leadT1ad

আল জাজিরার প্রতিবেদন

ভারতে মুসলিম নারীদের হেনস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে এআই

লেখা:
লেখা:
জয়তী ঠাকুর

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ১৬: ৫৬
ছবি: আল জাজিরা থেকে নেওয়া

ভিডিওটি প্রথম দেখেই স্তব্ধ হয়ে যান সামরিন আইয়ুব। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এই ফ্রিল্যান্স মডেল গত বছর মোবাইল ফোনে স্ক্রল করছিলেন। এ সময় এক বন্ধু তাঁকে ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর ক্লিপ পাঠান।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বসবাসকারী এক তরুণীর জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল ভিডিওটিতে। এতে ছিল বর্ণনাকারীর কণ্ঠ, সাবটাইটেল এবং টেলিভিশনের সংবাদ প্রতিবেদনের মতো শিরোনাম। কিন্তু পুরো ভিডিওটিই ছিল ভুয়া।

২৪ বছর বয়সী আইয়ুব বলেন, ‘এটা ছিল ভয়ংকর রকমের অনুসরণ বা স্টকিং। তারা আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম সেমিস্টার থেকে শেষ পর্যন্ত সব তথ্য জোগাড় করেছে।’

ভিডিওটিতে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার আইয়ুবের বিভিন্ন ছবি ব্যবহার করা হয়। এসব ছবির মধ্যে ছিল গ্রুপ প্রজেক্ট, বিদায়ী অনুষ্ঠান এবং সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সেলফি, যা ছিল তার স্বাভাবিক ক্যাম্পাস জীবনের অংশ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা ভয়েসওভারে মিথ্যা দাবি করা হয় যে, তিনি একজন মুসলিম নারী, যিনি হিন্দু পুরুষদের কাছে ‘নিজের শরীর বিক্রি করেছেন’। ভিডিওটিতে ছবির ব্যক্তিদের ভুলভাবে শনাক্ত করা হয় এবং তার নিজের ভাইকেও ‘দালাল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

আইয়ুব বলেন, ‘ভিডিওটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে আমার বাবা-মাও যদি এটি দেখতেন, তাহলে সত্যি বলে বিশ্বাস করতেন।’

গবেষকদের মতে, আইয়ুব সেইসব মুসলিম নারীর একজন, যারা এআই ব্যবহার করে তৈরি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, ভিডিও ও অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। তারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা এখন ক্রমেই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

আল জাজিরা এ ধরনের হামলার শিকার হওয়া কয়েকজন মুসলিম নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে তাঁরা লজ্জা, সামাজিক চাপ এবং মানসিক আঘাত পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।

‘যৌন কল্পনাকে ছবিতে রূপ দেওয়া’

ভারতে মুসলিম নারীদের ছবি ও ভিডিওকে যৌনভাবে উপস্থাপনের এই প্রবণতা এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন দেশটি বৈশ্বিক এআই নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। চলতি বছরের শুরুতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’ এবং এআই নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সি এস ওএইচ)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম নারীদের যৌন-সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছে।

গবেষণায় মে ২০২৩ থেকে মে ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি উন্মুক্ত অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৩২৬টি এআই নির্মিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, মুসলিম নারীদের যৌন-সংবেদনশীল চিত্রগুলোতে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ৬৭ লাখেরও বেশি প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ার হয়েছে।

গবেষণাটির সহলেখক এবং সিএসওএইচ এর ডিজিটাল গবেষণা বিশ্লেষক জেনিথ খান বলেন, ‘জেনারেটিভ এআই যৌন কল্পনাকে দ্রুত ও বিনা খরচে বাস্তবসম্মত ছবিতে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ইমেজ জেনারেটর ও ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব কম প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেও মানুষ বিদ্বেষমূলক বর্ণনাকে অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ভিজ্যুয়াল উপাদানে পরিণত করতে পারছে।’

মুম্বাইভিত্তিক রাটি ফাউন্ডেশন পরিচালিত অনলাইন নিরাপত্তা সহায়তা কেন্দ্র ‘মেরি ট্রাস্টলাইন’ও এ ধরনের ঘটনার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা লক্ষ করছে।

হেল্পলাইন ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক একটি চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যমে সাধারণত সেলিব্রিটি ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ঘটনার সংবাদ বেশি প্রকাশ পেলেও, জনপরিসরে পরিচিত নন এমন নারীরাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবির শিকার হচ্ছেন। এসব ছবি কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও ভুক্তভোগীদের জীবনে বাস্তব ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

হেল্পলাইনের কাউন্সিলর সালমান মুজাওয়ার জানান, তারা এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বাড়তে দেখছেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সংস্থাটির অনেক গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণ তৈরি হয়েছে।

২০২২ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে মেরি ট্রাস্টলাইন ৪৮২টিরও বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ঘটনায় প্রযুক্তিগতভাবে বিকৃত বা কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও ভিডিও ব্যবহৃত হয়েছে। এআই প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় এই হার ক্রমেই বাড়ছে।

মুজাওয়ার বলেন, ‘লজ্জা, ভয় ও মানসিক আঘাতের কারণে এসব নির্যাতনের ঘটনা অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের কাছেও বিষয়টি জানান না, ফলে জনপরিসরের আলোচনাতেও এসব ঘটনা খুব কমই আসে।’

রাজনীতির ‘পর্নিফিকেশন’

আইয়ুবের বিরুদ্ধে তৈরি করা ভুয়া ভিডিওটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় অশ্লীল মন্তব্য, হুমকিমূলক ফোনকল এবং তার চরিত্র নিয়ে নানা অভিযোগ।

আইয়ুব বলেন, ‘এটি ছিল এক প্রকার ডিজিটাল গণপিটুনি। শুধু একটি নয়, এক ডজনেরও বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, আর শত শত মানুষ তা আবার শেয়ার করছিল।’

সিএসওএইচের গবেষণা তথ্যভান্ডারে এমন বহু এআই তৈরি মিম পাওয়া গেছে, যেখানে ধর্মীয় পোশাক পরা মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণভাবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে ভুয়া পর্নোগ্রাফিক ছবিও।

গবেষকদের মতে, এসব ছবিতে একটি দৃশ্যপট বারবার দেখানো হয়েছে। যেমন ‘মুসলিম পরিচয়ের নারী’কে প্রায়ই ‘হিন্দু পরিচয়ের পুরুষের’ সঙ্গে যৌন বা আপত্তিকর অবস্থায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

মুসলিম পুরুষদের প্রায়ই সহিংস বা নৈতিকভাবে অধঃপতিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আর মুসলিম নারীদের দেখানো হয় অসহায় ও বশ্যতাস্বীকারকারী হিসেবে, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পুরুষরা ‘উদ্ধার’ করছে এমন মন্তব্য করেছেন গবেষক খান।

গবেষকদের মতে, এই ধরনের চিত্রায়ন রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রচারণারই একটি অংশ।

জার্মানির লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখের মিডিয়া নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা বলেন, এটি নারী ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত রাজনীতির একটি বৃহত্তর ‘পর্নিফিকেশন’ বা যৌনতাকেন্দ্রিকীকরণের অংশ। তাঁর মতে, ডানপন্থী ডিজিটাল সংস্কৃতি হাস্যরস, মিম ও যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি ব্যবহার করে অনলাইন নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তোলে।

উদুপা বলেন, ‘এসব কার্যক্রম একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরি করে। এটি দলগত উদযাপন ও সম্মিলিত আগ্রাসনের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে।’

গবেষকদের মতে, এই প্রবণতার শিকড় শুধু নারীবিদ্বেষে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে আরও গভীর আদর্শিক উদ্দেশ্য রয়েছে। গবেষক সোমা বসু তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, এখানে যৌনতাকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সোমা বসুর মতে, মুসলিম নারীদের শরীরকে সাম্প্রদায়িক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল ‘সুলি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’ বিতর্ক। যেখানে ভারতে মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে ভুয়া অনলাইন নিলাম প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছিল। বসুর দাবি, এসব ঘটনার পেছনে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু নেতার প্রকাশ্য সমর্থন এবং দলের ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবকদের অনানুষ্ঠানিক সহযোগিতা ছিল।

খানের গবেষণা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একই বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার অনেক সংস্কৃতিতে নারীদের পরিবারের সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে মুসলিম নারীদের ভিজ্যুয়ালি আক্রমণ করা বা অপমানজনকভাবে উপস্থাপন করা মুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করার একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায়।’

এই গবেষণার অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগতভাবেও তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। খান বলেন, ‘একজন মুসলিম নারী ও গবেষক হিসেবে বিষয়টি আমার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। হিজাব পরা এক নারীকে সফট পর্ন হিসেবে উপস্থাপন করা ছবি দেখে আমি ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলাম। একজন নারী হিসেবে প্রতিদিনই নানা ধরনের নারী বিদ্বেষী আচরণের মুখোমুখি হতে হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক আঘাত।’

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিজেপি নেতা আতিফ রশীদ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয়ভাবেই ব্যবহার করা যেতে পারে। এর অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান তিনি। ডিপফেক ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টকে তিনি ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ উল্লেখ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তবে তিনি বিষয়টিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ব্যাপারে বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, বিজেপি সব ধর্মের নারীদের সম্মান করে এবং ‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’ সংক্রান্ত ঘটনাগুলো আইনের বিধান অনুযায়ী মোকাবিলা করা হয়েছে।

এআইয়ের কারণে পুরোনো প্রবণতার নতুন বিস্তার

২০২১ ও ২০২২ সালে আলোচিত ‘সুল্লি ডিলস’ এবং ‘বুল্লি বাই’ কাণ্ডে বিকৃত ও সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। দুটি ঘটনাই দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং পুলিশি তদন্ত শুরু হয়।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘সুল্লি ডিলস’ অ্যাকাউন্ট তৈরির অভিযোগে ওমকারেশ্বর ঠাকুর এবং ‘বুল্লি বাই’ অ্যাপের নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত নিরাজ বিষ্ণোইকে গ্রেপ্তার করে। তবে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তারের পর দুই মাসের মধ্যেই মানবিক কারণে তাদের জামিন মঞ্জুর করেন নয়াদিল্লির আদালত।

গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে অনলাইনে মুসলিম নারীদের হয়রানির মাত্রা ও গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন ধরনের অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে যে কেউ ছবি আপলোড করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা আপত্তিকর ছবি তৈরি করা সম্ভব। এসব টুল অনলাইনে সহজলভ্য, অনেক ক্ষেত্রেই বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায় এবং এগুলো ব্যবহারের জন্য কোনো বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষতারও প্রয়োজন হয় না।

‘প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীদের, লক্ষ্যবস্তু বানানো ও হয়রানির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে,’ বলেন সিএসওএইচের গবেষণা ও আউটরিচ পরিচালক এভিয়ানে লেইডিগ। ‘তবে এখন পার্থক্য হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির এই লঙ্ঘনের মাত্রা ও ক্ষতির পরিধি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।’

যেসব নারী দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন হয়রানির শিকার হয়ে আসছেন, তাদের জন্য এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি নতুন ধরনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২৭ বছর বয়সী গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা ২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন বা সিএএ এর বিরুদ্ধে কথা বলার পর থেকেই অনলাইন নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি সেইসব মুসলিম নারীদের একজন, যাদের ছবি ‘সুলি ডিলস’ নামের বিতর্কিত অ্যাপে আপলোড করে প্রতীকীভাবে ‘নিলামে তোলা’ হয়েছিল।

জাতিসংঘ এই আইনকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। আইনটির লক্ষ্য হলো, প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে ২০২৫ সালের আগে ভারতে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুদের দ্রুত ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান করা।

সুলি ডিলস বিতর্কের চার বছর পরও অনলাইন হয়রানি থামেনি। ফাতিমা জানান, এখনও বিভিন্ন বেনামি অ্যাকাউন্ট যেগুলো প্রায়ই সাধারণ হিন্দু নাম ব্যবহার করে তাঁকে লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ বার্তা, ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি পাঠায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি সীমিত হলেও এসব হয়রানি অব্যাহত রয়েছে।

ফাতিমা বলেন, ‘প্রতি কয়েক দিন পরপরই কোনো না কোনো অচেনা অ্যাকাউন্ট থেকে ধর্ষণ বা হত্যার হুমকি আসে।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি যৌনধর্মী ভুয়া ছবি ও ভিডিওর প্রসার তাঁর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফাতিমার মতে, ‘এসব ছবির কথা পড়ার পর বিষয়টি আমার কাছে খুব ব্যক্তিগত মনে হয়েছে। এগুলো মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করে।’

তিনি আরও বলেন, অনলাইন বিদ্বেষ তাঁর বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। ‘একা ভ্রমণ করতে এখন অস্বস্তি লাগে। যখন দেখেন মুসলিম নারীদের নিয়ে এমন কল্পনা ও বিকৃত চিন্তা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন মনে হয় বাস্তবেও কেউ আক্রমণ করতে পারে।’

‘আমি আর নিরাপদ বোধ করি না’

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর মডেল আইয়ুবের পেশাগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, ‘একজন মডেলের জন্য সুনাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার প্রোফাইলে নেতিবাচক মন্তব্য দেখা গেলে অনেক ব্র্যান্ড আর যোগাযোগ করে না।’

চার থেকে পাঁচ মাস ধরে ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো তাঁর প্রোফাইলে অশালীন ও অপমানজনক মন্তব্য করতে থাকে, যা সম্ভাব্য ক্লায়েন্টদেরও দূরে সরিয়ে দেয়। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।

আইয়ুব বলেন, ‘ইনস্টাগ্রাম একসময় আমার জন্য নিরাপদ জায়গা ছিল। এখন সেখানে আমি নিরাপদ বোধ করি না। কী পোস্ট করব এবং কীভাবে পোস্ট করব, তা নিয়েও অনেক সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।’

ঘটনার পর তিনি নয়াদিল্লির পুলিশ সাইবার ক্রাইম ইউনিটে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তবে তার দাবি, অভিযোগের পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত তার বন্ধুদের সম্মিলিতভাবে রিপোর্ট করার কারণে বেশিরভাগ আপত্তিকর কনটেন্ট সরানো হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-নির্ভর ভুয়া ছবি ও ভিডিও মোকাবিলায় ভারতের বর্তমান আইন যথেষ্ট নয়। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও আইনজীবী অপার গুপ্তা বলেন, ‘ছবিটি ভুয়া হলেও ক্ষতিটা বাস্তব।’

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬-ই ধারায় কারও ব্যক্তিগত অঙ্গের ছবি অনুমতি ছাড়া ধারণ বা প্রকাশ করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির শরীরের প্রকৃত ছবি ব্যবহারই না করা হয় এবং পুরো ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে এই ধারা প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

গুপ্তা বলেন, ‘ছবিটি ভুয়া হলেও নারীদের জন্য এটি এক ধরনের স্থায়ী কলঙ্ক তৈরি করে।’

অন্যদিকে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো অবৈধ কনটেন্ট সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তা সরিয়ে ফেললে ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা পেয়ে থাকে। তবে গুপ্তার মতে, অনেক ভুক্তভোগীর জন্য অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াটিই ছিল জটিল।

তিনি বলেন, ‘প্ল্যাটফর্মগুলো এমন ব্যবস্থা রাখে না, যাতে সহজে বলা যায় এটি আমার ছবি, এটি ডিপফেক, তাই এটি সরাতে হবে।’

এমন পরিস্থিতিতে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া মুসলিম নারীদের দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখনও কঠিন রয়ে গেছে।

আইয়ুব বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা ছিল ওই অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করা। আমাকে না চিনেই তারা আমার সুনাম নষ্ট করেছে।’

(আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250

সম্পর্কিত