খড়গ প্রসাদ শর্মা, যিনি কেপি শর্মা অলি নামেই পরিচিত। নেপালের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী কয়েক দশক ধরে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন চারবার। গত বছর দেশটিতে জেন-জি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি।
আজ শনিবার (২৮ মার্চ) অলিকে গ্রেপ্তার করেছে নেপালের নতুন সরকারের পুলিশ। গতকাল শুক্রবার দেশটিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন জেন-জি বিপ্লব থেকে উঠে আসা নেতা বালেন্দ্র শাহ।
একই ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককেও আজ শনিবার সকালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে জেনারেশন জেড বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো প্রাণঘাতী দমন অভিযানে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
যেভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন অলি
কেপি শর্মা অলি ১৯৬৬ সালের পঞ্চায়েতবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ওই সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টি নেপালের সদস্য হন। এরপর ধীরে ধীরে দলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছান। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও জোরালো হয়। তখন তিনি ঝাপা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। এই আন্দোলনটি ছিল ভারতের নকশাল আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত চরমপন্থী বামপন্থী আন্দোলন।
অলির বয়স তখন অল্প। আর ঝাপা জেলা ছিল কমিউনিস্ট আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। চোখের সামনে আন্দোলন দেখতে দেখতে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং আন্দোলনে যোগ দেন।
এই আন্দোলনের কারণে তাঁকে প্রায় ১৪ বছর কারাভোগ করতে হয়। এতে অবশ্য তাঁর শাপে বরই হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ আরও দৃঢ় হয়েছে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ১৪ বছর কারাবন্দি ছিলেন অলি।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব
কারাগারে থাকাকালীন মদন ভান্ডারীরের নেতৃত্বাধীন সিপিএন (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন কেপি ওলি। ১৯৮৭ সালে কারাগার মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সক্রিয়ভাবে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৯৪ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মনমোহন অধিকারীর সংখ্যালঘু সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে একাধিক নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি মন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০১৫ সালে মাওবাদীদের সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন অলি। ২০১৮ সালে পুনরায় নির্বাচিত হন। অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালে স্বল্প সময়ের জন্য আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান অলি। সবশেষ ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর চতুর্থ মেয়াদ।
২০১৮ সালে সিপিএন (ইউএমএল) ও মাওবাদী দল একত্রিত হয়ে নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করলে তিনি পুষ্প কমল দহলের সঙ্গে যৌথ চেয়ারম্যান হন। তবে আদালতের সিদ্ধান্তে এই একত্রীকরণ বাতিল হয়ে গেলে দল দুটি আবার আলাদা হয়ে যায়। অলি তার দলের চেয়ারম্যান হিসেবেই থেকে যান।
১৯৯০-এর দশকে নেপালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর কেপি অলি নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। দলকে সুসংগঠিত করতে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে কমিউনিস্ট নীতিকে সামঞ্জস্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কেপি শর্মা অলি।
অলির পতন
অলির পতন ছিল অত্যন্ত নাটকীয় এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ফল। তাঁর পতনের নেপথ্যে প্রধানত তিনটি কারণ ছিল: দলীয় কোন্দল, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত।
২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির (এনসিপি) ভেতরে পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ডর সঙ্গে অলির ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অলি একক আধিপত্য বজায় রাখতে চাইলে দলের ভেতর বিদ্রোহ দেখা দেয়। নিজের পদত্যাগ ঠেকাতে অলি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এবং পুনরায় ২০২১ সালের মে মাসে অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে নেপালের সংসদ ভেঙে দেন।
বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট অলির সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে। ২০২১ সালের ১২ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে সংসদ পুনর্বহাল করে এবং বিরোধী দল নেপালি কংগ্রেসের নেতা শের বাহাদুর দেউবাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের ফলে অলির সাড়ে তিন বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং ১৩ জুলাই ২০২১-এ তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মূলত নিজ দলের সমর্থন হারানো এবং বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থানের কারণেই তাঁর পতন নিশ্চিত হয়। এরপর ২০২৪ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী হলেও মাত্র এক বছরের মাথায় তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন কেপি শর্মা অলি।
তথ্যসূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট, বিবিসি ও আল জাজিরা