স্ট্রিম ডেস্ক

ইসরায়েলে আটক হওয়ার আগে ও পরে মুজাহিদ বানি মুফলেহর ছবি দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই। এমনকি নিজেও আগের ছবিগুলোর দিকে তাকাতে পারেন না তিনি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেইতা শহরের এই ফিলিস্তিনি সাংবাদিক বলেন, আমি আগে কেমন ছিলাম, সেই ছবিগুলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হয়।
কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ইসরায়েলি হেফাজতে ছয় মাস কাটানোর অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে। ৩৬ বছরের মুজাহিদ বানি মুফলেহ কারাগার থেকে বের হন অত্যন্ত শীর্ণ ও দুর্বল অবস্থায়। মুখ ছিল কঙ্কালসার, চোখ বসা, এক লাফে বয়সও যেন বেড়েছে কয়েক বছর।
অথচ গ্রেপ্তারের আগে বানি মুফলেহের ডায়াবেটিস ছাড়া আর কোনো রোগ ছিল না। তিনি জানান, মাসের পর মাস নির্যাতন, শারীরিক নিপীড়ন ও চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছে।
হাসপাতালের শয্যা থেকে মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, নির্যাতন ও অপমানের ভারে আমার প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েছিল। তারা চেয়েছিল আপনি যেন ভুলে যান, আপনি কে ছিলেন।
২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়ার দুই দিন পর গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন বানি মুফলেহ। এরপর তাঁর স্ট্রোক হয়। তাঁর বিশ্বাস, ইসরায়েলি হেফাজতে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেটিই এর কারণ।
চিকিৎসকেরা জরুরি অস্ত্রোপচার করে তাঁর মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমাতে মাথার খুলির একটি অংশ অপসারণ করেন। এরপর তিনি দুই মাস কোমায় ছিলেন।

তিনি এখনো হাসপাতালে আছেন এবং দীর্ঘ ও কঠিন পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরো সময়ই সাংবাদিকতা করেছেন বানি মুফলেহ। তিনি বলেন, আটক অবস্থায় একটি চিন্তাই তাঁকে টিকিয়ে রেখেছিল— একদিন তিনি তাঁর সঙ্গে বন্দী থাকা মানুষগুলোর গল্প তুলে ধরবেন।
কিন্তু নির্যাতন এবং পরে হাসপাতালের দীর্ঘ চিকিৎসা সেই সুযোগ তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।
তিনি বলেন, আমি কখনো ভুলিনি যে আমি একজন সাংবাদিক। আটক থাকার পুরো সময় আমি ভাবতাম, একদিন আমি তাঁদের গল্প বলব, যারা আর নিজেদের হয়ে কথা বলতে পারে না। কিন্তু সময় আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি। নির্যাতিতদের গল্প লেখার আগেই আমি স্ট্রোকে আক্রান্ত হই। আর তাঁদের গল্প লেখার বদলে আমিই গল্প হয়ে গেলাম।
২০২৫ সালের ২৮ জুন বেইতা শহরে নিজের বাড়ি থেকে বানি মুফলেহকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি ইসরায়েলের প্রশাসনিক আটক নীতির আওতায় ছয় মাসের বেশি সময় আটক ছিলেন। এই নীতির অধীনে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে কারাবন্দি রাখা যায়। এসব প্রমাণ আটক ব্যক্তি বা তাঁর আইনজীবী—কেউই দেখতে পারেন না। আটকাদেশ অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত নবায়ন করা যেতে পারে। ফলে বন্দীরা জানতেই পারেন না, কবে বা আদৌ তাঁদের মুক্তি মিলবে কি না।
আটক অবস্থায় বানি মুফলেহর দাবি, তিনি মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, দীর্ঘ সময় অনাহার এবং চিকিৎসায় অবহেলার শিকার হয়েছেন।
মুক্তির কয়েক মাস পরও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। তাঁর কথা বলার গতি ধীর এবং পরিমিত। প্রতিটি বাক্যের মাঝেই শব্দ খুঁজে নিতে তাঁকে থামতে হয়।
তিনি বলেন, মনে হয় আমি বদলে গেছি। আগের মতো স্পষ্ট করে আর কথা বলতে পারি না।
ধীরে ধীরে আবার কথা বলতে শেখার সময় তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার অর্থ তাঁর সেলসঙ্গীদের কণ্ঠও বহন করা।
তিনি বলেন, আমি কখনো সামির আল-রিফাইকে ভুলব না। তিনি পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন মানুষ ছিলেন। সামির ও আমাকে একসঙ্গে আদালতে নেওয়া হয়েছিল। ফিরে আসার পর আমাদের নির্যাতন করা হয়। তাঁর শরীরের ওপর যা করা হয়েছিল, তা আর সহ্য করতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, পরে কারারক্ষীরা আমাদের সেলে ঢুকে ভেতরে মরিচের স্প্রে ছিটিয়ে দেয়। সামির মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি আর ফিরে আসেননি। পরে আমরা শুধু শুনেছিলাম, তিনি মারা গেছেন।
আল-রিফাই একমাত্র বন্দী নন, যার মৃত্যু মুফলেহর স্মৃতিতে গেঁথে আছে। আরেকজন ছিলেন ২০ বছর বয়সী বন্দী আহমাদ তাজাজাহ। মুফলেহর ভাষ্য, কারাগারে নির্যাতনের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।

তিনি বলেন, নির্যাতনের সময় আহমাদ তাজাজাহর ওপর একটি কুকুর ছেড়ে দেয়, যা তাঁর মুখ ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ক্ষতগুলোতে সংক্রমণ হয়। তাঁর যা দরকার ছিল, তা হলো অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স।
কিন্তু তার বদলে তাঁকে দিনের পর দিন কষ্ট পেতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি অবিরাম বমি করতে শুরু করেন। পরে তাঁকে কারাগারের আঙিনায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আর জীবিত ফিরে আসেননি।
সবকিছুর পরও বানি মুফলেহ বলেন, তিনি কখনো নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে ভাবা বন্ধ করেননি।
শারীরিকভাবে আবার সাংবাদিকতায় ফেরা কঠিন হলেও তিনি বলেন, এসব গল্প বলা তাঁর নিজের সুস্থ হয়ে ওঠারই একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কারাগারে রেখে আসা মানুষগুলোর কাছে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— তাঁদের গল্প বলবেন— সেটি তিনি এখনো রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা থেকে ২০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতন, অনাহারে রাখা, চিকিৎসায় অবহেলা এবং যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এসব পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি হেফাজতে অন্তত ৮৪ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
কারাগারে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের স্মৃতিই শুধু মুফলেহর সঙ্গে নেই। নির্যাতনের সেই সময়ে বাইরের পৃথিবী থেকে তিনি শুধু একটি স্মৃতিকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন—তাঁর ছোট ছেলে আরবের মুখ।
তিনি বলেন, কারাগারে আমি বারবার আমার ছেলে আরবের মুখ মনে করার চেষ্টা করতাম। যাতে কারাগারে মারা যাওয়া মানুষগুলোর মুখ আমাকে গ্রাস না করে। কিন্তু আমি শুধু একটি স্মৃতিই মনে করতে পারতাম— ইসরায়েলি সেনারা যখন আমাদের বাড়ি থেকে আমাকে গ্রেপ্তার করছিল, তখন সে কাঁদছিল।
তিনি আরও বলেন, তারা আমাকে মারধর ও নির্যাতন করার পর আমি মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় তাঁর দিকে তাকিয়েছিলাম। সে কাঁদছিল। সেটিই ছিল আমার শেষ স্মৃতি, যা আমার সঙ্গে রয়ে গিয়েছিল।
কারাগারের স্মৃতিগুলো মুছে যায়নি। সেগুলো তাঁর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
তাঁর স্ত্রী নুহা আল-শুরফা বলেন, পরিবর্তন শুধু তাঁর শরীরেই নয়, পরিবারটির প্রতিদিনের জীবনেও স্পষ্ট। কারণ, তাঁরা তাঁর ফিরে আসার পর নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আল-শুরফা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, মুজাহিদ যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন মনে হয়েছিল যেন আমাদের পরিবার আবার জীবনে ফিরে এসেছে। তিনি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ফিরেছেন। আটক অবস্থায় তাঁর প্রায় ২৫ কেজি ওজন কমে গেছে।
তিনি বলেন, কারাগারে থাকার পুরো সময়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাননি। তাঁকে ধীরে ধীরে হলেও সুস্থ হতে দেখলে আমাদের আশা জাগে এবং এগিয়ে চলার শক্তি পাই।
তিনি আরও বলেন, তাঁর অবস্থা এখনো নাজুক এবং পুরোপুরি সুস্থ হওয়া থেকে তিনি অনেক দূরে। এখনো তিনি বেশির ভাগ ধরনের তরল পান করতে পারেন না। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে এমনকি পানি পান করতেও তাঁর সমস্যা হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এতে তাঁর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে এবং ফুসফুসে প্রভাব ফেলতে পারে।
আল-শুরফা বলেন, আমরা জানি, তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার পথ এখনো অনেক বাকি এবং প্রতিদিন তাঁকে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কিন্তু তাঁকে আবার আমাদের কাছে ফিরে পাওয়ার জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ এবং প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা তাঁর পাশে থাকব।
পরিবারের কাছে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার মানে ছোট ছোট সাফল্য— কিছুটা বেশি কষ্ট ছাড়া কথা বলতে পারা, কারও সাহায্য ছাড়া আরও একটি পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা একটু কম ব্যথায় কাটানো একটি দিন।
বানি মুফলেহর কাছে এই অভিজ্ঞতা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোকেও নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
তিনি বলেন, আটক অবস্থায় আমি বুঝেছি প্রকৃত ক্ষুধা কাকে বলে— যে খাবারের জন্য অপেক্ষা করেও কখনো যথেষ্ট খাবার মেলে না, পেটব্যথা নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই অনুভূতি নিয়ে ঘুম থেকে ওঠা। আমি শিখেছি, একটি সাধারণ রুটিও কীভাবে স্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে, আর এক চুমুক ঠান্ডা পানি কীভাবে স্বর্গের আশীর্বাদের মতো মনে হতে পারে।
তিনি বলেন, সুস্থ হয়ে ওঠার পথ তাঁকে আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে। সুস্থ হওয়ার পুরো সময় আমি অসহায়ত্বের অর্থ শিখেছি— যখন বিছানা থেকে ওঠাই একটি যুদ্ধ হয়ে যায়, একটি পদক্ষেপ নেওয়াই অর্জন বলে মনে হয়, ব্যথা ছাড়া শ্বাস নেওয়া একটি আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয় এবং শান্তিতে একটি রাতের ঘুম অনেক দূরের বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।
সেই মাসগুলো আমাকে শিখিয়েছে, জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ আমরা আগে যেসব বড় বিষয় ভেবেছি, সেগুলো নয়। বরং সেগুলো হলো প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্ত, যেগুলোর মধ্যে আমরা বেঁচে থাকতাম, অথচ কখনো সেগুলোকে লক্ষ্যই করতাম না বলেন তিনি।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই

ইসরায়েলে আটক হওয়ার আগে ও পরে মুজাহিদ বানি মুফলেহর ছবি দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই। এমনকি নিজেও আগের ছবিগুলোর দিকে তাকাতে পারেন না তিনি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেইতা শহরের এই ফিলিস্তিনি সাংবাদিক বলেন, আমি আগে কেমন ছিলাম, সেই ছবিগুলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হয়।
কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ইসরায়েলি হেফাজতে ছয় মাস কাটানোর অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে। ৩৬ বছরের মুজাহিদ বানি মুফলেহ কারাগার থেকে বের হন অত্যন্ত শীর্ণ ও দুর্বল অবস্থায়। মুখ ছিল কঙ্কালসার, চোখ বসা, এক লাফে বয়সও যেন বেড়েছে কয়েক বছর।
অথচ গ্রেপ্তারের আগে বানি মুফলেহের ডায়াবেটিস ছাড়া আর কোনো রোগ ছিল না। তিনি জানান, মাসের পর মাস নির্যাতন, শারীরিক নিপীড়ন ও চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছে।
হাসপাতালের শয্যা থেকে মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, নির্যাতন ও অপমানের ভারে আমার প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েছিল। তারা চেয়েছিল আপনি যেন ভুলে যান, আপনি কে ছিলেন।
২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়ার দুই দিন পর গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন বানি মুফলেহ। এরপর তাঁর স্ট্রোক হয়। তাঁর বিশ্বাস, ইসরায়েলি হেফাজতে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেটিই এর কারণ।
চিকিৎসকেরা জরুরি অস্ত্রোপচার করে তাঁর মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমাতে মাথার খুলির একটি অংশ অপসারণ করেন। এরপর তিনি দুই মাস কোমায় ছিলেন।

তিনি এখনো হাসপাতালে আছেন এবং দীর্ঘ ও কঠিন পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরো সময়ই সাংবাদিকতা করেছেন বানি মুফলেহ। তিনি বলেন, আটক অবস্থায় একটি চিন্তাই তাঁকে টিকিয়ে রেখেছিল— একদিন তিনি তাঁর সঙ্গে বন্দী থাকা মানুষগুলোর গল্প তুলে ধরবেন।
কিন্তু নির্যাতন এবং পরে হাসপাতালের দীর্ঘ চিকিৎসা সেই সুযোগ তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।
তিনি বলেন, আমি কখনো ভুলিনি যে আমি একজন সাংবাদিক। আটক থাকার পুরো সময় আমি ভাবতাম, একদিন আমি তাঁদের গল্প বলব, যারা আর নিজেদের হয়ে কথা বলতে পারে না। কিন্তু সময় আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি। নির্যাতিতদের গল্প লেখার আগেই আমি স্ট্রোকে আক্রান্ত হই। আর তাঁদের গল্প লেখার বদলে আমিই গল্প হয়ে গেলাম।
২০২৫ সালের ২৮ জুন বেইতা শহরে নিজের বাড়ি থেকে বানি মুফলেহকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি ইসরায়েলের প্রশাসনিক আটক নীতির আওতায় ছয় মাসের বেশি সময় আটক ছিলেন। এই নীতির অধীনে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে কারাবন্দি রাখা যায়। এসব প্রমাণ আটক ব্যক্তি বা তাঁর আইনজীবী—কেউই দেখতে পারেন না। আটকাদেশ অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত নবায়ন করা যেতে পারে। ফলে বন্দীরা জানতেই পারেন না, কবে বা আদৌ তাঁদের মুক্তি মিলবে কি না।
আটক অবস্থায় বানি মুফলেহর দাবি, তিনি মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, দীর্ঘ সময় অনাহার এবং চিকিৎসায় অবহেলার শিকার হয়েছেন।
মুক্তির কয়েক মাস পরও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। তাঁর কথা বলার গতি ধীর এবং পরিমিত। প্রতিটি বাক্যের মাঝেই শব্দ খুঁজে নিতে তাঁকে থামতে হয়।
তিনি বলেন, মনে হয় আমি বদলে গেছি। আগের মতো স্পষ্ট করে আর কথা বলতে পারি না।
ধীরে ধীরে আবার কথা বলতে শেখার সময় তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার অর্থ তাঁর সেলসঙ্গীদের কণ্ঠও বহন করা।
তিনি বলেন, আমি কখনো সামির আল-রিফাইকে ভুলব না। তিনি পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন মানুষ ছিলেন। সামির ও আমাকে একসঙ্গে আদালতে নেওয়া হয়েছিল। ফিরে আসার পর আমাদের নির্যাতন করা হয়। তাঁর শরীরের ওপর যা করা হয়েছিল, তা আর সহ্য করতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, পরে কারারক্ষীরা আমাদের সেলে ঢুকে ভেতরে মরিচের স্প্রে ছিটিয়ে দেয়। সামির মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি আর ফিরে আসেননি। পরে আমরা শুধু শুনেছিলাম, তিনি মারা গেছেন।
আল-রিফাই একমাত্র বন্দী নন, যার মৃত্যু মুফলেহর স্মৃতিতে গেঁথে আছে। আরেকজন ছিলেন ২০ বছর বয়সী বন্দী আহমাদ তাজাজাহ। মুফলেহর ভাষ্য, কারাগারে নির্যাতনের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।

তিনি বলেন, নির্যাতনের সময় আহমাদ তাজাজাহর ওপর একটি কুকুর ছেড়ে দেয়, যা তাঁর মুখ ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ক্ষতগুলোতে সংক্রমণ হয়। তাঁর যা দরকার ছিল, তা হলো অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স।
কিন্তু তার বদলে তাঁকে দিনের পর দিন কষ্ট পেতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি অবিরাম বমি করতে শুরু করেন। পরে তাঁকে কারাগারের আঙিনায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আর জীবিত ফিরে আসেননি।
সবকিছুর পরও বানি মুফলেহ বলেন, তিনি কখনো নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে ভাবা বন্ধ করেননি।
শারীরিকভাবে আবার সাংবাদিকতায় ফেরা কঠিন হলেও তিনি বলেন, এসব গল্প বলা তাঁর নিজের সুস্থ হয়ে ওঠারই একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কারাগারে রেখে আসা মানুষগুলোর কাছে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— তাঁদের গল্প বলবেন— সেটি তিনি এখনো রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা থেকে ২০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতন, অনাহারে রাখা, চিকিৎসায় অবহেলা এবং যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এসব পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি হেফাজতে অন্তত ৮৪ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
কারাগারে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের স্মৃতিই শুধু মুফলেহর সঙ্গে নেই। নির্যাতনের সেই সময়ে বাইরের পৃথিবী থেকে তিনি শুধু একটি স্মৃতিকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন—তাঁর ছোট ছেলে আরবের মুখ।
তিনি বলেন, কারাগারে আমি বারবার আমার ছেলে আরবের মুখ মনে করার চেষ্টা করতাম। যাতে কারাগারে মারা যাওয়া মানুষগুলোর মুখ আমাকে গ্রাস না করে। কিন্তু আমি শুধু একটি স্মৃতিই মনে করতে পারতাম— ইসরায়েলি সেনারা যখন আমাদের বাড়ি থেকে আমাকে গ্রেপ্তার করছিল, তখন সে কাঁদছিল।
তিনি আরও বলেন, তারা আমাকে মারধর ও নির্যাতন করার পর আমি মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় তাঁর দিকে তাকিয়েছিলাম। সে কাঁদছিল। সেটিই ছিল আমার শেষ স্মৃতি, যা আমার সঙ্গে রয়ে গিয়েছিল।
কারাগারের স্মৃতিগুলো মুছে যায়নি। সেগুলো তাঁর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
তাঁর স্ত্রী নুহা আল-শুরফা বলেন, পরিবর্তন শুধু তাঁর শরীরেই নয়, পরিবারটির প্রতিদিনের জীবনেও স্পষ্ট। কারণ, তাঁরা তাঁর ফিরে আসার পর নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আল-শুরফা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, মুজাহিদ যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন মনে হয়েছিল যেন আমাদের পরিবার আবার জীবনে ফিরে এসেছে। তিনি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ফিরেছেন। আটক অবস্থায় তাঁর প্রায় ২৫ কেজি ওজন কমে গেছে।
তিনি বলেন, কারাগারে থাকার পুরো সময়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাননি। তাঁকে ধীরে ধীরে হলেও সুস্থ হতে দেখলে আমাদের আশা জাগে এবং এগিয়ে চলার শক্তি পাই।
তিনি আরও বলেন, তাঁর অবস্থা এখনো নাজুক এবং পুরোপুরি সুস্থ হওয়া থেকে তিনি অনেক দূরে। এখনো তিনি বেশির ভাগ ধরনের তরল পান করতে পারেন না। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে এমনকি পানি পান করতেও তাঁর সমস্যা হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এতে তাঁর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে এবং ফুসফুসে প্রভাব ফেলতে পারে।
আল-শুরফা বলেন, আমরা জানি, তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার পথ এখনো অনেক বাকি এবং প্রতিদিন তাঁকে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কিন্তু তাঁকে আবার আমাদের কাছে ফিরে পাওয়ার জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ এবং প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা তাঁর পাশে থাকব।
পরিবারের কাছে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার মানে ছোট ছোট সাফল্য— কিছুটা বেশি কষ্ট ছাড়া কথা বলতে পারা, কারও সাহায্য ছাড়া আরও একটি পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা একটু কম ব্যথায় কাটানো একটি দিন।
বানি মুফলেহর কাছে এই অভিজ্ঞতা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোকেও নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
তিনি বলেন, আটক অবস্থায় আমি বুঝেছি প্রকৃত ক্ষুধা কাকে বলে— যে খাবারের জন্য অপেক্ষা করেও কখনো যথেষ্ট খাবার মেলে না, পেটব্যথা নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই অনুভূতি নিয়ে ঘুম থেকে ওঠা। আমি শিখেছি, একটি সাধারণ রুটিও কীভাবে স্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে, আর এক চুমুক ঠান্ডা পানি কীভাবে স্বর্গের আশীর্বাদের মতো মনে হতে পারে।
তিনি বলেন, সুস্থ হয়ে ওঠার পথ তাঁকে আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে। সুস্থ হওয়ার পুরো সময় আমি অসহায়ত্বের অর্থ শিখেছি— যখন বিছানা থেকে ওঠাই একটি যুদ্ধ হয়ে যায়, একটি পদক্ষেপ নেওয়াই অর্জন বলে মনে হয়, ব্যথা ছাড়া শ্বাস নেওয়া একটি আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয় এবং শান্তিতে একটি রাতের ঘুম অনেক দূরের বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।
সেই মাসগুলো আমাকে শিখিয়েছে, জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ আমরা আগে যেসব বড় বিষয় ভেবেছি, সেগুলো নয়। বরং সেগুলো হলো প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্ত, যেগুলোর মধ্যে আমরা বেঁচে থাকতাম, অথচ কখনো সেগুলোকে লক্ষ্যই করতাম না বলেন তিনি।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
.png)

কাতারের দোহায় যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দূতদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে না বলে জানিয়েছে ইরান। এ সিদ্ধান্তের ফলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। খবর রয়টার্সের।
২১ মিনিট আগে
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার পেশোয়ারের উপকণ্ঠে আফগানিস্তানের ড্রোন হামলায় এক নারী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ছয়জন। মঙ্গলবার (৩০ জুন) গভীর রাতে হাছান খেল সাবডিভিশনের পাস্তাওয়ানা এলাকায় ওই হামলা হয়।
২ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলকে নজিরবিহীন ও ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়তে হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতার পর নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম নিয়ে বিস্তৃত পরীক্ষা চালিয়েছে ইসরায়েল।
৩ ঘণ্টা আগে
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা নিয়ে তেহরানের প্রকাশ্য অস্বীকার আসলে পারস্যের আলোচনার কৌশল। তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ীই চলছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
৫ ঘণ্টা আগে