মাহজাবিন নাফিসা

১৯৩৯ সালে ইরানের পূর্বাঞ্ছলে সাধারণ এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেয় এক শিশু। আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় এই শিশুই সাধারণের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা। শুধু দেশ নয়, সামরিক বাহিনীসহ সর্বত্র ছিল তাঁর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ছিলেন ধর্মীয় নেতাও। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বময় কর্তৃত্ব ছিলেন।
রোববার (১ মার্চ) সকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের এই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচার করা হয় বলে তথ্য দিয়েছে বিবিসি ও সিএনএন।
খামেনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কাঠামোর সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনির নিহত হওয়া এই নেতা ছিলেন ইরানের আদর্শিক পরিচয়, আঞ্চলিক জোট এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে কয়েক দশকের সংঘাতকে গঠন করা পরাক্রমশালী এক ব্যক্তি। তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক কর্তৃত্ব ছিলেন।
১৯৮৯ সালে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে খামেনি ইরানকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী সময়, কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালিত করেন।
সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে ইরানের সার্বভৌমত্বের দৃঢ় রক্ষক। সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন এমন এক কঠোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক, যা সংস্কার ও ভিন্নমত গ্রহণের কঠোর বিরোধী।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন এবং সশস্ত্র বাহিনী ও ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বজায় রাখতেন।
খামেনি ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে এক সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় মক্তব ও মাদ্রাসায়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি মাশহাদের মাদ্রাসায় ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে কোম শহরে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। কবিতা ও সাহিত্যেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খোমেনির আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৬৩ সাল থেকে পাহলভীর গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করলেও তিনি তাঁর অবস্থানে অটল ছিলেন। এ সময় তিনি কয়েক দফা নির্বাসনও ভোগ করেন।
১৯৭৮-১৯৭৯ সালে গণআন্দোলনে রাজতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে রাজনৈতিক বন্দি ও নির্বাসিতরা দেশে ফিরে আসেন। খামেনি আবার মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে সক্রিয় হন এবং খোমেনির বিপ্লবী কর্মসূচির পক্ষে সমর্থন সংগঠিত করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনি বিপ্লবী পরিষদে যোগ দেন এবং দ্রুত নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তেহরানের জুমার খতিব এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজাই নিহত হওয়ার পর খামেনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরে এক মসজিদে ভাষণ দেওয়ার সময় টেপ রেকর্ডারের ভেতরে লুকানো বোমা বিস্ফোরণে তিনি আহত হন এবং তার ডান হাত স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই পদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়।

প্রথমদিকে তাঁকে আপসের নেতা হিসেবে দেখা হলেও ধীরে ধীরে তিনি ক্ষমতা সুসংহত করেন এবং সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের প্রভাব নির্বাহী ও আইনসভা উভয়ের ওপর বাড়িয়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিরোধ, আঞ্চলিক জোট সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত প্রতিরোধ বজায় রাখাকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে।
বরাবরই ইরানের রাজনীতি সংস্কারপন্থী ও রক্ষণশীল ধারার মধ্যে দোলাচলে ছিল। ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির বিজয় জনমনে আশাবাদ সৃষ্টি করলেও খামেনি এ বিষয়ে তেমন আগাতে দেননি। মাহমুদ আহমাদিনেজাদের শাসনামল রক্ষণশীল নীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পরবর্তী সরকারগুলোও বাস্তববাদ ও আদর্শিক কঠোরতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার পথ অনুসরণ করেন, যার মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা ছিল উল্লেখযোগ্য। রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি খামেনির নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করেন।
খামেনির সময়ে বারবার বিক্ষোভ দেখা গেছে। ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়, যা গভীর সামাজিক অসন্তোষকে প্রকাশ করে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে আবার বিক্ষোভ শুরু হয়, যা প্রথমে অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে হলেও পরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এতে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৩,১০০ জনের বেশি নিহত হয়।
খামেনির শাসনামলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে।
২০১৫ সালে ইরান যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা চুক্তিতে পৌঁছে, যেখানে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলে চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। এরপর ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির শর্ত মানা কমিয়ে দেয়।
খামেনির মৃত্যুর সময় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলছিল। খামেনি সবসময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণনা করতেন এবং নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে দেখতেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি পারমাণবিক শক্তিকে ‘অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ বলে উল্লেখ করেন।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন খামেনির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবর গাজা যুদ্ধের পর তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বক্তব্য আরও তীব্র করেন এবং বিভিন্ন দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান।
এছাড়াও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাক ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন করা। ইরানি কর্মকর্তারা একে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে উল্লেখ করেন। এটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরোধিতা করে।
খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করে আসছেন। এই জোটকে তিনি ইরানের প্রধান শত্রু মনে করতেন। তিনি তেল আবিবের সঙ্গে সম্ভাবনা সকল আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেন। সাম্প্রতিক আন্দোলঙ্কে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান জানায়।
খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা তথ্য ও অত্যাধুনিক অনুসরণ ব্যবস্থার হাত থেকে তিনি পালাতে পারেননি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আমরা নিশ্চিত করেছি যে তিনি ও তার সঙ্গে নিহত অন্য নেতারা কিছুই করতে পারেননি।’
তিনি আবারও ‘ইরানের জনগণকে তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের’ আহ্বান জানান।
খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শাসকের অবসান ঘটাল। তিনি আজীবন ইরানের আদর্শিক পরিচয় নিয়ে সংগ্রাম করে গেছেন।
তার মৃত্যুর পর তেহরানে সৃষ্টি হওয়া অনিশ্চয়তা তার শাসনামলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আঞ্চলিক উত্তেজনা, নাজুক কূটনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই ইরানকে এখন নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, রয়টার্স, বিবিসি

১৯৩৯ সালে ইরানের পূর্বাঞ্ছলে সাধারণ এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেয় এক শিশু। আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় এই শিশুই সাধারণের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা। শুধু দেশ নয়, সামরিক বাহিনীসহ সর্বত্র ছিল তাঁর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ছিলেন ধর্মীয় নেতাও। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বময় কর্তৃত্ব ছিলেন।
রোববার (১ মার্চ) সকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের এই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচার করা হয় বলে তথ্য দিয়েছে বিবিসি ও সিএনএন।
খামেনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কাঠামোর সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনির নিহত হওয়া এই নেতা ছিলেন ইরানের আদর্শিক পরিচয়, আঞ্চলিক জোট এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে কয়েক দশকের সংঘাতকে গঠন করা পরাক্রমশালী এক ব্যক্তি। তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক কর্তৃত্ব ছিলেন।
১৯৮৯ সালে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে খামেনি ইরানকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী সময়, কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালিত করেন।
সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে ইরানের সার্বভৌমত্বের দৃঢ় রক্ষক। সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন এমন এক কঠোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক, যা সংস্কার ও ভিন্নমত গ্রহণের কঠোর বিরোধী।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন এবং সশস্ত্র বাহিনী ও ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বজায় রাখতেন।
খামেনি ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে এক সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় মক্তব ও মাদ্রাসায়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি মাশহাদের মাদ্রাসায় ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে কোম শহরে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। কবিতা ও সাহিত্যেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খোমেনির আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৬৩ সাল থেকে পাহলভীর গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করলেও তিনি তাঁর অবস্থানে অটল ছিলেন। এ সময় তিনি কয়েক দফা নির্বাসনও ভোগ করেন।
১৯৭৮-১৯৭৯ সালে গণআন্দোলনে রাজতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে রাজনৈতিক বন্দি ও নির্বাসিতরা দেশে ফিরে আসেন। খামেনি আবার মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে সক্রিয় হন এবং খোমেনির বিপ্লবী কর্মসূচির পক্ষে সমর্থন সংগঠিত করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনি বিপ্লবী পরিষদে যোগ দেন এবং দ্রুত নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তেহরানের জুমার খতিব এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজাই নিহত হওয়ার পর খামেনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরে এক মসজিদে ভাষণ দেওয়ার সময় টেপ রেকর্ডারের ভেতরে লুকানো বোমা বিস্ফোরণে তিনি আহত হন এবং তার ডান হাত স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই পদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়।

প্রথমদিকে তাঁকে আপসের নেতা হিসেবে দেখা হলেও ধীরে ধীরে তিনি ক্ষমতা সুসংহত করেন এবং সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের প্রভাব নির্বাহী ও আইনসভা উভয়ের ওপর বাড়িয়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিরোধ, আঞ্চলিক জোট সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত প্রতিরোধ বজায় রাখাকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে।
বরাবরই ইরানের রাজনীতি সংস্কারপন্থী ও রক্ষণশীল ধারার মধ্যে দোলাচলে ছিল। ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির বিজয় জনমনে আশাবাদ সৃষ্টি করলেও খামেনি এ বিষয়ে তেমন আগাতে দেননি। মাহমুদ আহমাদিনেজাদের শাসনামল রক্ষণশীল নীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পরবর্তী সরকারগুলোও বাস্তববাদ ও আদর্শিক কঠোরতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার পথ অনুসরণ করেন, যার মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা ছিল উল্লেখযোগ্য। রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি খামেনির নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করেন।
খামেনির সময়ে বারবার বিক্ষোভ দেখা গেছে। ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়, যা গভীর সামাজিক অসন্তোষকে প্রকাশ করে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে আবার বিক্ষোভ শুরু হয়, যা প্রথমে অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে হলেও পরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এতে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৩,১০০ জনের বেশি নিহত হয়।
খামেনির শাসনামলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে।
২০১৫ সালে ইরান যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা চুক্তিতে পৌঁছে, যেখানে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলে চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। এরপর ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির শর্ত মানা কমিয়ে দেয়।
খামেনির মৃত্যুর সময় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলছিল। খামেনি সবসময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণনা করতেন এবং নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে দেখতেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি পারমাণবিক শক্তিকে ‘অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ বলে উল্লেখ করেন।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন খামেনির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবর গাজা যুদ্ধের পর তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বক্তব্য আরও তীব্র করেন এবং বিভিন্ন দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান।
এছাড়াও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাক ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন করা। ইরানি কর্মকর্তারা একে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে উল্লেখ করেন। এটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরোধিতা করে।
খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করে আসছেন। এই জোটকে তিনি ইরানের প্রধান শত্রু মনে করতেন। তিনি তেল আবিবের সঙ্গে সম্ভাবনা সকল আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেন। সাম্প্রতিক আন্দোলঙ্কে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান জানায়।
খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা তথ্য ও অত্যাধুনিক অনুসরণ ব্যবস্থার হাত থেকে তিনি পালাতে পারেননি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আমরা নিশ্চিত করেছি যে তিনি ও তার সঙ্গে নিহত অন্য নেতারা কিছুই করতে পারেননি।’
তিনি আবারও ‘ইরানের জনগণকে তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের’ আহ্বান জানান।
খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শাসকের অবসান ঘটাল। তিনি আজীবন ইরানের আদর্শিক পরিচয় নিয়ে সংগ্রাম করে গেছেন।
তার মৃত্যুর পর তেহরানে সৃষ্টি হওয়া অনিশ্চয়তা তার শাসনামলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আঞ্চলিক উত্তেজনা, নাজুক কূটনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই ইরানকে এখন নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, রয়টার্স, বিবিসি

ইরানে হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। প্রায় চার দশক ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বময় কর্তৃত্বের কেন্দ্র হিসেবে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েল নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধকে একটি বিপজ্জনক যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন। তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধের পরিণতি হতে পারে কল্পনার অতীত।
২০ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। রক্তক্ষয়ী এই সহিংসতার সবশেষ খবরাখবর পড়ুন স্ট্রিমের লাইভ ফিডে।
১ দিন আগে
ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি দূর করতে দেশটিতে হামলা করা হয়েছে।
১ দিন আগে