সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছেন। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে সে বিষয়ে তিনি একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো পরিষ্কার বা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অনেকটাই অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দাম ছিল ১০০ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, ইরান যুদ্ধ সারা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়বে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ডোরাল শহরে উপস্থিত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মূলত বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল করা ও মিত্র দেশগুলোতে আশ্বস্ত করাই তাঁর ফ্লোরিডা সফরের উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ইরানে পরিচালিক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কৌশল রয়েছে। কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ হবে, সে ব্যাপারেও তাঁর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া ব্যক্তব্যে ইরান যুদ্ধের কৌশল বা পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি দেননি। ফলে ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও জোরালো হয়েছে।
প্রায় ৩৫ মিনিট ডোরাল শহরে ছিলেন ট্রাম্প। এই সময়ে তিনি শুধু মার্কিন বাহিনী ইরানে কতটা ক্ষয়ক্ষতি করতে পেরেছে, তারই বর্ণনা দিয়েছেন।
এর আগে এই এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে সিবিএস নিউজের প্রতিবেদককে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘যুদ্ধটি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’
তবে সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক যখন ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, ‘এই সপ্তাহেই তাহলে যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে?’ তখন তিনি সরাসরি প্রশ্নটির উত্তর দেননি। ট্রাম্প বলেন, ‘না। তবে আমি মনে করি খুব শিগগিরই শেষ হবে।’
এসময় আরেক সংবাদিক জানতে চান, ‘আপনি বলছেন যুদ্ধ প্রায় শেষ, কিন্তু আপনার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলছেন, এটা কেবল শুরু। তাহলে কোন বক্তব্য সত্য?’
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘দুটোই সত্য হতে পারে।’
এরপর ট্রাম্প যোগ করেন, ‘এটা একটা নতুন দেশ গড়ে তোলার শুরুও হতে পারে।’ যদিও এর আগে ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেবে না।
গত কয়েক দিনে ট্রাম্পকে একেক গণমাধ্য, একেক কথা বলতে দেখো গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত ১০ দিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় প্রতিটি ফোনালাপেই ইরান নিয়ে অবস্থান পাল্টেছেন ট্রাম্প।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হবে। তবে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এধরনের কোনো ঘোষণাই দেননি। বরং তাঁর ইঙ্গিত হচ্ছে, ইরানে অভিযান অব্যাগত থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাইলে এই যুদ্ধকে এখনই বিরাট সাফল্য হিসেবে দাবি করতে পারি। তবে আমরা আরও সামনে এগোতে চাইছি।’
সংবাদ সম্মেলনের আগে রিপাবলিকান মিত্রদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা অনেক দিক থেকেই জয়ী হয়েছি। কিন্তু আমাদের জয়টা যথেষ্ট নয়।’
ট্রাম্পের এসব স্ববিরোধী বক্তব্য অনেককেই বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। তাদের দাবি, ইরান সংঘাত নিয়ে ট্রাম্পের লক্ষ্য ও কৌশল স্পষ্ট নয়, বরং পরস্পরবিরোধী।
মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন এক কথা বিভ্রান্তিকর। তিনি কোনো পরিকল্পনা বা ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারছেন না এমনকি দেশটি যুদ্ধাবস্থায় আছে কি না সেটাও তিনি ঠিক করতে পারছেন না। তাঁর খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।’
গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে কিছু দেশের কাছে তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারেন। এতে তাঁর আগের নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। কারণ এর আগে তিনি রাশিয়ার তেল বিক্রির ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর নীতি নিয়েছিলেন, যাতে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো যায়।
এরপর ট্রাম্প সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যটি করেন, ‘ইরান গোপনে একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে মিনাব শহরের মেয়েদের স্কুলে হামলা চালিয়েছে। এতে ১৬৮ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই শিশু।’
সাংবাদিকরা জানতে চান, ওই হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্র নেবে কি না কারণ ঘটনার কিছু সময় পরেই যুক্তরাষ্ট্র কাছাকাছি একটি নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র অনেক দেশই ব্যবহার করে। ইরানের কাছেও কিছু টমাহক আছে।’
এ বক্তব্যে উপস্থিত অনেক সাংবাদিক বিস্ময় প্রকাশ করেন। একজন প্রতিবেদক বলেন, ‘আপনি বলছেন, যুদ্ধের প্রথম দিনই ইরান কোনোভাবে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র পেয়ে নিজের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়েছে। অথচ আপনার সরকারের অন্য কেউ এমন দাবি করেনি শুধু আপনিই বলছেন।’
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে যথেষ্ট জানি না। আমাকে বলা হয়েছে বিষয়টি তদন্তাধীন।’
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম