leadT1ad

ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গের বদলে যাওয়া রাজনীতিতে সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগ

লেখা:
লেখা:
তারুশি অশ্বিনী

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যটির মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে এক ধরনের নীরব উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা এখন প্রকাশ্যে কম কথা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সতর্কভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করছেন, এমনকি যতটা সম্ভব নজরের বাইরে থাকার চেষ্টা করছেন। তাদের মধ্যে নতুন এক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব এবার সরাসরি তাদের জীবনেও পড়তে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের ২১ বছর বয়সী প্রকৌশল শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রিজওয়ান বলেন, ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বিদ্বেষ তাকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে। ‘এখন আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগের মতো কিছু লিখতে পারি না। আগে রাজনৈতিক বিষয়ে সমালোচনা করা গেলেও এখন করি না। মনে হয়, কিছু বললে সমস্যা হতে পারে।’

তার এই ভয়ের পেছনে রয়েছে বিশেষ ঘটনা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ করার কারণে স্থানীয় এক মুসলিম যুবকের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই আটকের ঘটনার কারণেই তাঁর এই ভয় বলে তিনি দাবি করেন।

৪ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয় লাভ করে। দলটির সমর্থকেরা এটিকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে উদযাপন করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে এই ফলাফল নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বিতর্কিত নির্বাচনের অভিযোগ

সমালোচকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় ছিল ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক লড়াইগুলোর একটি। নির্বাচন কমিশন ভোটের আগে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা কর্মসূচি চালায়। কমিশনের দাবি ছিল, তারা মৃত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারদের শনাক্ত করছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লাখের বেশি ভোটারের নাম চিহ্নিত, বাদ বা যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

কেন্দ্রে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগ রয়েছে। গত ছয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন ধারাবাহিকভাবে সুপারিশ করে আসছে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের কারণে ভারতকে ‘কান্ট্রি অব পার্টিকুলার কন্সার্ন’ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো সেই সুপারিশ গ্রহণ করেনি, কমিশন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি।

নির্বাচনের আগে বিজেপির বিভিন্ন নেতা মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘উপদ্রব’, ‘কীটপতঙ্গ’ এবং ‘বাংলাদেশি’ বলে আখ্যা দেন। কেউ কেউ তাদের ভারতের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ‘জোঁক’-এর সঙ্গেও তুলনা করেন। পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ডিসেম্বরে তিনি মুসলিমদের ‘গাজার মতো শিক্ষা’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নির্বাচনে জয়ের পর তিনি ঘোষণা করেন ‘যেসব হিন্দু তাকে ভোট দিয়েছেন’ তিনি শুধু তাদের জন্যই কাজ করবেন।

কলকাতাভিত্তিক সমাজকর্মী ড. জেড আয়েশার মতে, ফল ঘোষণার আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। বিজেপি-শাসিত অন্যান্য রাজ্যে সংখ্যালঘুদের অভিজ্ঞতা দেখে তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মুসলিমদের লক্ষ্য করে বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যও সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় বাড়িয়েছে।’

তাঁর মতে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াও এই ভয়ের একটি বড় কারণ। বহু মানুষ আদালতে গিয়ে নিজেদের বৈধ কাগজপত্র দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম ফেরত পাননি। ফলে অনেক মুসলিম মনে করছেন, নির্বাচনের ফলাফলের পেছনে এই প্রক্রিয়ারও ভূমিকা ছিল।

সীমান্তে নতুন উত্তেজনা

নির্বাচনের এক মাসের মধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। ৪ জুন বাংলাদেশ জানায়, ভারত থেকে মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করার কয়েকটি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। এতে দুই দেশের মধ্যে কথিত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সীমান্তে দ্রুত অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এপ্রিল মাসে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ঘোষণা দেয়, নদীপথে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী নদী এলাকায় কুমির ও বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়া হবে। এরপর ক্ষমতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করা হবে।

এর জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারের বেড়াকে ভয় পায় না। বাংলাদেশ সরকারও ভয় পায় না। যেখানে কথা বলা দরকার, আমরা সেখানে কথা বলব।’

কলকাতাভিত্তিক সাংবাদিক ও লেখক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য মনে করেন, এই পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাঁর মতে, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এসেছে যে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির প্রধান বাধা। কিন্তু এখন বিজেপি নিজেই চুক্তিটি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে, কারণ এটি উত্তরবঙ্গের তাদের ভোটারদের একটি অংশকে অসন্তুষ্ট করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, কথিত অবৈধ অভিবাসীদের আটককেন্দ্রে রাখার পরিবর্তে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত। ‘এসব বক্তব্য দেখায় যে সীমান্তে পুশ-ইনের ঘটনা বাড়তে পারে। বিগত কয়েক দিনে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ভারত মানুষকে বাংলাদেশে পাঠাতে চাইছে, আর বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে অনেকেই নো-ম্যানস-ল্যান্ডে আটকা পড়ছে।’

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক ড. অমিত রঞ্জনের মতে, বাংলাদেশকে নিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক বক্তব্য ভারতের নিজের স্বার্থেরও ক্ষতি করতে পারে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা আগের চেয়ে ভিন্ন। বিজেপি বহু বছর ধরে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে অনুপ্রবেশ ও অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্নকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করেছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইশতেহারেও ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছিল।

রঞ্জনের মতে, গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর ভূমিকাও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশি গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ বলেন, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়ার ঘটনাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরাসহ সীমান্তবর্তী অধিকাংশ রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় ভবিষ্যতে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

‘বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছিল যে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে উত্তেজনা বাড়বে। এখন সেই আশঙ্কা সত্যি হতে দেখা যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের উদ্বেগ

এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মুসলিমদের মধ্যেই নয়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে থাকা মুহাম্মদ আলম আরজে বলেন, ‘আমরা ভারত যাওয়ার স্বপ্নও দেখি না। বিজেপি কীভাবে কাজ করে, তা আমরা জানি। শিবিরের ভেতর থেকেও সীমান্তের উত্তেজনা অনুভব করতে পারি।’

বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোর একটিতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের অনেকেই ভবিষ্যতে অন্য কোথাও নতুন জীবন শুরু করার আশা করেন। কিন্তু ভারতে দুই দশক ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী সাব্বের কিয়াও মিনের মতে, বিজেপির প্রভাব বাড়লে সেই আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিসিয়েটিভ’-এর পরিচালক মিন বলেন, ‘গত বছর আমরা দেখেছি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও সহিংসতা বেড়েছে। বাংলাদেশ আয়তনে ভারতের তুলনায় অনেক ছোট, কিন্তু আমাদের প্রতি তাদের আচরণ অনেক মানবিক।’ তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের বিভিন্ন আটককেন্দ্রে বহু রোহিঙ্গা দুর্ভোগের শিকার হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের দমদম জেলেও কিছু রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভয়, যদি এই ঘৃণার রাজনীতি চলতে থাকে, তাহলে আমাদের হয় সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হবে, নয়তো গণপিটুনির শিকার হতে হবে, অথবা বছরের পর বছর আটককেন্দ্রে কাটাতে হবে,’ বলেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত অঞ্চলের মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। তারা জানেন না রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সীমান্ত নীতি কতটা কঠোর হবে, কিংবা নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত থাকবে। তাই আপাতত তারা অপেক্ষা করছেন সামনে কী আসে তা দেখার জন্য।

  • তারুশি অশ্বিনী: ভারতীয় সাংবাদিক ও কলামিস্ট

(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250

সম্পর্কিত