জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মোদির ইসরায়েল সফর: মধ্যপ্রাচ্যে ভারত কী চায় তার পরীক্ষা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

নরেন্দ্র মোদি ও নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম ইসরায়েল সফরে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই দিনের এই সফরে তিনি ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেবেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে তার সফরসূচিতে ফিলিস্তিনি কোনো নেতার সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ নেই।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক দশকেরও বেশি সময় আগে ভারতে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এ দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সম্পর্ক আরও মজবুত করতেই মোদির এই সফর।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় এই সফর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

এর আগে, ২০১৭ সালে প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিই ইসরায়েল সফর করেছিলেন। সেই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের বাঁক বদল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এছাড়া ইসরায়েলি অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতাও ভারত।

নেতানিয়াহু এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেন, ইসরায়েল ও ভারতের বন্ধন দুই বৈশ্বিক নেতার মধ্যে এক শক্তিশালী মৈত্রী। স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতির জন্য আমরা নিজেদেরকে গড়ে তুলবে।

জবাবে মোদি বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্য দেয় ভারত। আর এটি গড়ে উঠেছে আস্থা, উদ্ভাবন এবং শান্তি ও অগ্রগতির প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ওপর।

পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হর্ষ ভি পান্ত বলেছেন, ভারত দেখাতে চায় সে ইসরায়েলের সঙ্গে অংশীদারিত্বে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অগ্রাধিকারের ভারসাম্য রক্ষারও চেষ্টা করছে।

ভারত ৭ অক্টোবরের হামাস হামলার নিন্দা করেছে এবং ইসরায়েলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে গাজায় বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন আঞ্চলিক উত্তেজনা তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে চাপ দিতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় সামরিক উপস্থিতি তৈরি করেছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদির সফরের মূল ফোকাস থাকবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই। আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হলেও তা গোপনই থাকবে। আর এটিও প্রত্যাশিতই, কারণ ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভারতের বেশ মজবুত সম্পর্ক রয়েছে।

অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মধ্যপ্রাচ্য কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক কবির তানেজা বলেছেন, ভারত ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে যা করার ছিল, তা মোটামুটি হয়ে গেছে। আঞ্চলিক সংঘাত আঞ্চলিকভাবে সমাধানের বিষয়ে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান রয়েছে। ভারত যেমন নিজের বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করে না, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করে।

তেল আবিবে পৌঁছানোর পরপরই মোদি নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করার কথা। এরপর জেরুজালেমে গিয়ে বাকি কর্মসূচি শেষ করবেন।

এদিকে, মোদির সফরের আগে ইসরায়েলের সংসদ নেসেট ভবন ভারতীয় পতাকার রঙে আলোকিত করা হয়েছে। মোদি সামাজিক মাধ্যমে ছবিটি শেয়ার করে জানিয়েছেন, আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে সেখানে ভাষণ দেওয়ার বিষয়ে তিনি উন্মুখ। তবে তার ভাষণ ইসরায়েলে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ না জানানোর অভিযোগে বিরোধীরা মোদির ভাষণ বয়কটের হুমকি দিয়েছে।

এদিকে, ভারতেও বিরোধী রাজনীতিকরা মোদির এই সফরের সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ এ সফরের নিন্দা করে বলেছেন, মোদি সরকার ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষা থেকে সরে আসছে।

সমালোচনা সত্ত্বেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফর ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হিসাব-নিকাশকেই প্রতিফলিত করেছে। তানেজা বলেন, যুদ্ধ যত বেশি স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে ততই পিছিয়ে পড়ছে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে উত্তেজনার কথা মাথায় রাখলে, সেরা প্রযুক্তি না খোঁজে ভারতের কোনো উপায় নেই। আর সেই চাহিদা পূরণে ইসরায়েলই প্রধান ভরসা।

তবে তিনি এ-ও বলেছেন, ভারতের বৃহত্তর স্বার্থ—বিশেষত যোগাযোগ ও জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।

মোদি ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের প্রশংসা করলেও, মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক রয়েছে এমন দেশ যারা ইসরায়েল বিরোধী—তারা যেন ক্ষুব্ধ না হন সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকবেন।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত