দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রে সমর্থন হারাচ্ছে ইসরায়েল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

এআই জেনারেটেড ছবি

ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘এই হামলা আমাদের বন্ধুর সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে।’

প্রায় সাত সপ্তাহ পর যুদ্ধ এখন নড়বড়ে এক যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর অনেকগুলোই এখনো অর্জিত হয়নি। তবে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের মিত্রের সংখ্যা দ্রুত কমছে।

এক বছর আগে পিউ রিসার্চের এক জরিপে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা বেশ তলানিতে ছিল। জরিপে দেখা যায়, আমেরিকার ডেমোক্র্যাটদের বড় অংশ এবং ৫০ বছরের কম বয়সী অর্ধেক রিপাবলিকান ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। উপসাগরীয় দেশ থেকে লেবানন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ কৌশলগতভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে একমত পোষণ করছে। জেরুজালেম ও ওয়াশিংটন মিলে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে দুটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এত কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

ইরান যুদ্ধকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখে ইসরায়েল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই মনে করেন এই যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয়, দেশের জন্য ভালো কিছু নয়। এতে দেশের বিপুল অর্থ ও সম্পদ ব্যয় হচ্ছে।

নেতানিয়াহুও এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদিচ্ছার ওপর বেশি নির্ভর করছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে ট্রাম্প নিজেও খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই।

ইসরায়েলের জনপ্রিয়তায় ধস

সর্বশেষ পিউ জরিপ অনুযায়ী ৬০ শতাংশ আমেরিকান ইসরায়েলকে অপছন্দ করেন। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাট এবং স্বতন্ত্র ভোটারই বেশি। ৪০ শতাংশের বেশি রিপাবলিকানও একই মত দিয়েছেন। সব দলের ৫০ বছরের কম বয়সী বেশিরভাগ আমেরিকান ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। এক-চতুর্থাংশের বেশি আমেরিকানের ইসরায়েল সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত নেতিবাচক।

আগের জরিপগুলোর মতো এবারও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের অবস্থান বেশ খারাপ। তরুণ ডেমোক্র্যাটদের প্রায় অর্ধেক বা ৪৭ শতাংশ ইসরায়েলকে খুব অপছন্দ করেন। বয়স্কদের মধ্যে এই হার কিছুটা কম—৩৯ শতাংশ।

বামপন্থী বিশ্লেষক ম্যাট ইগলেসিয়াস গত সপ্তাহে এক্সে লিখেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ ইসরায়েলপন্থী ডেমোক্র্যাটদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি নিখুঁত হামলার মতো কাজ করেছে। যুদ্ধ যদি আরও প্রলম্বিত হয়, তবে ইসরায়েলপন্থী রিপাবলিকানরাও হারিয়ে যাবে।’

পিউ জরিপের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা এখন ইরান যুদ্ধের মতোই তলানিতে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার আরও অনেক বেশি।

ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা শুধু বামপন্থীদের মধ্যেই কমছে না। তরুণ রিপাবলিকানদের বড় অংশ ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ধরনকে সমর্থন করলেও, তাদের বেশিরভাগই ইসরায়েলকে পছন্দ করেন না।

গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে যুদ্ধের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। এই খবর প্রকাশের পর নতুন করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর মানে দাঁড়ায়, ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রক্ত ও অর্থ দুটোই খোয়াতে হয়েছে। পাশাপাশি দৈনন্দিন পণ্যের জন্য আমেরিকানদের বেশি দাম চোকাতেও বাধ্য হতে হয়েছে।

সাবেক রিপাবলিকান স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং ট্রাম্পের সমালোচক টিম মিলার এক্সে লেখেন, ‘অবশ্যই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাম্পেরই ছিল। তবে ইসরায়েল যদি এই যুদ্ধের প্রস্তাব না দিত, তবে ট্রাম্পের একা এই যুদ্ধে নামার কোনো সুযোগই ছিল না।’

ট্রাম্পের ওপর নির্ভরতা

পিউ জরিপের তথ্যানুযায়ী, কেবল বয়স্ক রিপাবলিকানরাই এখনো ইসরায়েলকে বেশি সমর্থন করেন। আর নেতানিয়াহু মনে হয় বিশেষ একজন বয়স্ক রিপাবলিকানের সুনজরের ওপরই ভরসা করে আছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের সর্বকালের সেরা বন্ধুই নন, তিনি মুক্ত বিশ্বের একজন দৃঢ়চেতা নেতাও।’ চলতি মাসের শুরুতে নেতানিয়াহু জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর প্রতিদিন কথা হয়। তাঁদের মধ্যে ‘সম্পর্ক অবনতির’ খবর শুনলে তাঁরা নাকি শুধু ‘হাসেন’।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে খামখেয়ালি ট্রাম্প বারবার প্রমাণ করেছেন তাঁর সমর্থন কতটা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। তিনি প্রায়ই পুরোনো মিত্রদের ছুড়ে ফেলেছেন।

নেতানিয়াহু নিজেও ট্রাম্পের রোষানলে পড়েছিলেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের বিজয়ে শুভেচ্ছা জানানোয় ট্রাম্প তাঁর ওপর খেপে যান। ২০২১ সালের এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁকে গালিও দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য দুজনের মধ্যে মিটমাট হয়ে যায়।

তবে ২০২৮ সাল নাগাদ ইসরায়েল আরও বড় সমস্যায় পড়তে পারে। জনমতের জরিপে যদি বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, তবে ট্রাম্পের উত্তরসূরি প্রার্থীরা ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেই বেশি উৎসাহী হবেন।

শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা ইসরায়েলের সমালোচনা করতে বা প্রধান ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ আইপ্যাককে বর্জন করতে খুব একটা দ্বিধা করেননি। রিপাবলিকানদের দিক থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই এর বিরোধিতা করেছিলেন বলে শোনা যায়। তিনি তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরায়েল নিয়ে অনেক বেশি সন্দিহান গোষ্ঠীর অংশ। ইসরায়েলবিরোধী পণ্ডিত টাকার কার্লসনের সঙ্গেও ভ্যান্সের বেশ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

সংঘাত এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, ইসরায়েল ইস্যুতে তারা ট্রাম্পের দেখানো পথে হাঁটতে রাজি নয়।

সম্পর্কিত