আজ উকিল মুন্সির জন্মদিন
স্ট্রিম ডেস্ক

বিংশ শতাব্দীতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকা অনন্য এক লোকজ সাংস্কৃতিক জাগরণের সাক্ষী হয়েছিল। এই অঞ্চলের হাওর-বাঁওড় আর মেঠোপথ একসময় গানের সুরে মুখরিত থাকত। রশিদ উদ্দিন, জালাল খাঁ থেকে শুরু করে অসংখ্য সাধক বাউলের পদচারণায় ধন্য হয়েছে এই মাটি।
তবে এই নক্ষত্রমণ্ডলীর মাঝে বিরহী সুরের এক নিঃসঙ্গ ধ্রুবতারা হয়ে আজও জ্বলজ্বল করছেন মরমী সাধক উকিল মুন্সি। তাঁর গান ছিল ভাটি বাংলার সাধারণ মানুষের প্রাণের স্পন্দন ও আধ্যাত্মিক আর্তি। তা ছিল মানুষের জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণার প্রধান খোরাক।
ভাটির জলজ প্রকৃতি ও উকিল মুন্সির জীবনদর্শন
উকিল মুন্সির গানের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল ভাটি অঞ্চলের দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। ১৮৮৫ সালে নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে তাঁর জন্ম। ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকা এবং বাকি ছয় মাস কাদা-মাটির এই যে বিচিত্র জনপদ, এটিই ছিল তাঁর সাধনপীঠ।
বর্ষায় যখন চারদিক অথৈ পানিতে একাকার হয়ে যেতো, তখন হিজল-করচের ডালে বসে বা নৌকার গলুইয়ে হেলান দিয়ে উকিল খুঁজতেন জীবনের মানে। তাঁর কাছে আষাঢ়ের ‘তাজা পানি’ ছিল যৌবন আর আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতীক। ধনু নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা এই সাধকের রক্তে মিশে ছিল জলের কল্লোল।
উকিল মুন্সির জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তাঁর দ্বৈত সত্তা। তিনি একদিকে ছিলেন মরমী সাধক, অন্যদিকে ছিলেন মসজিদের ইমাম। শরিয়ত ও মারফতের এই সহাবস্থান তাঁর চরিত্রে অনন্য গভীরতা তৈরি করেছিল। সমাজ তাঁকে বাউল হিসেবে গ্রহণ করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর মুন্সিয়ানা বা ইমামতির মর্যাদাও ছিল অটুট। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, স্রষ্টার আরাধনা আর সংগীত সাধনা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
বিরহের সুর ও আধ্যাত্মিক সাধনার মেলবন্ধন
বাংলা লোকসংগীতে উকিল মুন্সিকে বলা হয় ‘বিরহী উকিল’। তাঁর গানের প্রধান ব্যাপার বিচ্ছেদ এবং প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি। তবে এই বিরহ কেবল লৌকিক নারী-পুরুষের প্রেম নয়, বরং তা ছিল জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের আধ্যাত্মিক হাহাকার। তিনি গানে লোকজ পরিবেশের অসাধারণ সব উপমা ব্যবহার করতেন। ‘বানা’ দিয়ে মাছ ধরা, নাইওর যাওয়ার নৌকা কিংবা পুবালি বাতাসের মতো সাধারণ বিষয়গুলো তাঁর হাতে পড়ে হয়ে উঠত জীবনদর্শন। ‘আষাঢ় মাইশ্যা ভাসা পানি’ গানে বাবার বাড়ি যাওয়ার যে আর্তি, তা আসলে পরপারে নিজের আদি আলয়ে ফিরে যাওয়ারই এক রূপক প্রকাশ।
উকিল মুন্সির আধ্যাত্মিক সাধনা আরও ঋদ্ধ হয়েছিল হবিগঞ্জের রিচি দরবার শরীফের পীর সৈয়দ মোজাফফর আহম্মদের সান্নিধ্যে। পীরের মুরিদ হওয়ার পর উকিলের গানে সুফি দর্শনের প্রভাব আরও প্রকট হয়। পীরের নির্দেশে তিনি পরবর্তী সময়ে গানে একতারা ছাড়া অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতেন না। এমনকি তিনি এতটাই শরিয়তপন্থী ছিলেন যে, নিজের ছবি পর্যন্ত তুলতেন না। তাঁর গানগুলো ছিল মূলত মোনাজাতের মতো; তিনি যখন গান ধরতেন, তাঁর দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরত। তাঁর সেই আবেগমাখা কণ্ঠ শ্রোতাদেরও চোখের জল ধরে রাখতে দিত না।
সুরের শক্তিতে জয় ও অমলিন উত্তরাধিকার
বাউল গান সবসময়ই লৌকিক ধর্মের কথা বলেছে, যা অনেক সময় মৌলবাদী গোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয়েছে। ১৯৫১ সালে নেত্রকোনায় বাউল গান নিষিদ্ধ করার জন্য বিশাল ধর্মসভার আয়োজন করা হয়েছিল। উকিল মুন্সি ও তাঁর সমসাময়িক সাধকদের গানের জনপ্রিয়তার কাছে সেই শক্তি হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বাউলদের সুরের ঢেউয়ে ভেসে গিয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার প্রচার।
১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ৯৩ বছর বয়সে এই মহান সাধক চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যান। আজ উকিল মুন্সির সহস্রাধিক গান মানুষের মুখে মুখে ফিরলেও তার যথাযথ কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি নেই। শিষ্যদের ছেঁড়া ডায়রি বা প্রবীণ বাউলদের স্মৃতিতেই তাঁর গানগুলো বেঁচে আছে। এমনকি গানের কথা বিকৃত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে প্রতিনিয়ত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল শব্দের বদলে অন্য শব্দ ঢুকে গেছে, যা গানের ভাবকে বদলে দিচ্ছে।
উকিল মুন্সির গানে যেমন বিরহ আছে, তেমনি আছে পরম সুন্দরের প্রতি গভীর ভক্তি। যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের বুকে নদী বইবে আর হাওরে পুবালি বাতাস খেলবে, ততক্ষণ উকিল মুন্সির গান মানুষের হৃদয়ে বিরহের পরশ বুলিয়ে যাবে।

বিংশ শতাব্দীতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকা অনন্য এক লোকজ সাংস্কৃতিক জাগরণের সাক্ষী হয়েছিল। এই অঞ্চলের হাওর-বাঁওড় আর মেঠোপথ একসময় গানের সুরে মুখরিত থাকত। রশিদ উদ্দিন, জালাল খাঁ থেকে শুরু করে অসংখ্য সাধক বাউলের পদচারণায় ধন্য হয়েছে এই মাটি।
তবে এই নক্ষত্রমণ্ডলীর মাঝে বিরহী সুরের এক নিঃসঙ্গ ধ্রুবতারা হয়ে আজও জ্বলজ্বল করছেন মরমী সাধক উকিল মুন্সি। তাঁর গান ছিল ভাটি বাংলার সাধারণ মানুষের প্রাণের স্পন্দন ও আধ্যাত্মিক আর্তি। তা ছিল মানুষের জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণার প্রধান খোরাক।
ভাটির জলজ প্রকৃতি ও উকিল মুন্সির জীবনদর্শন
উকিল মুন্সির গানের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল ভাটি অঞ্চলের দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। ১৮৮৫ সালে নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে তাঁর জন্ম। ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকা এবং বাকি ছয় মাস কাদা-মাটির এই যে বিচিত্র জনপদ, এটিই ছিল তাঁর সাধনপীঠ।
বর্ষায় যখন চারদিক অথৈ পানিতে একাকার হয়ে যেতো, তখন হিজল-করচের ডালে বসে বা নৌকার গলুইয়ে হেলান দিয়ে উকিল খুঁজতেন জীবনের মানে। তাঁর কাছে আষাঢ়ের ‘তাজা পানি’ ছিল যৌবন আর আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতীক। ধনু নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা এই সাধকের রক্তে মিশে ছিল জলের কল্লোল।
উকিল মুন্সির জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তাঁর দ্বৈত সত্তা। তিনি একদিকে ছিলেন মরমী সাধক, অন্যদিকে ছিলেন মসজিদের ইমাম। শরিয়ত ও মারফতের এই সহাবস্থান তাঁর চরিত্রে অনন্য গভীরতা তৈরি করেছিল। সমাজ তাঁকে বাউল হিসেবে গ্রহণ করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর মুন্সিয়ানা বা ইমামতির মর্যাদাও ছিল অটুট। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, স্রষ্টার আরাধনা আর সংগীত সাধনা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
বিরহের সুর ও আধ্যাত্মিক সাধনার মেলবন্ধন
বাংলা লোকসংগীতে উকিল মুন্সিকে বলা হয় ‘বিরহী উকিল’। তাঁর গানের প্রধান ব্যাপার বিচ্ছেদ এবং প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি। তবে এই বিরহ কেবল লৌকিক নারী-পুরুষের প্রেম নয়, বরং তা ছিল জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের আধ্যাত্মিক হাহাকার। তিনি গানে লোকজ পরিবেশের অসাধারণ সব উপমা ব্যবহার করতেন। ‘বানা’ দিয়ে মাছ ধরা, নাইওর যাওয়ার নৌকা কিংবা পুবালি বাতাসের মতো সাধারণ বিষয়গুলো তাঁর হাতে পড়ে হয়ে উঠত জীবনদর্শন। ‘আষাঢ় মাইশ্যা ভাসা পানি’ গানে বাবার বাড়ি যাওয়ার যে আর্তি, তা আসলে পরপারে নিজের আদি আলয়ে ফিরে যাওয়ারই এক রূপক প্রকাশ।
উকিল মুন্সির আধ্যাত্মিক সাধনা আরও ঋদ্ধ হয়েছিল হবিগঞ্জের রিচি দরবার শরীফের পীর সৈয়দ মোজাফফর আহম্মদের সান্নিধ্যে। পীরের মুরিদ হওয়ার পর উকিলের গানে সুফি দর্শনের প্রভাব আরও প্রকট হয়। পীরের নির্দেশে তিনি পরবর্তী সময়ে গানে একতারা ছাড়া অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতেন না। এমনকি তিনি এতটাই শরিয়তপন্থী ছিলেন যে, নিজের ছবি পর্যন্ত তুলতেন না। তাঁর গানগুলো ছিল মূলত মোনাজাতের মতো; তিনি যখন গান ধরতেন, তাঁর দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরত। তাঁর সেই আবেগমাখা কণ্ঠ শ্রোতাদেরও চোখের জল ধরে রাখতে দিত না।
সুরের শক্তিতে জয় ও অমলিন উত্তরাধিকার
বাউল গান সবসময়ই লৌকিক ধর্মের কথা বলেছে, যা অনেক সময় মৌলবাদী গোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয়েছে। ১৯৫১ সালে নেত্রকোনায় বাউল গান নিষিদ্ধ করার জন্য বিশাল ধর্মসভার আয়োজন করা হয়েছিল। উকিল মুন্সি ও তাঁর সমসাময়িক সাধকদের গানের জনপ্রিয়তার কাছে সেই শক্তি হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বাউলদের সুরের ঢেউয়ে ভেসে গিয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার প্রচার।
১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ৯৩ বছর বয়সে এই মহান সাধক চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যান। আজ উকিল মুন্সির সহস্রাধিক গান মানুষের মুখে মুখে ফিরলেও তার যথাযথ কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি নেই। শিষ্যদের ছেঁড়া ডায়রি বা প্রবীণ বাউলদের স্মৃতিতেই তাঁর গানগুলো বেঁচে আছে। এমনকি গানের কথা বিকৃত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে প্রতিনিয়ত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল শব্দের বদলে অন্য শব্দ ঢুকে গেছে, যা গানের ভাবকে বদলে দিচ্ছে।
উকিল মুন্সির গানে যেমন বিরহ আছে, তেমনি আছে পরম সুন্দরের প্রতি গভীর ভক্তি। যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের বুকে নদী বইবে আর হাওরে পুবালি বাতাস খেলবে, ততক্ষণ উকিল মুন্সির গান মানুষের হৃদয়ে বিরহের পরশ বুলিয়ে যাবে।

সাহিত্য সমালোচকদের মতে, ফররুখ আহমদ কাব্যের মাধ্যমে ইসলামি ভাবধারাকে এ দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি রাষ্ট্রের কোনো আনুকূল্য পাননি। বরং তাঁকে শিকার হতে হয়েছে তীব্র প্রতিরোধ ও প্রতিহিংসার। তবুও ক্ষুরধার কলম থেমে থাকেনি।
১ দিন আগে
বরফভাঙা জাহাজে টানা আট দিনের এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় তাঁরা ৮২ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ অতিক্রম করেন। উত্তাল সমুদ্র আর কনকনে ঠান্ডার মাঝে ‘বরফের জঙ্গল’ পেরিয়ে তাঁরা বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন।
১ দিন আগে
আজ ৯ জুন, আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারকগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ব সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। মূলত প্রাচীন নথি, দলিলাদি এবং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করাই এই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
২ দিন আগে
বাংলাদেশের মানুষের কাছে রাজনীতি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয়। রাষ্ট্রের বিন্যাস আর গঠনকাঠামো বুঝতে চাওয়া পাঠকের সংখ্যা প্রচুর। এ ধরনের বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়। তবে বিগত কয়েক দশকে রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই বিশেষ বিষয়কেন্দ্রিক বই প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক স
২ দিন আগে