মানিকন্ট্রোলের বিশ্লেষণ

জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে চীনের ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বিদ্যুৎ বিপ্লব

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

চীনের ঝাংইয়ে উচ্চ এলাকায় হামি-চংকিং ৮০০-কেভি প্রকল্পে কাজ করছেন শ্রমিকরা। ছবি: ফর্বোস

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের নাম—হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের একটি বিশাল অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সামান্যতম অচলাবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বা ‘চোকপয়েন্ট’ নিয়ে যখন পশ্চিমা বিশ্ব দুশ্চিন্তায় মগ্ন, তখন বেইজিং হাঁটছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে। আমদানিকৃত খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন এখন নিজের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তুলছে দেশব্যাপী এক ‘ইলেকট্রিসিটি সুপারগ্রিড’।

কৌশলগত রূপান্তর: তেলের বিকল্প যখন বিদ্যুৎ

চীনের এই মেগা-প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দুই দানবীয় প্রতিষ্ঠান—স্টেট গ্রিড কর্পোরেশন অব চীন এবং চীন সাউদার্ন পাওয়ার গ্রিড। বর্তমানে শত কোটিরও বেশি মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের নেটওয়ার্ককে একটি কৌশলগত অস্ত্রে রূপান্তর করছে।

এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো—দেশজুড়ে এমন এক আল্ট্রা-হাই-ভোল্টেজ (ইউএইচভি) সঞ্চালন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়েও বিদ্যুৎ অপচয় করবে না। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর চীনের নির্ভরতা নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। যখন অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছাবে, তখন হরমুজ প্রণালির সংকটে চীনের অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে না।

আল্ট্রা-হাই-ভোল্টেজ ও বিদ্যুতের মহাসড়ক

চীনের এই জ্বালানি বিপ্লবকে বলা হচ্ছে ‘বিদ্যুতের মহাসড়ক’। ভৌগোলিকভাবে চীনের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল বায়ু ও সৌরশক্তির আধার, অথচ শিল্পকারখানা ও জনবসতির অধিকাংশ হলো পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে। এই দূরত্বের ব্যবধান ঘোচাতেই সুপারগ্রিডের অবতারণা।

ভিয়েতনামভিত্তিক জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চীন কার্যত এমন এক সুপারগ্রিড নির্মাণ করছে যেখানে দুর্গম মরুভূমি বা পাহাড়ের সবুজ শক্তি সরাসরি উপকূলের কারখানায় প্রাণসঞ্চার করছে। এই ইউএইচভি লাইনগুলো কেবল তারের সংযোগ নয়, বরং চীনের জ্বালানি সার্বভৌমত্বের প্রতীক। যুদ্ধ বা অবরোধের সময় যখন সমুদ্রপথ অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তখন এই অভ্যন্তরীণ গ্রিডই হবে চীনের রক্ষাকবচ।

৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের মাস্টারপ্ল্যান

চীনের এই উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন পাওয়া যায় তাদের বিশাল বিনিয়োগের অংকে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই গ্রিড অবকাঠামো সম্প্রসারণে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৫৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই বিশাল অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় চীনের গ্রিড অপারেটররা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বন্ড ইস্যু ও বিপুল ঋণ গ্রহণ করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর বেসরকারি কোম্পানিগুলো যেখানে তাৎক্ষণিক মুনাফার পেছনে ছোটে, সেখানে চীনের এই কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তাদের কাছে এটি কেবল ব্যবসা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। ফলে মুনাফার চেয়ে অবকাঠামোর স্থায়িত্ব ও সক্ষমতা এখানে বেশি প্রাধান্য পায়।

সুপারগ্রিডের বহুমুখী সক্ষমতা

চীনের এই গ্রিড সম্প্রসারণ কৌশল কেবল বিদ্যুৎ পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে: ১. নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার: প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে মূল ধারার সাথে যুক্ত করা। ২. উদীয়মান প্রযুক্তির জ্বালানি: বৈদ্যুতিক যান, বিশাল ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো। ৩. আর্থিক স্থিতিশীলতা: জ্বালানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা থেকে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া। ৪. চোকপয়েন্ট নিরসন: আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর বা হরমুজের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জলপথের গুরুত্ব হ্রাস করা।

জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত

চীনের এই সুপারগ্রিড কেবল একটি প্রকৌশলগত সাফল্য নয়; এটি একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক চাল। বিশ্ব যখন হরমুজ প্রণালির প্রতিটি ছোটখাটো সংঘর্ষে বিশ্ববাজারের পতনের আশঙ্কায় কাঁপে, চীন তখন নীরবে এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে এই ধরনের ‘চোকপয়েন্ট’ তাদের অর্থনীতির জন্য আর কোনো হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না। যদি এই ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের মাস্টারপ্ল্যান সফল হয়, তবে তা বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণ চিরতরে বদলে দেবে। বেইজিং প্রমাণ করছে যে, শক্তির উৎস কেবল মাটির নিচে নয়, বরং তার সঠিক সঞ্চালন ও ব্যবস্থাপনার মধ্যেও নিহিত।

সম্পর্কিত