leadT1ad

মার্কিন নেতৃত্বে বিশ্বব্যবস্থার দিন শেষ: কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ভাষণ দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। এই ভাষণটি সমসাময়িক ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ মনে করছেন অনেকে। তিনি মার্কিন আধিপত্যের অবসান এবং প্রথাগত নিয়ম-ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ভাঙনকে সরাসরি স্বীকার করে নিয়েছেন। কার্নি বিশ্বের মধ্যম শক্তিগুলোকে ‘মিথ্যার মধ্যে বসবাস’ বাদ দিয়ে সার্বভৌমত্ব ও বাস্তববাদের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন জোট গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৪২
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

কানাডার মতো মধ্যম শক্তিগুলো ক্ষমতাহীন নয়। আমাদের মূল্যবোধ—যেমন মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রেখে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই ‘ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতা’ শুরু হয় সততার মাধ্যমে।

প্রতিদিন আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, আমরা বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে বাস করছি। সেখানে নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এখন শক্তিশালীরা যা খুশি করতে পারে আর দুর্বলদের তা সহ্য করতে হয়। থুসিডাইডিসের এই কথাটিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই যুক্তির মধ্যে থাকতে গিয়ে দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রবণতা দেখা দেয়। আর তা হল—সবকিছুর সাথে মানিয়ে চলা, ঝামেলা এড়ানো। তারা আশা করে যে এই নিয়ম মেনে চললে হয়তো নিরাপত্তা পাওয়া যাবে। কিন্তু সত্যি বলতে, তা হবে না।

ভাসলাভ হাভেলের উদাহরণ

তাহলে আমাদের হাতে বিকল্প কী? ১৯৭৮ সালে চেক ভিন্নমতালম্বী (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট) ভাসলাভ হাভেল দা পাওয়ার অব পাওয়ারলেস নামে একটি লেখা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি একটি সহজ প্রশ্ন করেছিলেন: কমিউনিস্ট ব্যবস্থা কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখত? তিনি একজন সবজি বিক্রেতার উদাহরণ দিয়ে উত্তর শুরু করেছিলেন। সেই দোকানদার প্রতিদিন সকালে তার জানলায় একটি স্লোগান ঝোলাত—‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। সে নিজে এই শ্লোগান বিশ্বাস করে না। কিন্তু ঝামেলা এড়াতে আর সে যে অনুগত তা বোঝাতে সে এই কাজ করে। যেহেতু প্রতিটি রাস্তার প্রতিটি দোকানদার একই কাজ করে, তাই সিস্টেমটি টিকে থাকে। এই ব্যবস্থা শুধু সহিংসতার মাধ্যমে নয়, টিকে থাকে সাধারণ মানুষের কিছু রীতিনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। যদিও তারা মনে মনে জানে যে এসব রীতিনীতি মিথ্যা। হাভেল একে বলেছিলেন ‘মিথ্যার মধ্যে বসবাস’। সিস্টেমের শক্তি তা সত্য বলে তৈরি হয় এমন নয়। সিস্টেমের মধ্যে সবাই সত্যের মতো অভিনয় করতে রাজি থাকে বলেই তার শক্তি তৈরি হয়। এর ভঙ্গুরতাও ঠিক একই জায়গায়। যখন একজন মানুষও অভিনয় করা বন্ধ করে দেয়, যখন সবজি বিক্রেতা তার সাইনবোর্ডটি সরিয়ে ফেলে, তখন সেই মায়া বা ভ্রম কেটে যেতে শুরু করে।

কানাডার অবস্থান ও নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থা

বন্ধুরা, এখন সময় এসেছে কোম্পানি এবং দেশগুলোর নিজেদের সেই সাইনবোর্ডগুলো নামিয়ে ফেলার। কয়েক দশক ধরে কানাডার মতো দেশগুলো ‘নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার’ অধীনে সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা এর প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছি, এর নীতির প্রশংসা করেছি। আমরা জানতাম এই নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থার গল্পটি আংশিক মিথ্যা। আমরা জানতাম সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের সুবিধামতো নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাবে। আমরা জানতাম অভিযুক্ত কে, তার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক আইন কখনো কঠোর কখনো কোমল হয়। এই কাল্পনিক ব্যবস্থাটি কার্যকর ছিল। বিশেষ করে আমেরিকান আধিপত্য, পাবলিক গুডস, স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। তাই আমরাও জানলায় সেই সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছিলাম, এর রীতিনীতিগুলোতে অংশ নিয়েছি এবং বাস্তবতার সাথে বক্তৃতার যে তফাত তা নিয়ে মুখ খোলা এড়িয়ে গেছি।

বর্তমান সংকট ও ফাটল

এই সমঝোতা আর কাজ করছে না। আমি সরাসরি বলি—আমরা কোনো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি না। আমরা একটি ভাঙনের মধ্যে আছি। গত দুই দশকে অর্থ, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটগুলো চরম বিশ্বায়নের ঝুঁকিকে মেলে ধরেছে। অতি সম্প্রতি বড় শক্তিগুলো অর্থনৈতিক সংহতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। শুল্ককে লিভারেজ হিসেবে, আর্থিক অবকাঠামোকে জোরজবরদস্তির মাধ্যম হিসেবে এবং সাপ্লাই চেইনকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আপনি যখন শোষণের শিকার হন, তখন আপনি পারস্পরিক সুবিধার মতো কোনো মিথ্যার মধ্যে বাস করতে পারেন না। ডব্লিউটিও, জাতিসংঘ, কপ ছিল আমাদের সম্মিলিত সমস্যা সমাধানের কাঠামো। তা এখন হুমকির মুখে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও ঝুঁকি

এর ফলে অনেক দেশ একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে যে তাদের জ্বালানি, খাদ্য, খনিজ সম্পদ এবং অর্থায়নে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন গড়ে তুলতে হবে। এই তাড়না বোঝা যায়। যে দেশ নিজের খাবার জোগাতে পারে না বা নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তার হাতে বিকল্প থাকে কম। কিন্তু আমাদের স্পষ্ট হতে হবে এর পরিণতি কী। দুর্গ দিয়ে ঘেরা একটি পৃথিবী আরও দরিদ্র, আরও ভঙ্গুর এবং কম টেকসই হবে। আরেকটি সত্য হলো যে বড় শক্তিগুলো যদি তাদের স্বার্থের জন্য নিয়ম ও মূল্যবোধের অভিনয়টুকুও ত্যাগ করে, তবে লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক থেকে লাভ পাওয়া হবে কঠিন। মিত্ররা তখন অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে এবং সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠন করতে বিকল্প খুঁজবে।

কানাডার নতুন কৌশল: মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদ

কানাডা সবার আগে এই সতর্কঘণ্টা শুনতে পেয়েছে। আমাদের আগে ধারণা ছিল যে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জোটের সদস্যপদ আমাদের নিরাপত্তা দেবে। তা এখন আর কাজ করছে না। আমাদের নতুন পদ্ধতি আলেকজান্ডার স্টাব-এর ভাষায় ‘মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদ’। আমরা একইসাথে নীতিবান এবং ব্যবহারিক হতে চাই। আমরা সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং মানবাধিকারের বিষয়ে নীতিবান। তবে এও মানি যে অগ্রগতি ধাপে ধাপে আসে এবং সব অংশীদার আমাদের সব মূল্যবোধ ধারণ করবে না। বিশ্ব যেমন আছে তেমনভাবেই তাকে গ্রহণ করছি। যেমনটা চাই তেমন হওয়ার অপেক্ষায় নেই।

দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে সক্ষমতা বৃদ্ধি

আমরা ঘরে শক্তি বাড়াচ্ছি। আমরা আয়কর এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগে কর কমিয়েছি। জ্বালানি, এআই এবং খনিজ সম্পদে দ্রুত এক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছি। এই দশকের শেষ নাগাদ আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করছি। বিদেশের ক্ষেত্রেও আমরা বৈচিত্র্য আনছি। আমরা ইইউ-র সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব করেছি। গত কয়েক দিনে চীন এবং কাতারের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব করেছি। ভারত, আসিয়ান, থাইল্যান্ড এবং ফিলিপাইনের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা করছি।

ভবিষ্যতের পথ

আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের সাথে জোট তৈরি করছি। ইউক্রেন ইস্যুতে আমরা বড় অবদান রাখছি। আর্কটিক সার্বভৌমত্বে আমরা গ্রিনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের পাশে আছি। বড় শক্তিগুলো হয়তো একা চলতে পারে। কিন্তু মধ্যম শক্তিগুলো যখন বড় শক্তির সাথে এককভাবে আলোচনা করে, তখন তারা দুর্বল অবস্থানে থাকে। একে সার্বভৌমত্ব বলা যায় না। এ হলো অধীনতা মেনে নিয়ে সার্বভৌমত্বের অভিনয় করা।

শেষ কথা

হাভেলের কথায় ফিরে আসি। মধ্যম শক্তিগুলোর জন্য ‘সত্যের মধ্যে বাস করা’ বলতে কী বোঝায়? এর অর্থ হলো বাস্তবতাকে তার আসল নাম ধরে ডাকা। নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থা আর কাজ করছে না। এর দোহাই দেওয়া বন্ধ করুন। মিত্র বা প্রতিদ্বন্দ্বী সবার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করুন। জোরজবরদস্তির সুযোগ দেবেন না। কানাডার কাছে যা আছে তা বিশ্ব চায়। আমরা একটি কার্যকর বহুত্ববাদী সমাজ। আমরা জানি পুরনো ব্যবস্থা আর ফিরে আসবে না। তা নিয়ে আমরা শোকও করছি না। আমরা বিশ্বাস করি এই ভাঙন থেকে আমরা আরও বড়, আরও শক্তিশালী এবং আরও ন্যায়সঙ্গত কিছু তৈরি করতে পারব। এটিই কানাডার পথ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত