leadT1ad

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতেও ভরসা পাচ্ছেন না ইরানিরা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ১৪: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে রোববার একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এ ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তির হাওয়া বইলেও তেহরানের রাস্তায় এখনও রয়ে গেছে অস্বস্তি। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা ও উত্তেজনার মধ্যে থাকা অনেক ইরানি মনে করছেন, এ সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে না। খবর আল-জাজিরার।

চুক্তির আওতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশ্লেষকদের আশা, এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।

বিপরীতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবরোধে আগে থেকেই সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতি আরও চাপে পড়ে।

তবে এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ। এসব বিষয় পরবর্তী সময়ে আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই অনেক ইরানি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে সন্দিহান।

তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পারিসা (ছদ্মনাম) বলেন, আমি মনে করি না এই চুক্তি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে না। আপাতত কার্যকর হলেও উভয়পক্ষ নিজেদের স্বার্থে একে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

রাজধানীর আরেক বাসিন্দা মেহেদীও দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধবিরতি টিকবে বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, আমি মনে করি না ইরানের সামান্যতম দাবিও মেনে নিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।

যেসব বিষয়ে জোর ইরানিদের

ইরানিদের মতে, স্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছাতে হলে আগে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে এবং দেশটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ে ইরানের দাবি নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ওই জলপথে আগের মতো বিনামূল্যে চলাচলের পক্ষে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং ইসরায়েলের বিরোধিতা সত্ত্বেও সমঝোতা স্মারকটি হয়েছে। তবে রোববার বৈরুতের উপশহরে ইসরায়েলের বোমা হামলা পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তোলে। তেহরান এ ধরনের হামলাকে ‘রেড লাইন’ বলে বিবেচনা করে।

চুক্তির বিষয়ে ইরানের কট্টরপন্থীদের আপত্তিও আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে। তাঁদের দাবি, সরকার আলোচনায় আরও কঠোর অবস্থান নেবে। ভবিষ্যতে যেকোনো ছাড়ের বিষয়েও তারা সমালোচনায় মুখর হতে পারে।

স্থানীয় সময় সোমবার মধ্যরাত পার হওয়ার পর ইরান চুক্তির ঘোষণা দেয়। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিনে এ ঘোষণা না দেওয়ার জন্যই এমনটা করা হয়। তবে সময়ের ব্যবধানের কারণে ওয়াশিংটন রোববারই চুক্তির ঘোষণা দেয়।

সোমবার তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কয়ারে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি বিশাল কালো ম্যুরাল উন্মোচন করা হয়। জুলাই মাসে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে। জীবদ্দশায় তিনি নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসের কথা বলতেন।

দেশজুড়ে রাষ্ট্রপন্থী সমর্থকদের বিভিন্ন সমাবেশে অনেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করেছেন এবং আলোচনাকারী দল ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেছেন।

যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা

ইরানের অনেকের আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই যুদ্ধ আবারও শুরু হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১০০ দিনের বেশি সময়ের যুদ্ধে ইরান যে কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে, তা ধরে রাখার পক্ষে তারা।

সরকারপন্থী মোহাদেসে নামের এক নারী আল জাজিরাকে বলেন, আমার মতে এই চুক্তি টিকবে না। যুক্তরাষ্ট্র আবারও এটি লঙ্ঘন করবে। তাই আমাদের অবস্থানে অটল থাকা উচিত। উদাহরণ হিসেবে হরমুজ প্রণালি না খোলাই ভালো।

চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তেহরান শুরু থেকেই এটি সমঝোতায় থাকতে হবে বলে জানিয়ে আসছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদর রোববার রাতে বৈরুতে ইসরায়েলের হামলার পর বলেছিলেন, ইসলামের যোদ্ধাদের প্রতিক্রিয়া আসন্ন।

তবে কয়েক ঘণ্টা পরই দেশের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা নিশ্চিত করে। কোনো ধরনের পাল্টা হামলাও হয়নি।

ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রতিশোধমূলক হামলা স্থগিত রাখার বিনিময়ে ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে নৌ অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হয়েছেন। আগে এ বিষয়ে ৩০ দিনের সময়সীমা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

এদিকে, চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাদের মতে, এটি ইসরায়েলের ব্যর্থতা।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজা উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। ইরান হামলা করলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

ইরানের অর্থনীতিতে সুবাতাস

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির আনুষ্ঠানিক অনুলিপি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে দুপক্ষই একে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

চুক্তির ঘোষণা দিতে গিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বলেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে এই সমঝোতায় সই করতে বাধ্য হতে হয়েছে।

সরাসরি সংঘাতের অবসান এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে ইরানের বাজারও। এতে আমদানিপণ্যের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক হওয়ার আশা দেখা দিয়েছে।

সপ্তাহের শুরু থেকে টানা তৃতীয় দিনের মতো সোমবারও ইরানি মুদ্রার মান শক্তিশালী হয়েছে। প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ১০ হাজার রিয়াল। গত মাসে এটি নেমে গিয়েছিল প্রায় ১৯ লাখ রিয়ালে।

তেহরানে স্বর্ণমুদ্রার দামও কমেছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। সোমবার লেনদেন শেষে তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক প্রায় ৫০ লাখ পয়েন্টে পৌঁছে নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে।

ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত হলে অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তা নির্ভর করবে নানা বিষয়ের ওপর, যার অনেকগুলোই তেহরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত