব্যথাও কমে আসে।
বিজ্ঞানীরা এখন নিউরোপ্লাস্টিসিটিকে কাজে লাগিয়ে অসাধ্য সাধনের পথে হাঁটছেন। স্টেম সেল দিয়ে নষ্ট নিউরন মেরামতের চেষ্টা চলছে। ইলন মাস্কের নিউরালিংক প্রজেক্ট মস্তিষ্কের সঙ্গে কম্পিউটার যোগ করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ শুধু চিন্তা দিয়ে হুইলচেয়ার বা কম্পিউটার চালাবেন। এমন দিনের আর বেশি দেরি নেই। জিন এডিটিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মস্তিষ্ককে আরও উন্নত করার গবেষণাও চলছে। আমরা হয়ত একদিন আমাদের বুদ্ধিমত্তা বা স্মৃতিশক্তিকে ইচ্ছামতো বাড়াতে পারব।
নিউরোপ্লাস্টিসিটির এই গল্প আমাদের এক নতুন আশার কথা শোনায়। আমরা জেনেছি অতীত আমাদের ভবিষ্যতকে পুরোপুরি বেঁধে রাখতে পারে না। আমাদের জন্মগত মেধা বা ক্ষমতা স্থির নয়। আজ আমরা যা ভাবব বা যা করব তাই আমাদের আগামী দিনের মস্তিষ্ক গড়ে দেবে। প্রতিটি নতুন চিন্তা ও নতুন কাজ আমাদের মাথার ভেতরে নতুন সংযোগ তৈরি করে। আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই শেষ পর্যন্ত আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ঠিক করে দেয়।
তাই আমরা শুধু আমাদের মস্তিষ্কের বাসিন্দা নই। আমরা এর স্থপতিও হতে পারি। নিজেদের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা নিজেদের নতুন করে গড়ার ক্ষমতা রাখি। প্রকৃতি আমাদের হাতে পরিবর্তনের চাবি তুলে দিয়েছে। সেই চাবি দিয়ে আমরা কোন দরজা খুলব তা একান্তই আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।

সৌন্দর্য বোঝার ক্ষেত্রে তাই দুটো দিক কাজ করে। একদিকে আছে বস্তুনিষ্ঠ দিক, অর্থাৎ কোনো জিনিসের গঠন, ভারসাম্য বা বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে আছে ব্যক্তিনিষ্ঠ দিক, মানে ব্যক্তির অনুভূতি, রুচি আর অভিজ্ঞতা। এই দুই দিক একসঙ্গে জড়িত বলেই সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া এত কঠিন।
২ ঘণ্টা আগে
প্রযুক্তির ইতিহাসে ১৯২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। বর্তমান যুগে আমরা যে টেলিভিশনকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছি, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই দিনটিতেই। স্কটিশ প্রকৌশলী জন লগি বেয়ার্ড সেদিন প্রথমবারের মতো ‘রিয়েল টেলিভিশন’ বা প্রকৃত টেলিভিশন জনসমক্ষে প্রদর্শন কর
৬ ঘণ্টা আগে
দোহারের ইকরাশি গ্রামের শান্তি রানী পাল। বয়স ৯২ বছর। বয়সের ভারে অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন। চোখের আলো কমে গেছে, গলার স্বরও ভেঙে গেছে; তবু সংসারের চাকাকে সচল রাখতে আদি পেশা হিসেবে কুমারের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
১ দিন আগে
জেনে অবাক হবেন যে শত বছর আগে বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলে বন্যপ্রাণী বাস করত। কোন কোন বন্যপ্রাণী ও পাখি সেখানে ছিল? নদী, জলাভূমি ও পুকুরে কী কী মাছ পাওয়া যেত? ১৯১০ সালে প্রকাশিত জে এন গুপ্ত-এর পূর্ববঙ্গ ও আসামের ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (বগুড়া) থেকে অনুবাদ করেছেন ভূ-পর্যটক তারেক অণু।
১ দিন আগে