মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী ও সহিংস মাদক পাচারকারী সংগঠনের নেতা এবং ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ মাদক সম্রাট ‘এল মেনচো’ সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পরিচালিত অভিযানের সময় তিনি নিহত হয়েছেন বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই তথ্য জানায়। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৯ বছর বয়সী এল মেনচো গতকাল রোববার গ্রেপ্তারের সময় তাঁর সমর্থক ও মেক্সিকান সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন। এরপর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
এল মেনচোর প্রকৃত নাম নেমেসিও ওসেগুয়েরা সারভান্তেস, তবে এল মেনচো নামেই তিনি বেশি পরিচিত। মেনচো ভয়ঙ্কর জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের নেতা ছিলেন। এটি মেক্সিকোর সবচেয়ে বিস্তৃত ও ভয়ানক মাদক তৈরি ও পাচারকারী সংগঠন। মেক্সিকোর জালিস্কো রাজ্যে ২০১০ সালে এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয়। মেক্সিকোর অধিকাংশ রাজ্যে ছাড়াও এটি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সরবরাহের অন্যতম প্রধান নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচিত। কোকেইন, মেথামফেটামিন ও ফেন্টানিল উৎপাদন ও পাচার করা তাদের প্রধান কাজ।
মেক্সিকোর মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলীয় জালিস্কো রাজ্যের তাপালপা শহরে এই অভিযানে সংগঠনের চার সদস্য নিহত হয়। তিনজন সেনাসদস্যও আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোকে তথ্য সরবরাহ করেছিল, যা এই অভিযানে সহায়তা করেছে।
প্রতিশোধ হিসেবে এল মেনচোর সমর্থকেরা আটটি রাজ্যে গাড়িতে আগুন দেয়, সড়ক অবরোধ গড়ে তোলে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এর প্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বেশ কিছু শহরে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের আশ্রয়ে থাকার সতর্কতা জারি করেছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের অধিকাংশ এলাকায় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তার গ্রেপ্তারে সহায়ক তথ্যের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার (প্রায় ১১ দশমিক ১ মিলিয়ন পাউন্ড) পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
এক বিবৃতিতে মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, অভিযানটি দেশের বিশেষ বাহিনী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছে। এতে মেক্সিকান বিমানবাহিনী ও ন্যাশনাল গার্ডের বিমানও মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও অভিযানে বেশ কয়েকটি সাঁজোয়া যান ও রকেট লঞ্চারসহ বিভিন্ন অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা দেশটির গুয়াদালাহারা-সহ একাধিক শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখেছেন। গুয়াদালাহারা আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের একটি আয়োজক শহর।
এ ঘটনায় জালিস্কো উপকূলের পর্যটনকেন্দ্র পুয়ের্তো ভাল্লার্তায় সম্ভাব্য হাজার হাজার পর্যটক আটকা পড়েছেন।
রোববার দিনজুড়ে জালিস্কোসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় সশস্ত্র ব্যক্তিদের দেখা যায়। জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস নাভারো সামাজিক মাধ্যমে বাসিন্দাদের ‘কোড রেড’ সতর্কতা মেনে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, রাজ্যে গণপরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও বাতিল করা হয়েছে।
মেক্সিকোতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ সামাজিকমাধ্যমে বলেন, এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের জন্য বড় অগ্রগতি।
এল মেনচোর নিহত হওয়া দেশটির প্রেসিডেন্টের মাদক কার্টেলবিরোধী লড়াইয়ে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্কও মজবুত করতে পারে। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প মেক্সিকোর মাটিতে কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
তবে প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম দেশটির দক্ষিণ সীমান্তে মার্কিন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে কার্টেলের সহিংস প্রতিক্রিয়ায় সরকারের এই সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে।
এর আগে তারা রকেটচালিত গ্রেনেড দিয়ে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে, বহু রাজ্য কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখাতে সেতু থেকে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে।