ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন

জ্বালানি সংকটে এশিয়াজুড়ে অস্থিরতা: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে পাম্পকর্মী নিহত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ২৩: ৪৬
রাঙামাটি শহরের একটি পাম্পে জ্বালানি নিতে বাইকচালকদের ভিড়। স্ট্রিম ছবি

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকট এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সহিংসতা ও অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে জ্বালানি না পেয়ে ক্ষুব্ধ চালকদের হাতে পেট্রল পাম্পের কর্মীদের প্রাণ হারানোর মতো ঘটনা ঘটছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো জরুরি রিজার্ভ ব্যবহার করে চড়া দামে জ্বালানি কিনছে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত কেনার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে পাকিস্তানে। তেলের পাম্পগুলোতে সরবরাহ না থাকায় বিক্ষুব্ধ চালকদের সঙ্গে পাম্পকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর শিয়ালকোটে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে গ্যালন ভরে তেল দিতে অস্বীকার করায় একজন পাম্পকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের পেট্রোলিয়াম ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান গুল নাওয়াজ আফ্রিদি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার কতদিন ভর্তুকি দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখবে জানি না। যেকোনো সময় মানুষ পাম্প মালিক ও কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালাতে পারে।’

এশিয়ার আরেক শক্তিধর দেশ ভারতেও জ্বালানি তেলের জেরে একাধিক চুরি ও হামলার ঘটনায় পাম্পকর্মীদের আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে গত সপ্তাহে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রতিবাদে হাজার হাজার পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট পালন করেছে, যা দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

জ্বালানি সংকটের এই ঢেউ ইউরোপ ও ওশেনিয়া অঞ্চলেও আছড়ে পড়েছে। ফ্রান্সে অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তার দাবিতে এই সপ্তাহে বড় বড় শহরগুলোতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন ট্রাকচালকরা। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন স্থানে তেল চুরির হার প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বাণিজ্যিক সংগঠনগুলো।

ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইডিয়ান সালেহিয়ান বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণত জনপদে সহিংসতা ও সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করে। যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ভয়াবহ অস্থিরতা দেখতে পাব।’

ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম সাধারণের নাগালে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতির কারণে এই ভর্তুকি তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইন্দোনেশিয়ায় ভর্তুকি কমানো হলে তা ২০২২ সালের মতো দেশব্যাপী বড় ধরনের দাঙ্গা বা গণবিক্ষোভের সূত্রপাত করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল যুদ্ধের ময়দানেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কুপ্রভাব এখন বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘এটি এক প্রকার উন্মাদনা। এই সংকট সমাধানে বৈশ্বিক বিবেক আজ কোথায়?” মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, ‘যে যুদ্ধে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই, তার জন্য আজ আমাদের শাস্তি পেতে হচ্ছে। সরকারের সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের সকল পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে গেছে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলমের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এলএনজি আমদানিতে এক বছর আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি ভর্তুকি দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণের সন্ধান করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা শীঘ্রই খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত