ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প

নিখোঁজের তালিকায় ৫০ হাজার, নিহত বেড়ে ১৪৩০

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় পরপর দুই শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কাই সত্য হতে পারে। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩০ জনের মরদেহ উদ্ধার হলেও মূল দুশ্চিন্তা বিপুল সংখ্যক নিখোঁজদের নিয়ে। জাতিসংঘের আনুমানিক হিসাবে, এই সংখ্যা ৫০ হাজারের মতো। তাঁদের জীবিত উদ্ধারে সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে। খবর আলজাজিরার।

গত বুধবার (২৪ জুন) আঘাত হানা ওই দুই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫। এতে দেশটির উপকূলীয় লা গুইরা এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে সরকারি উদ্ধারকারী দল সংকটে পড়েছে। স্থানীয় লোকজন খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজছেন। ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, জীবিত উদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরকারি উদ্ধারকারী দলের উপস্থিতি খুবই কম। যদিও কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী সরকারি তৎপরতার চিত্র তুলে ধরছে।

জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, এখন প্রত্যেকটি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা অলৌকিক ঘটনার মতো। এই ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা কিছুই গোপন করব না।

সরকারি বাহিনী লা গুইরায় বেঁচে যাওয়া মানুষের মাঝে খাদ্য ও পানি বিতরণ করেছে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, জীবিতদের উদ্ধারের এই সংকটপূর্ণ সময়ে তার সরকার সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে। তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ও মানবিক সহায়তার আগমনকে স্বাগতও জানান।

ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, লা গুইরাকে ‘সামরিক নিয়ন্ত্রণে’ আনা হয়েছে এবং আরও সহায়তা আসছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রয়োজনের তুলনায় এ সহায়তা খুবই অপ্রতুল।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ চলতি বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে দেশটি থেকে তুলে নিয়ে যায়।

শনিবার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন থেকে ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে।

এদিকে শনিবার (২৭ জুন) আরাগুয়া অঙ্গরাজ্যের উপকূলে ৪ দশমিক ৮ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূকম্পন কেন্দ্র। তবে এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

‘নিজেদের বাড়িতে ফিরতে ভয় পাচ্ছে মানুষ’

নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিজিটাল ডাটাবেজে এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন।

শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত আহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, এ দুর্যোগে প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এর মধ্যে রাজধানী কারাকাসেই রয়েছেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ।

আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ এক বিবৃতিতে বলেন, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বাস্তুচ্যুতি বাড়বে, এটা এখনই স্পষ্ট। জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে আমরা জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছে দিতে পারি এবং আগামী কঠিন দিন ও মাসগুলোতে ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে থাকতে পারি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প সময়ের ব্যবধানে কম গভীরতায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে।

আমেরিকা অঞ্চলের আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের আঞ্চলিক পরিচালক লয়েস পেস বলেন, মানুষ এখনও তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছে।

শনিবার ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য বিভিন্ন দেশের ১ হাজার ৬০০ সদস্যের উদ্ধারকারী দল দেশে পৌঁছেছে।

তবে আল জাজিরাকে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির ভেনেজুয়েলা পরিচালক নিকোল কাস্ট বলেন, উদ্ধারকারীরা ইতোমধ্যে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। আমরা আশা করি ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত মানুষ পাওয়া যেতে পারে।

নিকোল কাস্ট বলেন, ভেনেজুয়েলা আগে থেকেই মানবিক সংকটে ছিল। দেশটির বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্পদও সীমিত। আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল এলেও এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক মানুষ সম্ভবত ধ্বংসস্তূপের নিচেই থেকে যাবেন।

শনিবার এক মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে মেরামত করা হয়েছে। ফলে ত্রাণ সহায়তা আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

‘স্বজনদের খুঁজে পেতে সংগ্রাম’

রাজধানী কারাকাসের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি চাকাও। সেখান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নরিস সোটো জানান, জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা এখন অনেকটাই ক্ষীণ।

তিনি বলেন, ভারী যন্ত্রপাতি ও ড্রিল ব্যবহার করে এখনও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে।

তিনি আরও বলেন, উদ্ধারকারীদের মতে, এ পর্যায়ে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। বিশেষ করে লা গুইরা অঙ্গরাজ্যে মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেকেই তাঁদের স্বজনদের খুঁজে পাচ্ছেন না।

নরিস বলেন, পরিস্থিতি এতটাই বিশৃঙ্খল যে মানুষ জানেন না তাঁদের স্বজনেরা কোথায় আছেন। এমনকি উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো কোথায় নেওয়া হচ্ছে, সেটিও তাঁদের জানা নেই।

Ad 300x250

সম্পর্কিত