নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

ট্রাম্প এখন কোন পথ বেছে নেবেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সরাসরি আলোচনায়ও সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক বৈঠকেই ইরানের কাছ থেকে বড় ধরনের ছাড় আদায় করতে পারবেন না এটি আগেই অনুমান করা হচ্ছিল। তবে কূটনৈতিক পথ স্পষ্ট না করেই ইসলামাবাদ আলোচনা শেষ হওয়ায় সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন-পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কোনো পক্ষই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ৩৯ দিনের টানা সংঘাত শেষে দুই সপ্তাহের সাময়িক

যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎও অজানা। যদিও পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার আশা প্রকাশ করেছেন, দু’পক্ষই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।

ভ্যান্সের ‘নাও বা ছেড়ে দাও’ প্রস্তাব

ইরানের সঙ্গে ২১ ঘণ্টার আলোচনা শেষে রোববার ভোরে ইসলামাবাদে প্রেস ব্রিফিংয়ে খুব কম তথ্যই প্রকাশ করেছেন ভ্যান্স। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ইরানের সামনে একটি ‘নাও বা ছেড়ে দাও’ প্রস্তাব দেন, যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের দাবি ছিল। কিন্তু তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে।

ওই প্রেস ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেন, আমরা আমাদের ‘রেড লাইন’ স্পষ্ট করেছি এবং কোথায় সমঝোতা সম্ভব সেটিও জানিয়েছি। কিন্তু ইরান আমাদের শর্ত মেনে নেয়নি।

এই অচলাবস্থা অবশ্য নতুন নয়। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনাও একইভাবে ভেস্তে গিয়েছিল। এরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে ৩৯ দিন ধরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। ওই হামলায় ইরানের সামরিক স্থাপনা, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রের পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনাগুলো বিমান হামলার শিকার হয়।

সামরিক চাপেও বদলায়নি ইরানের অবস্থান

মার্কিন প্রশাসনের ধারণা ছিল, ব্যাপক সামরিক চাপ ইরানকে নীতিগত অবস্থান বদলাতে বাধ্য করবে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, ইরান আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংকল্প আরও জোরদার করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ ও জটিল আলোচনায় আটকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও ট্রাম্প মনে করেন, তিনিই এই যুদ্ধে বিজয়ী এবং তাই তাঁর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের ভাষায়- ইরানের উচিত ‘আত্মসমর্পণ’ করা।

যদিও অতীত অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র দেখায়। বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করতে প্রায় দুই বছর লেগেছিল এবং সেখানে ছিল একাধিক সমঝোতা।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দু পরমাণু কার্যক্রম ও হরমুজ প্রণালি

বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। ইরান এই প্রণালিকে তাদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের দাবি– যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবির বেশিরভাগই প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জানিয়েছে, কোনো চুক্তি হলে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

এ ছাড়া ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ছাড়তে রাজি নয়। তারা বলছে, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম চালানোর অধিকার তাদের রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে, ইরানের বর্তমান সক্ষমতা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে দুই কঠিন পথ

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। দুটিই কঠিন। একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। যুদ্ধ ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুদ্ধের হুমকি, কিন্তু ঝুঁকিও বড়

বর্তমানে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় চাপের কৌশল হলো সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর হুমকি। তবে ২১ এপ্রিল শেষ হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির পর পুনরায় শুরু হলে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বড় হতে পারে।

বিশেষ করে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির যে দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখনও কাটেনি। বাজারে সাময়িক স্থিতিশীলতা ফিরলেও নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আলোচনার এই পর্ব শেষে একটি বিষয় পরিষ্কার—উভয়পক্ষই নিজেদেরকে শক্ত অবস্থানে মনে করছে, ফলে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এতে শেষপর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

সম্পর্কিত