আলোচনায় ইরানের ১০ শর্ত, ছিটকে পড়ল ইসরায়েল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৬: ১৯
ইরানের দাবি, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঐতিহাসিক পরাজয় হয়েছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি তখনই কার্যকর হবে, যখন ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে’ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে।

যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘোষণা করছি– ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।’

আগামী ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান যে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তার বিস্তারিত সামনে এসেছে। এসব প্রস্তাবে ইরান কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নয় বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০ দফা মেনে নেবে বলেছে। তবে এখানে আরও কাজ হবে আগামী দুই সপ্তাহ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালায় ইরানে। প্রতিরোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। টানা ৪০ দিন পাল্টাপাল্টি হামলার আপাতত অবসান হয়েছে যুদ্ধবিরতিতে।

ইরানের দাবি, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঐতিহাসিক পরাজয় হয়েছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। শত্রুপক্ষ স্পষ্টভাবে পরাজিত হয়েছে এবং এখন তাদের সামনে ইরানের ইচ্ছা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই।

এতে আরও বলা হয়, গত ৪০ দিন ছিল ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সম্মিলিত যুদ্ধ, যেখানে ইরান ও তার মিত্ররা শত্রুপক্ষের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই বুঝতে পারে যে, তারা জয়ী হতে পারবে না। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা শুরু করে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ টুইট করে ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে এবং এই যুদ্ধবিরতি লেবাননসহ সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে প্রযোজ্য।

যুদ্ধবিরতি শুধু ইরানের মূল ভূখণ্ডে আমেরিকা-ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা পুরো অঞ্চলে প্রযোজ্য। অর্থাৎ লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ, ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধ, ইরাক-সিরিয়ায় আমেরিকান ঘাঁটিতে হামলা– সবকিছু বন্ধ হবে। শাহবাজ শরীফ উভয় পক্ষকে আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাকিস্তান এই ঐতিহাসিক বৈঠকের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন উইটকফ রয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রয়েছেন।

এই আলোচনায় ইসরায়েলকে একেবারেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কারণ, এটি মূলত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা। ইসরায়েলকে কখনো সরাসরি স্বীকৃতি দেয় না ইরান এবং তাদের সঙ্গে টেবিলে বসে না। পাকিস্তানের কাছে ইরানের দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকেই তার মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করে লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক, ফিলিস্তিনসহ সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। তাই ইসরায়েলকে আলাদা করে ডাকার প্রয়োজন পড়েনি।

অবশ্য ইসরায়েল এখনো এই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট বলেছেন, লেবানন ফ্রন্টে এই চুক্তি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে যাবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে, ইসরায়েল এখনো সীমিত পর্যায়ে লেবাননে ছোটখাটো হামলা ও তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

এই যুদ্ধবিরতি ইরানের ১০ দফা দাবির ভিত্তিতেই হয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল স্পষ্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ১০ দফা প্রস্তাবকে ‘কার্যকরী ভিত্তি’ হিসেবে মেনে নিয়েছে। এই দফাগুলোর ভিত্তিতেই আলোচনা চলবে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক রেজুলেশনে পরিণত করা হবে, যা আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা পাবে।

সংক্ষেপে ইরানের ১০ দফার মূল দাবি

১. ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন না করার লিখিত গ্যারান্টি

২. হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ

৩. ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

৪. সব প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া

৫. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আইএইএ বোর্ড অফ গভর্নরসের সব রেজুলেশন বাতিল

৬. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান

৭. মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন যুদ্ধবাহিনী ও ঘাঁটি প্রত্যাহার

৮. লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইয়েমেন (হুথি), ইরাক, ফিলিস্তিনসহ সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ

৯. বিদেশে আটকে থাকা সব ইরানি সম্পদ মুক্তি

১০. পুরো চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক রেজুলেশনে রূপান্তর, যা ‘বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন’–এ পরিণত হবে।

সম্পর্কিত